লেখা:

বলতে গেলে পাঁচ দশক ধরেই বাংলাদেশের রাজনীতি দিশেহারা। ১৯৭১ সালে গণতান্ত্রিক অধিকার আদায়ে লাখো আত্মত্যাগের বিনিময়ে স্বাধীনতা অর্জন করা দেশটি সেনাশাসনসহ নানা পালাবদলের ধারাবাহিকতায় এখন পর্যন্ত ১৩ টি জাতীয় নির্বাচন পেয়েছে। এর মধ্যে গত প্রায় ২০ বছর দেশটি চালিয়েছে বামঘেষা মধ্যমপন্থি দল হিসেবে পরিচিত বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ।
বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে নেতৃত্ব দেয়া দলটি একসময় অসাম্প্রদায়িক, গণতান্ত্রিক ও অংশগ্রহণমূলক রাজনীতির ধারায় থাকলেও অতি সম্প্রতি শেখ হাসিনা সরকার কতৃত্ববাদী রূপে হাজির হয়েছিল। পরিণতি হিসেবে বাংলাদেশের প্রচলিত রাজনৈতিক ধারায় সংঘটিত আন্দোলনগুলোর মতো ২০২৪ সালেও ব্যাপক আন্দোলনে হাসিনা সরকারের পতন হয়, ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রীসহ তাঁর দলের শীর্ষ নেতাদের অনেকেই ভারতে আশ্রয় নেন। এরপর মুহাম্মদ ইউনূস নেতৃত্বাধীন অন্তবর্তীকালীন সরকার আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ করে। যা দলটিকে গত ফেব্রুয়ারির নির্বাচন অর্থাৎ বাংলাদেশের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোটের লড়াই থেকেও দূরে রাখে।
জিয়াউর রহমানের প্রতিষ্ঠিত ডানঘেষা মধ্যমপন্থি - বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) আওয়ামী লীগের বয়ান বা ইতিহাসকে চ্যালেঞ্জ করে আসছে। বিশেষ করে বিএনপি ১৯৭১ সালে দলের প্রতিষ্ঠাতার অবদানকে বিশেষ মহিমায় দেখাতে চায়। এর ফলে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস নিয়েও আওয়ামী-বিএনপি আলাদা বয়ান তৈরি হয়েছে।
জামায়াতে ইসলামী, যারা বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরোধিতা করেছিল, তারাও বিগত বছরগুলোতে বিএনপির একটি অনুগত রাজনৈতিক শক্তি হিসেবেই ভূমিকা রেখেছে।
এধরনের রাজনৈতিক সংস্কৃতি দেশটিকে সামরিক অভ্যুত্থান, পাল্টা অভ্যুত্থান এবং হত্যাকাণ্ডে জর্জরিত করেছে। দেশটির রাজনীতিকে সংঘাতময় করেছে, অসহিষ্ণুতা এবং নির্বাচনী কারসাজির দিকে ঠেলে দিয়েছে।
চলতে থাকা টানাপোড়েনের সম্পর্ক এবং দলগুলোর পারস্পরিক শত্রুতাবোধ প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর ভেতরে স্বৈরাচারী মনোভাবকে আরও উসকে দিয়েছে। গত প্রায় দুই দশক আওয়ামী লীগ বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীকে নির্বাচন থেকে কৌশলে দূরে রেখেছে।
আর নতুন রাজনৈতিক সমীকরণে এবছর কঠোর পরিণতি দেখেছে আওয়ামী লীগও। এবারের ভোটে তারা অংশই নিতে পারেনি। তবে গত ৫ আগস্ট দিল্লিতে ফরেন করেসপন্ডেন্টস অব সাউথ এশিয়ার আয়োজনে শেখ হাসিনার ভার্চুয়াল বক্তব্য দলটিকে আবার বাংলাদেশের রাজনীতির কেন্দ্রে ফিরিয়ে আনার আবহ তৈরি করেছে।
