১১৫তম জন্মবার্ষিকী
সামসুল আলম

বাংলাদেশের ইতিহাসে এমন সব ব্যক্তিত্ব রয়েছেন, যাদের জীবন ও কর্ম একটি নির্দিষ্ট সময়ের গণ্ডি অতিক্রম করে যুগে যুগে মানুষের প্রেরণার উৎস হয়ে ওঠে। কবি সুফিয়া কামাল তেমনই একজন। তিনি সাহিত্য, সমাজসেবা, নারী আন্দোলন, মানবাধিকার, সাংস্কৃতিক চেতনা এবং গণতান্ত্রিক সংগ্রামের মধ্য দিয়ে বাঙালি জাতির ইতিহাসে স্থান অধিকার করে আছেন। সাহস, দৃঢ়তা, নিষ্ঠা ও মানবিক চেতনার অসাধারণ সমন্বয়ের কারণে তিনি ‘জননী সাহসিকা’ নামে পরিচিত।
নারীর অধিকার ও মানবাধিকারের প্রসঙ্গ এলেই সুফিয়া কামালের সংগ্রামী ও আপসহীন অবস্থানের কথা স্মরণ হয়। দেশে যখন সাম্প্রদায়িকতা, মৌলবাদ, সাংস্কৃতিক আগ্রাসন কিংবা স্বৈরাচারের উত্থান ঘটে, তখনও তাঁর আদর্শ নতুন করে প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে। তিনি সমগ্র জীবন উৎসর্গ করেছিলেন মানুষের মর্যাদা প্রতিষ্ঠা, নারী মুক্তি, অসাম্প্রদায়িক সমাজ গঠন, ভাষা ও সংস্কৃতির বিকাশ এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে।
সুফিয়া কামাল ১৯১১ সালের ২০ জুন বরিশালের শায়েস্তাবাদে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর শৈশব ছিল সংগ্রাম, সীমাবদ্ধতা ও আত্মপ্রতিষ্ঠার কাহিনি। মাত্র সাত বছর বয়সে বাবা সৈয়দ আব্দুল বারী সংসার ত্যাগ করে সুফি সাধনার উদ্দেশ্যে চলে যান। এরপর মা সৈয়দা সাবেদা খাতুন দুই সন্তানকে নিয়ে মাতৃগৃহে আশ্রয় নেন। নবাব পরিবারের রক্ষণশীল পরিবেশে বেড়ে ওঠা সুফিয়া কামালের জন্য প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সুযোগ ছিল না। পরিবারে ছিল উর্দুর প্রচলন এবং বাংলা ভাষাকে শিখতে উৎসাহিত করা হতো না। কিন্তু জ্ঞানার্জনের প্রতি প্রবল আগ্রহ এবং মায়ের উৎসাহ তাঁকে বাংলা ভাষা শেখার দিকে নিয়ে যায়।
সুফিয়া কামাল ‘একালের আমাদের কাল’ বইয়ে মায়ের অবদান প্রসঙ্গে বলেছেন, ‘মাটিকে বাদ দিয়ে ফুলগাছের যেমন কোনো অস্তিত্ব নেই, আমার মাকে বাদ দিয়ে আমারও তেমন কোনো কথা নেই।’ গোপনে বাংলা বই পড়ে নিজের চেষ্টায় তিনি নিজেকে শিক্ষিত করে তোলেন। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সুযোগ না পেলেও তিনি জ্ঞানচর্চার মাধ্যমে এমন উচ্চতায় পৌঁছেছিলেন, যা তাঁকে পরবর্তী সময়ে বাংলা সাহিত্য ও সমাজজীবনের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্বে পরিণত করে।
সুফিয়া কামাল শৈশবেই মানুষের প্রতি অবিচার ও বৈষম্যের বাস্তব রূপ দেখেছিলেন। নবাব পরিবারের চাকরদের প্রতি অপমানজনক আচরণ তাঁকে গভীরভাবে ব্যথিত করত। মানুষে মানুষে এই ভেদাভেদ তাঁর কোমল মনে গভীর রেখাপাত করেছিল। জীবনের এই অভিজ্ঞতা তাঁকে মানবতার পক্ষে এবং বৈষম্যের বিরুদ্ধে দৃঢ় অবস্থান নিতে সাহায্য করে। মানুষের প্রতি সম্মান, ন্যায়বোধ, সততা ও মানবিকতা তাঁর সাহিত্য ও জীবনদর্শনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে ওঠে। মানবিক চেতনা থেকেই তিনি ধীরে ধীরে নারী অধিকার ও মানবাধিকার আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হন। মাত্র সাত বছর বয়সে তিনি মায়ের সঙ্গে গিয়ে বেগম রোকেয়ার সঙ্গে পরিচিত হন। সেই পরিচয় পরে তাঁর জীবনের গতিপথ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
রোকেয়ায় প্রতিষ্ঠিত ‘আঞ্জুমানে খাওয়াতিনে ইসলাম’-এর কার্যক্রমের মাধ্যমে সুফিয়া কামাল নারী শিক্ষা, নারী অধিকার এবং সামাজিক অগ্রগতির ধারণার সঙ্গে পরিচিত হন। এ সম্পর্কে সুফিয়া কামাল লিখেছেন, ‘‘প্রথম জীবনে কাজ করার পর ১৮ থেকে ২০ বছর বয়স পর্যন্ত আমি বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেনের প্রতিষ্ঠিত কলকাতার ‘আঞ্জুমান খাওয়াতিনে’-তে কাজ করি। এই প্রতিষ্ঠানের কাজ ছিল কলকাতার বস্তি এলাকার মুসলমান মেয়েদের মনভাবে একটু শিক্ষিত করে তোলা। হামিদা মঈন, শামসুন্নাহার মাহমুদ, সরলা রায়, জগদীশ বাবুর স্ত্রী অবেলা বসু, ব্রহ্মকুমারী দেবী তারা সবাই ছিলেন এই প্রতিষ্ঠানে। আমার স্বামী ছিলেন উদার প্রকৃতির মানুষ, এসব কাজে তার কাছ থেকে প্রচুর উৎসাহ পেয়েছি আমি।” এই কার্যক্রমের মাধ্যমে রোকেয়ার চিন্তাধারা ও আদর্শ তাঁর মধ্যে সঞ্চারিত হয়, যা নারী জাগরণের আন্দোলনে তাঁকে অগ্রণী ভূমিকা পালনে অনুপ্রাণিত করে। নারী জাগরণের আন্দোলনকে কেন্দ্র করে তিনি সাহিত্যও রচনা করেছেন, যেখানে নারীদের অনুপ্রাণিত করা হয়েছে। যেমন তিনি লিখেছেন:
নারীর বাহুতে শক্তি রয়েছে, অন্তরে জ্ঞান-তৃষ্ণা,
সংশয় ভরা সংসার মাঝে আঁধার-আলোর দিশা
শত বাধা ব্যবধান
তারি মাঝ হতে, দূর হতে যেন শোনা যায় আহ্বান
দূর হতে আসে আলো!
