এক্সপ্লেইনার
আফতাব উদ্দিন ছিদ্দিকী রাগিব

স্থান নিউইয়র্ক। নিউইয়র্ক টাইমসের অফিস। সময় ১৯৭১ সালের জুনের প্রচণ্ড গরমের এক সন্ধ্যা। পত্রিকার নিউজরুমে তখন প্রবল উত্তেজনা। উত্তেজনার কারণ গুপ্তধনের মতো পাওয়া কিছু গোপন দলিল। তাতে ভিয়েতনাম যুদ্ধ নিয়ে মার্কিন সরকারের লুকানো সত্য লেখা।
উপস্থিত অনেক সাংবাদিক বললেন, ‘এই নথি ছাপলে সারা দেশ তোলপাড় হয়ে যাবে।’ কিন্তু সম্পাদক ভীষণ দ্বিধাগ্রস্ত— ‘এই নথি কী প্রকাশ করব, নাকি করব না?’ কারণ তাতে সরকারের রোষানল অনিবার্য।
এই দ্বিধা ও আতঙ্কের মধ্যে বেজে উঠল অফিসের ফোন। ওপাশে এক সরকারি কর্মকর্তা। তার কঠিন ও ঠান্ডা কণ্ঠ, ‘এই রিপোর্ট প্রকাশ করা যাবে না। এটা জাতীয় নিরাপত্তার জন্য বিপজ্জনক।’
সরকারের এই নিষেধাজ্ঞায় সম্পাদকের দ্বিধা ও আতঙ্কের পারদটা আরও উপরে উঠল। তখন এক তরুণ রিপোর্টার বলল, ‘আমরা যদি ভয় পাই, তাহলে সাংবাদিকতা কেন করছি?’ ধীরে ধীরে সম্পাদকের উপলব্ধি হলো, ‘আমাদের কাজ সরকারকে খুশি করা নয়। সত্যটা বলা।’
পরদিন সকালে পত্রিকা বের হলো। শীর্ষ সংবাদ—‘গোপন নথিতে ভিয়েতনাম যুদ্ধের সত্য’। সারা দেশে হৈচৈ পড়ে গেল। মানুষ হতবাক—সরকার মানুষকে বুঝাল কী, আর প্রকৃত সত্য কী?
ক্ষুব্ধ সরকার দ্রুত আদালতে গেল। মামলা গড়াল আমেরিকার সুপ্রিম কোর্টে। সরকারের দাবি, ‘এই গোপন নথির প্রকাশনা বন্ধ করতে হবে! এ প্রকাশনা জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি।’ পত্রিকা বলল, ‘এটা আমাদের অধিকার—মতপ্রকাশের স্বাধীনতা।’
কয়েক দিনের যুক্তিতর্ক ও উত্তেজনার পর রায় এল। আদালত বলল, ‘সরকার সংবাদপত্রকে এভাবে থামাতে পারবে না।’
সাংবাদিকদের মধ্যে উল্লাস শুরু হলো। কেউ কেউ চিৎকার করে উঠল, ‘আমরা জিতেছি!’ কিন্তু সম্পাদক চুপচাপ। তিনি জানতেন—এই জয়ের মানে শুধু একটা মামলা জেতা নয়। এর মানে সত্য বলার অধিকার বাঁচিয়ে রাখা।

এই ঘটনাটি দেখায়, সম্পাদকীয় নীতিমালা মানে শুধু নিয়ম নয়, সত্য প্রকাশের সাহস। আর সেই সাহসই গণতন্ত্রকে বাঁচিয়ে রাখে। এই ঘটনা পরে ‘পেন্টাগন পেপার্স কেস’ নামে ইতিহাসে জায়গা করে নেয়।
এই সাহসের গল্প শেষ হতে না হতেই, পরের বছর ভারতে একই প্রশ্ন অন্যভাবে সামনে এল। ১৯৭২ সালে সরকার এক আদেশে সংবাদপত্রের পৃষ্ঠাসংখ্যা সীমিত করে দিল। টাইমস অব ইন্ডিয়া ও তার মালিক বেনেট কোলম্যান অ্যান্ড কোং বুঝতে পারল—এটা শুধু কাগজের পৃষ্ঠা কমানো নয়, এটা দ্ব্যর্থহীনভাবে মত প্রকাশের কণ্ঠরোধ। তারা আদালতের দ্বারস্থ হলো। মামলা গড়াল ভারতের সুপ্রিম কোর্টে। দীর্ঘ শুনানি হলো। রায় এল ১৯৭৩ সালে। রায়ে আদালত বললেন—‘রাষ্ট্র পৃষ্ঠাসংখ্যা নির্ধারণ করে দিতে পারে না। এটা সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ।’ এই রায় দেখিয়ে দেয়, সম্পাদকীয় নীতিমালা শুধু পত্রিকার ভেতরের নৈতিক নির্দেশনা নয়, বরং রাষ্ট্রীয় নীতির সঙ্গেও গভীরভাবে যুক্ত।
এর বহু বছর পর, ২০১১ সালে যুক্তরাজ্যে ঘটল এক ভিন্ন ধরনের কাহিনি, যা প্রায় গোয়েন্দা থ্রিলারের মতো। লন্ডনের বৃষ্টিভেজা এক সকালে প্রকাশ পায় এক ভয়াবহ সত্য—নিউজ অব দ্য ওয়ার্ল্ড নামের বিখ্যাত ট্যাবলয়েড পত্রিকা দীর্ঘদিন ধরে মানুষের ব্যক্তিগত ফোন হ্যাক করে খবর সংগ্রহ করছিল। শুরুতে বিষয়টি ছিল সেলিব্রিটিদের নিয়ে, পরে রাজনীতিবিদ, এমনকি সাধারণ মানুষের জীবনও এতে ঢুকে পড়ে।