যদিও সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি হচ্ছে, কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ আদৌ কি বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় আবার জায়গা করে নিতে পারবে? বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে হওয়া শেখ হাসিনার মৃত্যুদণ্ডের রায় এই সংশয় আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
চলমান পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের রাজনীতিকে দুই দিকে নিয়ে যেতে পারে: হয় বিদ্যমান রাজনৈতিক কোন্দল ও বিরোধ আরও গভীর ও তীব্র করবে , না হয় একটি বিস্তৃত গণতান্ত্রিক প্রতিযোগিতার নতুন সম্ভাবনা উন্মোচন করবে।
নির্বাচনে আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতি বাংলাদেশের রাজনীতিতে বিএনপির বিরোধী শক্তি হিসেবে জামায়াতে ইসলামীকে সামনে নিয়ে এসেছে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলটি ৬৮টি আসনে জিতে সংসদে এসেছে। আওয়ামী লীগের শাসনামলে বিএনপির সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ থাকা জামায়াতকে এখন প্রবল বিএনপি বিরোধী ভূমিকায় দেখা যাচ্ছে।
এখন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জামায়াতের রাজনীতির লাগাম টানতে আওয়ামী লীগকে আবার রাজনীতিতে সক্রিয় হওয়ার সুযোগ দেবেন কি?
যদি তা-ই হয়, তাহলে এতে বর্তমান বন্দোবস্তের মধ্যে অস্বস্তি তৈরি করবে, কারণ রাজনৈতিক ক্ষেত্র উন্মুক্ত হলে আওয়ামী লীগ খুব দ্রুতই নিজেদের পুনর্গঠিত করে নিতে পারে,এমন সম্ভাবনা রয়েই যায়। ফলে, বিএনপি রাজনৈতিকভাবে আওয়ামী লীগের জন্য এই পরিসর এখনই উন্মুক্ত নাও করতে পারে। আর এ কারণেই গণমাধ্যমের সাথে হাসিনার সরাসরি মতবিনিময় তীব্র ও অস্বাভাবিক কড়া প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে বাংলাদেশ সরকার।
গণমাধ্যমের সাথে হাসিনার মতবিনিময় নিয়ে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। বাংলাদেশের তরফ থেকে বলা হয়েছে, ভারত থেকে এ ধরনের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের অনুমতি দেওয়া দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে।
ঘরের এসব চ্যালেঞ্জের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে বাইরেও ভারসাম্য বজায় রাখতে হচ্ছে। এক্ষেত্রে তারেক সম্ভবত কয়েকটি বিষয়ে প্রাধান্য দিচ্ছেন। প্রথমত, পাকিস্তান-ঘনিষ্ঠ কট্টরপন্থী ইসলামী শক্তিগুলোকে সামঞ্জস্যপূর্ণভাবে নিয়ন্ত্রণে রাখা; দ্বিতীয়ত, চীন এবং যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সমদূরত্ব বজায় রাখা; এবং তৃতীয়ত, ভারতের সাথে দরকষাকষির ক্ষেত্রে শক্ত অবস্থান নেওয়া।
১৯৭১ সালে ইসলামী আবেগকে পুঁজি করে বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরোধীতা করেছিল জামায়াতে ইসলামী। বাংলাদেশের রাজনীতিতে ইসলামী আবেগের জায়গা তৈরিতেও জামায়াত অন্যতম শক্তি।
