স্ট্রিম ডেস্ক

ইতিহাসে প্রায় সব ধরনের সরকার—গণতান্ত্রিক, সামরিক, সমাজতান্ত্রিক কিংবা স্বৈরশাসক—কোনো না কোনো সময়ে সংবাদমাধ্যম নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করেছে। তবে সেই নিয়ন্ত্রণের ধরন এক ছিল না। কোথাও সংবাদপত্র বন্ধ করা হয়েছে, কোথাও সাংবাদিকদের কারারুদ্ধ করা হয়েছে, কোথাও পুরো মিডিয়া রাষ্ট্রীয় মালিকানায় নেওয়া হয়েছে, আবার কোথাও প্রযুক্তি ও অ্যালগরিদমকে কাজে লাগানো হয়েছে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় রেডিও ছিল সবচেয়ে শক্তিশালী মাধ্যম। আজ সেই জায়গা নিয়েছে ইন্টারনেট, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং সার্চ ইঞ্জিন। কিন্তু উদ্দেশ্য প্রায় একই—জনগণ কী জানবে, কীভাবে জানবে এবং কী বিশ্বাস করবে, তা নিয়ন্ত্রণ করা।
একসময় জার্মানিতে মিডিয়া নিয়ন্ত্রণ ছিল রাষ্ট্র পরিচালনার কেন্দ্রীয় অংশ। ১৯৩৩ সালে অ্যাডলফ হিটলার ক্ষমতায় আসার পর তাঁর প্রচারমন্ত্রী জোসেফ গোয়েবলস সংবাদপত্র, রেডিও, চলচ্চিত্র ও প্রকাশনা শিল্পকে সরকারের নিয়ন্ত্রণে আনেন।
স্বাধীন সংবাদপত্র বন্ধ করা হয়, ইহুদি বা সরকারবিরোধী সম্পাদকদের সরিয়ে দেওয়া হয় এবং প্রতিদিন সম্পাদকদের জন্য নির্দেশনা পাঠানো হতো কী খবর ছাপতে হবে। রেডিওকে ব্যবহার করা হয় সবচেয়ে বড় অস্ত্র হিসেবে। সে সময় সরকারের তরফ থেকে সস্তায় রেডিও সেট বিক্রি করা হতো যেন জনগণ তা বেশি কেনে। এভাবে সরকারের বার্তা ঘরে ঘরে পৌঁছে দেওয়া হতো।
এর উদ্দেশ্য ছিল জাতীয়তাবাদ উসকে দেওয়া, বিরোধী মত দমন করা এবং যুদ্ধ ও ইহুদিবিদ্বেষের পক্ষে জনমত তৈরি করা। ইতিহাসবিদদের মতে, আধুনিক রাষ্ট্রীয় প্রচারণার সবচেয়ে সফল উদাহরণগুলোর একটি ছিল নাৎসি শাসনামলের জার্মানি।

সোভিয়েত ইউনিয়ন: রাষ্ট্রের কণ্ঠস্বরই সংবাদ
সোভিয়েত ইউনিয়নে সংবাদমাধ্যমকে কখনোই স্বাধীন প্রতিষ্ঠান হিসেবে দেখা হয়নি। এটি ছিল রাষ্ট্র ও কমিউনিস্ট পার্টির অংশ।
প্রাভদা ও ইজভেস্তিয়ার মতো পত্রিকাগুলো সরাসরি পার্টির অবস্থান প্রচার করত। বই, চলচ্চিত্র, গবেষণা এবং সংবাদ প্রকাশের আগে সরকারি সেন্সরশিপের মধ্য দিয়ে যেতে হতো। সরকারের ব্যর্থতা, দুর্ভিক্ষ বা রাজনৈতিক দমন-পীড়নের খবর সাধারণত প্রকাশ করা হতো না।
সোভিয়েত নেতৃত্বের বিশ্বাস ছিল, রাষ্ট্রের আদর্শিক ঐক্য বজায় রাখতে তথ্যের ওপর নিয়ন্ত্রণ জরুরি। এর ফলে কয়েক প্রজন্ম এমন একটি তথ্য পরিবেশে বড় হয়েছে যেখানে রাষ্ট্রই ছিল সত্যের প্রধান উৎস।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় যুক্তরাজ্যও সংবাদপ্রবাহের ওপর কিছু নিয়ন্ত্রণ আরোপ করেছিল। ব্রিটিশ সরকারের দাবি ছিল, রাষ্ট্রের সামরিক গোপনীয়তা রক্ষার উদ্দেশ্যেই এই নিয়ন্ত্রণ আরোপ।
