জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০২৬

ও গণভোট

ক্লিক করুন

জেন-জি আন্দোলনে ক্ষমতাচ্যুত কেপি ওলি ফের ভোটে! কোন পথে নেপাল?

স্ট্রিম ডেস্ক
স্ট্রিম ডেস্ক
ঢাকা

আন্দোলনের মাত্র ছয় মাসের মাথায় নেপাল আবার জাতীয় নির্বাচনের মুখোমুখি। স্ট্রিম গ্রাফিক

নেপালের রাজনীতিতে গত কয়েক মাসে যে নাটকীয় পরিবর্তন ঘটেছে, তা শুধু দেশটির অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেই নয়, দক্ষিণ এশিয়ার কূটনৈতিক সমীকরণেও বড় প্রভাব ফেলতে পারে। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে শুরু হওয়া গণআন্দোলন সেই পরিবর্তনের সূচনা করে। তরুণদের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা সেই আন্দোলনকে অনেকেই 'জেন-জি আন্দোলন' নামে অভিহিত করছেন। শেষ পর্যন্ত নেপালের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী কেপি শর্মা ওলি-র সরকারকে পদত্যাগ করতে বাধ্য করে। আন্দোলনের মাত্র ছয় মাসের মাথায় দেশটি আবারও জাতীয় নির্বাচনের মুখোমুখি হয়েছে। সেই নির্বাচনে আবারও প্রার্থী হিসেবে দাঁড়িয়েছেন ক্ষমতাচ্যুত এই নেতা। ফলে প্রশ্ন উঠেছে, নেপালের ভোটের লড়াই এবার কোন দিকে মোড় নেবে।

এই নির্বাচন নেপালের জন্য রাজনৈতিক পুনর্গঠনের মুহূর্ত। দুর্নীতি, বেকারত্ব, অর্থনীতির ধীরগতি এবং সাম্প্রতিক গণআন্দোলনের প্রভাব— সব মিলিয়ে দেশের মানুষ এখন নতুন নেতৃত্বের আশা করছে। একই সঙ্গে ভারত, চীন ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মতো দেশগুলোর আগ্রহও এই নির্বাচনকে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে।

২০২৫ সালের ৯ সেপ্টেম্বর নেপালের রাজনীতিতে এক অস্থির সময় শুরু হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিষেধাজ্ঞা আরোপের সিদ্ধান্ত ঘিরে প্রথমে ক্ষোভ তৈরি হয় তরুণদের মধ্যে। কিন্তু খুব দ্রুত সেই ক্ষোভ বড় আকারের রাজনৈতিক আন্দোলনে রূপ নেয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, তরুণ কর্মজীবী এবং শহুরে মধ্যবিত্তের বড় অংশ এতে যোগ দেয়।

শুরুতে আন্দোলনটি ছিল তুলনামূলক শান্তিপূর্ণ। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে উত্তেজনা বাড়তে থাকে। বিভিন্ন জায়গায় সংঘর্ষ হয় বিক্ষোভকারী ও পুলিশের মধ্যে। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছে যে রাজধানী কাঠমান্ডু-সহ বিভিন্ন শহরে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, এই আন্দোলনে অন্তত ৭৭ জনের মৃত্যু হয়। অনেকেই পুলিশের গুলিতে প্রাণ হারিয়েছিলেন।

বিক্ষোভের সময় সরকারি ভবন, প্রশাসনিক কার্যালয় এবং কিছু বেসরকারি স্থাপনায়ও আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। পার্লামেন্ট ভবন, সুপ্রিম কোর্টের আশপাশ এবং সচিবালয়ের এলাকায় উত্তেজনা তীব্র হয়ে ওঠে। শেষ পর্যন্ত পরিস্থিতি সামাল দিতে ব্যর্থ হয়ে প্রধানমন্ত্রী কেপি শর্মা ওলি পদত্যাগ করতে বাধ্য হন। এই ঘটনার পর নেপালে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। একটি অন্তর্বর্তীকালীন ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে দেশটি আবার নতুন নির্বাচনের দিকে এগিয়ে যায়।


বিক্ষোভের সময় সরকারি ভবন, প্রশাসনিক কার্যালয় এবং কিছু বেসরকারি স্থাপনায়ও আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। পার্লামেন্ট ভবন, সুপ্রিম কোর্টের আশপাশ এবং সচিবালয়ের এলাকায় উত্তেজনা তীব্র হয়ে ওঠে। শেষ পর্যন্ত পরিস্থিতি সামাল দিতে ব্যর্থ হয়ে প্রধানমন্ত্রী কেপি শর্মা ওলি পদত্যাগ করতে বাধ্য হন।


এখন আন্দোলনের মাত্র ছয় মাস পরই নেপালে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। অনেক বিশ্লেষকের মতে, এত দ্রুত নির্বাচনের সিদ্ধান্ত নেওয়ার উদ্দেশ্য ছিল রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা।

