সংরক্ষিত আসনের সদস্যরা কী ভূমিকা রাখেন

স্ট্রিম গ্রাফিক

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদে সংরক্ষিত নারী আসনে বিএনপি তাদের ৩৬ প্রার্থীর তালিকা দিয়েছে। জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় ঐক্যও তাদের ১৩ প্রার্থী চূড়ান্ত করেছে।

এখন প্রশ্ন সংসদ ও সংসদের বাইরে সংরক্ষিত নারী আসনের সদস্যদের ভূমিকা কী? জাতীয় সংসদে নারীদের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে এবং রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের উদ্দেশ্যে সংরক্ষিত আসনের ব্যবস্থা করা হয়েছিল। শুরুতে এই সংখ্যা কম থাকলেও ধাপে ধাপে তা বাড়িয়ে ৫০-এ উন্নীত করা হয়েছে। উদ্দেশ্য মহৎ হলেও, রাজনৈতিক বাস্তবতায় এই সদস্যদের ভূমিকা নিয়ে দীর্ঘকাল ধরে নানামুখী বিতর্ক রয়েছে। এর পেছনে কিছু কাঠামোগত ও রাজনৈতিক কারণ বিদ্যমান-

প্রথমত, সংরক্ষিত আসনের সদস্যরা সরাসরি জনগণের ভোটে নির্বাচিত হন না। সংসদে দলগুলোর প্রাপ্ত আসন সংখ্যার আনুপাতিক হারে তারা পরোক্ষভাবে নির্বাচিত হন। সরাসরি কোনো নির্বাচনী এলাকা না থাকায় তাদের প্রত্যক্ষ জবাবদিহিতার চাপ থাকে না। ফলে অনেক ক্ষেত্রেই তাদের 'আলংকারিক সংসদ সদস্য' হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

দ্বিতীয়ত, সরাসরি নির্বাচিত একজন সংসদ সদস্য এলাকার উন্নয়নের জন্য যে পরিমাণ সরকারি থোক বরাদ্দ বা কাঠামোগত সুবিধা পান, সংরক্ষিত আসনের সদস্যরা তা পান না। প্রশাসনিক ক্ষেত্রেও তাদের প্রভাব থাকে সীমিত। ফলে এলাকার মানুষের সরাসরি কোনো উপকারে আসার সুযোগ তাদের কম থাকে। অনেক সময় দলগুলো তৃণমূলের পরীক্ষিত ও দক্ষ নারী নেত্রীদের মূল্যায়ন না করে দলের শীর্ষ নেতাদের আত্মীয়, ব্যবসায়ী বা নির্দিষ্ট বলয়ের অনুগতদের এই আসনগুলোতে মনোনয়ন দেয়। এতে নারী ক্ষমতায়নের মূল উদ্দেশ্যই ব্যাহত হয়।

তবে সীমাবদ্ধতা থাকলেও একজন সংরক্ষিত নারী সংসদ সদস্যের সংসদে কার্যকর ভূমিকা রাখার বিশাল সুযোগ রয়েছে, যদি তিনি সেটা কাজে লাগাতে চান।

আইন প্রণয়ন ও নীতি নির্ধারণ: সংসদের মূল কাজ আইন প্রণয়ন। যেহেতু সংরক্ষিত আসনের সদস্যদের সরাসরি নির্বাচনী এলাকার প্রতিদিনের সমস্যা (যেমন- রাস্তাঘাট নির্মাণ, স্থানীয় বিরোধ মেটানো) নিয়ে ব্যস্ত থাকতে হয় না, তাই তারা চাইলে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন আইন, বিল এবং নীতি নিয়ে গভীরভাবে পড়াশোনা ও গবেষণা করতে পারেন। সংসদে যেকোনো বিল পাসের সময় তারা যৌক্তিক ও তথ্যভিত্তিক বিতর্কে অংশ নিতে পারেন।

নারী ও শিশুর অধিকার রক্ষায় সোচ্চার হওয়া: দেশের মোট জনসংখ্যার অর্ধেক নারী। এই বিশাল জনগোষ্ঠীর অধিকার, নিরাপত্তা এবং বৈষম্য দূরীকরণে সংরক্ষিত আসনের সদস্যরা সবচেয়ে জোরালো কণ্ঠস্বর হতে পারেন। বাল্যবিবাহ রোধ, নারী নির্যাতন প্রতিরোধ, কর্মক্ষেত্রে নারীদের নিরাপত্তা এবং সম্পত্তিতে নারীর অধিকার সংক্রান্ত আইনগুলো সংস্কার বা নতুন বিল (প্রাইভেট মেম্বার বিল) উত্থাপনের ক্ষমতা তাদের রয়েছে।

সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে ভূমিকা: জাতীয় সংসদের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ভিত্তিক স্থায়ী কমিটিগুলো সরকারের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার অন্যতম প্রধান জায়গা। সংরক্ষিত আসনের নারী সদস্যরা এসব কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত হয়ে মন্ত্রণালয়ের কাজের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে এবং দুর্নীতি রোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারেন।

জাতীয় ইস্যুতে জনমত গঠন: একজন সংসদ সদস্য হিসেবে তারা সমগ্র দেশের প্রতিনিধি। তারা চাইলে শুধু নারী ইস্যু নয়, বরং শিক্ষা, স্বাস্থ্য, অর্থনীতি ও পররাষ্ট্রনীতির মতো গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় ইস্যুতে সংসদে কথা বলতে পারেন। জিরো আওয়ারে বা পয়েন্ট অব অর্ডারে দাঁড়িয়ে তারা দেশ ও দশের গুরুত্বপূর্ণ সমস্যাগুলো জাতির সামনে তুলে ধরতে পারেন।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ এক নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় গঠিত হতে যাচ্ছে। বিএনপি এবং জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন জোট থেকে যারা সংরক্ষিত আসনে মনোনীত হচ্ছেন, তাদের সামনে একটি বড় সুযোগ রয়েছে প্রচলিত ধারণাকে ভেঙে দেওয়ার। তারা যদি শুধু দলের ‘ভোটব্যাংক’ বা ‘লবিংয়ের ফসল’ হিসেবে নিজেদের সীমাবদ্ধ না রাখেন, তবে তারা হয়ে উঠতে পারেন সত্যিকারের জনপ্রতিনিধি।

পরিশেষে বলতে হয়, সংরক্ষিত নারী আসন ব্যবস্থাটি চিরস্থায়ী কোনো সমাধান নয়। প্রকৃত রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন তখনই সম্ভব, যখন আরও বেশি নারী সরাসরি নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে জয়ী হয়ে সংসদে আসবেন। তবে যতদিন এই সংরক্ষিত ব্যবস্থাটি চালু আছে, ততদিন এই পদটিকে কেবল ‘পুরস্কার’ হিসেবে না দেখে ‘দায়িত্ব’ হিসেবে দেখা উচিত।

রাজনৈতিক দলগুলোকেও শুধু অনুগতদের নয়, বরং যোগ্য, শিক্ষিত ও বাগ্মী নারীদের সংসদে পাঠাতে হবে। তবেই সংরক্ষিত নারী আসনের সদস্যরা সংসদে তাদের প্রকৃত ও কার্যকর ভূমিকা রাখতে সক্ষম হবেন।

সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত