মৃত্যুদিনে স্মরণ

কবি জিম মরিসন কি রকস্টার পরিচয়ের আড়ালে হারিয়ে গেলেন

প্রকাশ : ০৩ জুলাই ২০২৬, ২১: ৫৬
কবি জিম মরিসন কি রকস্টার পরিচয়ের আড়ালে হারিয়ে গেলেন? স্ট্রিম গ্রাফিক

একজন শিল্পীকে আমরা কীভাবে মনে রাখি? তাঁর জনপ্রিয় বা প্রভাববিস্তারী কাজের মাধ্যমে, নাকি তিনি নিজেকে যে পরিচয়ে দেখতে চাইতেন, সেভাবে? রক মিউজিকের কিংবদন্তি জিম মরিসনের ক্ষেত্রে জীবন ও শিল্পকে ঘিরে এই প্রশ্নের সহজ কোনো উত্তর নেই।

পৃথিবীর কোটি কোটি মানুষের কাছে জিম মরিসন ‘দ্য ডোরস’ ব্যান্ডের ভোকাল, ষাটের দশকের বিদ্রোহী তরুণদের আইকন এবং ২৭ বছর বয়সে রহস্যময়ভাবে মারা যাওয়া এক চিরসবুজ রকস্টার। কিন্তু মরিসন নিজে এই পরিচয়ের ভেতর পুরোপুরি স্বাচ্ছন্দ্য খুঁজে পাননি। বিভিন্ন সাক্ষাৎকার ও ঘনিষ্ঠজনের স্মৃতিচারণায় দেখা যায়, তিনি নিজেকে মূলত একজন কবি ও লেখক হিসেবেই দেখতে চাইতেন। তাঁর কাছে গান ছিল কবিতাকে মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার বাহন।

জিম মরিসনের সাহিত্যিক সত্তার বীজ রোপিত হয়েছিল শৈশবেই। বাবার চাকরির কারণে পরিবারকে বারবার শহর বদলাতে হতো। ফলে ছোটবেলায় স্থায়ী বন্ধুত্ব গড়ে তোলার সুযোগ খুব বেশি পাননি। সেই অস্থির শৈশবে বই-ই হয়ে উঠেছিল বড় আশ্রয়। তাঁর পাঠ ও ভাবনার জগতে বড় প্রভাব ফেলেছিলেন আর্থার র‍্যাঁবো, শার্ল বোদলেয়ার, উইলিয়াম ব্লেক, ওয়াল্ট হুইটম্যান ও ফ্রিডরিখ নীটশের মতো কবি-দার্শনিকরা।

মরিসনের প্রিয় এই কবি-দার্শনিকদের মধ্যেও কিন্তু একটি বিষয়ে মিল আছে! তাঁরা কেউই প্রচলিত নিয়ম, নৈতিকতা বা ভাষার সীমানায় আটকে থাকতে চাননি। সমাজ, মানুষের চেতনা, স্বাধীনতা ও অস্তিত্বকে নতুনভাবে ভাবতে শিখিয়েছেন। তরুণ মরিসনও যেন সেই বিদ্রোহী ধারার মধ্যেই নিজের পথ খুঁজে নেন।

যে জনপ্রিয়তা মরিসনের কবি পরিচয়কে আড়াল করেছে, সেই জনপ্রিয়তাই আবার তাঁর শব্দ, কল্পনা ও ভাবনাকে বিশ্বের কোটি মানুষের সামনে নিয়ে এসেছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ে চলচ্চিত্র নিয়ে পড়াশোনা করলেও মরিসনের নোটবুকের বড় অংশ জুড়ে থাকত কবিতা, ভাবনা আর অসমাপ্ত লেখার খসড়া। সহপাঠী ও ঘনিষ্ঠজনদের স্মৃতিচারণায় পাওয়া যায়, তিনি প্রায় সব সময়ই কিছু না কিছু লিখতেন। সেই লেখাগুলোর অনেকই কখনো প্রকাশিত হয়নি; আবার অনেক ভাবনা পরে দ্য ডোরসের গানে নতুন জীবন পেয়েছে।