যুদ্ধ চলাকালে সেনাবাহিনীর অবস্থান, সামরিক পরিকল্পনা বা এমন কোনো তথ্য যা জার্মানির জন্য উপকারী হতে পারে, তা প্রকাশে নিষেধাজ্ঞা ছিল। সংবাদমাধ্যমকে সরকারের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করতে হতো।
যুদ্ধ শেষে এসব বিধিনিষেধ তুলে নেওয়া হয়। ফলে এটি স্থায়ী সেন্সরশিপে পরিণত হয়নি।
যুক্তরাষ্ট্রেও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় অনুরূপ ব্যবস্থা দেখা যায়। সরকার সাংবাদিকদের অনুরোধ করত সামরিক গোপনীয়তা রক্ষা করতে। অনেক ক্ষেত্রে সংবাদমাধ্যম স্বেচ্ছায় তথ্য প্রকাশ সীমিত রাখে।
তবে যুক্তরাষ্ট্রে সংবাদমাধ্যম পুরোপুরি রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণে যায়নি। যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর স্বাধীনতা আবার আগের অবস্থায় ফিরে আসে।
১৯৩৯ সালে গৃহযুদ্ধ শেষে জেনারেল ফ্রান্সিসকো ফ্রাঙ্কো ক্ষমতায় আসেন এবং প্রায় চার দশক স্পেন শাসন করেন। তাঁর শাসনামলে সংবাদপত্র প্রকাশের আগে সরকারি অনুমোদন প্রয়োজন হতো। বই, চলচ্চিত্র, নাটক এবং সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডও সেন্সর করা হতো। সরকারবিরোধী মতামত বা আঞ্চলিক জাতীয়তাবাদ নিয়ে আলোচনা সীমিত ছিল।
ফ্রাঙ্কো মনে করতেন রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও জাতীয় ঐক্য রক্ষার জন্য কঠোর তথ্য নিয়ন্ত্রণ প্রয়োজন।
১৯৫৯ সালের বিপ্লবের পর ফিদেল কাস্ত্রোর সরকার ধীরে ধীরে বেসরকারি সংবাদমাধ্যম রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসে। বেশিরভাগ টেলিভিশন, রেডিও ও সংবাদপত্র সরকারিভাবে পরিচালিত হতে থাকে। সরকারের যুক্তি ছিল, যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব ও পাল্টা বিপ্লবী কর্মকাণ্ড থেকে দেশকে রক্ষা করতে এই ব্যবস্থা প্রয়োজন।
সমালোচকেরা বলেন, এর ফলে স্বাধীন সাংবাদিকতার পরিসর সীমিত হয়ে পড়ে। কিন্তু কিউবান সরকার এটিকে বিপ্লবের অর্জন রক্ষার অংশ হিসেবে তুলে ধরে।
সাদ্দাম হোসেনের শাসনামলে ইরাকের সংবাদমাধ্যম কার্যত রাষ্ট্রীয় প্রচারণার যন্ত্রে পরিণত হয়েছিল।
টেলিভিশন, রেডিও এবং সংবাদপত্রে সরকার ও শাসকের ইতিবাচক চিত্র তুলে ধরা হতো। সমালোচনামূলক প্রতিবেদন প্রকাশ প্রায় অসম্ভব ছিল। সাংবাদিকদের ওপর নজরদারি ছিল কঠোর।
এখানে মিডিয়া নিয়ন্ত্রণের মূল উদ্দেশ্য ছিল শাসকের একছত্র ক্ষমতা ধরে রাখা।
১৯৭৩ সালে অগাস্তো পিনোশে ক্ষমতা দখলের পর চিলিতে বহু সংবাদপত্র বন্ধ করে দেওয়া হয়। সাংবাদিকদের গ্রেপ্তার, নির্যাতন ও নির্বাসনের ঘটনা ঘটে। সরকারের বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগগুলো সংবাদমাধ্যমে প্রকাশ করা কঠিন হয়ে পড়ে।
