এক্সপ্লেইনার

জেনজিদের কাছে শার্লক হোমস যতটা জনপ্রিয়, ফেলুদা ততটা নয় কেন

কাজী নিশাত তাবাসসুম
কাজী নিশাত তাবাসসুম

স্ট্রিম গ্রাফিক

আজকালকের ছেলেমেয়েদের পছন্দের সমীকরণ কেন বদলে যাচ্ছে, তা নিয়ে সাংস্কৃতিক মহলে বিস্তর আলোচনা হচ্ছে। জেনজি বা আজকের প্রজন্মের কাছে শার্লক হোমস যতটা ‘আইকনিক’, ফেলুদা কেন ততটা নয়—এই প্রশ্নও চায়ের আড্ডায়, ঘরোয়া আলোচনায় প্রায়ই শোনা যায়।

প্রশ্নটির উত্তর খুঁজতে বসলে দেখা যায়, বিশ্বায়ন ও আধুনিক মিডিয়া কনজাম্পশনের প্রভাব। যদিও সত্যজিৎ রায়ের ফেলুদা বাঙালির চিরকালীন আবেগ, তবুও আজকের তরুণদের কাছে শার্লক হোমস অনেক বেশি প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে মূলত ‘বিবিসি ইফেক্ট’-এর কারণে। ২০১০ সালে স্টিভেন মোফাট এবং মার্ক গ্যাটিস যখন শার্লককে ১৮৯৫-এর লন্ডন থেকে তুলে এনে বর্তমানের স্মার্টফোন ও জিপিএস-এর যুগে বসিয়ে দিলেন, তখন বেনেডিক্ট কাম্বারব্যাচের সেই চরিত্রটি জেনজির প্রযুক্তি-নির্ভর মানসিকতার সঙ্গে মিলেমিশে এক হয়ে গেল।

ব্রিটিশ সংবাদমাধ্য দ্য ইনডিপেনডেন্ট-এর এক জরিপ বলছে, এক দশকের সবচেয়ে জনপ্রিয় ড্রামা সিরিজ ছিল ‘শার্লক’। শুধু যুক্তরাজ্যেই গড়ে ১ কোটি ২০ লাখ দর্শক এই সিরিজ দেখেছে। ফলে বিবিসির এই সিরিজ যে শার্লক হোমসের জনপ্রিয়তা বাড়াতে সাহায্য করেছে, তাতে কোনোই সন্দেহ নেই।

বিপরীতে, ফেলুদাকে আধুনিক প্রেক্ষাপটে আনার বিচ্ছিন্ন কিছু চেষ্টা হলেও মূল গল্পের কাঠামো না ভাঙায় তিনি আজও সেই পুরনো আমেজেই বন্দি রয়ে গেছেন, যা আজকের গ্লোবাল জেনারেশনের কাছে অনেক সময় ‘ব্যাকডেটেড’ মনে হয়।

চরিত্রায়নের জটিলতাও এখানে একটি বড় ফ্যাক্টর হিসেবে কাজ করে। সেজ জার্নালে প্রকাশিত এক গবেষণায় রন তাম্বুরিনি, জসুয়া বাল্ডউইন ও সুজয় প্রভূ দেখিয়েছেন, আজকের তরুণ প্রজন্ম নিখুঁত বা ‘পারফেক্ট’ চরিত্রের চেয়ে জটিল এবং কিছুটা ত্রুটিপূর্ণ চরিত্র বেশি পছন্দ করে। ফলে শার্লক হোমস যখন নিজেকে একজন ‘হাই-ফাংশনিং সোসিওপ্যাথ’ হিসেবে দাবি করেন কিংবা তার মাদকাসক্তি ও অসামাজিক আচরণের কথা উঠে আসে, তখন তিনি রক্ত-মাংসের একজন মানুষ হিসেবে আরও বেশি রহস্যময় ও আকর্ষণীয় হয়ে ওঠেন।