দ্য ডোরস-এর বিখ্যাত গান ‘দ্য এন্ড’, ‘হয়েন দ্য মিউজিক ইজ ওভার’, কিংবা ‘রাইডার্স অন দ্য স্টর্ম’ পড়লে মনে হয় কোনো কবিতা পাঠ করছি। মরিসনের গানের কথায় প্রেম আছে, কিন্তু তা প্রচলিত রোমান্টিকতার মতো নয়। মৃত্যু আছে, কিন্তু তা কেবল শোক নয়। স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা আছে, কিন্তু তা কোনো রাজনৈতিক স্লোগানের মতো শোনায় না। তিনি মানুষের অবচেতন মন, স্বপ্ন, সহিংসতা এবং অস্তিত্বের সংকটকে নিয়ে লিখেছেন। আধুনিক ইউরোপীয় ও আমেরিকান কবিতার সঙ্গে পরিচিত পাঠকের কাছে তাঁর এই ভাষা অচেনা ছিল না। কিন্তু সাধারণ শ্রোতার কাছে তা ছিল রহস্যময়, ঘোরলাগা এবং অনেক সময় অস্বস্তিকর।

জিম মরিসনের সাহিত্যচর্চার অন্যতম বড় প্রমাণ তাঁর প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ ‘দ্য লর্ডস’ আর ‘দ্য নিউ ক্রিয়েচারস’। এর মাধ্যমে তিনি যেন বিশ্ববাসীকে বলতে চেয়েছিলেন, আমাকে শুধু একজন রকস্টার হিসেবে বিচার করবেন না। কিন্তু বাস্তবতা ছিল ভিন্ন। ১৯৬৭ সালে দ্য ডোরস-এর প্রথম অ্যালবাম প্রকাশের পর তাঁর জীবন প্রায় রাতারাতি বদলে যায়। তিনি হয়ে ওঠেন বিশ্বের অন্যতম আলোচিত মিউজিশিয়ান। এরপর ধীরে ধীরে কবি জিম মরিসন আড়ালে চলে গেলেন, সামনে রয়ে গেলেন রকস্টার জিম মরিসন। এই পরিবর্তন কি তাঁর জন্য আশীর্বাদ ছিল, নাকি কবিসত্তার অপমৃত্যু— এ প্রশ্ন আজও থেকে গেছে।

কনসার্টে জিম মরিসন। সংগৃহীত ছবি
কনসার্টে জিম মরিসন। সংগৃহীত ছবি

মরিসনের সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল তাঁর অসামান্য কল্পনাশক্তি। শব্দ দিয়ে তিনি এমন দৃশ্য তৈরি করতে পারতেন, যা পড়লে সামনে যেন রহস্যময় সিনেমা চলতে থাকে। তাঁর কবিতায় বাস্তব আর স্বপ্ন একসঙ্গে মিশে যায়। মৃত্যু সেখানে মানুষের মতো কথা বলে, রাস্তা হয়ে ওঠে জীবনের প্রতীক আর মরুভূমি দাঁড়িয়ে থাকে মানুষের একাকিত্বের রূপক হিসেবে। তবে তাঁর কবিতা নিয়ে সমালোচনাও আছে। কিছু সাহিত্য গবেষকের মতে, মরিসনের বেশ কিছু লেখা যথেষ্ট পরিণত নয়। কোথাও কোথাও প্রতীকের ঘন ব্যবহার মূল ভাবনাকে অস্পষ্ট করে দেয়। আবার কিছু লেখায় ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ও মানসিক অস্থিরতার ছাপ এত প্রবল যে সাধারণ পাঠকের পক্ষে তার সঙ্গে সহজে সংযোগ তৈরি করা কঠিন হয়ে পড়ে। এসব সমালোচনাকে পুরোপুরি অস্বীকার করার সুযোগ নেই।

একজন কবির পরিণত হতে সময় লাগে। অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে কবিতার ভাষা তৈরি হয়। জিম মরিসন সেই পথ হাঁটার সুযোগ পাননি। তবে তিনি একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন ঘটিয়েছেন। রকের দুনিয়ায় তিনি নিয়ে এসেছিলেন সাহিত্য, দর্শন, মনস্তত্ত্ব এবং অস্তিত্বের কঠিন প্রশ্ন।