এই নির্বাচনে প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী কেপি শর্মা ওলি আবারও প্রার্থী হিসেবে মাঠে নেমেছেন। তাঁর দল কমিউনিস্ট পার্টি অব নেপাল (Unified Marxist–Leninist) বা ইউএমএল এখনও দেশের বড় রাজনৈতিক শক্তিগুলোর একটি। আগের নির্বাচনে দলটি সংসদের সবচেয়ে বেশি আসন জিতেছিল। তবে এবার পরিস্থিতি আগের মতো নয়। আন্দোলনের ফলে জনমতের একটি বড় অংশ বদলে গিয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। বিশেষ করে তরুণ ভোটারদের মধ্যে রাজনৈতিক পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা স্পষ্ট।

এই নির্বাচনের অন্যতম আলোচিত নাম ৩৫ বছর বয়সি তরুণ রাজনীতিক বলেন্দ্র শাহ। তিনি আগে একজন জনপ্রিয় র‍্যাপ শিল্পী ছিলেন। পরে রাজনীতিতে এসে কাঠমান্ডুর মেয়র নির্বাচিত হন।

র‍্যাপার থেকে রাজনীতিবিদ হয়ে ওঠা এই তরুণ নেতা এখন জাতীয় রাজনীতিতেও বড় চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছেন। তিনি লড়ছেন রাষ্ট্রিয় স্বাধীনতা পার্টি বা আরএসপির হয়ে। ২০২২ সালের নির্বাচনে দলটি চতুর্থ অবস্থানে ছিল, কিন্তু এবার অনেকেই মনে করছেন দলটির জনপ্রিয়তা বেড়েছে।

নেপালের পুরোনো রাজনৈতিক শক্তিগুলিও এই নির্বাচনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। এর মধ্যে অন্যতম নেপালি কংগ্রেস। দলটি দীর্ঘদিন ধরে দেশের প্রধান গণতান্ত্রিক শক্তি হিসেবে পরিচিত।

এবার দলটির নেতৃত্বে আনা হয়েছে ৪৯ বছর বয়সি নেতা গগন থাপা-কে। তিনি তুলনামূলক তরুণ এবং সংস্কারপন্থী রাজনীতিক হিসেবে পরিচিত। অনেকেই মনে করছেন, তাঁকে সামনে আনার মাধ্যমে দলটি নতুন ভোটারদের আকৃষ্ট করার চেষ্টা করছে।

নির্বাচনে প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী কেপি শর্মা ওলি আবারও প্রার্থী হিসেবে মাঠে নেমেছেন। তাঁর দল কমিউনিস্ট পার্টি অব নেপাল (Unified Marxist–Leninist) বা ইউএমএল এখনও দেশের বড় রাজনৈতিক শক্তিগুলোর একটি। আগের নির্বাচনে দলটি সংসদের সবচেয়ে বেশি আসন জিতেছিল। তবে এবার পরিস্থিতি আগের মতো নয়।

এ ছাড়াও গুরুত্বপূর্ণ শক্তি হিসেবে রয়েছে পুষ্পা কমল ডাহাল-এর নেতৃত্বাধীন কমিউনিস্ট পার্টি অব নেপাল (Maoist Centre)। নেপালের রাজনীতিতে মাওবাদী শক্তি এখনও বড় প্রভাব রাখে। ফলে নির্বাচনটি মূলত তিন ধরনের শক্তির মধ্যে প্রতিযোগিতায় পরিণত হয়েছে, একদিকে পুরনো রাজনৈতিক দলগুলো। অন্যদিকে, প্রাক্তন ক্ষমতাসীনদের শিবির, আবার নতুন প্রজন্মের প্রতিনিধিত্বকারী নতুন শক্তিও রয়েছে।

এই নির্বাচনের সবচেয়ে আলোচিত কেন্দ্রগুলির একটি পূর্ব নেপালের ঝাপা জেলার একটি আসন, ঝাপা-৫। এই আসনটি বহু বছর ধরে কেপি শর্মা ওলির শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত। তিনি এখান থেকেই বারবার নির্বাচিত হয়েছেন। কিন্তু এবার সেখানে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছেন বলেন্দ্র শাহ। ফলে এই আসনটি প্রতীকীভাবে পুরনো রাজনীতি বনাম নতুন প্রজন্মের লড়াইয়ের প্রতীক হয়ে উঠেছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, যদি এই আসনে অপ্রত্যাশিত ফল আসে, তাহলে তা পুরো দেশের রাজনৈতিক প্রবণতা বোঝার একটি বড় ইঙ্গিত হতে পারে।

