ad

প্রথম পর্ব/শামসুর রাহমান: বাংলাদেশের স্মৃতি নির্মাণের কবি

মৃদুল মাহবুব
মৃদুল মাহবুব

শামসুর রাহমান। ছবি: স্ট্রিম গ্রাফিক

কবিতা হলো দুনিয়া দেখার উপায়।

যখন কোনো কবিতা থে‌কে চোখ তু‌লে দেখবেন আপনার চারপাশের দুনিয়াটাকে আর আগের মতো থাকে না। নতুন অর্থ নি‌য়ে দুনিয়া জেগে ওঠে। ভালো কবিতা বোঝার সবচেয়ে সহজ উপায় হলো কবিতাটা পড়ার পর যদি বুঝতে পারেন, এটা পড়ার পর আপনি আর আগের মানুষটি নেই, তবে তা নতুন কবিতা। এটা পড়ার পর যদি আপনার মনেও এটা অন্য কবির দ্বারা প্রভাবিত কিন্তু আপনাকে বদলে দিয়েছে, তবে বুঝবেন ভালো কবিতা আপনি পড়ে ফেলেছেন। ভালো কবিতা বোঝার জন্য তত্ত্ব তালাশ লাগে না।

এখন আপনি বলতে পারেন, এই কথা বাস্তবসম্মত নয়। তবে চিন্তা করে দেখুন, প্রথমবার জীবনানন্দ পড়ার পরই আপনি দেখতে পেয়েছেন আপনার চারপাশ বদলে গিয়েছে। আপনি জানতে পারেন উট এক চিরনিস্তব্ধ গ্রীবাধারী প্রাণী। আল মাহমুদের মিথ্যাবাদী রাখাল পড়ার পর মিথ্যাকে আপনি অন্যভাবে দেখবেন। বাংলা ভাষার বড় কবি উৎপল কুমার বসুকে পড়ার পর বুঝতে পারবেন শব্দ দিয়ে এমন একটা ল্যান্ড তৈরি করা যায় যেখানে দেশ বলে কিছু নেই, পুরোটাই মগজে গড়ে ওঠা একটা ভুবন। শামসুর রাহমানের বর্ণমালা, আমার দুঃখিনী বর্ণমালা বা ফ্রেব্রুয়ারি ১৯৬৯ পড়ে বুঝতে পারবেন আমাদের নিজস্ব ভূমি বা ভাষার কোনো অধিকার ছিল না। আমাদের একটা ল্যান্ড দরকার। ভালো কবিতা মানুষের অনুভূতির জগৎটা বদলে দেয়। দৃশ্যজগতের স্তরে স্তরে অর্থের সারল্য ছড়ানো-ছিটানো, সংকেতময়, মননের সঙ্গে বস্তুজগৎ সংযুক্ত, জৈব-তারে বাঁধা। দৃশ্য, শব্দ, নৈঃশব্দ্য, অনুভব, চিন্তা সকলই ভাষা, যা দেহের সঙ্গে বাইরের দুনিয়াকে সংযুক্ত করে।

ভাষা মানে শুধু আভিধানিক শব্দে গড়া বাক্য না। ভাষা আরও গভীরে বিস্তৃত, এ আরও সামগ্রিক বিষয়। এর ফলে ভাষা বদল মানে এই সমগ্রের পরিবর্তন। নতুন কবিতা মানেও সমগ্রের রি-অর্ডার। যে যত দেখতে, অনুভব করতে পারে, তার ব্রহ্মাণ্ড ততই সম্প্রসারিত, সংযুক্ত হতে পারার ক্ষমতাকে উন্মোচিত করে। কবিতা এমন এক মানবিক ডিসিপ্লিন, যা জগৎটাকে আরও বড় করে তোলে। প্রযুক্তি যেমন দুনিয়ার মাপটাকে ছেঁটে দিয়েছে, কবিতা তাকে আরও বড় করে তুলেছে। শিল্প মূলত বস্তু আর অবস্তু দুনিয়ার কাউন্টার ব্যালান্স। নতুন ব্যবহারিক শিল্প, সাহিত্য, কবিতা জীবনে নতুন অর্থ তৈরি করে, ধ্বংসস্তূপ পেরিয়ে ভেতরে বাঁচার প্রেরণা দেয়, পার্থিব আর অপার্থিবের যাতায়াত শুরু হয় মনোদেহের ভেতর।

কবিতা তথা যেকোনো শিল্পই ব্যবহারিক বিষয়। ব্যক্তিগতভাবে আমি সেই সমস্ত লেখা বা আর্টকেই গুরুত্বপূর্ণ মনে করি যার ব্যবহারিক মূল্য আছে। শামসুর রাহমানকে মূল্যায়নের সময় এটা আমি ভেবেছি ব্যবহারিকভাবে সে কতটা তাৎপর্যবহ। আর্ট মানুষকে কী দেয়? জীবনের অর্থ দেয়, মানে দেয়, অ্যাবসার্ড একটা দুনিয়ায় বাঁচার অনুপ্রেরণা দেয়।

মানুষ আসলে ‘বস্তুগত’ কোনো বিষয় না। সে শুধু ভাত খেয়ে শুতে, ঘুমাতে চায় না শুধু। এর জন্য দৈনন্দিন জীবনের বাইরে সে অনেকে কিছু করে। তারই ফলাফল শিল্প। এটা বিশেষ ‘মানসিক দশা’ তার জন্য। এই বিশেষ দশা বা ধারণা অর্জন করতে না পারলে সমস্ত দুনিয়াও যদি কাউকে দিয়ে দেওয়া হয়, তবু নিজেকে একটা শূন্য পাত্রের অধিক কিছুই মনে হবে না। আপাতদৃষ্টিতে অনেককে বাইরে থেকে দেখে খুব সফল, জনপ্রিয় মনে হতে পারে, কিন্তু কোনো এক সন্ধ্যায় তিনি আত্মহত্যার জন্য উন্মুখ হন। অথবা নিজেকে সামাল দিতে না পেরে মৃত্যু ও জীবনের সীমারেখা পার হয়ে যান। এমন শিল্পী, কবি, গায়ক, ব্যবসায়ী, উদ্যোক্তা বা আমাদের মতো সাধারণ মানুষের উদাহরণ দিয়ে শেষ করা যাবে না। শোকের এই মিছিল অনেক দীর্ঘ। কিছুর পর কী যেন নেই, কী যেন নেই, অন্য কোথাও, অন্য কোথাও-এর বোধ তাদেরকে ধাবিত করে নিয়ে যায় চূড়ান্ত বিন্দুর দিকে।

কবিতা তথা যেকোনো শিল্পই ব্যবহারিক বিষয়। ব্যক্তিগতভাবে আমি সেই সমস্ত লেখা বা আর্টকেই গুরুত্বপূর্ণ মনে করি যার ব্যবহারিক মূল্য আছে। শামসুর রাহমানকে মূল্যায়নের সময় এটা আমি ভেবেছি ব্যবহারিকভাবে সে কতটা তাৎপর্যবহ। আর্ট মানুষকে কী দেয়? জীবনের অর্থ দেয়, মানে দেয়, অ্যাবসার্ড একটা দুনিয়ায় বাঁচার অনুপ্রেরণা দেয়।

আবার প্রতিনিয়ত ব্যর্থ হওয়া মানুষটি, সব হারানো লোকটি কীভাবে ফাইট ব্যাক করে প্রশান্ত এক জীবন অতিবাহিত করে? প্রতিটি যুদ্ধের ময়দান থেকে ফেরত আসা সৈনিকের জীবন ও অস্তিত্বের অর্থহীনতা দেখে ফেলার পর বেঁচে থাকার কথা না আর। তারপরও মানুষ বাঁচে। তারা কীভাবে সমুদ্র গর্জনে অভিভূত হওয়ার জন্য সৈকতে শুয়ে থাকে শান্তিতে? বা উন্মুক্ত নক্ষত্রোজ্জ্বল রাতে অস্তিত্বের বিস্ময় নিয়ে জেগে থাকে? শত বাধা-বিপত্তির পরও মানুষ বাঁচে। তাকে কে বাঁচায়? হয়তো রবীন্দ্রনাথের গান বা রুমির কবিতার লাইন বা দিন শেষে টিভি রেডিওর সোপ অপেরা বা তামিল ছবির আইটেম সং বা হিরো আলমের ডান্স বা কোনো মোটিভেশনাল স্পিকারের কথার চাতুরী বা ধর্ম-উপদেশ বা ওয়াজ। এসব শিল্পের আওতার বাইরে নয়। আর্ট যেহেতু মানুষের কাজে লাগে, জীবনদান করে, সেই অর্থে শিল্প চূড়ান্ত ব্যবহারিক একটা বিষয় আমার কাছে। একজন বিজ্ঞানী শতকের পর শতক গবেষণা করে যেমন জীবন রক্ষাকারী ওষুধ বা টিকা তৈরি করে, তেমনি একজন কবি বা লেখক নিরন্তর প্রচেষ্টায় মানুষের অস্তিত্বকে নতুন নতুন অর্থ দেন।

মানবিক শূন্যতার বোধ দুনিয়ার অন্য কোনো প্রাণীর ভেতরে আছে কি না, তা আমি বলতে পারি না। কিন্তু সভ্য মানুষের সংকট ও সম্ভাবনা হলো অপ্রাপ্তি আর অসুখের ভেতর দিয়ে নিজেকে প্রতিনিয়ত খুঁজতে থাকা ও অগ্রসর হওয়া। পথের শেষ না থাকলেও মানসিকভাবে এমন একটা স্থানে মানুষ পৌঁছাতে পারে, যার নাম ‘আনন্দ-লোক’। এই আনন্দ-লোকের অভিজ্ঞতা যত না বহির্বিশ্বের সঙ্গে সংযুক্ত, তার থেকে বেশি ব্যক্তির অন্তর্জগতে বিকশিত। ফলে, কবিতা আমাদের ভঙ্গুর অস্তিত্বের একটা মান দেয়। কবিতা শুধু আনন্দ-লোকের যাত্রাই নয় এটা মানুষের চিন্তা, ভাষা ও দার্শনিকতার চূড়ান্ততম প্রকাশ। কবিতা এমন একটা শক্তিশালী টুলস যা সত্যের ধ্বংসাত্মক হাত থেকে রক্ষা করে সজীব রাখে সভ্যতাকে। কবিতাকে প্রতিষ্ঠিত সত্যের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে পারতে হয় যা সত্যকে প্রশ্ন করে, জীবনকে নতুন করে পুনর্জন্ম দেয়। ফলে এই বিপুল জার্নি যাদের কবিতায় দেখা যায় তারাই একটা দেশের বড় কবি যারা সময়ের সঙ্গে কোনোদিন ম্লান হয় না।