১৯৭১ সালে প্যারিসে চলে যাওয়ার সময় অনেকেই ভেবেছিলেন, এটি হয়তো জিম মরিসনের সাময়িক বিরতি। কিন্তু বাস্তবে তিনি যেন নিজের জীবনটাকেই নতুন করে শুরু করতে চেয়েছিলেন। রকস্টার জীবনের ক্লান্তি, সংবাদমাধ্যমের অবিরাম নজর আর খ্যাতির চাপ থেকে দূরে সরে গিয়ে তিনি একজন লেখকের মতো বাঁচতে চেয়েছিলেন। ঘনিষ্ঠজনদের সঙ্গে আলাপচারিতায় তিনি প্রায়ই বলতেন, তিনি ক্লান্ত; বিখ্যাত হওয়ার চেয়ে তাঁর কাছে তখন বেশি জরুরি ছিল লেখা।

প্যারিসে মরিসনের দিনগুলো কাটছিল হাঁটাহাঁটি, বই পড়া আর লেখালেখির মধ্য দিয়ে। ঘনিষ্ঠদের ধারণা, তিনি আরেকটি কবিতার বই প্রকাশের কথাও ভাবছিলেন। কিন্তু সেই নতুন শুরুর সম্ভাবনা পূর্ণতা পাওয়ার আগেই ১৯৭১ সালের ৩ জুলাই তাঁর জীবন থেমে যায়।

জিম মরিসনের নোটবুক। সংগৃহীত ছবি
জিম মরিসনের নোটবুক। সংগৃহীত ছবি

তাহলে প্রশ্নে ফিরে আসা যাক, রকস্টার পরিচয়ের আড়ালে কি কবি জিম মরিসন হারিয়ে গেলেন? উত্তরটি সম্ভবত ‘হ্যাঁ’ এবং ‘না’—দুটোই।

‘হ্যাঁ’, কারণ বেশিরভাগ মানুষ মরিসনকে রকস্টার হিসেবেই চেনে, তাঁর কবিতার বই পড়েনি। জনপ্রিয়তার আড়ালে তাঁর সাহিত্যিক পরিচয় অনেকটাই ঢাকা পড়েছে।

কিন্তু ‘না’ বলারও কারণ আছে। কারণ রক মিউজিকই তাঁর কবিতাকে কোটি মানুষের কাছে পৌঁছে দিয়েছে। তিনি যদি শুধু কবিতা লিখতেন, তাহলে হয়তো এর গণ্ডিতেই সীমাবদ্ধ থাকতেন। দ্য ডোরসের গান তাঁর কবিতাকে এমন এক শ্রোতাসমাজ দিয়েছে, যা একজন কবির পক্ষে একা অর্জন করা প্রায় অসম্ভব।

জিম মরিসনের জীবন তাই অদ্ভুত বৈপরীত্যের গল্প। যে জনপ্রিয়তা তাঁর কবি পরিচয়কে আড়াল করেছে, সেই জনপ্রিয়তাই আবার তাঁর শব্দ, কল্পনা ও ভাবনাকে বিশ্বের কোটি মানুষের সামনে নিয়ে এসেছে। তিনি আমেরিকার সর্বকালের শ্রেষ্ঠ কবিদের একজন হয়ে উঠতেন কি না, তা আমরা নিশ্চিত জানি না। তাঁর কাব্যগ্রন্থগুলো সাহিত্যজগতের ক্লাসিক হয়ে উঠত কি না, সেটিও অজানা। কিন্তু এটুকু বলা যায়, তাঁর মধ্যে একজন বড় কবি হয়ে ওঠার সম্ভাবনা ছিল।

সেই সম্ভাবনা আমরা পুরোপুরি দেখতে পাইনি। হয়তো জিম মরিসনকে এই দ্বৈততার বাইরে বোঝাই সম্ভব নয়। তিনি একই সঙ্গে রকস্টার এবং কবি; খ্যাতির আলোয় উজ্জ্বল, আবার নিজের প্রিয় পরিচয়ের ভেতর আংশিকভাবে আড়াল হয়ে থাকা এক শিল্পী। তবু প্রশ্নটি থেকে যায়—আমরা কি তাঁর সেই প্রিয় পরিচয়টিকে দেখতে ভুলে গেছি?

Ad 300x250
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত