এক্সপ্লেইনার

শিক্ষামন্ত্রী, সেলিব্রিটি ও ট্রল সংস্কৃতি

কাজী নিশাত তাবাসসুম
কাজী নিশাত তাবাসসুম

স্ট্রিম গ্রাফিক

ফেসবুকে একেক দিন একেক ট্রেন্ড। আজ-কাল ফেসবুকে ঢুকলে একের পর এক রিলস আসছে—‘এই তোমরা কেমন আছ? ঠিকমতো পড়াশোনা কর তো? পড়তে হবে, নকল আর হবে না।’

এটি শিক্ষামন্ত্রী এহছানুল হক মিলনের বক্তব্য। সম্প্রতি তিনি শিক্ষার্থীদের সামনে নকল প্রতিরোধ নিয়ে কথা বলার সময় মন্তব্যটি করেছিলেন। এরপর থেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শুরু হয় ব্যাপক ‘ট্রল’। স্কুলপড়ুয়া শিক্ষার্থীরা তো বটেই, নানা বয়সী মানুষ দেশের জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সংকট নিয়েও শিক্ষামন্ত্রীর মন্তব্যের আদলে ট্রল ভিডিও ও মিম তৈরি করছেন।

ভিডিও ট্রল বা মিম ডিজিটাল দুনিয়ার নতুন বাস্তবতা। একটি মন্তব্য, একটি ভিডিও ক্লিপ বা একটি ভুল উচ্চারণ মুহূর্তেই হয়ে ওঠে হাজারো মিম, ভিডিও আর ব্যঙ্গ-বিদ্রূপের উপাদান। চিত্রনায়িকা পরীমনি ২০২০ সালে তাঁর জন্মদিনের অনুষ্ঠানে কথাপ্রসঙ্গে ময়ূরের ইংরেজি ‘পিকক’ বলতে গিয়ে ‘ককপিট’ বলে ফেলেন। সঙ্গে সঙ্গে শুধরে নিয়ে সঠিক উচ্চারণ করলেও, ট্রল থেকে রেহাই পাননি। তাঁর ইংরেজি জানা বা না-জানা নিয়ে ‘ট্রল’ করতে থাকেন বিপুল সংখ্যক সামাজিকমাধ্যমবাসী।

‘ট্রল’ এল কোথা থেকে

‘ট্রল’ শব্দটির শেকড় ইন্টারনেটের শুরুর দিকের ফোরাম সংস্কৃতিতে। তখন কিছু ব্যবহারকারী ইচ্ছাকৃতভাবে উসকানিমূলক মন্তব্য করে অন্যদের প্রতিক্রিয়া আদায় করতেন। ১৯৯০ দশকের শেষের দিকে বিভিন্ন অনলাইন ফোরাম ও চ্যাটরুমে ‘ট্রলিং’ বলতে বোঝাত এমন আচরণ, যেখানে কেউ ইচ্ছা করে উসকানিমূলক মন্তব্য করে অন্যদের প্রতিক্রিয়া আদায় করত।

কলিন্স ডিকশনারিতে ট্রলের সংজ্ঞায় বলা হয়েছে, অনলাইন ফোরাম, চ্যাটরুম বা ব্লগে যখন কোনো ব্যক্তি পাঠককে উসকে দেওয়ার জন্য অহেতুক, বিরক্তিকর ও বিষয়বহির্ভূত কথা বলেন, তখন তাকে ট্রল বলা হয়।

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই আচরণ রূপ নেয় ‘মিম কালচারে’ যেখানে ছবি, ভিডিও বা সংক্ষিপ্ত বাক্যের মাধ্যমে ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ প্রকাশ করা হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বিশেষ করে ফেসবুক, টুইটার (বর্তমানে এক্স) এবং টিকটক ট্রল সংস্কৃতিকে ত্বরান্বিত করেছে। অ্যালগরিদম এমন কনটেন্টকেই বেশি ছড়ায়, যা দ্রুত প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। ফলে মজার, তির্যক বা বিতর্কিত পোস্টই ভাইরাল হয় বেশি।

হিব্রু ইউনিভার্সিটি অব জেরুজালেমের গবেষক অধ্যাপক লিমর শিফম্যান বলেছেন, মিম বা ভিডিও ট্রল এমন ডিজিটাল উপাদান, যা মানুষ ছড়ায়, নকল করে এবং নতুনভাবে রূপান্তরিত করে।

ব্রিটিশ গবেষক রিচার্ড ডকিন্স ১৯৭৬ সালে ‘দ্য সেলফিস জিন’ বইয়ে ‘মিম’ শব্দটি ব্যবহার করেন। তিনি বলেন, মিমি হচ্ছে এমন এক ধরনের আইডিয়া, আচরণ বা প্রতীক যা অনুকরণের মাধ্যমে ভার্চুয়াল জগতে ছড়িয়ে পড়ে।