সামরিক সরকার মনে করত, বিরোধী কণ্ঠস্বর জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি। ফলে মিডিয়া নিয়ন্ত্রণ তাদের রাজনৈতিক কৌশলের অংশ হয়ে ওঠে।
১৯৭৬ থেকে ১৯৮৩ সালের সামরিক শাসনামলে আর্জেন্টিনায় হাজার হাজার মানুষ গুম হয়। এই সময় অনেক সংবাদমাধ্যম সামরিক সরকারের চাপের মুখে ছিল। সাংবাদিকদের ভয় দেখানো, গ্রেপ্তার এবং সেন্সরশিপ ছিল সাধারণ ঘটনা।
ফলে ‘ডার্টি ওয়ার’-এর বহু ঘটনা দীর্ঘদিন জনসাধারণের কাছে পুরোপুরি পৌঁছায়নি।
মিডিয়া নিয়ন্ত্রণের সবচেয়ে চরম উদাহরণ সম্ভবত উত্তর কোরিয়া। দেশটির সব সংবাদমাধ্যম রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণে। বিদেশি সংবাদ, ইন্টারনেট এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রচার কঠোরভাবে সীমাবদ্ধ। সাধারণ নাগরিকদের তথ্যপ্রাপ্তির সুযোগ খুবই কম।
রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম সরকার ও নেতৃত্বের ইতিবাচক চিত্র তুলে ধরে। সমালোচনামূলক বা বিকল্প তথ্যের প্রবেশ প্রায় অসম্ভব।
চীন মিডিয়া নিয়ন্ত্রণকে ডিজিটাল যুগে নিয়ে গেছে। দেশটির ‘গ্রেট ফায়ারওয়াল’ বিশ্বের সবচেয়ে বিস্তৃত অনলাইন সেন্সরশিপ ব্যবস্থাগুলোর একটি।
চীনে গুগল, ফেসবুক, টুইটার, ইউটিউবের মতো আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্ম নিষিদ্ধ বা সীমিত। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্টও পর্যবেক্ষণ করা হয় এবং সংবেদনশীল বিষয়বস্তু সরিয়ে ফেলা হয়।
চীন সরকারের মতে, জাতীয় নিরাপত্তা, সামাজিক স্থিতিশীলতা এবং ভুয়া তথ্য মোকাবিলার জন্য এই ব্যবস্থা প্রয়োজন। সমালোচকদের মতে, এটি ডিজিটাল যুগের সবচেয়ে শক্তিশালী তথ্য নিয়ন্ত্রণ কাঠামো।
২০১৬ সালের ব্যর্থ সামরিক অভ্যুত্থানের পর তুরস্কে জরুরি অবস্থা জারি করা হয়। এরপর বহু সংবাদমাধ্যম বন্ধ হয়ে যায় এবং অসংখ্য সাংবাদিক গ্রেপ্তার হন। সরকার দাবি করে, রাষ্ট্রবিরোধী নেটওয়ার্ক মোকাবিলার জন্য এসব পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
কিন্তু আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো বলেছে, এর ফলে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা উল্লেখযোগ্যভাবে সংকুচিত হয়েছে।
রাশিয়ায় বড় টেলিভিশন নেটওয়ার্কগুলোর ওপর দীর্ঘদিন ধরেই রাষ্ট্রীয় প্রভাব রয়েছে। তবে ইউক্রেন যুদ্ধের পর পরিস্থিতি আরও কঠোর হয়।
যুদ্ধসংক্রান্ত ‘মিথ্যা তথ্য’ প্রচারের বিরুদ্ধে আইন পাস করা হয়। এর ফলে অনেক স্বাধীন সংবাদমাধ্যম কার্যক্রম সীমিত করে বা রাশিয়া ছেড়ে চলে যায়।