জাগো মাতা-বধু! তোমার ঘরের মাটির প্রদীপ জ্বালো!
(আলোর শিখা/ সুফিয়া কামাল)
বাংলাদেশের নারী আন্দোলনের ইতিহাস বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সুফিয়া কামাল ছিলেন অন্যতম প্রধান সংগঠক ও অনুপ্রেরণাদাত্রী। তাঁর নেতৃত্বে নারী আন্দোলন নতুন গতি লাভ করে এবং অসংখ্য নারী সামাজিক ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণের সাহস পায়। এখানেই তাঁর প্রাসঙ্গিকতা শেষ হয় না। নারী জাগরণের প্রশ্ন থেকে তিনি ধীরে ধীরে বৃহত্তর মানবমুক্তি এবং সামাজিক পরিবর্তনের আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হন। তিনি ছিলেন মুক্তবুদ্ধি, মুক্তচিন্তা এবং প্রগতিশীল মূল্যবোধের দৃঢ় সমর্থক। ধর্মীয় গোঁড়ামি, কুসংস্কার এবং মৌলবাদী চিন্তার বিরুদ্ধে সব সময় অবস্থান নিয়েছেন। বর্তমান সময়ে যখন উগ্রবাদ, অসহিষ্ণুতা এবং ধর্মের অপব্যাখ্যা সমাজে বিভিন্ন সংকট সৃষ্টি করছে। তখন সুফিয়া কামালের মুক্তবুদ্ধির চর্চা বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে।
মুক্তচিন্তার পাশাপাশি অসাম্প্রদায়িক চেতনা ছিল সুফিয়া কামালের ব্যক্তিত্বের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য। ১৯৪৬ সালে কলকাতার সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার সময় তিনি লেডি ব্র্যাবোর্ন কলেজে আশ্রয়কেন্দ্র পরিচালনা করেন এবং বিপন্ন মানুষের পাশে দাঁড়ান। তিনি স্মৃতিচারণে লিখেছেন: “১৯৪৩-এর দুর্ভিক্ষের সময় বর্ধমানে এবং ১৯৪৬-এর ‘ডাইরেক্ট অ্যাকশন ডে’-র হিন্দু মুসলমান সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার পর বিপন্ন এবং আহতদের মধ্যে কাজ করেছি। এ সময়েই তো হাজেরা মাহমুদ, রোকেয়া কবির, হোসেনা রশিদ ও তোমার (নূরজাহান মুর্শিদ) সঙ্গে আমার পরিচয় হলো।” অর্থাৎ ধর্ম, বর্ণ কিংবা সম্প্রদায় নির্বিশেষে মানুষকে মানুষ হিসেবে দেখার যে মানবিক শিক্ষা তাঁর মধ্যে ছিল, তা আজও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

মানবিকতা, অসাম্প্রদায়িকতা এবং প্রগতিশীল চিন্তার এই ধারা সুফিয়া কামালকে জাতীয় আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত করেছে। ১৯২৫ সালে অবিভক্ত ভারতে ব্রিটিশবিরোধী অসহযোগ আন্দোলনের সময় মহাত্মা গান্ধী বরিশাল সফরে এলে সুফিয়া কামাল নিজ হাতে চরকায় সুতা কেটে তাঁর হাতে তুলে দেন। এ সম্পর্কে ‘সুফিয়া কামাল নারীর ঘর, নারীর বাহির’ প্রবন্ধে সুমন সাজ্জাদ লিখেছেন: “সময়ের গভীর টানে এক সময় সুফিয়া কামাল নেমে এসেছেন রাজনীতির ময়দানেও। বরিশালে মহাত্মা গান্ধীর হাতে তুলে দিয়েছেন নিজের হাতে কাটা সুতো। বিভিন্ন কারণে প্রকাশ্য সভায় তাঁর জন্য যাওয়া ছিল অসম্ভব। তাই সাধারণ পোশাকে সিঁদুর পরে তিনি বাইরে এলেন। মনে গেঁথে নিলেন গান্ধী-দর্শনের অক্ষয় স্মৃতি।”
১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন ছিল বাঙালি জাতীয়তাবাদের ইতিহাসে যুগান্তকারী ঘটনা। এই আন্দোলনে সুফিয়া কামাল সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন এবং নারীদের সংগঠিত করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তিনি নারীদের নিয়ে মিছিল সংগঠিত করেন। আন্দোলনে নেতৃত্ব দেন এবং ভাষা আন্দোলনের পক্ষে জনমত গঠনে কাজ করেন। শুধু রাজনৈতিকভাবে নয়, সাহিত্যিকভাবেও তিনি ভাষা আন্দোলনের চেতনাকে ধারণ করেছিলেন। ভাষা আন্দোলনকে কেন্দ্র করে তিনি বহু কবিতা ও প্রবন্ধ রচনা করেন, যেখানে মাতৃভাষার মর্যাদা, সাংস্কৃতিক পরিচয় এবং জাতীয় চেতনার বিষয়গুলো গুরুত্ব পেয়েছে। যেমন তিনি লিখেছেন:
আশ্চর্য এমন দিন। মৃত্যুতে করে না কেহ শোক,
মৃত্যুরে করে না ভয়, শঙ্কাহীন, কিসের আলোক
উদ্ভাসিত ক’রে তোলে ক্লান্ত দেহ, মুখ, পদক্ষেপ
সংকল্পের দ্যুতি তরে দৃঢ়তার প্রচার প্রলেপ
করেছে ভাস্বর।
এরা যেন করেছে স্বাক্ষর
মৃত্যুর পরওয়ানা প’রে বাংলা ভাষার লিখি নাম:
‘আমার মায়েরই আমি মাটি থেকে বুকে মোর তুলিয়া নিলাম’
সালাম বরকত ছিল, আর ও ছিল নাম নাহি জানা কতোজন
পিতার অন্তিম আশা, জননীর বুক-জোড়া ধন,
কাহারও জীবন সাথী, বোনদের একমাত্র ভাই
তারা আজ নাই।
নাই? - আছে, আছে ... (একুশের কবিতা/সুফিয়া কামাল)
ভাষা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে সুফিয়া কামালের যে জাতীয়তাবাদী ও সাংস্কৃতিক চেতনার বিকাশ ঘটেছিল, তার প্রতিফলন দেখা যায় পাকিস্তানি শাসনামলের বিভিন্ন বৈষম্যমূলক নীতি ও স্বৈরাচারী কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে দৃঢ় অবস্থানে। তিনি বিভিন্ন গণতান্ত্রিক আন্দোলন, সভা-সমাবেশ এবং সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে জনগণকে সচেতন করার চেষ্টা করেন। গণতান্ত্রিক চেতনার পাশাপাশি সাংস্কৃতিক স্বাধীনতার প্রশ্নেও তিনি ছিলেন আপসহীন। পাকিস্তানি সরকার যখন বাঙালির ভাষা ও সংস্কৃতিকে দমিয়ে রাখার চেষ্টা করে, তখন সুফিয়া কামাল তার বিরুদ্ধে দৃঢ় অবস্থান গ্রহণ করেন।
