ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের চলমান যুদ্ধের মধ্যেই বিরোধী কুর্দি গোষ্ঠীগুলোকে অস্ত্র দেওয়ার বিষয় নিয়ে আলোচনা করছে যুক্তরাষ্ট্র—এমন তথ্য দিয়েছে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম। ধারণা করা হচ্ছে, এর মাধ্যমে ইরানের ভেতরে বিদ্রোহ উসকে দেওয়ার পরিকল্পনা থাকতে পারে।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএন–এর এক প্রতিবেদনে কুর্দি ও মার্কিন কর্মকর্তাদের উদ্ধৃতি দিয়ে বলা হয়েছে, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন ইরানের সরকারবিরোধী কুর্দি সংগঠনগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ করছে। তাদের অস্ত্র দিয়ে ইরানের ভেতরে বিদ্রোহ সংগঠিত করার সম্ভাবনা নিয়েই আলোচনা চলছে। তবে বুধবার পর্যন্ত কোনো কিছু চূড়ান্ত চুক্তি হয়েছে কি না তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
দীর্ঘদিন ধরেই কুর্দি বিদ্রোহীরা খামেনি সরকারের বিরোধিতা করে আসছে। ইরানের কুর্দিস্তান প্রদেশসহ পশ্চিমাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকায় তারা একাধিক হামলা চালিয়েছে। এসব গোষ্ঠীর অনেকেই ইরাক-ইরান সীমান্ত অঞ্চলে সক্রিয়, যেখানে দুই দেশের কুর্দি জনগোষ্ঠীর মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে।
মার্কিন কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা (সিআইএ) অতীতেও ইরাকের কুর্দি গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে কাজ করার ইতিহাস রয়েছে। ২০০৩ সালে যুক্তরাষ্ট্র ইরাক আক্রমণের পর ওই অঞ্চলে কুর্দি বাহিনীর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তোলে। একইভাবে সিরিয়ায় সাবেক প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের সময়ও কুর্দি যোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ ও অস্ত্র দিয়েছিল ওয়াশিংটন। গত কয়েক দশকে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতির সমালোচনাকারী বিভিন্ন সরকারকে অস্থিতিশীল করতে বিশ্বের নানা দেশে সশস্ত্র গোষ্ঠীকে সমর্থন দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে সিআইএর বিরুদ্ধে।
এদিকে চলমান সংঘাতের মধ্যে ইরান উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি ও তাঁদের স্থাপনায় হামলা চালাচ্ছে। একই সময় ইরানের শক্তিশালী সামরিক বাহিনী ইরানী বিপ্লবী গার্ডস (আইআরজিসি) পশ্চিমাঞ্চলে কুর্দি অবস্থানগুলো লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে বলে জানা গেছে।
যুক্তরাজ্যভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান চ্যাথাম হাউসের বিশ্লেষক নেইল কুইলিয়াম মনে করেন, এমন পদক্ষেপ ইরানের ভেতরে আরও অভ্যন্তরীণ সংঘাত বাড়িয়ে দিতে পারে। আল জাজিরাকে তিনি বলেন, এই পরিকল্পনা বড় কোনো কৌশলগত পরিকল্পনার অংশ বলে মনে হয় না বরং এটি দেখায় যে ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক পদক্ষেপ খুব সুপরিকল্পিত নয়।
কী ঘটছে?
সিএনএনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সিআইএ একাধিক কুর্দি সংগঠনের সঙ্গে যোগাযোগ করছে, যাতে তাঁরা ইরানের ভেতরে বিদ্রোহে সহায়তা করতে পারে। মার্কিন কর্মকর্তাদের মতে, কুর্দি বাহিনীকে ব্যবহার করে ইরানি বাহিনীকে বিভিন্ন দিকে ব্যস্ত রাখা এবং ইরানের ভেতরে গণবিক্ষোভের সুযোগ তৈরি করা হতে পারে। এমনকি উত্তর ইরানের কিছু অঞ্চল নিয়ন্ত্রণে এনে ইসরায়েলের জন্য একটি বাফার জোন তৈরির কথাও আলোচনায় রয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ট্রাম্প ইরানি কুর্দি সংগঠন ইরানিয়ান কুর্দিস্তানের ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রধান মুস্তাফা হিজরির সঙ্গেও কথা বলেছেন। কুর্দি এক কর্মকর্তার দাবি, আগামী কয়েক দিনের মধ্যে পশ্চিম ইরানে সম্ভাব্য স্থল অভিযানে কুর্দি গোষ্ঠীগুলো অংশ নিতে পারে।