হাঙ্গেরি দেখিয়েছে, মিডিয়া নিয়ন্ত্রণ সবসময় সরাসরি সেন্সরশিপের মাধ্যমে হয় না। দেশটিতে সরকার ঘনিষ্ঠ ব্যবসায়ী গোষ্ঠীগুলো ধীরে ধীরে বহু সংবাদমাধ্যমের মালিকানা অর্জন করেছে। ফলে সংবাদ পরিবেশনের বৈচিত্র্য কমেছে বলে সমালোচকেরা অভিযোগ করেন।
এখানে সংবাদপত্র বন্ধ করার প্রয়োজন হয়নি; মালিকানা কাঠামোই বড় ভূমিকা পালন করেছে।
সিঙ্গাপুরকে অনেক গবেষক ‘সফট কন্ট্রোল’ ব্যবস্থার উদাহরণ হিসেবে দেখেন। এখানে সংবাদমাধ্যম পুরোপুরি রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণে নয়, কিন্তু লাইসেন্স ব্যবস্থা, মানহানি আইন এবং নিয়ন্ত্রক কাঠামোর মাধ্যমে সরকার উল্লেখযোগ্য প্রভাব রাখতে পারে। ফলে এটি উত্তর কোরিয়া বা চীনের মতো কঠোর নয়, আবার পুরোপুরি মুক্তও নয়—মাঝামাঝি একটি মডেল।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশের অভিজ্ঞতা থেকে বোঝা যায় মিডিয়া নিয়ন্ত্রণের পদ্ধতি বদলেছে, কিন্তু লক্ষ্য প্রায় একই।
গোয়েবলস রেডিও ব্যবহার করেছিলেন। সোভিয়েত ইউনিয়ন ব্যবহার করেছে রাষ্ট্রীয় সংবাদপত্র। কিউবা ও উত্তর কোরিয়া রাষ্ট্রীয় মালিকানার পথ বেছে নিয়েছে। চীন প্রযুক্তি ও অ্যালগরিদমকে কাজে লাগিয়েছে। রাশিয়া তথ্যযুদ্ধকে কৌশল হিসেবে ব্যবহার করছে। আর হাঙ্গেরি দেখিয়েছে, মালিকানার মাধ্যমেও সংবাদপ্রবাহ প্রভাবিত করা যায়।
আজকের পৃথিবীতে তথ্য আটকে রাখা আগের চেয়ে কঠিন। কিন্তু তথ্যের প্রবাহকে প্রভাবিত করা, দৃশ্যমানতা নিয়ন্ত্রণ করা এবং জনমত গঠন করা এখনও সম্ভব। ফলে মিডিয়া নিয়ন্ত্রণের ইতিহাস শেষ হয়নি, নতুন প্রযুক্তির সঙ্গে নতুন রূপে তা ক্রমাগত পরিবর্তিত হচ্ছে।
তথ্যসূত্র: রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডার্স, হিউম্যান রাইটস ওয়াচ, কমিটি টু প্রোটেক্ট জার্নালিস্টস, অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল, লাইব্রেরি অব কংগ্রেস ও ইউএস হলোকাস্ট মেমোরিয়াল মিউজিয়াম

ইতিহাসে প্রায় সব ধরনের সরকার—গণতান্ত্রিক, সামরিক, সমাজতান্ত্রিক কিংবা স্বৈরশাসক—কোনো না কোনো সময়ে সংবাদমাধ্যম নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করেছে। তবে সেই নিয়ন্ত্রণের ধরন এক ছিল না। কোথাও সংবাদপত্র বন্ধ করা হয়েছে, কোথাও সাংবাদিকদের কারারুদ্ধ করা হয়েছে, কোথাও পুরো মিডিয়া রাষ্ট্রীয় মালিকানায় নেওয়া হয়েছে, আবার কোথাও প্রযুক্তি ও অ্যালগরিদমকে কাজে লাগানো হয়েছে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় রেডিও ছিল সবচেয়ে শক্তিশালী মাধ্যম। আজ সেই জায়গা নিয়েছে ইন্টারনেট, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং সার্চ ইঞ্জিন। কিন্তু উদ্দেশ্য প্রায় একই—জনগণ কী জানবে, কীভাবে জানবে এবং কী বিশ্বাস করবে, তা নিয়ন্ত্রণ করা।