শিল্পের আসল শক্তি হলো যেকোনো সময়ে, যেকোনো দেশে নিজেকে নতুন অর্থ দিয়ে ভ্যালিড থাকে। তার রিলেভেন্সি নষ্ট হয় না সময়ের সঙ্গে সঙ্গে। চিন্তা পুরাতন হয়ে যায়, অকার্যকর হয়ে যায়, কিন্তু ‘রক্তকরবী’র ফুল ম্লান হয় না কোনোদিন। আমার এই কবিতার ব্যবহারিক গুণ ও সত্যের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর শক্তির সাপেক্ষে শামসুর রাহমান বাংলা ভাষার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও প্রয়োজনীয় কবি।

কবিতা নিয়ে যে সমস্ত গতানুগতিক আলাপ হয় আমি সেই দিকে যাবো না। এই রকম শব্দ, বাক্য, ছন্দ, উৎপ্রেক্ষা, অন্ত্যমিল, দন্ত্যমিল ইত্যাদি নিয়ে রাহমানের কবিতার অনেক আলোচনা হয়েছে। সেই পথে আমি যেতে চাই না। রাহমানের উপর ভর করে আমি বরং বলতে চাই কীভাবে একজন কবি একটা ভাষার গুরুত্বপূর্ণ কবি হয়ে ওঠে। রাহমান কতটা হয়ে উঠেছেন, কীভাবে হয়ে উঠেছেন সেই বিচারে যাব। তিনি যত বড়, তাঁকে তত বড় না দেখাতে চাওয়ার রাজনীতিটাই বা কোথায়। ফলে আমার কথা কবিতার বাইরে চলে যাবে। তাতে সমস্যা নেই। যারা কবিতার প্রতিষ্ঠিত আলোচনা পদ্ধতিতে বিষয়গুলো জানতে চান, তাঁদের জন্য দিস্তার পর দিস্তা আলোচনা আছে। আমি সেই আলোচনার ধারায় যেতে চাই না। অন্য একটা বিষয় নিয়ে কথা বলি।

.

জীবনানন্দ দাশের রূপসী বাংলা বা জসীম উদ্‌দীনের নকশি কাঁথার মাঠ কেন বাংলা সাহিত্যে গুরুত্বপূর্ণ দুটি বই? দুটো বই-ই প্রাকৃতিক বর্ণনা আক্রান্ত, পৌনঃপুনিক, রিপিটেশনে ভরা বলে কারও কারও মনে হতে পারে। এর ভাব ও ভাষা নতুন, এই কারণে? কবি মাত্রই একজন থেকে অন্যজন আলাদা। আপনি যদি অন্য কারও কবিতার মতো করে কবিতা লেখেন ও দীর্ঘদিনের চর্চা থাকে, তবে আপনার কবিতা আলাদা হবেই। তাঁর মতো হবে না। যেমন অরিজিনাল ছবির নকলেও নকলকারীর নিজস্ব কিছু স্বাক্ষর থাকে। ফলে এইসব কারণে রূপসী বাংলা বা নকশি কাঁথার মাঠ গুরুত্বপূর্ণ না।

কারণটা হলো মানুষের মেমোরি বা স্মৃতি আমাদের অস্তিত্বকে তৈরি করে। আমাদের ইন্ডিভিজ্যুয়াল বা কালেকটিভ আইডেনটিটি, অভিজ্ঞতা, বোঝাপড়ার সঙ্গে স্মৃতির সম্পর্ক গভীর। আত্ম-সচেতনতার মূল হলো স্মৃতি। অতীতের অভিজ্ঞতা ও প্রজ্ঞা, সম্পর্ক, ইতিহাসের সঙ্গে ব্যক্তির সম্পর্ক মূলত নির্মাণ করে স্মৃতি। অতীত নেই তো কোনো ধারাবাহিকতা নেই। এটা ছাড়া ব্যক্তির যেমন পরিচয় নেই, জাতীয় কোনো চরিত্রও নেই। ফলে, স্মৃতি জীবনকে অর্থ দেয়, প্রেক্ষাপট তৈরি করে। এর পরের ধাপে যদি যাই তবে সমষ্টিগত পরিচয়ের জন্য স্মৃতি অপরিহার্য। আমাদের যে কালেকটিভ মেমোরি তাই আমাদের একসঙ্গে ধরে রাখে, একসঙ্গে আমরা অনুভব করি, নাড়া দেই।

কলোনিয়াল বাংলা ভাষার যে ত্রিশের আধুনিক কবিতা, তার অনেক কলকবজা, ভাব, চিন্তা ইউরোপ থেকে ধার করা। ফলে, সেই কবিতাকে আত্মস্থ করার জন্য পশ্চিমের কবিতার সঙ্গে ভালো মাপের বোঝাপড়া থাকা লাগে। জীবনানন্দ ত্রিশের কবি হলেও রূপসী বাংলা-য় তিনি আবহমান বাংলার দৃশ্য তৈরি করেছেন। নকশি কাঁথার মাঠ কলোনি-পূর্ব যে বাংলার হাজার বছরের ইতিহাস তার কাছাকাছি। এটা ভূগোল নির্মাণ করে। বাংলার স্মৃতিকে ধারণ করে। ফলে, জীবনানন্দের রূপসী বাংলা আর জসীম উদ্‌দীনের নকশি কাঁথার মাঠ গুরুত্বপূর্ণ বই বাংলা ভাষার। সেট মেমোরিকে কবিতার ভাষায় তাঁরা দুইজন ধরতে পেরেছেন।