১৯৬১ সালে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্মশতবার্ষিকীতে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে নানা আয়োজন করা হলেও তৎকালীন পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী রবীন্দ্রনাথকে উপেক্ষা করার নীতি গ্রহণ করে। শুধু তা-ই নয়, রবীন্দ্রসংগীতের বিরুদ্ধেও অপপ্রচার চালানো হয়। এই পরিস্থিতিতে সুফিয়া কামাল সাহসিকতার সঙ্গে প্রতিবাদ করেন। পাকিস্তানি শাসকদের হুমকি ও চাপ উপেক্ষা করে তিনি অন্যান্য সাহিত্যিক, শিল্পী ও বুদ্ধিজীবীদের সঙ্গে রবীন্দ্র জন্মশতবার্ষিকী উদ্যাপনের উদ্যোগ গ্রহণ করেন। এই আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় প্রতিষ্ঠিত হয় ‘ছায়ানট’, যা পরবর্তীকালে বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়। সুফিয়া কামাল এর সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৬৭ সালে পাকিস্তানের তথ্যমন্ত্রী খাজা শাহাবুদ্দিন যখন রবীন্দ্রসংগীত প্রচারের ওপর বিধিনিষেধ আরোপ করেন, তখন সুফিয়া কামাল বিবৃতিতে স্বাক্ষর করে সাংস্কৃতিক স্বাধীনতার পক্ষে অবস্থান নেন। বিভিন্ন ধরনের সাংস্কৃতিক আগ্রাসন ও সাংস্কৃতিক সংকটের মুখে দাঁড়িয়ে বাঙালি সংস্কৃতির স্বাতন্ত্র্য রক্ষার প্রশ্নে তাঁর এই ভূমিকা ছিল প্রাসঙ্গিক।
বাঙালির সাংস্কৃতিক আন্দোলনের ধারা পরে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায়। বাংলাদেশের মুক্তির সংগ্রামে সুফিয়া কামাল ছিলেন সক্রিয়। ১৯৭১ সালের অসহযোগ আন্দোলনের সময় তিনি ঢাকায় নারী সমাবেশ ও মিছিলে নেতৃত্ব দেন; জনগণকে স্বাধীনতার সংগ্রামের জন্য উদ্বুদ্ধ করেন। তিনি তখন বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সভাপতি ছিলেন এবং নারীদের সংগঠিত করার ক্ষেত্রে ভূমিকা পালন করেন। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে তাঁর দুই কন্যা ভারতে গিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের সেবায় আত্মনিয়োগ করেন। আগরতলায় প্রতিষ্ঠিত হাসপাতালে তাঁরা যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাদের চিকিৎসা ও সেবাকাজে অংশ নেন। অন্যদিকে সুফিয়া কামাল এবং তাঁর স্বামী ঢাকায় অবস্থান করে মুক্তিযোদ্ধাদের বিভিন্নভাবে সহযোগিতা করতে থাকেন। সোভিয়েত সরকার নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে তাঁকে বিশেষ বিমানে দেশত্যাগের প্রস্তাব দিলেও তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেন। এ সম্পর্কে ‘সুফিয়া কামাল: অন্তরাঙ্গ আত্মভাষ্য’, আবুল আহসান চৌধুরী লিখেছেন: “দেশ ও জাতির ক্রান্তিলগ্নে সব সময় পালন করেছেন নির্ভীক দিকপালীর ভূমিকা। ভাষা আন্দোলন থেকে মুক্তিযুদ্ধ পর্যন্ত সক্রিয় সাহসী ভূমিকা পালন করেন। সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা প্রতিরোধ, রবীন্দ্রবর্জনের সরকারি উদ্যোগের বিরোধিতা, রবীন্দ্র-জন্মশতবার্ষিকী উদযাপনে অগ্রণী ভূমিকা পালন, উনসত্তরের গণআন্দোলনে সরকারি খেতাব বর্জন, সত্তরের প্রলয়ংকরী প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পাশে এসে দাঁড়ানো, মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতি পর্বে একাত্তরের অসহযোগ আন্দোলনসহ সব কর্মসূচিতে মহিলাদের অনুষ্ঠানে নেতৃত্বদান তাঁর সমাজ ও দেশপ্রেমিক বিবেকী চেতনার স্মারক।’’
মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে সুফিয়া কামাল নিয়মিত ডায়েরি লিখতেন, যা পরে ‘একাত্তরের ডায়েরি’ নামে প্রকাশিত হয়। বইটি যুদ্ধকালীন বাংলাদেশের বাস্তবতা, মানুষের কষ্ট, সংগ্রাম এবং মুক্তির আকাঙ্ক্ষার একটি মূল্যবান দলিল। বর্তমান প্রজন্মের কাছে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে এই রচনা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। দেশপ্রেম, আত্মত্যাগ এবং জাতীয় দায়িত্ববোধের যে শিক্ষা তাঁর জীবন থেকে পাওয়া যায়, তা আজও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক।

বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পরও সুফিয়া কামালের সংগ্রাম থেমে যায়নি। তিনি যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ পুনর্গঠনের কাজে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন। ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি বাহিনীর নির্যাতনের শিকার অসংখ্য নারী সমাজে অবহেলিত ও অসহায় অবস্থায় পড়েছিলেন। তাঁদের চিকিৎসা, পুনর্বাসন এবং সামাজিক মর্যাদা ফিরিয়ে দেওয়ার কাজে সুফিয়া কামাল ভূমিকা রেখেছিলেন। স্বাধীনতার মাত্র কয়েক দিনের মধ্যে তাঁর নেতৃত্বে ‘কেন্দ্রীয় নারী পুনর্বাসন সংস্থা’ প্রতিষ্ঠিত হয়। এই প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে নির্যাতিত ও ক্ষতিগ্রস্ত নারীদের পুনর্বাসনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। এরপর আরও তিনি বাংলাদেশ পল্লী উন্নয়ন কমিটি এবং দুস্থ পুনর্বাসন সংস্থাসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্ব দেন। এ ছাড়া ছায়ানট, বাংলাদেশ প্রতিবন্ধী ফাউন্ডেশন এবং নারী কল্যাণ সংস্থার সঙ্গেও তিনি যুক্ত ছিলেন। সমাজসেবার প্রতি তাঁর এই অঙ্গীকার বর্তমান সময়েও আমাদের জন্য অনুসরণীয়।
স্বাধীনতার পরও সুফিয়া কামাল নীরব থাকেননি। শাসনের বিরুদ্ধে তিনি ধারাবাহিকভাবে প্রতিবাদ ও প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। বিশেষ করে এরশাদবিরোধী আন্দোলনে তাঁর ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। আশি বছর বয়সেও তিনি রাজপথে নেমে এসেছিলেন। ১৯৯০ সালে কারফিউ উপেক্ষা করে মিছিলে নেতৃত্ব দেওয়ার ঘটনা তাঁর সাহস ও দৃঢ়তার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের প্রশ্নেও তিনি ছিলেন আপসহীন।
সুফিয়া কামালের কাছে সাহিত্য ছিল মানবমুক্তি, নারী মুক্তি, প্রতিবাদ এবং সামাজিক পরিবর্তনের শক্তিশালী হাতিয়ার। শৈশবে কাজী নজরুল ইসলাম, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং বেগম রোকেয়ার রচনা তাঁকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল। তাঁদের লেখা পড়ে তিনি সাহস পেয়েছিলেন নিজেও লেখালেখি শুরু করার। এ সম্পর্কে তিনি স্মৃতিচারণে লিখেছেন:
“এমন কোনো বর্ষণমুখর দিনে মুসলিম সাহিত্য পত্রিকায় প্রকাশিত কাজী নজরুল ইসলামের লেখা হেনা পড়েছিলাম বানান করে। প্রেম, বিরহ, মিলন এসবের মানে কী তখন বুঝি? তবু যে কী ভালো, কী ব্যথা লেগেছিল তা প্রকাশের ভাষা কি আজ আর আছে? গদ্য লেখার সেই নেশা। এরপর প্রবাসী পত্রিকায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিতা পড়তে পড়তে অদ্ভুত এক মোহগ্রস্ত ভাব এসে মনকে যে কোনো অজানা রাজ্যে নিয়ে যেত। এরপর দেখতাম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন, বেগম সারা তৈয়বজী লিখছেন। কবিতা লিখছেন বেগম মোতাহেরা বানু। মনে হলো ওরা লিখছেন আমি কি লিখতে পারি না? শুরু হলো লেখা লেখার খেলা। কী গোপনে, কত কুণ্ঠায়, ভীষণ লজ্জার সেই হিজিবিজি লেখা ছড়া, গল্প। কিন্তু কোনোটা কি মনের মতো হয়! কেউ জানবে, কেউ দেখে ফেলবে বলে ভয়ে ভাবনায় সে লেখা কত লুকিয়ে রেখে আবার দেখে দেখে নিজেই লজ্জায় সংকুচিত হয়ে উঠি।”
এভাবেই সুফিয়া কামাল সাহিত্যচর্চায় মনোনিবেশ করেন। তাঁর সাহিত্য মানুষকে অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে, মানবিক মূল্যবোধ ধারণ করতে এবং প্রগতিশীল সমাজ গঠনে উদ্বুদ্ধ করে। কৃতিত্বের স্বরূপ দেশ-বিদেশে ৫০টিরও বেশি পুরস্কার লাভ করেছেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য বাংলা একাডেমি পুরস্কার, সোভিয়েত লেনিন পদক, একুশে পদক, বেগম রোকেয়া পদক, জাতীয় কবিতা পরিষদ পুরস্কার ও স্বাধীনতা দিবস পদক ইত্যাদি।
নারী অধিকার প্রতিষ্ঠা, মানবাধিকার রক্ষা, অসাম্প্রদায়িক চেতনার বিকাশ, গণতান্ত্রিক আন্দোলন, সাংস্কৃতিক সংগ্রাম, মুক্তিযুদ্ধ এবং সমাজসেবামূলক কর্মকাণ্ড—প্রতিটি ক্ষেত্রেই সুফিয়া কামাল অসামান্য অবদান রেখে গেছেন। তাঁর জীবন ছিল ন্যায়, সত্য এবং মানবতার পক্ষে অবিরাম সংগ্রামের ইতিহাস। মুক্তিযুদ্ধসহ বাঙালির সমস্ত প্রগতিশীল আন্দোলনে ভূমিকা পালনকারী সুফিয়া কামাল ১৯৯৯ সালের ২০ নভেম্বর, শনিবার সকালে বার্ধক্যজনিত কারণে মৃত্যুবরণ করেন। সম্পূর্ণ রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় ইচ্ছানুযায়ী তাঁকে আজিমপুর কবরস্থানে সমাহিত করা হয়।
সাম্প্রতিককালে যখন নারী নির্যাতন, সামাজিক বৈষম্য, সাম্প্রদায়িকতা, মৌলবাদ, সাংস্কৃতিক আগ্রাসন এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের সংকট আমাদের উদ্বিগ্ন করে, তখন সুফিয়া কামালের আদর্শ নতুন করে আমাদের সামনে পথনির্দেশক হয়ে ওঠে। তাঁর জীবনদর্শন অনুসরণ করতে পারলে একটি মানবিক, ন্যায়ভিত্তিক, অসাম্প্রদায়িক এবং প্রগতিশীল বাংলাদেশ গড়ে তোলা সম্ভব হবে। তাঁর কর্ম, চিন্তা ও আদর্শ যুগে যুগে বাঙালি জাতিকে আলোকিত করবে এবং ন্যায় ও মানবতার পথে চলার শক্তি জোগাবে।