একসময় জার্মানিতে মিডিয়া নিয়ন্ত্রণ ছিল রাষ্ট্র পরিচালনার কেন্দ্রীয় অংশ। ১৯৩৩ সালে অ্যাডলফ হিটলার ক্ষমতায় আসার পর তাঁর প্রচারমন্ত্রী জোসেফ গোয়েবলস সংবাদপত্র, রেডিও, চলচ্চিত্র ও প্রকাশনা শিল্পকে সরকারের নিয়ন্ত্রণে আনেন।
স্বাধীন সংবাদপত্র বন্ধ করা হয়, ইহুদি বা সরকারবিরোধী সম্পাদকদের সরিয়ে দেওয়া হয় এবং প্রতিদিন সম্পাদকদের জন্য নির্দেশনা পাঠানো হতো কী খবর ছাপতে হবে। রেডিওকে ব্যবহার করা হয় সবচেয়ে বড় অস্ত্র হিসেবে। সে সময় সরকারের তরফ থেকে সস্তায় রেডিও সেট বিক্রি করা হতো যেন জনগণ তা বেশি কেনে। এভাবে সরকারের বার্তা ঘরে ঘরে পৌঁছে দেওয়া হতো।
এর উদ্দেশ্য ছিল জাতীয়তাবাদ উসকে দেওয়া, বিরোধী মত দমন করা এবং যুদ্ধ ও ইহুদিবিদ্বেষের পক্ষে জনমত তৈরি করা। ইতিহাসবিদদের মতে, আধুনিক রাষ্ট্রীয় প্রচারণার সবচেয়ে সফল উদাহরণগুলোর একটি ছিল নাৎসি শাসনামলের জার্মানি।

সোভিয়েত ইউনিয়ন: রাষ্ট্রের কণ্ঠস্বরই সংবাদ
সোভিয়েত ইউনিয়নে সংবাদমাধ্যমকে কখনোই স্বাধীন প্রতিষ্ঠান হিসেবে দেখা হয়নি। এটি ছিল রাষ্ট্র ও কমিউনিস্ট পার্টির অংশ।
প্রাভদা ও ইজভেস্তিয়ার মতো পত্রিকাগুলো সরাসরি পার্টির অবস্থান প্রচার করত। বই, চলচ্চিত্র, গবেষণা এবং সংবাদ প্রকাশের আগে সরকারি সেন্সরশিপের মধ্য দিয়ে যেতে হতো। সরকারের ব্যর্থতা, দুর্ভিক্ষ বা রাজনৈতিক দমন-পীড়নের খবর সাধারণত প্রকাশ করা হতো না।
সোভিয়েত নেতৃত্বের বিশ্বাস ছিল, রাষ্ট্রের আদর্শিক ঐক্য বজায় রাখতে তথ্যের ওপর নিয়ন্ত্রণ জরুরি। এর ফলে কয়েক প্রজন্ম এমন একটি তথ্য পরিবেশে বড় হয়েছে যেখানে রাষ্ট্রই ছিল সত্যের প্রধান উৎস।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় যুক্তরাজ্যও সংবাদপ্রবাহের ওপর কিছু নিয়ন্ত্রণ আরোপ করেছিল। ব্রিটিশ সরকারের দাবি ছিল, রাষ্ট্রের সামরিক গোপনীয়তা রক্ষার উদ্দেশ্যেই এই নিয়ন্ত্রণ আরোপ।
যুদ্ধ চলাকালে সেনাবাহিনীর অবস্থান, সামরিক পরিকল্পনা বা এমন কোনো তথ্য যা জার্মানির জন্য উপকারী হতে পারে, তা প্রকাশে নিষেধাজ্ঞা ছিল। সংবাদমাধ্যমকে সরকারের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করতে হতো।
যুদ্ধ শেষে এসব বিধিনিষেধ তুলে নেওয়া হয়। ফলে এটি স্থায়ী সেন্সরশিপে পরিণত হয়নি।
যুক্তরাষ্ট্রেও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় অনুরূপ ব্যবস্থা দেখা যায়। সরকার সাংবাদিকদের অনুরোধ করত সামরিক গোপনীয়তা রক্ষা করতে। অনেক ক্ষেত্রে সংবাদমাধ্যম স্বেচ্ছায় তথ্য প্রকাশ সীমিত রাখে।
তবে যুক্তরাষ্ট্রে সংবাদমাধ্যম পুরোপুরি রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণে যায়নি। যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর স্বাধীনতা আবার আগের অবস্থায় ফিরে আসে।