এ খবর প্রকাশ পেতেই দেশজুড়ে তীব্র ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। প্রশ্ন ওঠে—সংবাদ পাওয়ার জন্য কি মানুষের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা লঙ্ঘন করা যায়? চাপ বাড়তে বাড়তে শেষ পর্যন্ত ১৬৮ বছরের পুরোনো সেই পত্রিকাটি বন্ধ হয়ে যায়। সাংবাদিক ও সম্পাদকদের বিরুদ্ধে তদন্ত ও মামলা হয়। এই ঘটনা প্রমাণ করে, সম্পাদকীয় নীতিমালা লঙ্ঘনে সাফল্য যত বড়ই হোক, পতন অবশ্যম্ভাবী।
কয়েক বছর পর পতনের এই গল্পই যেন এক ধরনের প্রতিধ্বনি হয়ে শোনা গেল বাংলাদেশে। ২০১৬ সালের ফেব্রুয়ারি, ঢাকা। ইংরেজি দৈনিক ডেইলি স্টারের সম্পাদক মাহফুজ আনাম আচমকা একটি টক শোতে বলে বসলেন, ২০০৭ সালের রাজনৈতিক অস্থিরতার সময় কিছু খবর যাচাই-বাছাই না করেই ডেইলি স্টারে ছাপা হয়েছিল। এই স্বীকারোক্তির পর তাঁর বিরুদ্ধে দেশ জুড়ে একের পর এক মামলা দায়ের হতে থাকে। তাতে শুরু হয় নতুন বিতর্ক—সত্য বলা কি অপরাধ, নাকি এটি সাংবাদিকতায় সততার প্রমাণ? এই ঘটনা দেখায়, সম্পাদকীয় নীতিমালা শুধু অন্যের ভুল ধরার বিষয় নয়; নিজের ভুল স্বীকার করার সাহসও এর অংশ, যদিও সেই সাহসের মূল্য অনেক বড় হতে পারে।
এই চারটি গল্প একে অপরের সঙ্গে অদৃশ্য সুতোয় বাঁধা। যুক্তরাষ্ট্রের পেন্টাগন পেপার্স, ভারতের বেনেট কোলম্যান মামলা, যুক্তরাজ্যের ফোন হ্যাকিং কেলেঙ্কারি এবং বাংলাদেশের ডেইলি স্টার বিতর্ক—এই চার ঘটনা আমাদের শেখায়, সম্পাদকীয় নীতিমালা কেবল নিয়মের বই নয়। এটি একদিকে সত্য প্রকাশের অধিকার, অন্যদিকে দায়িত্বের সীমা। কোথাও এই নীতিমালা গণতন্ত্রকে রক্ষা করে। কোথাও তা লঙ্ঘিত হলে প্রতিষ্ঠান ধ্বংস হয়। আবার কোথাও তা নিজের ভুল স্বীকারের মধ্য দিয়ে নতুন করে সংজ্ঞা পায়।

প্রকৃতপক্ষে এই নীতিমালাই গণমাধ্যমের ভিত। রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ হিসেবে গণমাধ্যম কতটা দৃঢ় ও শক্ত হবে, তা নির্ভর করে এই ভিতের ওপর। মুক্ত গণমাধ্যম দিবসে এই সম্পাদকীয় নীতিমালার প্রয়োজন, বাস্তবতা ও চ্যালেঞ্জ নতুন করে ভাবা জরুরি। তার আগে ‘সম্পাদকীয় নীতিমালা’ বিষয়টির সঙ্গে পাঠককে পরিচিত করানো যাক।
সম্পাদকীয় নীতিমালা হলো সংবাদমাধ্যমের জন্য নির্ধারিত একগুচ্ছ নীতি, মানদণ্ড ও নির্দেশনা—যার মাধ্যমে ঠিক হয় কীভাবে সংবাদ সংগ্রহ, যাচাই, উপস্থাপন ও প্রকাশ করা হবে। এ নীতিমালা ঠিক করে সংবাদমাধ্যম কী ছাপবে, কীভাবে ছাপবে, আর কোথায় সীমা টানবে। অন্যভাবে সম্পাদকীয় নীতিমালা হলো একটি গণমাধ্যমের নৈতিক, পেশাগত ও কার্যকরী নির্দেশিকা। একে গণমাধ্যমের ‘নৈতিক সংবিধান’ও বলা হয়ে থাকে। এর মধ্যে থাকে সত্যতা যাচাই, নিরপেক্ষতা, স্বার্থের সংঘাত এড়ানো, গোপনীয়তার প্রতি সম্মান, ভুল সংশোধনের নিয়ম এবং বিজ্ঞাপন ও সংবাদ আলাদা রাখার নীতি ইত্যাদি।
এই নীতিমালার পরিধি ও প্রয়োগ, বাংলাদেশ, ভারতসহ উন্নত দেশগুলোতে এমন সব ঘটনা ও গল্পের জন্ম দিয়েছে; যা শুধু মিডিয়া নয়, গণতন্ত্র ও মত প্রকাশের স্বাধীনতার ধারণাকেই নাড়িয়ে দিয়েছে। এই লেখার শুরুতে উল্লেখ করা ঘটনাগুলো ছিল তেমনি বহুল আলোচিত ও বহুল চর্চিত কিছু ঘটনা।
গণমাধ্যম শুধু তথ্য দেয় না, জনমত গঠন করে। নীতিমালা না থাকলে তথ্য বিকৃত হতে পারে। পক্ষপাত বাড়ে। ক্ষমতার অপব্যবহার সহজ হয়। গণমাধ্যম ব্যবসায়িক বা রাজনৈতিক প্রভাবদুষ্ট হতে পারে। থাকলে সাংবাদিকতার বিশ্বাসযোগ্যতা বাড়ে। তথ্যের ভুল ও বিভ্রান্তি কমে। পাঠকের আস্থা তৈরি হয়। সাংবাদিকদের জন্য স্পষ্ট দিকনির্দেশনা তৈরি হয় এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত হয়।