এ ছাড়া মার্কিন সংবাদমাধ্যম এক্সিওস জানায়, হামলা শুরুর পর ট্রাম্প ইরাকের দুই কুর্দি নেতা মাসউদ বারজীনি এবং বাফেল টালাবিনির সঙ্গেও কথা বলেছেন। এ সময় যুক্তরাষ্ট্র ও কুর্দি নেতৃত্বের মধ্যে সম্ভাব্য সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা হয়।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্র ও কুর্দি গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে সহযোগিতা বাড়ানোর পক্ষে কাজ করে আসছেন। ইতোমধ্যে ইরান, ইরাক ও সিরিয়ায় কুর্দি গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে ইসরায়েলের গোয়েন্দা নেটওয়ার্কও রয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।
তবে বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এমন পরিকল্পনা ইরানের অভ্যন্তরীণ বিরোধী গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে বিভাজন বাড়াতে পারে এবং আঞ্চলিক রাজনীতিতেও নতুন উত্তেজনা তৈরি করতে পারে।
কুর্দিদের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক
মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে থাকা কুর্দিরা দীর্ঘদিন ধরে স্বায়ত্ত্বশাসনের দাবি জানিয়ে আসছে। বিশেষ করে ইরাকের কুর্দি অঞ্চল বহু বছর ধরে ওয়াশিংটনের গুরুত্বপূর্ণ মিত্র।
১৯৯১ সালের উপসাগরীয় যুদ্ধের পর যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তায় একটি নো-ফ্লাই জোন প্রতিষ্ঠিত হয়, যার মাধ্যমে কুর্দিদের নিয়ন্ত্রণে একটি স্বশাসিত অঞ্চল গড়ে ওঠে। পরে এটি কুর্দিস্তান আঞ্চলিক সরকার হিসেবে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পায়।
পরবর্তীতে যুক্তরাষ্ট্র কুর্দিস্তানের সামরিকবাহিনী পেশমার্গা–এর সঙ্গে মিলে জঙ্গি সংগঠন আইএসআইএসের বিরুদ্ধে লড়াই করে। একইভাবে সিরিয়ায় কুর্দি মিলিশিয়া পিপলস প্রোটেকশন ইউনিটস (ওয়াইপিজি) এবং সিরিয়ান ডেমোক্র্যাটিক ফোর্সেসকেও প্রশিক্ষণ ও অস্ত্র দিয়েছিল ওয়াশিংটন।
তবে বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র অতীতে একাধিকবার আঞ্চলিক মিত্রদের সমর্থন থেকে সরে এসেছে। ফলে ইরানের কুর্দি গোষ্ঠীগুলোর ক্ষেত্রেও দীর্ঘমেয়াদি সমর্থন নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে।
বিদ্রোহী গোষ্ঠীকে সিআইএর অস্ত্র ও অর্থ দেওয়ার সংক্ষিপ্ত ইতিহাস
গত পাঁচ-ছয় দশকে সিআইএ বহু দেশে বিদ্রোহী ও সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে অর্থায়ন, প্রশিক্ষণ ও অস্ত্র দিয়েছে।
আফগানিস্তান:
১৯৭০-এর দশকের শেষ দিকে সোভিয়েত দখলের বিরুদ্ধে লড়াই করতে আফগান মুজাহিদিনদের অর্থ ও প্রশিক্ষণ দেয় সিআইএ।
লিবিয়া:
২০১১ সালে দীর্ঘদিনের নেতা মুয়াম্মার গাদ্দাফির বিরুদ্ধে লড়াইরত বিদ্রোহীদের গোয়েন্দা সহায়তা দেয় যুক্তরাষ্ট্র।
ইরান:
১৯৫৩ সালে সিআইএ ব্রিটিশ গোয়েন্দা সংস্থা এমআই৬-এর সঙ্গে যৌথভাবে অভিযান চালিয়ে সামরিক কর্মকর্তাসহ বিভিন্ন গোষ্ঠীকে সহায়তা করে ইরানের প্রথম গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ মোসাদ্দেককে ক্ষমতাচ্যুত করতে।
নিকারাগুয়া:
১৯৮০-এর দশকে সমাজতান্ত্রিক সান্দিনিস্তা সরকারের নেতা ড্যানিয়েল ওরটেগার বিরুদ্ধে কনট্রা বিদ্রোহীদের অর্থ ও অস্ত্র দেয় সিআইএ। এছাড়া গুয়াতেমালা (১৯৫৪), কিউবা (১৯৬০-৬১) এবং এল সালভাদরেও যুক্তরাষ্ট্রের নীতির সমালোচক সরকারগুলোকে অস্থিতিশীল করতে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে সমর্থন দিয়েছিল।
ভিয়েতনাম:
১৯৫০-এর দশক থেকে সিআইএ ভিয়েতনামে বিদ্রোহীদের অস্ত্র দিতে শুরু করে। পরে যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি সেনা পাঠায়, যা ইতিহাসের অন্যতম রক্তক্ষয়ী মার্কিন সামরিক হস্তক্ষেপে পরিণত হয়।
ইন্দোনেশিয়া:
১৯৬০-এর দশকের শেষ দিকে প্রেসিডেন্ট সুকর্ণর বিরুদ্ধে বিদ্রোহীদের অস্ত্র দেয় মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা।
ইংরেজি থেকে অনুবাদ করেছেন আব্দুর রহমান খান সার্জিল