অন্যদিকে, ফেলুদা একজন ‘আদর্শ ভদ্রলোক’। ধূমপান বা চারমিনার আসক্তি ছাড়া তার চরিত্রে কোনো অন্ধকার দিক নেই। এই অতি-পারফেকশন জেনজির কাছে একঘেয়ে মনে হতে পারে, যারা মূলত ‘হাউস’ বা শার্লকের মতো উদ্ধত কিন্তু জিনিয়াস অ্যান্টি-হিরোদের বেশি পছন্দ করে।

এছাড়া বৈশ্বিক ব্র্যান্ডিং ও নেটফ্লিক্স সংস্কৃতির কথা ভুলে গেলে চলবে না। রবার্ট ডাউনি জুনিয়রের সিনেমা থেকে শুরু করে ‘এনোলা হোমস’—শার্লককে বারবার ভেঙে নতুনভাবে বিশ্ববাজারে বিপণন করা হয়েছে। অথচ ফেলুদা মূলত বাংলা ভাষাভাষী গণ্ডিতেই সীমাবদ্ধ রয়ে গেছেন।

সাংস্কৃতিক নান্দনিকতার ক্ষেত্রেও শার্লক অনেক ধাপ এগিয়ে। সোশ্যাল মিডিয়ায় বর্তমানে জনপ্রিয় ‘ডার্ক অ্যাকাডেমিয়া’ ট্রেন্ডের সঙ্গে শার্লকের লং-কোট, লন্ডনের কুয়াশা এবং মেথডিক্যাল চিন্তার যে আবহ, তা খুব সহজেই মানিয়ে যায়। শার্লক এখন কেবল একটি গোয়েন্দা চরিত্র নন, তিনি একটি গ্লোবাল স্টাইল স্টেটমেন্ট। সেই তুলনায় ফেলুদার ধুতি-পাঞ্জাবি বা সাদামাটা পোশাক আজকের তরুণদের ফ্যাশন সেন্সের সঙ্গে ততটা মেলানো যায় না। এমনকি গোয়েন্দা ও সহকারীর সমীকরণেও বড় তফাত লক্ষ্য করা যায়।

জেনজি প্রজন্ম সমঅধিকার ও অংশীদারত্বে বিশ্বাসী। শার্লক ও ওয়াটসনের সম্পর্ক অনেকটা সমানে-সমান বন্ধুর মতো, যেখানে ওয়াটসন হোমসের নৈতিক দর্পন হিসেবে কাজ করেন। কিন্তু ফেলুদার ক্ষেত্রে তোপসে সবসময়ই একজন অনুগত শিষ্য বা শাগরেদ, যে কেবল প্রশ্নাতীতভাবে গুরুকে মেনে নেয়। এই ‘গুরু-শিষ্য’ সম্পর্কের চেয়ে ‘পার্টনারশিপ’ আজকের প্রজন্মের কাছে অনেক বেশি রিলেটেবল।

সবশেষে বলা যায়, ফেলুদা বাঙালির কাছে যতটা না সাহিত্য, তার চেয়ে বেশি নস্টালজিয়া। কিন্তু আজকের বিশ্বনাগরিক প্রজন্মের কাছে সেই নস্টালজিয়ার চেয়ে আধুনিক বাস্তবতাই বড় সত্য। শার্লক হোমস নিজেকে প্রতি যুগে ভেঙে সময়োপযোগী করেছেন বলেই তিনি আজও অপ্রতিরোধ্য, আর ফেলুদা এখনও রয়ে গেছেন পুরনো কলকাতার সোনালী স্মৃতির পাতায়।

তথ্যসূত্র: ইনডিপেনডেন্ট, সেজ জার্নাল, দ্য গার্ডিয়ান রিভিউ, রোলিং স্টোন ম্যাগাজিন ও দ্য হিন্দু

সম্পর্কিত