বাংলাদেশে অনলাইন গণমাধ্যম ও টিভিসহ সকল সম্প্রচার মাধ্যমের জন্য সম্পাদকীয় নীতিমালা প্রণয়ন ও অনুসরণ বাধ্যতামূলক। জাতীয় অনলাইন গণমাধ্যম নীতিমালা-২০১৭ এর ৫.১ অনুচ্ছেদ ও জাতীয় সম্প্রচার নীতিমালা-২০১৪ এর ৭.১ অনুচ্ছেদে এ নির্দেশনা সুস্পষ্ট। অন্যদিকে প্রিন্ট মিডিয়ার ক্ষেত্রে প্রেস কাউন্সিল আইন, ১৯৭৪ সাংবাদিকতার নৈতিকতার মানদণ্ড নির্ধারণ করে।
প্রেস কাউন্সিল সাংবাদিকদের জন্য আচরণবিধি তৈরি ও তদারকি করে। তাছাড়া সাইবার সুরক্ষা বিষয়ক আইন, দণ্ডবিধিসহ দেশের প্রচলিত বিভিন্ন আইন, নীতিমালা, বিধি-বিধান ও আদালতের রায় সংবাদে শালীনতা, রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা, মানহানি, আদালত অবমাননাসহ বিভিন্ন বিষয়ে সীমারেখা টেনে দিয়েছে—যা বাস্তবে সম্পাদকীয় নীতিমালার অংশ হয়ে দাঁড়ায়। এক্ষেত্রে তথ্য মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (সম্প্রচারের ক্ষেত্রে) নির্দেশনাও প্রাসঙ্গিক।
বাংলাদেশের শীর্ষ গণমাধ্যম প্রথম আলো ও দ্য ডেইলি স্টার নিজস্ব সম্পাদকীয় নীতিমালা অনুসরণ করে। প্রথম আলো ও ডেইলি স্টার উভয় পত্রিকার নীতিমালায় বস্তুনিষ্ঠ, আপসহীন ও পক্ষপাতশূন্য সংবাদ পরিবেশন ও পূর্ণ সত্য উদঘাটনকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে জনস্বার্থ, মানবাধিকার, এবং ক্ষমতার জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার নীতিও অন্তর্ভুক্ত। এসব প্রতিষ্ঠানে সাধারণত ফ্যাক্ট-চেকিং, সম্পাদকীয় স্বাধীনতা, পাঠকের প্রতি দায়বদ্ধতা গুরুত্ব পায়। তবে ছোট ও অনলাইন প্ল্যাটফর্মে অনেক সময় এই কাঠামো দুর্বল বা অনিয়মিত।
তবে বাস্তবতা হলো, বাংলাদেশের সিংহভাগ গণমাধ্যমে লিখিত ও প্রকাশ্য নীতিমালা নেই। অনেক ক্ষেত্রে রাজনৈতিক চাপ, মালিকানার প্রভাব ও বিজ্ঞাপন নির্ভরতা নীতিমালার পূর্ণ প্রয়োগকে বাধাগ্রস্ত করে। ফলে নীতিমালা থাকলেও সবসময় তা মানা হয় না। তাছাড়া অনলাইন গণমাধ্যমে প্রচুর নৈরাজ্য। বেশিরভাগ অনলাইনে বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ ও তথ্য যাচাই-বাছাইয়ের ঘাটতি বেশ প্রবল।
একটি কার্যকর নীতিমালায় নিম্নোক্ত বিষয় থাকা উচিত:
তথ্য যাচাইয়ের কঠোর মানদণ্ড, স্বার্থের সংঘাত এড়ানোর নিয়ম, ভুয়া খবর প্রতিরোধ ব্যবস্থা, নিরপেক্ষতা,
জবাবদিহি, স্বচ্ছতা, সংশোধন, মানবাধিকার ও বৈচিত্র্যের প্রতি শ্রদ্ধা ইত্যাদি।
এছাড়া ডিজিটাল যুগে ভুয়া খবর, ভুল বা মিথ্যা তথ্য ও অপতথ্য রোধ ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার নিয়েও বিশেষ ও স্পষ্ট নির্দেশনা প্রয়োজন।
একসময় সংবাদপত্র ছিল মূলত ব্যবসা। বিশ্বাসযোগ্যতা নয়, বিক্রিই ছিল প্রধান লক্ষ্য। ১৯শ শতক পর্যন্ত সাংবাদিকতার জগতে কোনো সুসংগঠিত নীতিমালা ছিল না। তখন ‘ইয়েলো জার্নালিজম’-এর দাপটে অতিরঞ্জন, পক্ষপাত আর উত্তেজনাই ছিল পাঠক টানার হাতিয়ার। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে প্রশ্ন উঠতে শুরু করল—সংবাদ কি শুধু পণ্য, নাকি সমাজের প্রতি এর কোনো দায়ও আছে? এই প্রশ্ন থেকেই ১৯২৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রে আমেরিকান সোসাইটি অব নিউজপেপার এডিটরস কর্তৃক প্রণীত হলো ‘কানুনস অব জার্নালিজম’; যা আধুনিক বিশ্বের প্রথম বড় আকারের সম্পাদকীয় নীতিমালা। এখানে সাংবাদিকদের দায়িত্ব, স্বাধীনতা, নিরপেক্ষতা, সত্যতা ও জনস্বার্থকে সাংবাদিকতার মূল স্তম্ভ হিসেবে ঘোষণা করা হয়।

এরপর ১৯৪৭ সালে হাচিন্স কমিশন ‘সোশ্যাল রেসপন্সিবিলিটি থিওরি’ তুলে ধরে বলল—মিডিয়ার কাজ শুধু খবর পরিবেশন নয়, বরং সমাজকে সঠিকভাবে প্রতিফলিত করা এবং জনস্বার্থ রক্ষা করা। এরপর বিবিসির ‘এডিটোরিয়াল গাইডলাইনস’ Editorial Guidelines এবং দ্য নিউইয়র্ক টাইমস -এর নৈতিক কোড বিশ্বব্যাপী মানদণ্ডে পরিণত হয়।