শামসুর রাহমান আলোচনায় এই দুটো বইয়ের কথা বলছি বোঝার স্বার্থে ও অন্য একটা কারণে। রাহমানের কীর্তি এই দুটো বই থেকেও আরও তাৎপর্যপূর্ণ। তিনি বাংলাদেশের এমন এক স্মৃতি নির্মাণ করেছেন যা ছিল, কিন্তু ভাষা ও সংস্কৃতিতে তার কোনো অবস্থান ছিল না। বলা চলে একরকম শূন্য থেকে তিনি একটা রাজধানী নির্মাণ করছেন, যা যুগপৎ এই দেশের লড়াই, সংগ্রামের সূচনাবিন্দুতেই সম্পর্কিত। রবীন্দ্রনাথ বৃহৎ ভারত ও দীনেশচন্দ্র সেন বৃহৎ বঙ্গের কল্পনা তৈরি করছেন, জাতীয়তাবাদ তৈরি করছেন মানুষের স্মৃতির ভেতর তখন একটা মাত্র সূত্রে এটাকে গাঁথার মতো মৌল সূত্র ছিল না। সেই সূত্র দিলেন বঙ্কিম, ‘বন্দে মাতরম’-এর ভেতর দিয়ে। গুলির সামনে বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়েছে মানুষ ‘বন্দে মাতরম’ বলতে বলতে। জমাটবদ্ধ যে মানবিক প্রত্যাশা তাকে কবি লেখকরা ড্রাইভ করেন। ভারত স্বাধীনতায় বঙ্কিমের যে অবদান শামসুর রাহমানের অবদান তার থেকে কোনো অংশেই কম নয়।

বুনো মহিষকে যেমন তাড়িয়ে নিয়ে যেতে হয় গন্তব্যের দিকে, সেভাবেই এই খাপছাড়া ঢাকাকে পরম মমতায় তিনি স্থান দিয়েছেন তাঁর কবিতায়। এই শহরের সঙ্গে মানুষের স্মৃতি তৈরি হয়েছে। এই নগরীতে যা কিছু যেভাবে দেখা যায়, তা তিনি সেভাবেই অঙ্কন করেছেন। অতিসাম্প্রতিক যারা ঢাকার দেয়ালচিত্রগুলো দেখেছেন তাঁরা জানেন শালীনতা, সৌন্দর্যবোধ আর পচে যাওয়া নীতিকথা সব মুছে দিয়েছে তরুণ-তরুণীরা। যাকে আপনি অ-নান্দনিক বলে গালি দিয়েছেন তাই উঠে এসেছে দেয়ালে দেয়ালে। পরিশীলিত সংস্কৃতি মরা হয়ে গেছে। ফলে, সমাজের ভেতরের আসল কথাটা বের হয়ে পড়েছে। কী যে ভালো লাগে ঢাকার রাস্তায় ঘুরতে! যারা লুভ্যর দেখেছেন তাঁদের কাছে মনে হবে ঢাকার দেয়ালগুলোর মহত্ত্ব লুভ্যরে ঝোলানো চিত্রগুলো থেকে কোনো অংশেই কম না। কেননা তা আসল ‘র’ একটা বাস্তবতা তুলে এসেছে এখানে। সেই একই কাজটা শামসুর রহমান করেছেন তাঁর কবিতায়। ১৯৬০ সালে তাঁর প্রথম বই প্রথম গান, দ্বিতীয় মৃত্যুর আগে প্রকাশিত হয়। এটাকে অনেকে জীবনানন্দ ও সুধীনের মিক্স ভাষা বলতে চায়। আমার কাছে ভাষা কোনো মুখ্য বিষয় না কোনোদিন। কিন্তু এই প্রথম গ্রন্থ থেকেই তিনি নির্মাণ করছেন একটা শহর, শহরের ভিত্তি-স্থাপন করছেন ‘কবর-খোঁড়ার গান’ ভেতর দিয়ে। জীবনানন্দের মহীনের অলৌকিক ঘোড়াকে তিনি ঢাকার রাস্তায় নামিয়ে এনেছেন। এ কোনো পরাবাস্তব ঘোড়া নয়, সত্যিকার জ্যান্ত, ক্লান্ত বেতো ঘোড়া।

ফলে জীবনানন্দের রূপসী বাংলা বা জসীম উদ্‌দীন বা এস এম সুলতান বা কালিদাসের মেঘদূতে যে ভূখণ্ড আপনি পাবেন, সেখানে সৌন্দর্য আর সৌন্দর্য। নান্দনিকতার বিরাট এক ফাঁক ও ফাঁদ। সিকিভাগ এই সমকালীন বাংলার। এটাই আমাদের বাংলা কবিতার ট্রেন্ড। সোনার বাংলায় যে রবীন্দ্রনাথের বাংলা তা খুবই সমৃদ্ধ, সবল মাতৃমূর্তি। কিন্তু আমাদের মায়েরা দুর্বল।