বাংলাদেশের ইতিহাসে এমন সব ব্যক্তিত্ব রয়েছেন, যাদের জীবন ও কর্ম একটি নির্দিষ্ট সময়ের গণ্ডি অতিক্রম করে যুগে যুগে মানুষের প্রেরণার উৎস হয়ে ওঠে। কবি সুফিয়া কামাল তেমনই একজন। তিনি সাহিত্য, সমাজসেবা, নারী আন্দোলন, মানবাধিকার, সাংস্কৃতিক চেতনা এবং গণতান্ত্রিক সংগ্রামের মধ্য দিয়ে বাঙালি জাতির ইতিহাসে স্থান অধিকার করে আছেন। সাহস, দৃঢ়তা, নিষ্ঠা ও মানবিক চেতনার অসাধারণ সমন্বয়ের কারণে তিনি ‘জননী সাহসিকা’ নামে পরিচিত।
নারীর অধিকার ও মানবাধিকারের প্রসঙ্গ এলেই সুফিয়া কামালের সংগ্রামী ও আপসহীন অবস্থানের কথা স্মরণ হয়। দেশে যখন সাম্প্রদায়িকতা, মৌলবাদ, সাংস্কৃতিক আগ্রাসন কিংবা স্বৈরাচারের উত্থান ঘটে, তখনও তাঁর আদর্শ নতুন করে প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে। তিনি সমগ্র জীবন উৎসর্গ করেছিলেন মানুষের মর্যাদা প্রতিষ্ঠা, নারী মুক্তি, অসাম্প্রদায়িক সমাজ গঠন, ভাষা ও সংস্কৃতির বিকাশ এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে।
সুফিয়া কামাল ১৯১১ সালের ২০ জুন বরিশালের শায়েস্তাবাদে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর শৈশব ছিল সংগ্রাম, সীমাবদ্ধতা ও আত্মপ্রতিষ্ঠার কাহিনি। মাত্র সাত বছর বয়সে বাবা সৈয়দ আব্দুল বারী সংসার ত্যাগ করে সুফি সাধনার উদ্দেশ্যে চলে যান। এরপর মা সৈয়দা সাবেদা খাতুন দুই সন্তানকে নিয়ে মাতৃগৃহে আশ্রয় নেন। নবাব পরিবারের রক্ষণশীল পরিবেশে বেড়ে ওঠা সুফিয়া কামালের জন্য প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সুযোগ ছিল না। পরিবারে ছিল উর্দুর প্রচলন এবং বাংলা ভাষাকে শিখতে উৎসাহিত করা হতো না। কিন্তু জ্ঞানার্জনের প্রতি প্রবল আগ্রহ এবং মায়ের উৎসাহ তাঁকে বাংলা ভাষা শেখার দিকে নিয়ে যায়।
সুফিয়া কামাল ‘একালের আমাদের কাল’ বইয়ে মায়ের অবদান প্রসঙ্গে বলেছেন, ‘মাটিকে বাদ দিয়ে ফুলগাছের যেমন কোনো অস্তিত্ব নেই, আমার মাকে বাদ দিয়ে আমারও তেমন কোনো কথা নেই।’ গোপনে বাংলা বই পড়ে নিজের চেষ্টায় তিনি নিজেকে শিক্ষিত করে তোলেন। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সুযোগ না পেলেও তিনি জ্ঞানচর্চার মাধ্যমে এমন উচ্চতায় পৌঁছেছিলেন, যা তাঁকে পরবর্তী সময়ে বাংলা সাহিত্য ও সমাজজীবনের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্বে পরিণত করে।
সুফিয়া কামাল শৈশবেই মানুষের প্রতি অবিচার ও বৈষম্যের বাস্তব রূপ দেখেছিলেন। নবাব পরিবারের চাকরদের প্রতি অপমানজনক আচরণ তাঁকে গভীরভাবে ব্যথিত করত। মানুষে মানুষে এই ভেদাভেদ তাঁর কোমল মনে গভীর রেখাপাত করেছিল। জীবনের এই অভিজ্ঞতা তাঁকে মানবতার পক্ষে এবং বৈষম্যের বিরুদ্ধে দৃঢ় অবস্থান নিতে সাহায্য করে। মানুষের প্রতি সম্মান, ন্যায়বোধ, সততা ও মানবিকতা তাঁর সাহিত্য ও জীবনদর্শনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে ওঠে। মানবিক চেতনা থেকেই তিনি ধীরে ধীরে নারী অধিকার ও মানবাধিকার আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হন। মাত্র সাত বছর বয়সে তিনি মায়ের সঙ্গে গিয়ে বেগম রোকেয়ার সঙ্গে পরিচিত হন। সেই পরিচয় পরে তাঁর জীবনের গতিপথ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
রোকেয়ায় প্রতিষ্ঠিত ‘আঞ্জুমানে খাওয়াতিনে ইসলাম’-এর কার্যক্রমের মাধ্যমে সুফিয়া কামাল নারী শিক্ষা, নারী অধিকার এবং সামাজিক অগ্রগতির ধারণার সঙ্গে পরিচিত হন। এ সম্পর্কে সুফিয়া কামাল লিখেছেন, ‘‘প্রথম জীবনে কাজ করার পর ১৮ থেকে ২০ বছর বয়স পর্যন্ত আমি বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেনের প্রতিষ্ঠিত কলকাতার ‘আঞ্জুমান খাওয়াতিনে’-তে কাজ করি। এই প্রতিষ্ঠানের কাজ ছিল কলকাতার বস্তি এলাকার মুসলমান মেয়েদের মনভাবে একটু শিক্ষিত করে তোলা। হামিদা মঈন, শামসুন্নাহার মাহমুদ, সরলা রায়, জগদীশ বাবুর স্ত্রী অবেলা বসু, ব্রহ্মকুমারী দেবী তারা সবাই ছিলেন এই প্রতিষ্ঠানে। আমার স্বামী ছিলেন উদার প্রকৃতির মানুষ, এসব কাজে তার কাছ থেকে প্রচুর উৎসাহ পেয়েছি আমি।” এই কার্যক্রমের মাধ্যমে রোকেয়ার চিন্তাধারা ও আদর্শ তাঁর মধ্যে সঞ্চারিত হয়, যা নারী জাগরণের আন্দোলনে তাঁকে অগ্রণী ভূমিকা পালনে অনুপ্রাণিত করে। নারী জাগরণের আন্দোলনকে কেন্দ্র করে তিনি সাহিত্যও রচনা করেছেন, যেখানে নারীদের অনুপ্রাণিত করা হয়েছে। যেমন তিনি লিখেছেন:
নারীর বাহুতে শক্তি রয়েছে, অন্তরে জ্ঞান-তৃষ্ণা,
সংশয় ভরা সংসার মাঝে আঁধার-আলোর দিশা
শত বাধা ব্যবধান
তারি মাঝ হতে, দূর হতে যেন শোনা যায় আহ্বান
দূর হতে আসে আলো!
জাগো মাতা-বধু! তোমার ঘরের মাটির প্রদীপ জ্বালো!