এই ধারাবাহিকতায় আজকের বিশ্বে ৪০০-রও বেশি সম্পাদকীয় নীতিমালা তৈরি হয়েছে, যা বিভিন্ন মিডিয়া প্রতিষ্ঠান, প্রেস কাউন্সিল ও সাংবাদিক সংগঠন অনুসরণ করে।
উন্নত বিশ্বের গণমাধ্যমে সবচেয়ে বড় গুরুত্ব পায় জনস্বার্থ, গণতন্ত্রের সুরক্ষা, ক্ষমতার জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং মানবাধিকারের প্রশ্ন। তারা নিজেদের ‘ওয়াচডগ’ বা প্রহরী হিসেবে দেখে—যেখানে ক্ষমতার অপব্যবহার হলেই তা উন্মোচন করা তাদের দায়িত্ব। শক্তিশালী সম্পাদকীয় বোর্ড, আলাদা ফ্যাক্ট চেকিং টিম, এমনকি পাঠকের অভিযোগ শোনার জন্য পাবলিক এডিটর বা ন্যায়পাল নিয়োগ—এসবই এই দায়িত্ববোধের প্রতিফলন। তবে এখানেও বিতর্ক থেমে নেই। ‘অবজেক্টিভ জার্নালিজম’ বনাম ‘অ্যাকটিভিস্ট জার্নালিজম’—এই দ্বন্দ্ব এখন বিশ্বজুড়ে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। একই সঙ্গে অনেক জায়গায় প্রেস স্বাধীনতা কমে যাওয়ার উদ্বেগও বাড়ছে।
উন্নত দেশগুলোর প্রতিষ্ঠিত গণমাধ্যমে সম্পাদকীয় নীতিমালাগুলো কেবল কাগজে নয়, বাস্তবেও কার্যকর। বিশ্বের সবচেয়ে প্রভাবশালী মিডিয়াগুলোর ক্ষেত্রে—যেমন বিবিসি, দ্য গার্ডিয়ান, দ্য নিউইয়র্ক টাইমস—এর নীতিমালা প্রকাশ্য, কঠোর এবং নিয়মিত আপডেট হয়। সেখানে মূল অগ্রাধিকার থাকে জনস্বার্থ, মানবাধিকার এবং ক্ষমতার জবাবদিহি নিশ্চিত করা। সেখানে তথ্য যাচাই ছাড়া কোনো সংবাদ প্রকাশ করা হয় না, ভুল হলে দ্রুত সংশোধন দেওয়া হয়, আর সম্পাদকীয় বিভাগকে মালিক, সরকার বা বিজ্ঞাপনদাতার প্রভাব থেকে আলাদা রাখতে শক্ত ‘ফায়ারওয়াল’ বজায় রাখা হয়।
সংবাদে সব পক্ষের বক্তব্য তুলে ধরা, সূত্র উল্লেখ করা, পাঠকের অভিযোগ গ্রহণ করা এবং বিজ্ঞাপন ও সংবাদকে স্পষ্টভাবে আলাদা রাখা—এসবই তাদের দৈনন্দিন চর্চার অংশ। ডিজিটাল যুগে যোগ হয়েছে নতুন মাত্রা—সোশ্যাল মিডিয়ায় সাংবাদিকের আচরণ, এমনকি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহারের ক্ষেত্রেও পৃথক নীতিমালা প্রণীত হচ্ছে।
অন্যদিকে বাংলাদেশ ও ভারতীয় উপমহাদেশের বাস্তবতা ভিন্ন। এখানে সম্পাদকীয় নীতিমালা থাকলেও তার প্রয়োগ অনেক সময়ই দুর্বল। রাজনৈতিক প্রভাব, করপোরেট মালিকানার চাপ এবং বিজ্ঞাপন নির্ভরতা সংবাদকে প্রভাবিত করে। ফলে সেলফ সেন্সরশিপ, দলীয় বিভাজন, দুর্বল ফ্যাক্ট চেকিং এবং সাংবাদিকদের নিরাপত্তা ঝুঁকি—এসব সমস্যা প্রায়ই সামনে আসে। উন্নত দেশের তুলনায় এখানে স্বাধীনতা সীমিত, জবাবদিহিতা দুর্বল এবং নীতিমালার প্রয়োগ আংশিক। যে নীতিমালা পশ্চিমা বিশ্বে একটি কার্যকর ‘নৈতিক কাঠামো’ হিসেবে কাজ করে, তা অনেক সময় উন্নয়নশীল দেশে কেবল ‘কাগুজে নীতি’ হিসেবেই থেকে যায়।
গণমাধ্যমের স্বাধীনতা মানে সীমাহীন স্বাধীনতা নয়। এর সঙ্গে জুড়ে আছে দায়িত্ব। সম্পাদকীয় নীতিমালা সেই দায়িত্বের কাঠামো তৈরি করে। মুক্ত গণমাধ্যম দিবসে আমাদের প্রশ্ন হওয়া উচিত—গণমাধ্যম কি শুধু স্বাধীন, নাকি দায়িত্বশীলও? কারণ সত্যিকারের স্বাধীনতা তখনই অর্থবহ, যখন তা নীতির ভিত্তিতে দাঁড়িয়ে থাকে।
তথ্যসূত্র: UNESCO World Press Freedom Day, American Society of Newspaper Editors (ASNE), BBC Editorial Guidelines, The New York Times Ethics Handbook, Judgement of Supreme Court of India (Bennett Coleman case), United States Supreme Court (Pentagon Papers case Documentation).