‘কবর-খোঁড়ার গান’ কবিতায় মেঘপুঞ্জ, নক্ষত্রগুচ্ছের নিচে আফিমখোরের মতো একটা ঘোড়া যার ক্ষত নিঃসৃত মদিরা পান করা তিনটি মাছি, তার বিপত্নীক সহিসের শুয়ে থাকা নাগরিক খড়ের গাদার পাশে প্রৌঢ় তাড়িখোরদের গণিকালয়ে গমন, নোংরা নর্দমায় ত্যানা আর থ্যাঁতলানো ইঁদুর, ফুলের তোড়া নগরের আভাস তৈরি করে কবিতার ভাষায়। ১৯৬০ সাল থেকেই তাঁর কবিতার ভেতর একটা শহর তৈরি হচ্ছে। বাংলাদেশের কবিতায় বিরল এক ঘটনা। শক্তিশালী নাগরিক ধারণা ছাড়া আধুনিক সমাজ, ব্যবস্থা, রাষ্ট্র কিছুই তৈরি হতে পারে না। ৪৭-এর দেশভাগের পর ওপার থেকে যে লেখকরা এখানে এসেছেন, তাঁদের নাগরিকতা কলকাতা-আচ্ছন্ন, তা কবিতা কিংবা গল্প-উপন্যাস, সবখানে। তাঁদের কাছে নগর মানে কলকাতা। শামসুর রহমান এখানে বিরল। প্যারিসের কবি-সাহিত্যিক যারা প্যারিসকে তিলোত্তমা নগরী হিসেবে গড়ে তুলেছেন, সেই প্যারিসের রাস্তা ঘিঞ্জি, অপরিচ্ছন্ন তা বিশ্বাস হবে না। কিন্তু তাঁদের লেখক-কবি-শিল্পীরা নাগরিক চেতনা তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে। এই জন্য প্যারিস রেভ্যুলেশনারি শহর। রাহমানের সমসাময়িক অনেকে হয়তো সংস্কৃতিতে ঢাকাকে নির্মাণ করতে চেয়েছেন। কিন্তু তাঁর মতো সফল আর কেউ নেই।

আমাদের গ্রাম নিয়ে অগণিত চিত্রকলা আছে, উপন্যাস আছে, আছে কবিতা, চলচ্চিত্র। এখনও ফিল্মমেকাররা সিনেমার সুন্দর দৃশ্য ধারণের জন্য গ্রামে ছুটে যান। কারণ জীবনানন্দ আর জসীম উদ্‌দীনরা গ্রামকে নির্মাণ করছেন। তাঁরা কোনো নগর তৈরি করতে পারেননি। কয়টা ফিল্মে বা চিত্রকলায় ঢাকার সৌন্দর্য উঠে এসেছে? আমি দীর্ঘদিন ঢাকায় থাকলেও পুরাতন ঢাকা তেমন একটা দেখা হয়নি। কিন্তু অতিসাম্প্রতিক এটা দেখে আমার মনে হয়েছে, বিরাট একটা জায়গা স্টকহোমের গামলা স্ট্যানের মতো একটা জায়গা ছিল। ওরা ধরে রেখেছে জন্য অনুভব করা যায়। আমরা শেষ করে দিয়েছি এই অসম্ভব একটা শহরকে। এই যে আমার নগর ও নাগরিক বোধ তৈরি করতে পারলাম না, সংস্কৃতিতে তার একটা বিপুল খেসারত আমাদের দিতে হয়েছে। আমরা বাপ-দাদার ভিটার গাছ না কাটলেও এই শহরে বাড়ি করার সময় সব গাছ কেটে ফেলি। আসল কথা হলো এই শহরের সঙ্গে আমাদের মায়া নেই, স্মৃতি নেই। সেই মায়াটা তৈরি করতে পারলে আমরা আরও বেশি নাগরিক হতে পারতাম। রাহমান এই শহরটাকে নির্মাণ করেছেন তাঁর কবিতায়। তা আমাদের কীভাবে কাজে লেগেছে ও পরবর্তী সময়ে কীভাবে কাজে লাগানো যায় তা বলব সামনে।

রৌদ্র করোটি-র ‘খেলনার দোকানের সামনে ভিখিরি’ পড়তে গেলে দেখবেন, এ এক অন্য পূর্ব বাংলার দৃশ্য, জীবনানন্দের রূপসী বাংলা বা প্যারাফিন লুণ্ঠনের কলকাতা নয়, কিছুটা ধূসর, বর্ণহীন, অনুজ্জ্বল রূপকথার গল্প নয়, আমাদের বাস্তবতা। রাহমান তাঁর এই কবিতায় নতুন বঙ্গ হাজির করেছেন। সেখানে যে বাংলাদেশের দেখা আপনি পাবেন, তা অতিরঞ্জিত নয়। শিল্প বাস্তবতাকে ডিস্টর্টেড করে। এই সত্য রাহমানের কবিতার ক্ষেত্রে খাটে না। ফলে তিনি পূর্ব বাংলার মাথার ভেতর একটা নিজস্ব শহরের কল্পনা, স্মৃতি সেট দিয়েছেন যা ধুলায় মলিন, যার ড্রেন থেকে মলমূত্রের গন্ধ আসে, ডাস্টবিনের পাশে যে শহরের ফুলের দোকান।

প্রশ্ন হলো এই স্মৃতি কী কাজে লাগে? রাহমানকে অনেকে নাগরিক কবি বলেছেন। তাঁর কবিতার অনুষঙ্গ শহর এই জন্য। কিন্তু তাঁর কেউ বলেনি, এই নগর নির্মাণে আমাদের জন্য কী উপকার হয়েছে? এটা কেন কাজে লাগে? আমরা অনুসন্ধান মূলত সেটা, তিনি নাগরিক কবি কি না, তা খুব প্রাথমিক আলাপ। আমি সে দিকে যেতে চাই না। কবিতার ব্যবহারিক আলাপে যাই চলুন।

.

জার্মান দার্শনিক ওয়াল্টার বেঞ্জামিনের Theses on the Philosophy of History বইয়ে ‘অ্যাঞ্জেল অব হিস্ট্রি’ বলে একটি আইডিয়া আছে। ইতিহাস, স্মৃতি ও উন্নয়ন বা প্রগতি নিয়ে তাঁর কথাগুলো এখানে স্মরণ করা জরুরি, রাহমানের কবিতায় যে শহর, ঢাকা শহর দেখতে পাই তা অনুধাবন করার জন্য। ইসরায়েলের বিখ্যাত লেখক হাইম শাপিরা বলেছিলেন, জার্মান দার্শনিক মানেই তাঁর বেশিরভাগ কথা বোঝা যাবে না। ফলে, আমি খুব সহজ করে বলি। বেঞ্জামিনের মতে স্মৃতি আর ইতিহাসের সম্পর্ক গভীর, বিশেষত কীভাবে আমরা ইতিহাসকে রিড করি তা দেখার আছে। ইতিহাসের সরল বর্ণনা হলো সভ্যতাকে খুব প্রগ্রেসিভ জায়গা থেকে দেখানো। মানুষ দিনকে দিন ভালো আর ভালো করছে। ইতিহাস সাফল্যে ভরা। আগে মেট্রো ছিল না, এখন আছে। উন্নয়ন আর উন্নয়ন। কিন্তু ইতিহাস এত সরল কোনো বিষয় নয়। ইতিহাসে নানা গ্যাপ, ইন্টারাপশন থাকে, ভুলে যাওয়া, ইচ্ছা বা অনিচ্ছাকৃত উপেক্ষা থাকে। মানুষের প্রতি অত্যাচার, অবিচার তার সংগ্রাম ও ট্র্যাজেডিকে দেখতে চাওয়া হয় না প্রাতিষ্ঠানিক ইতিহাসে। কিন্তু স্মৃতি হলো সেই আকর, বীজ যা থেকে মানুষের এই হারিয়ে যাওয়া মুহূর্তগুলো ফিরিয়ে আনা সম্ভব। দমিত, দলিত, সংখ্যালঘু মানুষের আসল কথাগুলো স্মৃতিই পারে আমাদের বলে দিতে। ফলে, ইতিহাস নামক মিথ্যার শুদ্ধাচার করা যায় স্মৃতি দিয়ে। বেঞ্জামিনের মতে স্মৃতি হলো শাসকের ব্যারেলে আটকে রাখা ভুলে যাওয়া গল্পগুলো খুলে ফিরিয়ে আনার রেঞ্জ। এর ভেতর দিয়ে আমরা রিফ্লেক্ট করতে পারি, ভুলগুলো শুধরে নিতে পারি, নতুন কিছুর জন্ম দিতে পারি। নতুন ইতিহাসের জন্মও দিতে পারি।

বুনো মহিষকে যেমন তাড়িয়ে নিয়ে যেতে হয় গন্তব্যের দিকে, সেভাবেই এই খাপছাড়া ঢাকাকে পরম মমতায় তিনি স্থান দিয়েছেন তাঁর কবিতায়। এই শহরের সঙ্গে মানুষের স্মৃতি তৈরি হয়েছে। এই নগরীতে যা কিছু যেভাবে দেখা যায়, তা তিনি সেভাবেই অঙ্কন করেছেন।

বেঞ্জামিন তাঁর ইতিহাসের ধারণা সিম্বলিকভাবে বর্ণনা করার জন্য পল ক্লি’র ‘অ্যাঞ্জেলাস নোভাস’ (নিউ অ্যাঞ্জেল) এর উদাহরণ টেনেছিলেন। এই ছবিতে একজন দেবদূতের দেখা মেলে। সে কী যেন ভাবছে। ভাবতে ভাবতে দূরে সরে যাচ্ছে। তার চোখ সুদূরে কিছু দেখছে, মুখ খোলা, বলতে চায়। ডানা দুটো ছড়ানো। এটাই ইতিহাসের দেবদূতের ছবি। তার মুখ অতীতের দিকে ফেরানো। তার সম্মুখে বিপর্যয়ের পর বিপর্যয়, ধ্বংসস্তূপ, অনেকগুলো ঘটনা। সে মৃতকে নতুন প্রাণ দান করতে চায়, যা কিছু ঘটেছে তার জন্য সে লজ্জিত হতে চায়, এই বাস্তব দুনিয়ায় সে এই সমস্ত নিয়েই থেকে যেতে চায়। কিন্তু স্বর্গ থেকে ঝড় ওঠে। তার ডানায় এই প্রবল হাওয়ার তোড়ে সে তার ডানা আর বন্ধ করতে পারে না। এই অপ্রতিরোধ্য হাওয়া তাকে ভবিষ্যতের দিকে ভাসিয়ে নিয়ে যায়। এই ঝড়টাই প্রগতি। সে ইতিহাস বলে যা জানি তার দর্শন খুব নির্মম। সফল, সুন্দর, নান্দনিক, অতিরিক্ত পজিটিভ বা ইতিবাচক কিছু ছাড়া ট্রেডিশনাল ইতিহাসে কারও স্থান হয় না। আমাদের কবিতা, শিল্প, সাহিত্যও তাই।

