গ্যাস সংকটে অন্তর্বর্তী সরকারের দায়, কী বলছেন বিশেষজ্ঞরা

স্ট্রিম গ্রাফিক

চলমান গ্যাস সংকটে সামনে এসেছে এক চুক্তি। আমদানি করা তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) রূপান্তর করে সরবরাহের জন্য দুটি ভাসমান টার্মিনাল নির্মাণের ওই চুক্তি বাতিল করেছিল অন্তর্বর্তী সরকার। একই বিষয়ে সম্প্রতি বিএনপি সরকার উদ্যোগ নেওয়ায়, ড. ইউনূসের নেতৃত্বাধীন সরকারের সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।

পেট্রোবাংলা সূত্র জানায়, ২০২৪ সালের মার্চে এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণে সামিট গ্রুপের সঙ্গে চুক্তি এবং এক্সিলারেট এনার্জির সঙ্গে ২০২৩ সালের নভেম্বরে টার্মশিট সই করেছিল ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকার। পেট্রোবাংলার সে সময়ের চেয়ারম্যান জনেন্দ্র নাথ সরকার বলেছিলেন, দুটি ভাসমান ও স্থলভাগের একটি মিলে মোট তিনটি এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণে দরপত্র আহ্বান করা হবে।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে শেখ হাসিনার সরকারের পতন হয়। এরপর অন্তর্বর্তী সরকার প্রায় ১৮ মাস দেশ পরিচালনা করে। এর মধ্যে ২০২৪ সালের অক্টোবরে সামিটের সঙ্গে চুক্তি এবং নভেম্বরে এক্সিলারেটরের সঙ্গে সই হওয়া টার্মশিট বাতিল করা হয়। বিশেষ বিধান আইনের অধীন কোনো চুক্তি না করার সিদ্ধান্ত থেকে অন্তর্বর্তী সরকার বিদ্যুৎ খাতের নবায়নযোগ্য জ্বালানির ৩১টি প্রকল্পও বাতিল করে।

বর্তমানে দুটি এলএনজি টার্মিনালের একটি সামিট; অন্যটি এক্সিলারেট এনার্জি পরিচালনা করছে। কক্সবাজারের মহেশখালীর ভাসমান দুটি টার্মিনালের ওপর অনেকটাই নির্ভরশীল জ্বালানি খাত। সম্প্রতি এক্সিলারেটর টার্মিনালে ত্রুটি দেখা দেওয়ার পর তীব্র গ্যাস সংকটে পড়ে দেশ, যা এখনো কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হয়নি।

বিএনপি সরকার সম্প্রতি কক্সবাজারের মহেশখালীর কুতুবজোমে একটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণে চায়না ন্যাশনাল এনার্জি ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড কনস্ট্রাকশন কোম্পানি লিমিটেডের প্রস্তাব জিটুজি পদ্ধতিতে প্রক্রিয়াকরণে নীতিগত অনুমোদন দিয়েছে। গত ২৮ জুলাই সচিবালয়ে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সভাপতিত্বে অর্থনৈতিক বিষয়-সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির বৈঠকে এই অনুমোদন দেওয়া হয়।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পরে অন্তর্বর্তী সরকার প্রায় ১৮ মাস দেশ পরিচালনা করে। এর মধ্যে ২০২৪ সালের অক্টোবরে সামিটের সঙ্গে চুক্তি এবং নভেম্বরে এক্সিলারেটরের সঙ্গে সই হওয়া টার্মশিট বাতিল করা হয়। বিশেষ বিধান আইনের অধীন কোনো চুক্তি না করার সিদ্ধান্ত থেকে অন্তর্বর্তী সরকার বিদ্যুৎ খাতের নবায়নযোগ্য জ্বালানির ৩১টি প্রকল্পও বাতিল করে।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জ্বালানি নিরাপত্তায় বাংলাদেশের হাতে খুব বেশি বিকল্প নেই। ফলে সরাসরি বাতিল না করে অন্তর্বর্তী সরকার সে সময় দুটি এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণের বিষয় যাচাই-বাছাই করতে পারত।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ম. তামিম স্ট্রিমকে বলেন, চুক্তি বাতিল করার আগে এফএসআরইউ-এর ইন্টারন্যাশনাল মার্কেট কী, এসব বিষয় যাচাই-বাছাই করতে পারত। প্রথমত দেখার বিষয়, এর প্রয়োজনীয়তা আছে কিনা। আমাদের বাস্তবতায় আমি মনে করি, প্রয়োজনীয়তা ছিল। এরপর কত দ্রুত টার্মিনাল স্থাপন করা যায়, সেটি বিবেচ্য বিষয়। কারণ, চাইলেই তো টার্মিনাল বসানো যায় না। অন্তত দুই থেকে তিন বছর লাগে।