১৯৩৯ সালে গৃহযুদ্ধ শেষে জেনারেল ফ্রান্সিসকো ফ্রাঙ্কো ক্ষমতায় আসেন এবং প্রায় চার দশক স্পেন শাসন করেন। তাঁর শাসনামলে সংবাদপত্র প্রকাশের আগে সরকারি অনুমোদন প্রয়োজন হতো। বই, চলচ্চিত্র, নাটক এবং সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডও সেন্সর করা হতো। সরকারবিরোধী মতামত বা আঞ্চলিক জাতীয়তাবাদ নিয়ে আলোচনা সীমিত ছিল।
ফ্রাঙ্কো মনে করতেন রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও জাতীয় ঐক্য রক্ষার জন্য কঠোর তথ্য নিয়ন্ত্রণ প্রয়োজন।
১৯৫৯ সালের বিপ্লবের পর ফিদেল কাস্ত্রোর সরকার ধীরে ধীরে বেসরকারি সংবাদমাধ্যম রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসে। বেশিরভাগ টেলিভিশন, রেডিও ও সংবাদপত্র সরকারিভাবে পরিচালিত হতে থাকে। সরকারের যুক্তি ছিল, যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব ও পাল্টা বিপ্লবী কর্মকাণ্ড থেকে দেশকে রক্ষা করতে এই ব্যবস্থা প্রয়োজন।
সমালোচকেরা বলেন, এর ফলে স্বাধীন সাংবাদিকতার পরিসর সীমিত হয়ে পড়ে। কিন্তু কিউবান সরকার এটিকে বিপ্লবের অর্জন রক্ষার অংশ হিসেবে তুলে ধরে।
সাদ্দাম হোসেনের শাসনামলে ইরাকের সংবাদমাধ্যম কার্যত রাষ্ট্রীয় প্রচারণার যন্ত্রে পরিণত হয়েছিল।
টেলিভিশন, রেডিও এবং সংবাদপত্রে সরকার ও শাসকের ইতিবাচক চিত্র তুলে ধরা হতো। সমালোচনামূলক প্রতিবেদন প্রকাশ প্রায় অসম্ভব ছিল। সাংবাদিকদের ওপর নজরদারি ছিল কঠোর।
এখানে মিডিয়া নিয়ন্ত্রণের মূল উদ্দেশ্য ছিল শাসকের একছত্র ক্ষমতা ধরে রাখা।
১৯৭৩ সালে অগাস্তো পিনোশে ক্ষমতা দখলের পর চিলিতে বহু সংবাদপত্র বন্ধ করে দেওয়া হয়। সাংবাদিকদের গ্রেপ্তার, নির্যাতন ও নির্বাসনের ঘটনা ঘটে। সরকারের বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগগুলো সংবাদমাধ্যমে প্রকাশ করা কঠিন হয়ে পড়ে।
সামরিক সরকার মনে করত, বিরোধী কণ্ঠস্বর জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি। ফলে মিডিয়া নিয়ন্ত্রণ তাদের রাজনৈতিক কৌশলের অংশ হয়ে ওঠে।
১৯৭৬ থেকে ১৯৮৩ সালের সামরিক শাসনামলে আর্জেন্টিনায় হাজার হাজার মানুষ গুম হয়। এই সময় অনেক সংবাদমাধ্যম সামরিক সরকারের চাপের মুখে ছিল। সাংবাদিকদের ভয় দেখানো, গ্রেপ্তার এবং সেন্সরশিপ ছিল সাধারণ ঘটনা।
ফলে ‘ডার্টি ওয়ার’-এর বহু ঘটনা দীর্ঘদিন জনসাধারণের কাছে পুরোপুরি পৌঁছায়নি।
মিডিয়া নিয়ন্ত্রণের সবচেয়ে চরম উদাহরণ সম্ভবত উত্তর কোরিয়া। দেশটির সব সংবাদমাধ্যম রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণে। বিদেশি সংবাদ, ইন্টারনেট এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রচার কঠোরভাবে সীমাবদ্ধ। সাধারণ নাগরিকদের তথ্যপ্রাপ্তির সুযোগ খুবই কম।
রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম সরকার ও নেতৃত্বের ইতিবাচক চিত্র তুলে ধরে। সমালোচনামূলক বা বিকল্প তথ্যের প্রবেশ প্রায় অসম্ভব।
চীন মিডিয়া নিয়ন্ত্রণকে ডিজিটাল যুগে নিয়ে গেছে। দেশটির ‘গ্রেট ফায়ারওয়াল’ বিশ্বের সবচেয়ে বিস্তৃত অনলাইন সেন্সরশিপ ব্যবস্থাগুলোর একটি।
চীনে গুগল, ফেসবুক, টুইটার, ইউটিউবের মতো আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্ম নিষিদ্ধ বা সীমিত। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্টও পর্যবেক্ষণ করা হয় এবং সংবেদনশীল বিষয়বস্তু সরিয়ে ফেলা হয়।
চীন সরকারের মতে, জাতীয় নিরাপত্তা, সামাজিক স্থিতিশীলতা এবং ভুয়া তথ্য মোকাবিলার জন্য এই ব্যবস্থা প্রয়োজন। সমালোচকদের মতে, এটি ডিজিটাল যুগের সবচেয়ে শক্তিশালী তথ্য নিয়ন্ত্রণ কাঠামো।
২০১৬ সালের ব্যর্থ সামরিক অভ্যুত্থানের পর তুরস্কে জরুরি অবস্থা জারি করা হয়। এরপর বহু সংবাদমাধ্যম বন্ধ হয়ে যায় এবং অসংখ্য সাংবাদিক গ্রেপ্তার হন। সরকার দাবি করে, রাষ্ট্রবিরোধী নেটওয়ার্ক মোকাবিলার জন্য এসব পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
কিন্তু আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো বলেছে, এর ফলে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা উল্লেখযোগ্যভাবে সংকুচিত হয়েছে।
রাশিয়ায় বড় টেলিভিশন নেটওয়ার্কগুলোর ওপর দীর্ঘদিন ধরেই রাষ্ট্রীয় প্রভাব রয়েছে। তবে ইউক্রেন যুদ্ধের পর পরিস্থিতি আরও কঠোর হয়।
যুদ্ধসংক্রান্ত ‘মিথ্যা তথ্য’ প্রচারের বিরুদ্ধে আইন পাস করা হয়। এর ফলে অনেক স্বাধীন সংবাদমাধ্যম কার্যক্রম সীমিত করে বা রাশিয়া ছেড়ে চলে যায়।
হাঙ্গেরি দেখিয়েছে, মিডিয়া নিয়ন্ত্রণ সবসময় সরাসরি সেন্সরশিপের মাধ্যমে হয় না। দেশটিতে সরকার ঘনিষ্ঠ ব্যবসায়ী গোষ্ঠীগুলো ধীরে ধীরে বহু সংবাদমাধ্যমের মালিকানা অর্জন করেছে। ফলে সংবাদ পরিবেশনের বৈচিত্র্য কমেছে বলে সমালোচকেরা অভিযোগ করেন।
এখানে সংবাদপত্র বন্ধ করার প্রয়োজন হয়নি; মালিকানা কাঠামোই বড় ভূমিকা পালন করেছে।
সিঙ্গাপুরকে অনেক গবেষক ‘সফট কন্ট্রোল’ ব্যবস্থার উদাহরণ হিসেবে দেখেন। এখানে সংবাদমাধ্যম পুরোপুরি রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণে নয়, কিন্তু লাইসেন্স ব্যবস্থা, মানহানি আইন এবং নিয়ন্ত্রক কাঠামোর মাধ্যমে সরকার উল্লেখযোগ্য প্রভাব রাখতে পারে। ফলে এটি উত্তর কোরিয়া বা চীনের মতো কঠোর নয়, আবার পুরোপুরি মুক্তও নয়—মাঝামাঝি একটি মডেল।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশের অভিজ্ঞতা থেকে বোঝা যায় মিডিয়া নিয়ন্ত্রণের পদ্ধতি বদলেছে, কিন্তু লক্ষ্য প্রায় একই।
