জাতিসংঘের মহাসচিব কে হচ্ছেন

তথ্যসূত্র:
তথ্যসূত্র:
রয়টার্স

প্রকাশ : ২২ এপ্রিল ২০২৬, ১৯: ৫৬
স্ট্রিম গ্রাফিক

বিশ্ব রাজনীতিতে জাতিসংঘের মহাসচিব পদটি বৈশ্বিক নেতৃত্ব ও নৈতিকতার প্রতীক। ২০২৭ সালের ১ জানুয়ারি থেকে আবারও পাঁচ বছরের জন্য শুরু হতে যাচ্ছে দশম মহাসচিবের মেয়াদ। এই পদকে কেন্দ্র করে এখন বিশ্ব কূটনীতিতে চলছে নীরব প্রতিযোগিতা।

বর্তমান মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের পর যিনি মহাসচিবের পদে বসবেন, তাঁকে একদিকে যেমন যুদ্ধ, জলবায়ু সংকট, অর্থনৈতিক বৈষম্যের মুখোমুখি হতে হবে, তেমনি অন্যদিকে ভেঙে পড়া বহুপাক্ষিক অবস্থার জটিল বাস্তবতাও সামলাতে হবে। এই প্রেক্ষাপটে প্রার্থীরা শুধু নিজেদের রাষ্ট্রীয় অভিজ্ঞতা নয়, বরং বৈশ্বিক নেতৃত্বের দর্শনও সামনে আনছেন।

সাধারণত জাতিসংঘের মহাসচিব নির্বাচিত হয় নিরাপত্তা পরিষদের সুপারিশ এবং সাধারণ পরিষদের অনুমোদনের মাধ্যমে। নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী পাঁচ সদস্য যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, চীন, যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্স এখানে কার্যত নির্ধারক ভূমিকা পালন করেন। ফলে প্রার্থীদের ব্যক্তিগত যোগ্যতার পাশাপাশি বড় শক্তিগুলোর সমর্থনও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

সম্প্রতি যুক্তরাজ্যভিত্তিক সংবাদমাধ্যম ‘রয়টার্স’ জাতিসংঘের মহাসচিব নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী প্রার্থীদের তালিকা প্রকাশ করে সংবাদ প্রকাশ করেন।

রাফায়েল গ্রোসি: পারমাণবিক কূটনীতির ‘সক্রিয় মধ্যস্থতাকারী’

আর্জেন্টিনার কূটনৈতিক ও আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) মহাপরিচালক রাফায়েল গ্রোসি এই দৌড়ে অন্যতম শক্তিশালী প্রার্থী । ৬৫ বছর বয়সী গ্রোসি গত ছয় বছর ধরে পারমাণবিক ইস্যুগুলো সামলাচ্ছেন।

গ্রোসি ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আন্তর্জাতিক সমঝোতা রক্ষায় কাজ করছেন। ২০১৮ সালে যুক্তরাষ্ট্রের পরমাণু চুক্তি থেকে সরে যাওয়ার পর তিনি নতুন করে আলোচনায় আসেন। সব মিলিয়ে, তিনি বৈশ্বিক কূটনীতিতে নিজেকে ‘সক্রিয় মধ্যস্থতাকারী’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন।

রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের সময় বিশেষ করে ইউক্রেনের জাপোরিঝঝিয়া পারমাণবিক কেন্দ্র ঘিরে (আইএইএ) মিশন মোতায়ন করে আন্তর্জাতিক প্রশংসা কুড়িয়েছেন। গ্রোসিকে নিয়ে সমালোচকেরা বলেন, ইরান ইস্যুতে তিনি কখনও কখন অতিরিক্ত আপস করেছেন। তবে গ্রোসি নিজেকে বহুপাক্ষিকতার বাস্তববাদী সমর্থক হিসেবে তুলে ধরেছেন, যেখানে বড় শক্তিগুলোর সঙ্গে কাজ করার অভিজ্ঞতা তাঁর বড় সম্পদ।

রেবেকা গ্রিনস্প্যান: প্রথম নারী মহাসচিবের সম্ভাবনা

কোস্টারিকার অর্থনীতিবিদ এবং জাতিসংঘ বাণিজ্য ও উন্নয়ন সংস্থার প্রধান রেবেকা গ্রিনস্প্যান নিজেকে ‘সংস্কারমুখী বহুপক্ষবাদী’ হিসেবে উপস্থাপন করেছেন। ৭০ বছর বয়সী গ্রিনস্প্যান নির্বাচিত হলে তিনি হবেন জাতিসংঘের ইতিহাসে প্রথম নারী মহাসচিব।