তিনি বলেন, বিশেষ আইনে হওয়ায় বাতিলের সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে জাতীয় প্রয়োজনে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার সুযোগ ছিল। আরও নেগোসিয়েশন করে বেটার ডিলে আসতে পারলে ভালো হতো। কারণ, আমরা দেখছি যেকোনো সময় দুর্ঘটনা ঘটতে পারে এবং এতে জাতীয়ভাবে অনিশ্চয়তা থেকেই যাচ্ছে।

জানতে চাইলে অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ফাওজুল কবির খান বলেন, ‘এটি ছিল সরকারের সিদ্ধান্ত। আমার ব্যক্তিগত কোনো সিদ্ধান্ত নয়। জ্বালানি বিভাগ ও আইন মন্ত্রণালয়ের নথিতে এই বিষয়ে বিস্তারিত উল্লেখ রয়েছে।’

পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান আব্দুল মান্নান স্ট্রিমকে বলেন, ‘অতীতে কী হয়েছে বলতে পারছি না। তবে বর্তমানে এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণের বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে দেখা হচ্ছে এবং কাজ চলছে।’

সংকট নিরসনে যা করছে সরকার

গ্যাসের উৎপাদন কমে আসায় ২০১৮ সাল থেকে এলএনজি আমদানি শুরু করে আওয়ামী লীগ সরকার। এর জন্য সমুদ্রে দুটি ভাসমান টার্মিনাল নির্মাণ করা হয়। দেশের মোট গ্যাসের প্রায় ৪০ শতাংশ সরবরাহ হয়ে আসছে ওই দুটি টার্মিনাল থেকে। দেশীয় গ্যাসের মজুত কমে আসায় বর্তমানে সংকট চরমে পৌঁছেছে। ফলে এলএনজি আমদানি বাড়িয়ে ঝক্কি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করছে বিএনপি সরকার।

সরকারের বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয় বলছে, সাগরে গ্যাস অনুসন্ধান, নতুন কূপ খনন, নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসারসহ দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার মাধ্যমে সরকার জ্বালানি সংকট নিরসনের চেষ্টা করছে। ইতোমধ্যে সাগরে গ্যাস অনুসন্ধানের জন্য দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে। নতুন করে শতাধিক কূপ খননেরও উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

বিশেষ আইনে হওয়ায় বাতিলের সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে জাতীয় প্রয়োজনে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার সুযোগ ছিল। আরও নেগোসিয়েশন করে বেটার ডিলে আসতে পারলে ভালো হতো। অধ্যাপক ম. তামিম, জ্বালানি বিশেষজ্ঞ

পেট্রোবাংলার পক্ষে এলএনজি আমদানি কার্যক্রমের মূল দায়িত্ব পালন করে রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাস কোম্পানি লিমিটেড (আরপিজিসিএল)। প্রতিষ্ঠানটির তথ্য বলছে, মহেশখালীতে ৫০০ এমএমসিএফডি ক্ষমতাসম্পন্ন তৃতীয় এফএসআরইউ এবং কক্সবাজারের মাতারবাড়িতে ১০০০ এমএমসিএফডি ক্ষমতাসম্পন্ন একটি ল্যান্ড বেইজড এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে। এর বাইরে পটুয়াখালীর পায়রায় আরেকটি এফএসআরইউ স্থাপনের প্রক্রিয়া চলছে।

বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু সম্প্রতি জানিয়েছেন, ২০২৯ সালের মধ্যে নতুন তিনটি এলএনজি টার্মিনালের নির্মাণকাজ শেষ করতে চাইছেন তারা। চট্টগ্রামের বাইরেও নির্মাণের মধ্য দিয়ে জ্বালানির বিকেন্দ্রীকরণ করা হবে।

Ad 300x250
লেটেস্ট
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত

গ্যাস সংকটে অন্তর্বর্তী সরকারের দায়, কী বলছেন বিশেষজ্ঞরা