সেই জামায়াত এখন বিএনপি ও তারেকের প্রবল বিরোধী।
জুন মাসে তারেকের প্রথম বিদেশ সফরের জন্য মালয়েশিয়াকে বেছে নেওয়া একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক বার্তা বহন করে। মালয়েশিয়া অপেক্ষাকৃত নমনীয় ইসলামী রাজনীতির দেশ। ফলে মালয়েশিয়াকে বেছে নেওয়ার মাধ্যমে তারেক যেমন একদিকে মুসলিম বিশ্বের সাথে তাঁর যোগাযোগের ইঙ্গিত দিতে পেরেছেন তেমনি ইসলামী আবেগের রাজনীতিতে জামায়াতের একক প্রভাবকেও চ্যালেঞ্জ করতে পেরেছেন।
জুনের একই সফরে আসলে তারেকের প্রধান লক্ষ্য ছিল চীন। তারেকের চীন সফর বাংলাদেশের জন্য যুক্তরাষ্ট্র থেকে সমান দূরত্ব বজায় রাখার এবং ভারতের প্রভাবকে ভারসাম্যপূর্ণ করার একটি সুযোগ তৈরি করেছে। এই সফরে এমন দুটি প্রকল্প আলোচনায় অন্তর্ভুক্ত ছিল যা সরাসরি ভারতের নিরাপত্তা ও স্বার্থের সাথে জড়িত, একটি হলো-মোংলা বন্দরের আধুনিকায়ন এবং অন্যটি 'তিস্তা নদী সমন্বিত ব্যবস্থাপনা ও পুনরুদ্ধার প্রকল্প'-এর অগ্রগতি।
চীন সফরের মাধ্যমে তারেক রহমান সম্ভবত এই ইঙ্গিতও দিলেন যে, তিনি হাসিনার মতো ভারতঘেষা নন অথবা ড. ইউনূসের মতো যুক্তরাষ্ট্রের দিকে ঝুঁকে পড়ছেন না। বিশেষ করে তারেক ভারতের সঙ্গে আপোষের বদলে চাপ প্রয়োগেই হয়তো গুরুত্ব দিচ্ছেন।
তারেকের 'সবার আগে বাংলাদেশ' নীতির মূল উদ্দেশ্য হলো, তাঁর সরকার ভারতের কাছ থেকে হাসিনার চেয়েও বেশি সুবিধা আদায় করে নিতে পারে, তা প্রমাণ করা। বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক উষ্ণ করতে ভারত সেপ্টেম্বরে আসন্ন ব্রিকস সম্মেলনে তারেক রহমানকে আমন্ত্রণ জানিয়েছে। তারেক এই সম্মেলনে ভারত সফরে গিয়ে তাঁর অবস্থানের জানান দিতে পারেন। এখন পর্যন্ত প্রকাশিত সংবাদগুলো বলছে, বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকেও সুবিধাজনক সময়ে সরকার প্রধানের ভারত সফরের বিষয়টি পর্যালোচনায় রয়েছে।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রও দক্ষিণ এশিয়া বিশেষ করে সাগরে তার প্রভাব বিস্তারে বাংলাদেশকে পাশে চাইছে। সম্ভবত মার্কিনীরা বঙ্গোপসাগরে চীনা প্রভাব এবং ভারতের আঞ্চলিক শক্তিকে নিয়ন্ত্রণের মধ্যে রাখতে এমন তৎপরতা চালাচ্ছে বলে মনে করা হচ্ছে।
এজন্য যুক্তরাষ্ট্র কয়েকটি দিকে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করতে পারে। সেগুলো হতে পারে বাংলাদেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতায় প্রভাব রাখা, বিশেষ করে দেশটির রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে আরও ধোঁয়াশা তৈরির চেষ্টা করা। এছাড়া আরও শক্তিশালী প্রভাব বিস্তারের উদ্দেশে বাংলাদেশের অর্থনীতিকে হাতের মুঠোয় নিয়ে আসার চেষ্টা করা। এমনকি তারা বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের চিরচেনা চেহারাও বদলে দেয়ার চেষ্টা করতে পারে। আসলে যুক্তরাষ্ট্র এই অঞ্চলে ভারত-চীনের একচ্ছত্র প্রভাব মোকাবিলায় একটি ভারসাম্যপূর্ণ প্রক্সি খুঁজছে, আর তা হতে পারে বাংলাদেশ।
সব মিলিয়ে তারেক রহমানের সাম্প্রতিক পদক্ষেপগুলো দেখে মনে হচ্ছে তিনি এই শক্তিগুলোর সঙ্গে ভারসাম্য রক্ষার চেষ্টা করছেন। একদিকে তিনি দেশের ভেতর আওয়ামী লীগ ও জামায়াতে ইসলামীকে সামলানোর চেষ্টা করছেন, অন্যদিকে বৈশ্বিকভাবে তিনি ভারত-চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে কৌশলগত স্বতন্ত্র ভারসাম্য রাখতেও ব্যস্ত।
লেখক: জওহরলাল নেহেরু বিশ্ববিদ্যালয়ের সাউথ এশিয়া স্টাডিজের অধ্যাপক
প্রকাশ: ডেকান হেরাল্ড

বলতে গেলে পাঁচ দশক ধরেই বাংলাদেশের রাজনীতি দিশেহারা। ১৯৭১ সালে গণতান্ত্রিক অধিকার আদায়ে লাখো আত্মত্যাগের বিনিময়ে স্বাধীনতা অর্জন করা দেশটি সেনাশাসনসহ নানা পালাবদলের ধারাবাহিকতায় এখন পর্যন্ত ১৩ টি জাতীয় নির্বাচন পেয়েছে। এর মধ্যে গত প্রায় ২০ বছর দেশটি চালিয়েছে বামঘেষা মধ্যমপন্থি দল হিসেবে পরিচিত বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ।
বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে নেতৃত্ব দেয়া দলটি একসময় অসাম্প্রদায়িক, গণতান্ত্রিক ও অংশগ্রহণমূলক রাজনীতির ধারায় থাকলেও অতি সম্প্রতি শেখ হাসিনা সরকার কতৃত্ববাদী রূপে হাজির হয়েছিল। পরিণতি হিসেবে বাংলাদেশের প্রচলিত রাজনৈতিক ধারায় সংঘটিত আন্দোলনগুলোর মতো ২০২৪ সালেও ব্যাপক আন্দোলনে হাসিনা সরকারের পতন হয়, ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রীসহ তাঁর দলের শীর্ষ নেতাদের অনেকেই ভারতে আশ্রয় নেন। এরপর মুহাম্মদ ইউনূস নেতৃত্বাধীন অন্তবর্তীকালীন সরকার আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ করে। যা দলটিকে গত ফেব্রুয়ারির নির্বাচন অর্থাৎ বাংলাদেশের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোটের লড়াই থেকেও দূরে রাখে।
জিয়াউর রহমানের প্রতিষ্ঠিত ডানঘেষা মধ্যমপন্থি - বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) আওয়ামী লীগের বয়ান বা ইতিহাসকে চ্যালেঞ্জ করে আসছে। বিশেষ করে বিএনপি ১৯৭১ সালে দলের প্রতিষ্ঠাতার অবদানকে বিশেষ মহিমায় দেখাতে চায়। এর ফলে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস নিয়েও আওয়ামী-বিএনপি আলাদা বয়ান তৈরি হয়েছে।
জামায়াতে ইসলামী, যারা বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরোধিতা করেছিল, তারাও বিগত বছরগুলোতে বিএনপির একটি অনুগত রাজনৈতিক শক্তি হিসেবেই ভূমিকা রেখেছে।
এধরনের রাজনৈতিক সংস্কৃতি দেশটিকে সামরিক অভ্যুত্থান, পাল্টা অভ্যুত্থান এবং হত্যাকাণ্ডে জর্জরিত করেছে। দেশটির রাজনীতিকে সংঘাতময় করেছে, অসহিষ্ণুতা এবং নির্বাচনী কারসাজির দিকে ঠেলে দিয়েছে।
চলতে থাকা টানাপোড়েনের সম্পর্ক এবং দলগুলোর পারস্পরিক শত্রুতাবোধ প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর ভেতরে স্বৈরাচারী মনোভাবকে আরও উসকে দিয়েছে। গত প্রায় দুই দশক আওয়ামী লীগ বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীকে নির্বাচন থেকে কৌশলে দূরে রেখেছে।
আর নতুন রাজনৈতিক সমীকরণে এবছর কঠোর পরিণতি দেখেছে আওয়ামী লীগও। এবারের ভোটে তারা অংশই নিতে পারেনি। তবে গত ৫ আগস্ট দিল্লিতে ফরেন করেসপন্ডেন্টস অব সাউথ এশিয়ার আয়োজনে শেখ হাসিনার ভার্চুয়াল বক্তব্য দলটিকে আবার বাংলাদেশের রাজনীতির কেন্দ্রে ফিরিয়ে আনার আবহ তৈরি করেছে।
যদিও সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি হচ্ছে, কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ আদৌ কি বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় আবার জায়গা করে নিতে পারবে? বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে হওয়া শেখ হাসিনার মৃত্যুদণ্ডের রায় এই সংশয় আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
চলমান পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের রাজনীতিকে দুই দিকে নিয়ে যেতে পারে: হয় বিদ্যমান রাজনৈতিক কোন্দল ও বিরোধ আরও গভীর ও তীব্র করবে , না হয় একটি বিস্তৃত গণতান্ত্রিক প্রতিযোগিতার নতুন সম্ভাবনা উন্মোচন করবে।
নির্বাচনে আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতি বাংলাদেশের রাজনীতিতে বিএনপির বিরোধী শক্তি হিসেবে জামায়াতে ইসলামীকে সামনে নিয়ে এসেছে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলটি ৬৮টি আসনে জিতে সংসদে এসেছে। আওয়ামী লীগের শাসনামলে বিএনপির সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ থাকা জামায়াতকে এখন প্রবল বিএনপি বিরোধী ভূমিকায় দেখা যাচ্ছে।
এখন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জামায়াতের রাজনীতির লাগাম টানতে আওয়ামী লীগকে আবার রাজনীতিতে সক্রিয় হওয়ার সুযোগ দেবেন কি?
যদি তা-ই হয়, তাহলে এতে বর্তমান বন্দোবস্তের মধ্যে অস্বস্তি তৈরি করবে, কারণ রাজনৈতিক ক্ষেত্র উন্মুক্ত হলে আওয়ামী লীগ খুব দ্রুতই নিজেদের পুনর্গঠিত করে নিতে পারে,এমন সম্ভাবনা রয়েই যায়। ফলে, বিএনপি রাজনৈতিকভাবে আওয়ামী লীগের জন্য এই পরিসর এখনই উন্মুক্ত নাও করতে পারে। আর এ কারণেই গণমাধ্যমের সাথে হাসিনার সরাসরি মতবিনিময় তীব্র ও অস্বাভাবিক কড়া প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে বাংলাদেশ সরকার।
গণমাধ্যমের সাথে হাসিনার মতবিনিময় নিয়ে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। বাংলাদেশের তরফ থেকে বলা হয়েছে, ভারত থেকে এ ধরনের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের অনুমতি দেওয়া দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে।
ঘরের এসব চ্যালেঞ্জের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে বাইরেও ভারসাম্য বজায় রাখতে হচ্ছে। এক্ষেত্রে তারেক সম্ভবত কয়েকটি বিষয়ে প্রাধান্য দিচ্ছেন। প্রথমত, পাকিস্তান-ঘনিষ্ঠ কট্টরপন্থী ইসলামী শক্তিগুলোকে সামঞ্জস্যপূর্ণভাবে নিয়ন্ত্রণে রাখা; দ্বিতীয়ত, চীন এবং যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সমদূরত্ব বজায় রাখা; এবং তৃতীয়ত, ভারতের সাথে দরকষাকষির ক্ষেত্রে শক্ত অবস্থান নেওয়া।
১৯৭১ সালে ইসলামী আবেগকে পুঁজি করে বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরোধীতা করেছিল জামায়াতে ইসলামী। বাংলাদেশের রাজনীতিতে ইসলামী আবেগের জায়গা তৈরিতেও জামায়াত অন্যতম শক্তি।
সেই জামায়াত এখন বিএনপি ও তারেকের প্রবল বিরোধী।
জুন মাসে তারেকের প্রথম বিদেশ সফরের জন্য মালয়েশিয়াকে বেছে নেওয়া একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক বার্তা বহন করে। মালয়েশিয়া অপেক্ষাকৃত নমনীয় ইসলামী রাজনীতির দেশ। ফলে মালয়েশিয়াকে বেছে নেওয়ার মাধ্যমে তারেক যেমন একদিকে মুসলিম বিশ্বের সাথে তাঁর যোগাযোগের ইঙ্গিত দিতে পেরেছেন তেমনি ইসলামী আবেগের রাজনীতিতে জামায়াতের একক প্রভাবকেও চ্যালেঞ্জ করতে পেরেছেন।
জুনের একই সফরে আসলে তারেকের প্রধান লক্ষ্য ছিল চীন। তারেকের চীন সফর বাংলাদেশের জন্য যুক্তরাষ্ট্র থেকে সমান দূরত্ব বজায় রাখার এবং ভারতের প্রভাবকে ভারসাম্যপূর্ণ করার একটি সুযোগ তৈরি করেছে। এই সফরে এমন দুটি প্রকল্প আলোচনায় অন্তর্ভুক্ত ছিল যা সরাসরি ভারতের নিরাপত্তা ও স্বার্থের সাথে জড়িত, একটি হলো-মোংলা বন্দরের আধুনিকায়ন এবং অন্যটি 'তিস্তা নদী সমন্বিত ব্যবস্থাপনা ও পুনরুদ্ধার প্রকল্প'-এর অগ্রগতি।
চীন সফরের মাধ্যমে তারেক রহমান সম্ভবত এই ইঙ্গিতও দিলেন যে, তিনি হাসিনার মতো ভারতঘেষা নন অথবা ড. ইউনূসের মতো যুক্তরাষ্ট্রের দিকে ঝুঁকে পড়ছেন না। বিশেষ করে তারেক ভারতের সঙ্গে আপোষের বদলে চাপ প্রয়োগেই হয়তো গুরুত্ব দিচ্ছেন।
তারেকের 'সবার আগে বাংলাদেশ' নীতির মূল উদ্দেশ্য হলো, তাঁর সরকার ভারতের কাছ থেকে হাসিনার চেয়েও বেশি সুবিধা আদায় করে নিতে পারে, তা প্রমাণ করা। বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক উষ্ণ করতে ভারত সেপ্টেম্বরে আসন্ন ব্রিকস সম্মেলনে তারেক রহমানকে আমন্ত্রণ জানিয়েছে। তারেক এই সম্মেলনে ভারত সফরে গিয়ে তাঁর অবস্থানের জানান দিতে পারেন। এখন পর্যন্ত প্রকাশিত সংবাদগুলো বলছে, বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকেও সুবিধাজনক সময়ে সরকার প্রধানের ভারত সফরের বিষয়টি পর্যালোচনায় রয়েছে।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রও দক্ষিণ এশিয়া বিশেষ করে সাগরে তার প্রভাব বিস্তারে বাংলাদেশকে পাশে চাইছে। সম্ভবত মার্কিনীরা বঙ্গোপসাগরে চীনা প্রভাব এবং ভারতের আঞ্চলিক শক্তিকে নিয়ন্ত্রণের মধ্যে রাখতে এমন তৎপরতা চালাচ্ছে বলে মনে করা হচ্ছে।
এজন্য যুক্তরাষ্ট্র কয়েকটি দিকে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করতে পারে। সেগুলো হতে পারে বাংলাদেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতায় প্রভাব রাখা, বিশেষ করে দেশটির রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে আরও ধোঁয়াশা তৈরির চেষ্টা করা। এছাড়া আরও শক্তিশালী প্রভাব বিস্তারের উদ্দেশে বাংলাদেশের অর্থনীতিকে হাতের মুঠোয় নিয়ে আসার চেষ্টা করা। এমনকি তারা বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের চিরচেনা চেহারাও বদলে দেয়ার চেষ্টা করতে পারে। আসলে যুক্তরাষ্ট্র এই অঞ্চলে ভারত-চীনের একচ্ছত্র প্রভাব মোকাবিলায় একটি ভারসাম্যপূর্ণ প্রক্সি খুঁজছে, আর তা হতে পারে বাংলাদেশ।
সব মিলিয়ে তারেক রহমানের সাম্প্রতিক পদক্ষেপগুলো দেখে মনে হচ্ছে তিনি এই শক্তিগুলোর সঙ্গে ভারসাম্য রক্ষার চেষ্টা করছেন। একদিকে তিনি দেশের ভেতর আওয়ামী লীগ ও জামায়াতে ইসলামীকে সামলানোর চেষ্টা করছেন, অন্যদিকে বৈশ্বিকভাবে তিনি ভারত-চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে কৌশলগত স্বতন্ত্র ভারসাম্য রাখতেও ব্যস্ত।
লেখক: জওহরলাল নেহেরু বিশ্ববিদ্যালয়ের সাউথ এশিয়া স্টাডিজের অধ্যাপক
প্রকাশ: ডেকান হেরাল্ড
.png)

১৭ বছরের স্বৈরশাসনের পর একটি সরকারের ছয় মাসের কার্যক্রম দিয়ে তার পূর্ণাঙ্গ মূল্যায়ন করা কঠিন। রাষ্ট্র পরিচালনা কোনো ১০০ মিটার দৌড় নয়। এটি দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়া। বিশেষ করে একটি দীর্ঘ রাজনৈতিক সংকট, গণঅভ্যুত্থান এবং ক্ষমতার পরিবর্তনের পর যে সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করে
৪ ঘণ্টা আগে
শেখ হাসিনার সম্প্রতি দেশে ফেরার অঙ্গীকার করেছেন। এই অঙ্গীকার বাংলাদেশের জন্য অস্থিতিশীলতার কারণ হতে পারে। তেমনি ভারতের জন্যও এর সুদূরপ্রসারী প্রভাব দেখা দিতে পারে। বাংলাদেশের নতুন সরকারের সঙ্গে দিল্লি সম্পর্ক পুনঃপ্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছে।
১ দিন আগে
২০০৫ সালের ১৭ আগস্ট বাংলাদেশের নিরাপত্তা ইতিহাসের একটি কালো অধ্যায়। মাত্র আধা ঘণ্টার মধ্যে দেশের ৬৩টি জেলায় ৪৫৯টি বোমা বিস্ফোরণ ঘটেছিল। ঘটনাটির দায় জামাআতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশ (জেএমবি) স্বীকার করে এবং পরবর্তী তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়ায় সংগঠনটির শীর্ষ নেতৃত্বের সম্পৃক্ততা জানা যায়। সেই ঘটনার ২১ বছ
১৭ আগস্ট ২০২৬
বিমান ও পর্যটন খাত নিয়ে গত কয়েক মাসের কার্যক্রম পর্যালোচনা করলে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে ওঠে। সরকারের এই খাতে কাজ করার আগ্রহ দৃশ্যমান। যাত্রীবান্ধব সেবা সম্প্রসারণ থেকে শুরু করে নিরাপত্তা ব্যবস্থার পুনর্গঠন, রুট পুনরায় চালু করা, নতুন বিমানবন্দর চালুর উদ্যোগ এবং পর্যটন খাতে তরুণদের প্রশিক্ষণ—সব মি