(আলোর শিখা/ সুফিয়া কামাল)
বাংলাদেশের নারী আন্দোলনের ইতিহাস বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সুফিয়া কামাল ছিলেন অন্যতম প্রধান সংগঠক ও অনুপ্রেরণাদাত্রী। তাঁর নেতৃত্বে নারী আন্দোলন নতুন গতি লাভ করে এবং অসংখ্য নারী সামাজিক ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণের সাহস পায়। এখানেই তাঁর প্রাসঙ্গিকতা শেষ হয় না। নারী জাগরণের প্রশ্ন থেকে তিনি ধীরে ধীরে বৃহত্তর মানবমুক্তি এবং সামাজিক পরিবর্তনের আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হন। তিনি ছিলেন মুক্তবুদ্ধি, মুক্তচিন্তা এবং প্রগতিশীল মূল্যবোধের দৃঢ় সমর্থক। ধর্মীয় গোঁড়ামি, কুসংস্কার এবং মৌলবাদী চিন্তার বিরুদ্ধে সব সময় অবস্থান নিয়েছেন। বর্তমান সময়ে যখন উগ্রবাদ, অসহিষ্ণুতা এবং ধর্মের অপব্যাখ্যা সমাজে বিভিন্ন সংকট সৃষ্টি করছে। তখন সুফিয়া কামালের মুক্তবুদ্ধির চর্চা বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে।
মুক্তচিন্তার পাশাপাশি অসাম্প্রদায়িক চেতনা ছিল সুফিয়া কামালের ব্যক্তিত্বের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য। ১৯৪৬ সালে কলকাতার সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার সময় তিনি লেডি ব্র্যাবোর্ন কলেজে আশ্রয়কেন্দ্র পরিচালনা করেন এবং বিপন্ন মানুষের পাশে দাঁড়ান। তিনি স্মৃতিচারণে লিখেছেন: “১৯৪৩-এর দুর্ভিক্ষের সময় বর্ধমানে এবং ১৯৪৬-এর ‘ডাইরেক্ট অ্যাকশন ডে’-র হিন্দু মুসলমান সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার পর বিপন্ন এবং আহতদের মধ্যে কাজ করেছি। এ সময়েই তো হাজেরা মাহমুদ, রোকেয়া কবির, হোসেনা রশিদ ও তোমার (নূরজাহান মুর্শিদ) সঙ্গে আমার পরিচয় হলো।” অর্থাৎ ধর্ম, বর্ণ কিংবা সম্প্রদায় নির্বিশেষে মানুষকে মানুষ হিসেবে দেখার যে মানবিক শিক্ষা তাঁর মধ্যে ছিল, তা আজও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

মানবিকতা, অসাম্প্রদায়িকতা এবং প্রগতিশীল চিন্তার এই ধারা সুফিয়া কামালকে জাতীয় আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত করেছে। ১৯২৫ সালে অবিভক্ত ভারতে ব্রিটিশবিরোধী অসহযোগ আন্দোলনের সময় মহাত্মা গান্ধী বরিশাল সফরে এলে সুফিয়া কামাল নিজ হাতে চরকায় সুতা কেটে তাঁর হাতে তুলে দেন। এ সম্পর্কে ‘সুফিয়া কামাল নারীর ঘর, নারীর বাহির’ প্রবন্ধে সুমন সাজ্জাদ লিখেছেন: “সময়ের গভীর টানে এক সময় সুফিয়া কামাল নেমে এসেছেন রাজনীতির ময়দানেও। বরিশালে মহাত্মা গান্ধীর হাতে তুলে দিয়েছেন নিজের হাতে কাটা সুতো। বিভিন্ন কারণে প্রকাশ্য সভায় তাঁর জন্য যাওয়া ছিল অসম্ভব। তাই সাধারণ পোশাকে সিঁদুর পরে তিনি বাইরে এলেন। মনে গেঁথে নিলেন গান্ধী-দর্শনের অক্ষয় স্মৃতি।”
১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন ছিল বাঙালি জাতীয়তাবাদের ইতিহাসে যুগান্তকারী ঘটনা। এই আন্দোলনে সুফিয়া কামাল সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন এবং নারীদের সংগঠিত করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তিনি নারীদের নিয়ে মিছিল সংগঠিত করেন। আন্দোলনে নেতৃত্ব দেন এবং ভাষা আন্দোলনের পক্ষে জনমত গঠনে কাজ করেন। শুধু রাজনৈতিকভাবে নয়, সাহিত্যিকভাবেও তিনি ভাষা আন্দোলনের চেতনাকে ধারণ করেছিলেন। ভাষা আন্দোলনকে কেন্দ্র করে তিনি বহু কবিতা ও প্রবন্ধ রচনা করেন, যেখানে মাতৃভাষার মর্যাদা, সাংস্কৃতিক পরিচয় এবং জাতীয় চেতনার বিষয়গুলো গুরুত্ব পেয়েছে। যেমন তিনি লিখেছেন:
আশ্চর্য এমন দিন। মৃত্যুতে করে না কেহ শোক,
মৃত্যুরে করে না ভয়, শঙ্কাহীন, কিসের আলোক
উদ্ভাসিত ক’রে তোলে ক্লান্ত দেহ, মুখ, পদক্ষেপ
সংকল্পের দ্যুতি তরে দৃঢ়তার প্রচার প্রলেপ
করেছে ভাস্বর।
এরা যেন করেছে স্বাক্ষর
মৃত্যুর পরওয়ানা প’রে বাংলা ভাষার লিখি নাম:
‘আমার মায়েরই আমি মাটি থেকে বুকে মোর তুলিয়া নিলাম’
সালাম বরকত ছিল, আর ও ছিল নাম নাহি জানা কতোজন
পিতার অন্তিম আশা, জননীর বুক-জোড়া ধন,
কাহারও জীবন সাথী, বোনদের একমাত্র ভাই
তারা আজ নাই।
নাই? - আছে, আছে ... (একুশের কবিতা/সুফিয়া কামাল)
ভাষা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে সুফিয়া কামালের যে জাতীয়তাবাদী ও সাংস্কৃতিক চেতনার বিকাশ ঘটেছিল, তার প্রতিফলন দেখা যায় পাকিস্তানি শাসনামলের বিভিন্ন বৈষম্যমূলক নীতি ও স্বৈরাচারী কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে দৃঢ় অবস্থানে। তিনি বিভিন্ন গণতান্ত্রিক আন্দোলন, সভা-সমাবেশ এবং সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে জনগণকে সচেতন করার চেষ্টা করেন। গণতান্ত্রিক চেতনার পাশাপাশি সাংস্কৃতিক স্বাধীনতার প্রশ্নেও তিনি ছিলেন আপসহীন। পাকিস্তানি সরকার যখন বাঙালির ভাষা ও সংস্কৃতিকে দমিয়ে রাখার চেষ্টা করে, তখন সুফিয়া কামাল তার বিরুদ্ধে দৃঢ় অবস্থান গ্রহণ করেন।