স্থান নিউইয়র্ক। নিউইয়র্ক টাইমসের অফিস। সময় ১৯৭১ সালের জুনের প্রচণ্ড গরমের এক সন্ধ্যা। পত্রিকার নিউজরুমে তখন প্রবল উত্তেজনা। উত্তেজনার কারণ গুপ্তধনের মতো পাওয়া কিছু গোপন দলিল। তাতে ভিয়েতনাম যুদ্ধ নিয়ে মার্কিন সরকারের লুকানো সত্য লেখা।
উপস্থিত অনেক সাংবাদিক বললেন, ‘এই নথি ছাপলে সারা দেশ তোলপাড় হয়ে যাবে।’ কিন্তু সম্পাদক ভীষণ দ্বিধাগ্রস্ত— ‘এই নথি কী প্রকাশ করব, নাকি করব না?’ কারণ তাতে সরকারের রোষানল অনিবার্য।
এই দ্বিধা ও আতঙ্কের মধ্যে বেজে উঠল অফিসের ফোন। ওপাশে এক সরকারি কর্মকর্তা। তার কঠিন ও ঠান্ডা কণ্ঠ, ‘এই রিপোর্ট প্রকাশ করা যাবে না। এটা জাতীয় নিরাপত্তার জন্য বিপজ্জনক।’
সরকারের এই নিষেধাজ্ঞায় সম্পাদকের দ্বিধা ও আতঙ্কের পারদটা আরও উপরে উঠল। তখন এক তরুণ রিপোর্টার বলল, ‘আমরা যদি ভয় পাই, তাহলে সাংবাদিকতা কেন করছি?’ ধীরে ধীরে সম্পাদকের উপলব্ধি হলো, ‘আমাদের কাজ সরকারকে খুশি করা নয়। সত্যটা বলা।’
পরদিন সকালে পত্রিকা বের হলো। শীর্ষ সংবাদ—‘গোপন নথিতে ভিয়েতনাম যুদ্ধের সত্য’। সারা দেশে হৈচৈ পড়ে গেল। মানুষ হতবাক—সরকার মানুষকে বুঝাল কী, আর প্রকৃত সত্য কী?
ক্ষুব্ধ সরকার দ্রুত আদালতে গেল। মামলা গড়াল আমেরিকার সুপ্রিম কোর্টে। সরকারের দাবি, ‘এই গোপন নথির প্রকাশনা বন্ধ করতে হবে! এ প্রকাশনা জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি।’ পত্রিকা বলল, ‘এটা আমাদের অধিকার—মতপ্রকাশের স্বাধীনতা।’
কয়েক দিনের যুক্তিতর্ক ও উত্তেজনার পর রায় এল। আদালত বলল, ‘সরকার সংবাদপত্রকে এভাবে থামাতে পারবে না।’
সাংবাদিকদের মধ্যে উল্লাস শুরু হলো। কেউ কেউ চিৎকার করে উঠল, ‘আমরা জিতেছি!’ কিন্তু সম্পাদক চুপচাপ। তিনি জানতেন—এই জয়ের মানে শুধু একটা মামলা জেতা নয়। এর মানে সত্য বলার অধিকার বাঁচিয়ে রাখা।

এই ঘটনাটি দেখায়, সম্পাদকীয় নীতিমালা মানে শুধু নিয়ম নয়, সত্য প্রকাশের সাহস। আর সেই সাহসই গণতন্ত্রকে বাঁচিয়ে রাখে। এই ঘটনা পরে ‘পেন্টাগন পেপার্স কেস’ নামে ইতিহাসে জায়গা করে নেয়।
এই সাহসের গল্প শেষ হতে না হতেই, পরের বছর ভারতে একই প্রশ্ন অন্যভাবে সামনে এল। ১৯৭২ সালে সরকার এক আদেশে সংবাদপত্রের পৃষ্ঠাসংখ্যা সীমিত করে দিল। টাইমস অব ইন্ডিয়া ও তার মালিক বেনেট কোলম্যান অ্যান্ড কোং বুঝতে পারল—এটা শুধু কাগজের পৃষ্ঠা কমানো নয়, এটা দ্ব্যর্থহীনভাবে মত প্রকাশের কণ্ঠরোধ। তারা আদালতের দ্বারস্থ হলো। মামলা গড়াল ভারতের সুপ্রিম কোর্টে। দীর্ঘ শুনানি হলো। রায় এল ১৯৭৩ সালে। রায়ে আদালত বললেন—‘রাষ্ট্র পৃষ্ঠাসংখ্যা নির্ধারণ করে দিতে পারে না। এটা সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ।’ এই রায় দেখিয়ে দেয়, সম্পাদকীয় নীতিমালা শুধু পত্রিকার ভেতরের নৈতিক নির্দেশনা নয়, বরং রাষ্ট্রীয় নীতির সঙ্গেও গভীরভাবে যুক্ত।
এর বহু বছর পর, ২০১১ সালে যুক্তরাজ্যে ঘটল এক ভিন্ন ধরনের কাহিনি, যা প্রায় গোয়েন্দা থ্রিলারের মতো। লন্ডনের বৃষ্টিভেজা এক সকালে প্রকাশ পায় এক ভয়াবহ সত্য—নিউজ অব দ্য ওয়ার্ল্ড নামের বিখ্যাত ট্যাবলয়েড পত্রিকা দীর্ঘদিন ধরে মানুষের ব্যক্তিগত ফোন হ্যাক করে খবর সংগ্রহ করছিল। শুরুতে বিষয়টি ছিল সেলিব্রিটিদের নিয়ে, পরে রাজনীতিবিদ, এমনকি সাধারণ মানুষের জীবনও এতে ঢুকে পড়ে।
এ খবর প্রকাশ পেতেই দেশজুড়ে তীব্র ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। প্রশ্ন ওঠে—সংবাদ পাওয়ার জন্য কি মানুষের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা লঙ্ঘন করা যায়? চাপ বাড়তে বাড়তে শেষ পর্যন্ত ১৬৮ বছরের পুরোনো সেই পত্রিকাটি বন্ধ হয়ে যায়। সাংবাদিক ও সম্পাদকদের বিরুদ্ধে তদন্ত ও মামলা হয়। এই ঘটনা প্রমাণ করে, সম্পাদকীয় নীতিমালা লঙ্ঘনে সাফল্য যত বড়ই হোক, পতন অবশ্যম্ভাবী।