ট্রলের মনস্তত্ত্ব

বিশ্লেষকরা বলছেন, ট্রলের পেছনে কয়েকটি কারণ কাজ করে। যেমন—মনস্তাত্ত্বিক তৃপ্তি, গোষ্ঠী সংস্কৃতি, নিরাপদ দূরত্ব। অনেকেই অন্যকে ব্যঙ্গ করে নিজের বুদ্ধিমত্তা বা শ্রেষ্ঠত্ব দেখানোর চেষ্টা করে। ফলে এই ধরনের মিম শেয়ার করে একটি ‘কমিউনিটি’ তৈরি করে। তবে অনলাইনে পরিচয় গোপনের সুযোগ থাকায় অনেকেই সীমা লঙ্ঘন করে।

ফেডারেশন ইউনিভার্সিটি অস্ট্রেলিয়ার গবেষক এভিটা মার্চ তাঁর ‘লস অ্যান্ড দ্য ডার্ক টেট্রাড’ গবেষণায় বলেছেন, যারা ট্রল করেন তাদের সাধারণ বৈশিষ্ট্য হচ্ছে ‘স্যাডিজম’। অর্থাৎ তারা অন্যকে মানসিকভাবে আঘাত দিয়ে আনন্দ পায়।

ট্রল কিছু ক্ষেত্রে সামাজিক সমালোচনার শক্তিশালী মাধ্যম হিসেবেও কাজ করে। অনেক সময় ট্রল কোনো সমস্যা বা অন্যায়কে খুব সহজভাবে মানুষের সামনে তুলে ধরে। যেমন, বাংলাদেশের সামাজিকমাধ্যমে রাস্তার খারাপ অবস্থা বা যানজট নিয়ে মজার মিম বা ট্রল ভাইরাল হয়। এতে মানুষ বিষয়টি নিয়ে বেশি আলোচনা শুরু করে এবং কর্তৃপক্ষের নজরে আসে।

বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন নেতার বক্তব্য বা ভুল সিদ্ধান্ত নিয়েও ট্রল হয়। যেমন, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মন্তব্য নিয়ে প্রায়ই ট্রল হয়। পড়াশোনা, পরীক্ষা বা দৈনন্দিন জীবনের চাপ নিয়েও অনেকে সামাজিকমাধ্যমে মজার ছলে মিম, ভিডিও শেয়ার করে। এতে শিক্ষার্থীরা মানসিক চাপ থেকে কিছুটা স্বস্তি পায় বলে মনে করেন হংকং ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজির গবেষক জুউ ঝু, জিয়াজিয়ং হু, শিজু জহু ও জিয়াওজুয়ান মা। এই চার গবেষক তাঁদের ‘হোয়াট মেকস আ মিম রিলিভিং’ গবেষণায় দেখিয়েছেন, পরীক্ষার সময় মিম ভিডিও শিক্ষার্থীদের পরীক্ষার চাপ কমায়।

স্কুলপড়ুয়া শিক্ষার্থীরা তো বটেই, নানা বয়সী মানুষ দেশের জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সংকট নিয়েও শিক্ষামন্ত্রীর মন্তব্যের আদলে ট্রল ভিডিও ও মিম তৈরি করছেন। ছবি: ভিডিও থেকে নেওয়া
স্কুলপড়ুয়া শিক্ষার্থীরা তো বটেই, নানা বয়সী মানুষ দেশের জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সংকট নিয়েও শিক্ষামন্ত্রীর মন্তব্যের আদলে ট্রল ভিডিও ও মিম তৈরি করছেন। ছবি: ভিডিও থেকে নেওয়া

তবে ট্রলের অন্ধকার দিকও কম নয়। ব্যক্তিগত আক্রমণ ও অপমান মানসিক স্বাস্থ্যে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। অনেক সময় বিকৃত তথ্য বা ভুল ব্যাখ্যা সহজে ভাইরাল হয়। ফলে সহজেই তা হয়রানি বা বুলিংয়ে পরিণত হতে পারে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রায়ই দেখা যায়, কনটেন্ট ক্রিয়েটররা একে অন্যের সঙ্গে দ্বন্দ্বে লিপ্ত হয়, এরপর ডিজিটাল বুলিং করেন।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ট্রল যখন ব্যক্তিগত আক্রমণ বা ঘৃণার ভাষায় রূপ নেয়, তখন তা আর ‘হাস্যরস’ থাকে না বরং হয়ে ওঠে সামাজিক সমস্যা। বিখ্যাত ব্যক্তিরাও রেহাই পান না। বিশ্বজুড়ে বহু পরিচিত ব্যক্তি ট্রলের শিকার হয়েছেন। ক্রিস্টিয়ান রোনালদোর খেলার মাঠে পারফরম্যান্স বা মাঠের আচরণ নিয়ে নিয়মিত মিম তৈরি হয়। টেইলর সুইফটের গান ও ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে অসংখ্য ট্রল ছড়িয়েছে। উইল স্মিথ একটি পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানের ঘটনার পর ব্যাপক ট্রলের মুখে পড়েন।

বাংলাদেশেও বিভিন্ন সময় রাজনীতিবিদ, অভিনেতা কিংবা ক্রীড়াবিদরা ট্রলের শিকার হয়েছেন। সাম্প্রতিক শিক্ষামন্ত্রী এহছানুল হক মিলন তারই একটি উদাহরণ।