তিনি লিঙ্গ-বৈষম্য, উন্নয়ন-বৈষম্য এবং বৈশ্বিক বাণিজ্য কাঠামোর সংস্কারের পক্ষে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছেন। তাঁর বক্তব্যে বারবার উঠে এসেছে ‘সহযোগিতামূলক জাতিসংঘ’ ধারণা। যেখানে সদস্য দেশগুলোর মধ্যে আস্থা পুনর্গঠনই মূল লক্ষ্য।

তিনি বলেছেন, ‘আমি বিশেষ সুবিধা চাই না, সমান আচরণ চাই।’ বিশ্লেষকদের মতে, তাঁর শক্তিই উন্নয়ন অর্থনীতি ও বহুপাক্ষিক বাণিজ্য কূটনীতিতে; তবে নিরাপত্তা ও সামরিক সংকট ব্যবস্থাপনায় তার অভিজ্ঞতা তুলনামূলক কম।

মিশেল বাচেলেত: মানবাধিকার অভিজ্ঞতার ভার

চিলির সাবেক প্রেসিডেন্ট মিশেল বাচেলেত জাতিসংঘের মানবাধিকার হাইকমিশনার হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। ৭৪ বছর বয়সী এই নেতা দুইবার রাষ্ট্রপ্রধান এবং জাতিসংঘে উচ্চপদে কাজ করার অভিজ্ঞতা নিয়ে প্রার্থিতায় আছেন। তবে তাঁর প্রার্থিতা ঘিরে রাজনৈতিক বিতর্ক রয়েছে।

চিলির বর্তমান সরকার তাঁর প্রতি সমর্থন প্রত্যাহার করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের কিছু রক্ষণশীল মহল তাঁর মানবাধিকার ও রাজনৈতিক বিতর্ক সংক্রান্ত অবস্থান নিয়ে সমালোচনা করছে। তবুও মানবাধিকার ও বৈশ্বিক নীতি নির্ধারণের অভিজ্ঞতা তাঁকে শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দ্বী করে তুলেছে।

ম্যাকি সাল: আফ্রিকার কূটনৈতিক কণ্ঠ

সেনেগালের সাবেক প্রেসিডেন্ট ম্যাকি সাল ১২ বছরের শাসনামল শেষে এবার আন্তর্জাতিক মঞ্চে নেতৃত্বের লক্ষ্য নিয়ে এগোচ্ছেন। ৬৪ বছর বয়সী এই ভূতত্ত্ববিদ অবকাঠামোগত উন্নয়ন, অর্থনৈতিক সংস্কার এবং আফ্রিকার উন্নয়ন এজেন্ডাকে সামনে রেখেছেন।

তিনি দীর্ঘদিন ধরে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের সংস্কার দাবি করে আসছেন, যেখানে আফ্রিকার স্থায়ী সদস্যপদ নিশ্চিত করার দাবি রয়েছে। তবে আফ্রিকার মধ্যেই তাঁর সমর্থন একরকম নয়, যা তাঁর প্রার্থিতাকে কিছুটা দুর্বলও করছে। তবুও তিনি আফ্রিকার সম্ভাব্য তৃতীয় মহাসচিব হওয়ার দৌড়ে আছেন।

নির্বাচন প্রক্রিয়া ও বৈশ্বিক রাজনীতি

জাতিসংঘ আজ এমন এক সময়ে দাঁড়িয়ে আছে, যখন তার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন বাড়ছে। সমালোচকরা বলছেন, সংস্থাটিকে আরও দ্রুত, কার্যকর ও প্রতিনিধিত্বশীল হতে হবে। এই প্রেক্ষাপটে নতুন মহাসচিব নির্বাচন ভবিষ্যৎ বৈশ্বিক শাসন ব্যবস্থার দিক নির্ধারণের একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তও।

নিরাপত্তা পরিষদের সুপারিশ ছাড়া কোনো প্রার্থী নির্বাচিত হতে পারেন না এখানে। এ ছাড়া স্থায়ী সদস্যদের ভেটো ক্ষমতা এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এ কারণে অনেক বিশ্লেষক মনে করেন, এটা বৈশ্বিক শক্তির ভারসাম্যের প্রতিফলনও।

বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে যিনি নতুন মহাসচিব হবেন, তাঁকে বহুমাত্রিক চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে হবে। তবে কে হবেন পরবর্তী জাতিসংঘের মহাসচিব? গ্রোসি, গ্রিনস্প্যান, বাচেলেত, না সাল? উত্তরটি শুধু নিউইয়র্কের ভোটকক্ষে নয়, লেখা হচ্ছে বৈশ্বিক কূটনৈতিক সমীকরণে। আর সেই উত্তরই নির্ধারণ করবে জাতিসংঘ আগামী দিনে আরও শক্তিশালী হবে, নাকি বিভক্ত।

বিষয়:

জাতিসংঘ

সম্পর্কিত