কাঠমান্ডু উপত্যকার আসনগুলোর দিকেও বিশেষ নজর রাখা হচ্ছে। কাঠমান্ডু এবং আশপাশের এলাকায় মোট ১৫টি সংসদীয় আসন রয়েছে। এই অঞ্চলটি নেপালেরর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কেন্দ্র হওয়ায় এখানে ভোটের প্রবণতা অনেক সময় জাতীয় রাজনীতির দিক নির্ধারণ করে। শহরের তরুণ ভোটাররা বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সক্রিয় এবং তারা জেন-জি আন্দোলনের অন্যতম চালিকাশক্তি ছিল। ফলে তাদের ভোটের সিদ্ধান্ত নির্বাচনের ফলাফলে বড় প্রভাব ফেলতে পারে।

এই নির্বাচনে প্রধান আলোচ্য বিষয়গুলোর মধ্যে রয়েছে দুর্নীতি, কর্মসংস্থান সংকট এবং অর্থনৈতিক স্থবিরতা। দীর্ঘদিন ধরে নেপালের সাধারণ মানুষের অভিযোগ, রাজনৈতিক নেতৃত্ব দুর্নীতির বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে ব্যর্থ হয়েছে। সরকারি প্রকল্প থেকে শুরু করে প্রশাসনিক নিয়োগ, অনেক ক্ষেত্রেই অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। ফলে বিভিন্ন দল তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে দুর্নীতিবিরোধী ব্যবস্থা জোরদার করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। উদাহরণ হিসেবে নেপালি কংগ্রেস একটি প্রস্তাব দিয়েছে, ১৯৯০ সালের পর থেকে যারা রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ পদে ছিলেন, তাদের সম্পদের উৎস নিয়ে উচ্চপর্যায়ের তদন্ত করা। একই সঙ্গে বেকারত্ব কমানো, অর্থনীতিকে গতিশীল করা এবং তরুণদের জন্য নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করার কথাও বলা হচ্ছে।

নেপালের সংসদে মোট ২৭৫টি আসন রয়েছে। এর মধ্যে ১৬৫টি আসনে সরাসরি ভোটের মাধ্যমে প্রতিনিধিরা নির্বাচিত হন। অর্থাৎ প্রতিটি আসনে যে প্রার্থী বেশি ভোট পান, তিনি সংসদ সদস্য হন।

নেপালের নির্বাচন শুধু দেশটির অভ্যন্তরীণ রাজনীতির বিষয় নয়। এটি দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতির সঙ্গেও গভীরভাবে জড়িত।

নেপাল ভৌগোলিকভাবে দুই বড় শক্তি— ভারত এবং চিনের মাঝখানে অবস্থিত। ফলে ঐতিহাসিকভাবেই এই দুই দেশের প্রভাব নেপালের রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।

দিল্লি সব সময়ই নেপালের রাজনৈতিক পরিস্থিতি ঘনিষ্ঠভাবে পর্যবেক্ষণ করে। কারণ নেপালের স্থিতিশীলতা ভারতের নিরাপত্তা ও কৌশলগত স্বার্থের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। অন্যদিকে বেইজিংও গত এক দশকে নেপালে তার প্রভাব বাড়ানোর চেষ্টা করেছে।

নেপালের সংসদে মোট ২৭৫টি আসন রয়েছে। এর মধ্যে ১৬৫টি আসনে সরাসরি ভোটের মাধ্যমে প্রতিনিধিরা নির্বাচিত হন। অর্থাৎ প্রতিটি আসনে যে প্রার্থী বেশি ভোট পান, তিনি সংসদ সদস্য হন।

বাকি ১১০টি আসন ভোটের শতাংশ অনুযায়ী বিভিন্ন দলের মধ্যে ভাগ করে দেওয়া হয়। এতে রাজনৈতিক দলগুলো যে পরিমাণ ভোট পায়, তার ভিত্তিতে সংসদে আসন পায়। নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, সরাসরি নির্বাচিত আসনগুলোর ফল সাধারণত ভোটের ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই ঘোষণা করা হয়। তবে পাহাড়ি ভূপ্রকৃতির কারণে অনেক সময় ব্যালট বাক্স সংগ্রহে অতিরিক্ত সময় লাগে।সমানুপাতিক পদ্ধতির আসনগুলোর ফল ঘোষণা করতে সাধারণত আরও দুই থেকে তিন দিন সময় লাগে।

যদি পুরোনো দলগুলো আবার ক্ষমতায় ফিরে আসে, তাহলে রাজনৈতিক ধারাবাহিকতা বজায় থাকবে। কিন্তু যদি নতুন প্রজন্মের নেতৃত্ব শক্তিশালী হয়ে ওঠে, তাহলে নেপালের রাজনীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন দেখা যেতে পারে। সব মিলিয়ে নেপালের এই নির্বাচন এক অর্থে অতীত ও ভবিষ্যতের সংঘর্ষ। একদিকে দীর্ঘদিনের প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক শক্তি, অন্যদিকে নতুন প্রজন্মের পরিবর্তনের দাবি। এই দ্বন্দ্বের মধ্যেই নির্ধারিত হবে, দেশটি আগামী দিনে কোন পথে হাঁটবে।

সম্পর্কিত