বিখ্যাতরাই কেন বেশি ট্রলের শিকার হন

ট্রলের শিকার যে কেউই হতে পারেন। তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জনপ্রিয় তারকা ও বিখ্যাত ব্যক্তিদেরই বেশি ট্রলের শিকার হতে দেখা যায়। এ ব্যাপারে গবেষকদের গবেষণাও থেমে নেই।

সায়েন্স ডিরেক্ট জার্নালে প্রকাশিত ‘হু ডু ইউ ট্রল অ্যান্ড হোয়াই’ গবেষণায় বলা হয়েছে, যারা বেশি জনপ্রিয় বা দৃশ্যমান—তাদের নিয়ে বেশি ট্রল হয়। কারণ যারা ট্রল করেন, তারা বেশি প্রতিক্রিয়া, মনোযোগ এবং সামাজিক প্রভাব চান।

আবার সাইকোলজি টুডেতে প্রকাশিত প্রবন্ধে মার্কিন লেখক ও গবেষক মাইকেল হুয়ান লিখেছেন, নার্সিসিজমের সঙ্গে অনলাইন বিদ্বেষের সম্পর্ক রয়েছে। মূল কথা হচ্ছে, সেলিব্রিটিদের উচ্চ মর্যাদা দেখে কিছু মানুষের মধ্যে ‘রিলেটিভ ডিপ্রাইভেশন’ বা নিজেকে পিছিয়ে পড়া অনুভূতি তৈরি হয় এবং তাদের আত্মমর্যাদা হুমকির মুখে পড়ে। তখন তারা অনলাইনে আক্রমণাত্মক আচরণ করে, যা বেশির ভাগ সময়েই ট্রল বা মিম আকারে প্রকাশিত হয়।

সেলিব্রেটি ট্রল নিয়ে আবার ভিন্ন ব্যাখ্যা দিয়েছেন ভোগ সাময়িকীর লেখক আনা ক্যাফোলা। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে প্রকাশিত এক লেখায় তিনি বলেছেন, অনেক মানুষ মনে করে সে তারকাকে চেনে। সেই বোধ থেকে সে ট্রলকেও ‘স্বাভাবিক যোগাযোগ’ মনে করতে শুরু করে। এতে বিখ্যাত ব্যক্তিরা বেশি আক্রান্ত হন।

ট্রল ঠেকাতে দেশে দেশে আইন

বিভিন্ন দেশে সাইবার বুলিং ও অনলাইন হয়রানি ঠেকাতে আইন রয়েছে। যেমন যুক্তরাজ্যে ‘ম্যালিসিয়াস কমিউনিকেশনস অ্যাক্ট ১৯৯৮’ এবং ‘কমিউনিকেশনস অ্যাক্ট ২০০৩’–এর মাধ্যমে গুরুতর অনলাইন ট্রলিং, হুমকি, অপমানজনক বা ক্ষতিকর বার্তার বিরুদ্ধে মামলা করা যায়।

সিঙ্গাপুরে ‘প্রটেকশন ফ্রম হ্যারাসমেন্ট অ্যাক্ট ২০১৪’ নামে আইন রয়েছে। ওই আইনে অনলাইন হয়রানি, ট্রলিং ও সাইবার বুলিংয়ের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া যায়।

আয়ারল্যান্ডে ‘হ্যারাসমেন্ট, হার্মফুল কমিউনিকেশনস অ্যান্ড রিলেটেড অফেন্স অ্যাক্ট ২০২০’-এর মাধ্যমে সাইবার বুলিংকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়।

দক্ষিণ কোরিয়া ও অস্ট্রেলিয়ায় সাইবার বুলিং ও ট্রলের বিরুদ্ধে কঠোর আইন রয়েছে। এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রে সাইবার স্টকিং, থ্রেটস, হ্যারাসমেন্ট ও ডিফামেশনের মাধ্যমে ভুক্তভোগী মামলা করতে পারেন।

বাংলাদেশেও ডিজিটাল নিরাপত্তা সম্পর্কিত আইন আছে। তবে এর প্রয়োগ ও সীমাবদ্ধতা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। নৈতিকতার প্রশ্নও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। অনলাইনে আমরা যা বলি, তা বাস্তব জীবনের মতোই অন্যের ওপর প্রভাব ফেলে। ডিজিটাল যুগে ট্রল পুরোপুরি বন্ধ করা সম্ভব নয়। তবে এটিকে নিয়ন্ত্রণ ও ইতিবাচক দিকে পরিচালিত করা সম্ভব।

ট্রল আজকের ডিজিটাল সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। এটি যেমন হাস্যরস ও সৃজনশীলতার জায়গা তৈরি করেছে, তেমনি তৈরি করেছে নতুন ধরনের সামাজিক চাপ ও ঝুঁকি। একটি ক্লিকেই যেমন বিনোদন তৈরি হয়, তেমনি আঘাতও তৈরি হতে পারে। সুতরাং, ট্রল করার আগে একবার ভাবা জরুরি এটি কি কেবল মজা, নাকি কারও প্রতি অন্যায় আচরণ?

সম্পর্কিত