কয়েক বছর পর পতনের এই গল্পই যেন এক ধরনের প্রতিধ্বনি হয়ে শোনা গেল বাংলাদেশে। ২০১৬ সালের ফেব্রুয়ারি, ঢাকা। ইংরেজি দৈনিক ডেইলি স্টারের সম্পাদক মাহফুজ আনাম আচমকা একটি টক শোতে বলে বসলেন, ২০০৭ সালের রাজনৈতিক অস্থিরতার সময় কিছু খবর যাচাই-বাছাই না করেই ডেইলি স্টারে ছাপা হয়েছিল। এই স্বীকারোক্তির পর তাঁর বিরুদ্ধে দেশ জুড়ে একের পর এক মামলা দায়ের হতে থাকে। তাতে শুরু হয় নতুন বিতর্ক—সত্য বলা কি অপরাধ, নাকি এটি সাংবাদিকতায় সততার প্রমাণ? এই ঘটনা দেখায়, সম্পাদকীয় নীতিমালা শুধু অন্যের ভুল ধরার বিষয় নয়; নিজের ভুল স্বীকার করার সাহসও এর অংশ, যদিও সেই সাহসের মূল্য অনেক বড় হতে পারে।
এই চারটি গল্প একে অপরের সঙ্গে অদৃশ্য সুতোয় বাঁধা। যুক্তরাষ্ট্রের পেন্টাগন পেপার্স, ভারতের বেনেট কোলম্যান মামলা, যুক্তরাজ্যের ফোন হ্যাকিং কেলেঙ্কারি এবং বাংলাদেশের ডেইলি স্টার বিতর্ক—এই চার ঘটনা আমাদের শেখায়, সম্পাদকীয় নীতিমালা কেবল নিয়মের বই নয়। এটি একদিকে সত্য প্রকাশের অধিকার, অন্যদিকে দায়িত্বের সীমা। কোথাও এই নীতিমালা গণতন্ত্রকে রক্ষা করে। কোথাও তা লঙ্ঘিত হলে প্রতিষ্ঠান ধ্বংস হয়। আবার কোথাও তা নিজের ভুল স্বীকারের মধ্য দিয়ে নতুন করে সংজ্ঞা পায়।

প্রকৃতপক্ষে এই নীতিমালাই গণমাধ্যমের ভিত। রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ হিসেবে গণমাধ্যম কতটা দৃঢ় ও শক্ত হবে, তা নির্ভর করে এই ভিতের ওপর। মুক্ত গণমাধ্যম দিবসে এই সম্পাদকীয় নীতিমালার প্রয়োজন, বাস্তবতা ও চ্যালেঞ্জ নতুন করে ভাবা জরুরি। তার আগে ‘সম্পাদকীয় নীতিমালা’ বিষয়টির সঙ্গে পাঠককে পরিচিত করানো যাক।
সম্পাদকীয় নীতিমালা হলো সংবাদমাধ্যমের জন্য নির্ধারিত একগুচ্ছ নীতি, মানদণ্ড ও নির্দেশনা—যার মাধ্যমে ঠিক হয় কীভাবে সংবাদ সংগ্রহ, যাচাই, উপস্থাপন ও প্রকাশ করা হবে। এ নীতিমালা ঠিক করে সংবাদমাধ্যম কী ছাপবে, কীভাবে ছাপবে, আর কোথায় সীমা টানবে। অন্যভাবে সম্পাদকীয় নীতিমালা হলো একটি গণমাধ্যমের নৈতিক, পেশাগত ও কার্যকরী নির্দেশিকা। একে গণমাধ্যমের ‘নৈতিক সংবিধান’ও বলা হয়ে থাকে। এর মধ্যে থাকে সত্যতা যাচাই, নিরপেক্ষতা, স্বার্থের সংঘাত এড়ানো, গোপনীয়তার প্রতি সম্মান, ভুল সংশোধনের নিয়ম এবং বিজ্ঞাপন ও সংবাদ আলাদা রাখার নীতি ইত্যাদি।
এই নীতিমালার পরিধি ও প্রয়োগ, বাংলাদেশ, ভারতসহ উন্নত দেশগুলোতে এমন সব ঘটনা ও গল্পের জন্ম দিয়েছে; যা শুধু মিডিয়া নয়, গণতন্ত্র ও মত প্রকাশের স্বাধীনতার ধারণাকেই নাড়িয়ে দিয়েছে। এই লেখার শুরুতে উল্লেখ করা ঘটনাগুলো ছিল তেমনি বহুল আলোচিত ও বহুল চর্চিত কিছু ঘটনা।
গণমাধ্যম শুধু তথ্য দেয় না, জনমত গঠন করে। নীতিমালা না থাকলে তথ্য বিকৃত হতে পারে। পক্ষপাত বাড়ে। ক্ষমতার অপব্যবহার সহজ হয়। গণমাধ্যম ব্যবসায়িক বা রাজনৈতিক প্রভাবদুষ্ট হতে পারে। থাকলে সাংবাদিকতার বিশ্বাসযোগ্যতা বাড়ে। তথ্যের ভুল ও বিভ্রান্তি কমে। পাঠকের আস্থা তৈরি হয়। সাংবাদিকদের জন্য স্পষ্ট দিকনির্দেশনা তৈরি হয় এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত হয়।
বাংলাদেশে অনলাইন গণমাধ্যম ও টিভিসহ সকল সম্প্রচার মাধ্যমের জন্য সম্পাদকীয় নীতিমালা প্রণয়ন ও অনুসরণ বাধ্যতামূলক। জাতীয় অনলাইন গণমাধ্যম নীতিমালা-২০১৭ এর ৫.১ অনুচ্ছেদ ও জাতীয় সম্প্রচার নীতিমালা-২০১৪ এর ৭.১ অনুচ্ছেদে এ নির্দেশনা সুস্পষ্ট। অন্যদিকে প্রিন্ট মিডিয়ার ক্ষেত্রে প্রেস কাউন্সিল আইন, ১৯৭৪ সাংবাদিকতার নৈতিকতার মানদণ্ড নির্ধারণ করে।