ফলে জীবনানন্দের রূপসী বাংলা বা জসীম উদ্‌দীন বা এস এম সুলতান বা কালিদাসের মেঘদূতে যে ভূখণ্ড আপনি পাবেন, সেখানে সৌন্দর্য আর সৌন্দর্য। নান্দনিকতার বিরাট এক ফাঁক ও ফাঁদ। সিকিভাগ এই সমকালীন বাংলার। এটাই আমাদের বাংলা কবিতার ট্রেন্ড। সোনার বাংলায় যে রবীন্দ্রনাথের বাংলা তা খুবই সমৃদ্ধ, সবল মাতৃমূর্তি। কিন্তু আমাদের মায়েরা দুর্বল।

কিন্তু শামসুর রাহমান যে শহরের স্মৃতি তৈরি করেছেন, তার ভেতর কোনো ব্যাপার নেই। এই শহর যেমন তাই তাই উঠে এসেছে তাঁর কবিতায়। জোর করে নান্দনিক করে তোলার কসরত নাই। এমনকি ছন্দ বিষয়ে তাঁর এত ছুঁতমার্গ ছিল না। তিনি সত্য এক নগরকে স্থাপন করেছেন আমাদের মাথার ভেতর। পল ক্লি’র দেবদূতের মতো সে পালিয়ে যায় না, প্রগতি তাকে ভাসিয়ে নিয়ে যায় না। নাগরিক সৌন্দর্য তৈরির কোনো চাপ নেই। শামসুর রাহমানও আমাদের কবিতায় ‘অ্যাঞ্জেলা নোভাস’, যাকে স্বর্গীয় ঝড়ের নিচে অগণিত মানুষ ও দৃশ্যের স্মৃতি আছে, সেখান থেকে প্রকৃত ইতিহাসের পুনর্জাগরণ সম্ভব।

.

স্মৃতি খুব গুরুত্বপূর্ণ। এটা যেমন তৈরি করতে হয়, ডি-লার্নিংও করতে হয়। পুরাতনকে ভেঙে নতুনকে জাগরিত করতে হয়। স্মৃতি বিষয়ে কথা বলতে গেলে অন্য এক জার্মান দার্শনিককে আবার টেনে আনতে হবে। ফ্রেডরিক নিৎশে। তাঁর Genealogy of Morality-তে মানুষের বিবেক ও অপরাধবোধ কোথা থেকে উৎপন্ন তা উন্মোচন করেছেন। সমাজে মানুষকে একটা নির্দিষ্ট নিয়ম ও বাধ্যবাধকতা মেনে চলার জন্য মানুষের ওপর নানা দায় ও প্রতিশ্রুতি চাপিয়ে দেয়। আর স্মৃতি হলো সেই জিনিস, যার ভেতর দিয়ে সমাজের মানুষের আচরণ ও সংস্কৃতিকে একটা ‘শেইপ’ দেওয়া হয়। নিৎশে স্মৃতির এই রূপকে বলেছেন bad conscience, যা মানুষের অপরাধবোধকে জাগ্রত রাখে এবং প্রতিনিয়ত ব্যক্তির ভেতর আত্ম-শাস্তি বা সেলফ পানিশমেন্টের মতো নেতিবাচক শক্তিকে কার্যকর রাখে। আমরা সেই সমস্ত সামাজিক নীতি মেনে চলি। এমন অনেক দায়িত্ব পালনে বাধ্য হই, যা আমাদের আত্মাকে ক্ষয় করে দেয়। অপরাধীর মতো জেলখানার বাইরে চলাচল করি। মানুষের আসল স্বাধীনতাবোধ ধ্বংস করে দেওয়ার জন্য দায়ী নীতির দাসত্ব যা অতীত থেকে তৈরি হয় এবং ব্যক্তি স্মৃতিতে তা বহন করে চলে। মানুষের ব্যক্তিত্ব তৈরিতে স্মৃতির ভূমিকা ব্যাপক। ফলে, মানবিক স্বাধীনতা অর্জনের জন্য মানুষের ভুলে যাওয়ার স্বাধীনতা লাগে। নিৎশের যে Übermensch (Overman or Superman)-এর যে ধারণা, তা বিস্মৃতির সঙ্গে জড়িত। অতীতকে নতুনভাবে তৈরি করা লাগে, নতুন স্মৃতির জন্ম দিতে হয় যেখানে ব্যক্তি নিজেই নিজের পথ তৈরি করে, অপ্রয়োজনীয় ঐতিহ্য, বিশ্বাস, ধ্যান-ধারণা, নীতিকে চুরমার করে দিয়ে নতুন একটা পথের দিকে সে অগ্রসর হবে। এই ভুলে যাওযার পদ্ধতি নিষ্ক্রিয় কোনো ব্যাপার না। এটা ‘অ্যাক্টিভ ফরগেটিং’। সচেতনতা ছাড়া অতীতের ভুল, বোঝা, স্খলিত নৈতিকতা থেকে বের হতে পারব না আমরা।