গোয়েবলস রেডিও ব্যবহার করেছিলেন। সোভিয়েত ইউনিয়ন ব্যবহার করেছে রাষ্ট্রীয় সংবাদপত্র। কিউবা ও উত্তর কোরিয়া রাষ্ট্রীয় মালিকানার পথ বেছে নিয়েছে। চীন প্রযুক্তি ও অ্যালগরিদমকে কাজে লাগিয়েছে। রাশিয়া তথ্যযুদ্ধকে কৌশল হিসেবে ব্যবহার করছে। আর হাঙ্গেরি দেখিয়েছে, মালিকানার মাধ্যমেও সংবাদপ্রবাহ প্রভাবিত করা যায়।
আজকের পৃথিবীতে তথ্য আটকে রাখা আগের চেয়ে কঠিন। কিন্তু তথ্যের প্রবাহকে প্রভাবিত করা, দৃশ্যমানতা নিয়ন্ত্রণ করা এবং জনমত গঠন করা এখনও সম্ভব। ফলে মিডিয়া নিয়ন্ত্রণের ইতিহাস শেষ হয়নি, নতুন প্রযুক্তির সঙ্গে নতুন রূপে তা ক্রমাগত পরিবর্তিত হচ্ছে।
তথ্যসূত্র: রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডার্স, হিউম্যান রাইটস ওয়াচ, কমিটি টু প্রোটেক্ট জার্নালিস্টস, অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল, লাইব্রেরি অব কংগ্রেস ও ইউএস হলোকাস্ট মেমোরিয়াল মিউজিয়াম

বাংলাদেশ ও ভারতের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক নিয়ে টানাপোড়েনের মধ্যেই নতুন মোড়। গতকাল ১৪ জুন রাতে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমানকে নয়াদিল্লির ইন্দিরা গান্ধী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে কয়েক ঘণ্টা আটকে হয়রানির ঘটনায় দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক নিয়ে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
২১ ঘণ্টা আগে
বর্তমান সময়ের মতো তথ্যের এমন সহজলভ্যতা মানুষের ইতিহাসে আগে কখনো ছিল না। এখন কোনো ঘটনা ঘটার সঙ্গে সঙ্গেই তা আমাদের সামনে চলে আসে। তাই কোনো বিষয় সম্পর্কে জানা এখন আগের চেয়ে অনেক সহজ। আগে কোনো খবর সম্পর্কে জানতে হলে কখন তা টিভিতে দেখাবে বা পরদিনের খবরের কাগজের জন্য অপেক্ষা করতে হতো।
১ দিন আগে
পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বেনজীর আহমেদকে দুবাইয়ে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ইন্টারপোলের সহায়তায় দুবাই পুলিশ তাঁকে গ্রেপ্তার করেছে বলে গতকাল রোববার (১৪ জুন) খবর প্রকাশিত হয়। এরপর থেকে আলোচনায় এসেছে ‘ইন্টারপোল’ শব্দটি।
১ দিন আগে
বাংলাদেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের বরেন্দ্র অঞ্চলে তীব্র খরা। ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ায় গভীর নলকূপগুলোতে পানির সংকট দেখা দিয়েছে। কৃষকের মনে গভীর শঙ্কা। প্রখর রোদে মাটি ফেটে চৌচির হয়ে যাচ্ছে। কৃষকরা বলছেন, তাদের জীবন ও কৃষির প্রধান ভিত্তি ভূগর্ভস্থ পানি; সেটিই দ্রুত কমে যাচ্ছে।
২ দিন আগে