১৯৬১ সালে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্মশতবার্ষিকীতে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে নানা আয়োজন করা হলেও তৎকালীন পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী রবীন্দ্রনাথকে উপেক্ষা করার নীতি গ্রহণ করে। শুধু তা-ই নয়, রবীন্দ্রসংগীতের বিরুদ্ধেও অপপ্রচার চালানো হয়। এই পরিস্থিতিতে সুফিয়া কামাল সাহসিকতার সঙ্গে প্রতিবাদ করেন। পাকিস্তানি শাসকদের হুমকি ও চাপ উপেক্ষা করে তিনি অন্যান্য সাহিত্যিক, শিল্পী ও বুদ্ধিজীবীদের সঙ্গে রবীন্দ্র জন্মশতবার্ষিকী উদ্যাপনের উদ্যোগ গ্রহণ করেন। এই আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় প্রতিষ্ঠিত হয় ‘ছায়ানট’, যা পরবর্তীকালে বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়। সুফিয়া কামাল এর সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৬৭ সালে পাকিস্তানের তথ্যমন্ত্রী খাজা শাহাবুদ্দিন যখন রবীন্দ্রসংগীত প্রচারের ওপর বিধিনিষেধ আরোপ করেন, তখন সুফিয়া কামাল বিবৃতিতে স্বাক্ষর করে সাংস্কৃতিক স্বাধীনতার পক্ষে অবস্থান নেন। বিভিন্ন ধরনের সাংস্কৃতিক আগ্রাসন ও সাংস্কৃতিক সংকটের মুখে দাঁড়িয়ে বাঙালি সংস্কৃতির স্বাতন্ত্র্য রক্ষার প্রশ্নে তাঁর এই ভূমিকা ছিল প্রাসঙ্গিক।
বাঙালির সাংস্কৃতিক আন্দোলনের ধারা পরে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায়। বাংলাদেশের মুক্তির সংগ্রামে সুফিয়া কামাল ছিলেন সক্রিয়। ১৯৭১ সালের অসহযোগ আন্দোলনের সময় তিনি ঢাকায় নারী সমাবেশ ও মিছিলে নেতৃত্ব দেন; জনগণকে স্বাধীনতার সংগ্রামের জন্য উদ্বুদ্ধ করেন। তিনি তখন বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সভাপতি ছিলেন এবং নারীদের সংগঠিত করার ক্ষেত্রে ভূমিকা পালন করেন। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে তাঁর দুই কন্যা ভারতে গিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের সেবায় আত্মনিয়োগ করেন। আগরতলায় প্রতিষ্ঠিত হাসপাতালে তাঁরা যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাদের চিকিৎসা ও সেবাকাজে অংশ নেন। অন্যদিকে সুফিয়া কামাল এবং তাঁর স্বামী ঢাকায় অবস্থান করে মুক্তিযোদ্ধাদের বিভিন্নভাবে সহযোগিতা করতে থাকেন। সোভিয়েত সরকার নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে তাঁকে বিশেষ বিমানে দেশত্যাগের প্রস্তাব দিলেও তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেন। এ সম্পর্কে ‘সুফিয়া কামাল: অন্তরাঙ্গ আত্মভাষ্য’, আবুল আহসান চৌধুরী লিখেছেন: “দেশ ও জাতির ক্রান্তিলগ্নে সব সময় পালন করেছেন নির্ভীক দিকপালীর ভূমিকা। ভাষা আন্দোলন থেকে মুক্তিযুদ্ধ পর্যন্ত সক্রিয় সাহসী ভূমিকা পালন করেন। সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা প্রতিরোধ, রবীন্দ্রবর্জনের সরকারি উদ্যোগের বিরোধিতা, রবীন্দ্র-জন্মশতবার্ষিকী উদযাপনে অগ্রণী ভূমিকা পালন, উনসত্তরের গণআন্দোলনে সরকারি খেতাব বর্জন, সত্তরের প্রলয়ংকরী প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পাশে এসে দাঁড়ানো, মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতি পর্বে একাত্তরের অসহযোগ আন্দোলনসহ সব কর্মসূচিতে মহিলাদের অনুষ্ঠানে নেতৃত্বদান তাঁর সমাজ ও দেশপ্রেমিক বিবেকী চেতনার স্মারক।’’
মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে সুফিয়া কামাল নিয়মিত ডায়েরি লিখতেন, যা পরে ‘একাত্তরের ডায়েরি’ নামে প্রকাশিত হয়। বইটি যুদ্ধকালীন বাংলাদেশের বাস্তবতা, মানুষের কষ্ট, সংগ্রাম এবং মুক্তির আকাঙ্ক্ষার একটি মূল্যবান দলিল। বর্তমান প্রজন্মের কাছে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে এই রচনা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। দেশপ্রেম, আত্মত্যাগ এবং জাতীয় দায়িত্ববোধের যে শিক্ষা তাঁর জীবন থেকে পাওয়া যায়, তা আজও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক।

বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পরও সুফিয়া কামালের সংগ্রাম থেমে যায়নি। তিনি যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ পুনর্গঠনের কাজে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন। ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি বাহিনীর নির্যাতনের শিকার অসংখ্য নারী সমাজে অবহেলিত ও অসহায় অবস্থায় পড়েছিলেন। তাঁদের চিকিৎসা, পুনর্বাসন এবং সামাজিক মর্যাদা ফিরিয়ে দেওয়ার কাজে সুফিয়া কামাল ভূমিকা রেখেছিলেন। স্বাধীনতার মাত্র কয়েক দিনের মধ্যে তাঁর নেতৃত্বে ‘কেন্দ্রীয় নারী পুনর্বাসন সংস্থা’ প্রতিষ্ঠিত হয়। এই প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে নির্যাতিত ও ক্ষতিগ্রস্ত নারীদের পুনর্বাসনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। এরপর আরও তিনি বাংলাদেশ পল্লী উন্নয়ন কমিটি এবং দুস্থ পুনর্বাসন সংস্থাসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্ব দেন। এ ছাড়া ছায়ানট, বাংলাদেশ প্রতিবন্ধী ফাউন্ডেশন এবং নারী কল্যাণ সংস্থার সঙ্গেও তিনি যুক্ত ছিলেন। সমাজসেবার প্রতি তাঁর এই অঙ্গীকার বর্তমান সময়েও আমাদের জন্য অনুসরণীয়।