নিৎশে মেটাফরিক্যালি চূড়ান্ত এক আনন্দের দিকে মানুষকে ধাবিত করতে চেয়েছেন। আপনাকে যদি জীবনের সব দুঃখ, কষ্ট, পাপ-তাপের পরও যদি প্রশ্ন করা হয়, আপনি কি এই জীবনে আবার ফিরতে চান? আর তার উত্তর যদি হয় হ্যাঁ। তবে আপনি জীবনের প্রতি ইতিবাচক। এটাই আত্ম-ঘোষণা বা ‘লাইফ-অ্যাফার্মেশ’, প্রচলিত সত্যকে অস্বীকার করে নতুন সত্য তৈরি করা। বারবার দুনিয়ায় ফিরে ফিরে আসার মতো জীবন কাটানো। নিৎশে বা জীবনানন্দের আত্মজীবনী যারা পাঠ করেছেন, তাঁরা জানেন এই কবিদের ব্যক্তিজীবনের দুঃখ-কষ্ট যা-ই থাকুক না কেন, তাঁরা বারবার ‘ইটারনাল রিটার্ন’ বা শাশ্বত প্রত্যাবর্তন করতে চেয়েছেন, ‘‘আবার আসিব ফিরে ধানসিঁড়িটির তীরে’’ বা ‘‘আমরা দুজনে শূন্য করে যাবো জীবনের প্রচুর ভাড়ার’’।

বড় লেখকরা একটা জনপদের জন্য ইতিবাচক স্মৃতি ও নৈতিকতা তৈরি করে। জীবনানন্দ যে শস্য-শ্যামলা বাংলায় ফিরে আসার দৃশ্য তৈরি করেছেন, শামসুর রাহমান ঘিঞ্জি-গলির, পচাগলা ঢাকাতেই ফেরালেন আমাদের, যার ভেতর দিয়ে একটা জাতি তার সত্য নাগরিক রূপ দেখার সুযোগ পেল। সাহিত্যে এমন দেশের কথা ঘুরে ফিরে এসেছে যা খুবই সমৃদ্ধশালী। কিন্তু আসলে তো কলোনির দাপটে সব হারিয়ে ফেলেছি। আমাদের সাহিত্যে সবসময় যে বাংলাদেশের নগরের কথা লেখা হয়েছে, তা মূলত কলকাতার রাজপথ। আমাদের নিজেদের আইডেনটিটি তৈরি জন্য যে শহর দরকার ছিল, তা এখানে ছিল না। ফলে দেশভাগের পর যে কলকাতার স্মৃতি ভুলে নতুন শহরের বাস্তবতা ও তার নাগরিকদের সম্ভাবনা ও সংকট লেখার জন্য আমাদের একটা ‘ডিলার্নিং’ ফেইস দরকার ছিল। এটা আমাদের রাজনৈতিক পরিচয় নিমার্ণের প্রশ্ন। ফলে, বিরাট বড় একটা কালচারাল ডিলার্নিংয়ের ব্যাপার আছে রাহমানের কবিতায়। ফলে পূর্বতন কবিতার যে অন্তর্গত দর্শন থাকে তার সঙ্গে একটা ছেদ বলা চলে। এই ছেদ ছাড়া আমরা স্বাধীন এক দেশের স্বপ্ন দেখতে পারতাম না। ইতিহাসে Übermensch ধারণার যে বাস্তবতা তা ১৯৭১। স্বাধীন এক ভূখণ্ডের দিকে আমরা যে এগিয়ে যেতে পারলাম, তার সূচনা কালচারাল পয়েন্ট থেকে। শামসুর রাহমানের মতো অপরাপর কবি-সাহিত্যিক-শিল্পীরা এটি তৈরি করেছেন। এর ভেতর রাহমানের ভূমিকা অনেক বেশি।

নিৎশের আরেকটা কথা আছে গে সাইন্স-এ... ‘আমাদের শিল্পের জন্যই সত্য দিয়ে ধ্বংস হয়ে যাওয়ার কিছু নেই।’

আমাদের সকল বাস্তবতা তার কবিতায় ফুটে ওঠে। আমাদের ভেতর একটা নতুন দেশের, ভূমির স্বপ্ন বাড়তে থাকে। কবিতা শুধু ভাব বা দার্শনিক ঘটনা নয়, এটা রাজনৈতিক ঘটনাও, আমাদের জীবন কীভাবে আমরা উৎরে যাব সেই ঘটনা। বাংলা ভাষায় শামসুর রাহমানের মতো এমন ব্যাপ্তি, বৈচিত্র্য, নতুন দেশ নির্মাণের উপাদান তৈরির যে শক্তি তা বিরল। অনেক কিছু ভুলে নতুন বাংলার জন্য স্মৃতির জন্ম দিয়েছেন। সত্যি এক নাগরিক বোধ আমরা খুঁজে পেলাম যা নিয়ে গেছে চূড়ান্ত বাংলাদেশ-চিন্তার দিকে। স্মৃতি ছাড়া এগুলো হয় না। বাংলাদেশের স্মৃতি নির্মাণের কবি: শামসুর রাহমান।

লেখক: কবি, গদ্যকার ও চিন্তক

Ad 300x250
লেটেস্ট
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত

শামসুর রাহমান: বাংলাদেশের স্মৃতি নির্মাণের কবি