প্রেস কাউন্সিল সাংবাদিকদের জন্য আচরণবিধি তৈরি ও তদারকি করে। তাছাড়া সাইবার সুরক্ষা বিষয়ক আইন, দণ্ডবিধিসহ দেশের প্রচলিত বিভিন্ন আইন, নীতিমালা, বিধি-বিধান ও আদালতের রায় সংবাদে শালীনতা, রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা, মানহানি, আদালত অবমাননাসহ বিভিন্ন বিষয়ে সীমারেখা টেনে দিয়েছে—যা বাস্তবে সম্পাদকীয় নীতিমালার অংশ হয়ে দাঁড়ায়। এক্ষেত্রে তথ্য মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (সম্প্রচারের ক্ষেত্রে) নির্দেশনাও প্রাসঙ্গিক।
বাংলাদেশের শীর্ষ গণমাধ্যম প্রথম আলো ও দ্য ডেইলি স্টার নিজস্ব সম্পাদকীয় নীতিমালা অনুসরণ করে। প্রথম আলো ও ডেইলি স্টার উভয় পত্রিকার নীতিমালায় বস্তুনিষ্ঠ, আপসহীন ও পক্ষপাতশূন্য সংবাদ পরিবেশন ও পূর্ণ সত্য উদঘাটনকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে জনস্বার্থ, মানবাধিকার, এবং ক্ষমতার জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার নীতিও অন্তর্ভুক্ত। এসব প্রতিষ্ঠানে সাধারণত ফ্যাক্ট-চেকিং, সম্পাদকীয় স্বাধীনতা, পাঠকের প্রতি দায়বদ্ধতা গুরুত্ব পায়। তবে ছোট ও অনলাইন প্ল্যাটফর্মে অনেক সময় এই কাঠামো দুর্বল বা অনিয়মিত।
তবে বাস্তবতা হলো, বাংলাদেশের সিংহভাগ গণমাধ্যমে লিখিত ও প্রকাশ্য নীতিমালা নেই। অনেক ক্ষেত্রে রাজনৈতিক চাপ, মালিকানার প্রভাব ও বিজ্ঞাপন নির্ভরতা নীতিমালার পূর্ণ প্রয়োগকে বাধাগ্রস্ত করে। ফলে নীতিমালা থাকলেও সবসময় তা মানা হয় না। তাছাড়া অনলাইন গণমাধ্যমে প্রচুর নৈরাজ্য। বেশিরভাগ অনলাইনে বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ ও তথ্য যাচাই-বাছাইয়ের ঘাটতি বেশ প্রবল।
একটি কার্যকর নীতিমালায় নিম্নোক্ত বিষয় থাকা উচিত:
তথ্য যাচাইয়ের কঠোর মানদণ্ড, স্বার্থের সংঘাত এড়ানোর নিয়ম, ভুয়া খবর প্রতিরোধ ব্যবস্থা, নিরপেক্ষতা,
জবাবদিহি, স্বচ্ছতা, সংশোধন, মানবাধিকার ও বৈচিত্র্যের প্রতি শ্রদ্ধা ইত্যাদি।
এছাড়া ডিজিটাল যুগে ভুয়া খবর, ভুল বা মিথ্যা তথ্য ও অপতথ্য রোধ ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার নিয়েও বিশেষ ও স্পষ্ট নির্দেশনা প্রয়োজন।
একসময় সংবাদপত্র ছিল মূলত ব্যবসা। বিশ্বাসযোগ্যতা নয়, বিক্রিই ছিল প্রধান লক্ষ্য। ১৯শ শতক পর্যন্ত সাংবাদিকতার জগতে কোনো সুসংগঠিত নীতিমালা ছিল না। তখন ‘ইয়েলো জার্নালিজম’-এর দাপটে অতিরঞ্জন, পক্ষপাত আর উত্তেজনাই ছিল পাঠক টানার হাতিয়ার। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে প্রশ্ন উঠতে শুরু করল—সংবাদ কি শুধু পণ্য, নাকি সমাজের প্রতি এর কোনো দায়ও আছে? এই প্রশ্ন থেকেই ১৯২৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রে আমেরিকান সোসাইটি অব নিউজপেপার এডিটরস কর্তৃক প্রণীত হলো ‘কানুনস অব জার্নালিজম’; যা আধুনিক বিশ্বের প্রথম বড় আকারের সম্পাদকীয় নীতিমালা। এখানে সাংবাদিকদের দায়িত্ব, স্বাধীনতা, নিরপেক্ষতা, সত্যতা ও জনস্বার্থকে সাংবাদিকতার মূল স্তম্ভ হিসেবে ঘোষণা করা হয়।

এরপর ১৯৪৭ সালে হাচিন্স কমিশন ‘সোশ্যাল রেসপন্সিবিলিটি থিওরি’ তুলে ধরে বলল—মিডিয়ার কাজ শুধু খবর পরিবেশন নয়, বরং সমাজকে সঠিকভাবে প্রতিফলিত করা এবং জনস্বার্থ রক্ষা করা। এরপর বিবিসির ‘এডিটোরিয়াল গাইডলাইনস’ Editorial Guidelines এবং দ্য নিউইয়র্ক টাইমস -এর নৈতিক কোড বিশ্বব্যাপী মানদণ্ডে পরিণত হয়।
এই ধারাবাহিকতায় আজকের বিশ্বে ৪০০-রও বেশি সম্পাদকীয় নীতিমালা তৈরি হয়েছে, যা বিভিন্ন মিডিয়া প্রতিষ্ঠান, প্রেস কাউন্সিল ও সাংবাদিক সংগঠন অনুসরণ করে।
উন্নত বিশ্বের গণমাধ্যমে সবচেয়ে বড় গুরুত্ব পায় জনস্বার্থ, গণতন্ত্রের সুরক্ষা, ক্ষমতার জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং মানবাধিকারের প্রশ্ন। তারা নিজেদের ‘ওয়াচডগ’ বা প্রহরী হিসেবে দেখে—যেখানে ক্ষমতার অপব্যবহার হলেই তা উন্মোচন করা তাদের দায়িত্ব। শক্তিশালী সম্পাদকীয় বোর্ড, আলাদা ফ্যাক্ট চেকিং টিম, এমনকি পাঠকের অভিযোগ শোনার জন্য পাবলিক এডিটর বা ন্যায়পাল নিয়োগ—এসবই এই দায়িত্ববোধের প্রতিফলন। তবে এখানেও বিতর্ক থেমে নেই। ‘অবজেক্টিভ জার্নালিজম’ বনাম ‘অ্যাকটিভিস্ট জার্নালিজম’—এই দ্বন্দ্ব এখন বিশ্বজুড়ে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। একই সঙ্গে অনেক জায়গায় প্রেস স্বাধীনতা কমে যাওয়ার উদ্বেগও বাড়ছে।