স্বাধীনতার পরও সুফিয়া কামাল নীরব থাকেননি। শাসনের বিরুদ্ধে তিনি ধারাবাহিকভাবে প্রতিবাদ ও প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। বিশেষ করে এরশাদবিরোধী আন্দোলনে তাঁর ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। আশি বছর বয়সেও তিনি রাজপথে নেমে এসেছিলেন। ১৯৯০ সালে কারফিউ উপেক্ষা করে মিছিলে নেতৃত্ব দেওয়ার ঘটনা তাঁর সাহস ও দৃঢ়তার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের প্রশ্নেও তিনি ছিলেন আপসহীন।
সুফিয়া কামালের কাছে সাহিত্য ছিল মানবমুক্তি, নারী মুক্তি, প্রতিবাদ এবং সামাজিক পরিবর্তনের শক্তিশালী হাতিয়ার। শৈশবে কাজী নজরুল ইসলাম, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং বেগম রোকেয়ার রচনা তাঁকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল। তাঁদের লেখা পড়ে তিনি সাহস পেয়েছিলেন নিজেও লেখালেখি শুরু করার। এ সম্পর্কে তিনি স্মৃতিচারণে লিখেছেন:
“এমন কোনো বর্ষণমুখর দিনে মুসলিম সাহিত্য পত্রিকায় প্রকাশিত কাজী নজরুল ইসলামের লেখা হেনা পড়েছিলাম বানান করে। প্রেম, বিরহ, মিলন এসবের মানে কী তখন বুঝি? তবু যে কী ভালো, কী ব্যথা লেগেছিল তা প্রকাশের ভাষা কি আজ আর আছে? গদ্য লেখার সেই নেশা। এরপর প্রবাসী পত্রিকায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিতা পড়তে পড়তে অদ্ভুত এক মোহগ্রস্ত ভাব এসে মনকে যে কোনো অজানা রাজ্যে নিয়ে যেত। এরপর দেখতাম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন, বেগম সারা তৈয়বজী লিখছেন। কবিতা লিখছেন বেগম মোতাহেরা বানু। মনে হলো ওরা লিখছেন আমি কি লিখতে পারি না? শুরু হলো লেখা লেখার খেলা। কী গোপনে, কত কুণ্ঠায়, ভীষণ লজ্জার সেই হিজিবিজি লেখা ছড়া, গল্প। কিন্তু কোনোটা কি মনের মতো হয়! কেউ জানবে, কেউ দেখে ফেলবে বলে ভয়ে ভাবনায় সে লেখা কত লুকিয়ে রেখে আবার দেখে দেখে নিজেই লজ্জায় সংকুচিত হয়ে উঠি।”
এভাবেই সুফিয়া কামাল সাহিত্যচর্চায় মনোনিবেশ করেন। তাঁর সাহিত্য মানুষকে অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে, মানবিক মূল্যবোধ ধারণ করতে এবং প্রগতিশীল সমাজ গঠনে উদ্বুদ্ধ করে। কৃতিত্বের স্বরূপ দেশ-বিদেশে ৫০টিরও বেশি পুরস্কার লাভ করেছেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য বাংলা একাডেমি পুরস্কার, সোভিয়েত লেনিন পদক, একুশে পদক, বেগম রোকেয়া পদক, জাতীয় কবিতা পরিষদ পুরস্কার ও স্বাধীনতা দিবস পদক ইত্যাদি।
নারী অধিকার প্রতিষ্ঠা, মানবাধিকার রক্ষা, অসাম্প্রদায়িক চেতনার বিকাশ, গণতান্ত্রিক আন্দোলন, সাংস্কৃতিক সংগ্রাম, মুক্তিযুদ্ধ এবং সমাজসেবামূলক কর্মকাণ্ড—প্রতিটি ক্ষেত্রেই সুফিয়া কামাল অসামান্য অবদান রেখে গেছেন। তাঁর জীবন ছিল ন্যায়, সত্য এবং মানবতার পক্ষে অবিরাম সংগ্রামের ইতিহাস। মুক্তিযুদ্ধসহ বাঙালির সমস্ত প্রগতিশীল আন্দোলনে ভূমিকা পালনকারী সুফিয়া কামাল ১৯৯৯ সালের ২০ নভেম্বর, শনিবার সকালে বার্ধক্যজনিত কারণে মৃত্যুবরণ করেন। সম্পূর্ণ রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় ইচ্ছানুযায়ী তাঁকে আজিমপুর কবরস্থানে সমাহিত করা হয়।
সাম্প্রতিককালে যখন নারী নির্যাতন, সামাজিক বৈষম্য, সাম্প্রদায়িকতা, মৌলবাদ, সাংস্কৃতিক আগ্রাসন এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের সংকট আমাদের উদ্বিগ্ন করে, তখন সুফিয়া কামালের আদর্শ নতুন করে আমাদের সামনে পথনির্দেশক হয়ে ওঠে। তাঁর জীবনদর্শন অনুসরণ করতে পারলে একটি মানবিক, ন্যায়ভিত্তিক, অসাম্প্রদায়িক এবং প্রগতিশীল বাংলাদেশ গড়ে তোলা সম্ভব হবে। তাঁর কর্ম, চিন্তা ও আদর্শ যুগে যুগে বাঙালি জাতিকে আলোকিত করবে এবং ন্যায় ও মানবতার পথে চলার শক্তি জোগাবে।

বনে ছাড়ার পর দেখা গেল, প্রতিটি বনরুই তুলনামূলকভাবে ছোট একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলের মধ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছে। তারা চেনা পরিবেশের ভেতরেই নিজেদের চলাফেরা সীমাবদ্ধ রাখছে। এই তথ্য গবেষকদের বেশ অবাক করেছে। কারণ এর আগের অন্যান্য প্রজাতির গবেষণায় দেখা গেছে, বনের নতুন পরিবেশে ছাড়লে প্রাণীরা অনেক দূরে দূরে ঘুরে বেড়া
২০ ঘণ্টা আগে
মোহাম্মদ রশিদুজ্জামান যুক্তরাষ্ট্রের রোয়ান বিশ্ববিদ্যালয়ের এমেরিটাস অধ্যাপক। তিনি ব্রিটিশ শাসনামলের ভারত, পকিস্তান ও বাংলাদেশ নিয়ে বেশ কিছু প্রশংসিত গ্রন্থের লেখক। এক দশকেরও বেশি সময় তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করেছেন।
১ দিন আগে
আজ ১৯ জুন, ‘ওয়ার্ল্ড স্যান্টারিং ডে’ বা ‘বিশ্ব ধীরে হাঁটা দিবস’। ‘স্যান্টারিং’ শব্দের অর্থ হলো কোনো নির্দিষ্ট গন্তব্যের তাড়া না রেখে আয়েশি ভঙ্গিতে উদ্দেশ্যহীনভাবে চারপাশটা দু’চোখ ভরে দেখতে দেখতে হেঁটে বেড়ানো। ১৯৭৯ সালে ডব্লিউ টি র্যাবে মানুষের ব্যস্ততা ও ক্যালোরি পোড়ানোর ফিটনেস-আসক্তির প্রতিবাদে এই
১ দিন আগে
আজ ১৮ জুন আন্তর্জাতিক প্যানিক দিবস। এটি জাতিসংঘ স্বীকৃত কোনো দিবস নয়। মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে সচেতনতা বাড়ানোর অনানুষ্ঠানিক উদ্যোগ। প্যানিক অ্যাটাক, উদ্বেগ ও মানসিক চাপ সম্পর্কে মানুষকে জানানোই এই দিবসের মূল উদ্দেশ্য।
২ দিন আগে