উন্নত দেশগুলোর প্রতিষ্ঠিত গণমাধ্যমে সম্পাদকীয় নীতিমালাগুলো কেবল কাগজে নয়, বাস্তবেও কার্যকর। বিশ্বের সবচেয়ে প্রভাবশালী মিডিয়াগুলোর ক্ষেত্রে—যেমন বিবিসি, দ্য গার্ডিয়ান, দ্য নিউইয়র্ক টাইমস—এর নীতিমালা প্রকাশ্য, কঠোর এবং নিয়মিত আপডেট হয়। সেখানে মূল অগ্রাধিকার থাকে জনস্বার্থ, মানবাধিকার এবং ক্ষমতার জবাবদিহি নিশ্চিত করা। সেখানে তথ্য যাচাই ছাড়া কোনো সংবাদ প্রকাশ করা হয় না, ভুল হলে দ্রুত সংশোধন দেওয়া হয়, আর সম্পাদকীয় বিভাগকে মালিক, সরকার বা বিজ্ঞাপনদাতার প্রভাব থেকে আলাদা রাখতে শক্ত ‘ফায়ারওয়াল’ বজায় রাখা হয়।
সংবাদে সব পক্ষের বক্তব্য তুলে ধরা, সূত্র উল্লেখ করা, পাঠকের অভিযোগ গ্রহণ করা এবং বিজ্ঞাপন ও সংবাদকে স্পষ্টভাবে আলাদা রাখা—এসবই তাদের দৈনন্দিন চর্চার অংশ। ডিজিটাল যুগে যোগ হয়েছে নতুন মাত্রা—সোশ্যাল মিডিয়ায় সাংবাদিকের আচরণ, এমনকি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহারের ক্ষেত্রেও পৃথক নীতিমালা প্রণীত হচ্ছে।
অন্যদিকে বাংলাদেশ ও ভারতীয় উপমহাদেশের বাস্তবতা ভিন্ন। এখানে সম্পাদকীয় নীতিমালা থাকলেও তার প্রয়োগ অনেক সময়ই দুর্বল। রাজনৈতিক প্রভাব, করপোরেট মালিকানার চাপ এবং বিজ্ঞাপন নির্ভরতা সংবাদকে প্রভাবিত করে। ফলে সেলফ সেন্সরশিপ, দলীয় বিভাজন, দুর্বল ফ্যাক্ট চেকিং এবং সাংবাদিকদের নিরাপত্তা ঝুঁকি—এসব সমস্যা প্রায়ই সামনে আসে। উন্নত দেশের তুলনায় এখানে স্বাধীনতা সীমিত, জবাবদিহিতা দুর্বল এবং নীতিমালার প্রয়োগ আংশিক। যে নীতিমালা পশ্চিমা বিশ্বে একটি কার্যকর ‘নৈতিক কাঠামো’ হিসেবে কাজ করে, তা অনেক সময় উন্নয়নশীল দেশে কেবল ‘কাগুজে নীতি’ হিসেবেই থেকে যায়।
গণমাধ্যমের স্বাধীনতা মানে সীমাহীন স্বাধীনতা নয়। এর সঙ্গে জুড়ে আছে দায়িত্ব। সম্পাদকীয় নীতিমালা সেই দায়িত্বের কাঠামো তৈরি করে। মুক্ত গণমাধ্যম দিবসে আমাদের প্রশ্ন হওয়া উচিত—গণমাধ্যম কি শুধু স্বাধীন, নাকি দায়িত্বশীলও? কারণ সত্যিকারের স্বাধীনতা তখনই অর্থবহ, যখন তা নীতির ভিত্তিতে দাঁড়িয়ে থাকে।
তথ্যসূত্র: UNESCO World Press Freedom Day, American Society of Newspaper Editors (ASNE), BBC Editorial Guidelines, The New York Times Ethics Handbook, Judgement of Supreme Court of India (Bennett Coleman case), United States Supreme Court (Pentagon Papers case Documentation).

অর্থনীতিবিদ আনু মুহাম্মদ বলেছেন, নির্বাচনী প্রচারে তারেক রহমান ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ স্লোগান দিয়েছিলেন। কিন্তু সরকারের আড়াই মাসের কর্মকাণ্ডে দেখা যাচ্ছে– সরকার আসলে চলছে ‘সবার আগে যুক্তরাষ্ট্র’ নীতিতে।
১৪ ঘণ্টা আগে
২০২৫ সালে সামরিক খাতে সবচেয়ে বেশি ব্যয় করা পাঁচ দেশ হলো যুক্তরাষ্ট্র, চীন, রাশিয়া, জার্মানি এবং ভারত।
১৬ ঘণ্টা আগে
আজকালকের ছেলেমেয়েদের পছন্দের সমীকরণ কেন বদলে যাচ্ছে, তা নিয়ে সাংস্কৃতিক মহলে বিস্তর আলোচনা হচ্ছে। জেনজি বা আজকের প্রজন্মের কাছে শার্লক হোমস যতটা ‘আইকনিক’, ফেলুদা কেন ততটা নয়—এই প্রশ্নও চায়ের আড্ডায়, ঘরোয়া আলোচনায় প্রায়ই শোনা যায়।
২১ ঘণ্টা আগে
অবিশ্বাস্য মনে হলেও সত্যি। বাংলাদেশ ও ভারতের দীর্ঘ সীমান্তে যেখানে কাঁটাতারের বেড়া দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না, সেখানে অনুপ্রবেশ ঠেকাতে এবার বিষধর সাপ ও ভয়ংকর কুমির ছেড়ে দেওয়ার কথা ভাবছে ভারত!
১ দিন আগে