সামিয়া রহমান

১৭৯৫ সালের ২৭ নভেম্বর কলকাতার ডোমতলার (অধুনা এজরা স্ট্রিট) পঁচিশ নম্বর বাড়িতে গেরাসিম স্তেপানোভিচ লেবেদেফ নামে এক রুশ সংগীতজ্ঞ পর্দা তুললেন। মঞ্চস্থ হলো কাল্পনিক সংবদল। রিচার্ড পল জোড্রেলের ইংরেজি প্রহসন দ্য ডিসগাইজ-এর বঙ্গানুবাদ। এশীয় কোনো ভাষায় প্রসেনিয়াম মঞ্চে অভিনীত প্রথম নাটক। দুই শতাব্দী পরে ১৯৯১ সালে ঢাকা থিয়েটার মঞ্চে আনল সেলিম আল দীনের নাটক চাকা। সেখানে অঙ্ক নেই, দৃশ্য নেই, আছে লম্বক ও তরঙ্গ। একাদশ শতকের কাশ্মীরি কবি সোমদেবের কথাসরিৎসাগর থেকে গৃহীত বিভাজনরীতি। বিরামচিহ্ন হিসেবে বিদ্যাসাগর-প্রবর্তিত ইংরেজি-উদ্ভূত যতিব্যবস্থার পরিবর্তে ব্যবহৃত হলো পুঁথির তারকা, একদণ্ড আর দ্বিদণ্ড।
দুই নাটকের মঞ্চায়িত হওয়ার মুহূর্তের মধ্যবর্তী দূরত্বটাই আমাদের আলোচ্য। দূরত্বটা শুধু কালগত নয় তাঁর থেকেও বেশি চিন্তার কাঠামোগত। প্রশ্নটিও সরল নয়। কোন শর্তে একটি জাতি নিজের নাট্যভাষা নিজে নির্ধারণ করে আর কখন সে গৃহীত ছাঁচে নিজের অভিজ্ঞতাকে ঢালাই করতে বাধ্য হয়?
বি-উপনিবেশায়ন শব্দটি প্রথমে রাজনৈতিক অর্থে প্রযুক্ত হয়েছিল। তারপর ঔপনিবেশিক শাসনের অবসান, পতাকা বদল, সংবিধান প্রণয়ন। ১৯৪৭ কিংবা ১৯৭১ সেই অর্থে বি-উপনিবেশায়নের তারিখ। কিন্তু ফ্রাঞ্জ ফানোঁ দ্য রেচেড অব দি আর্থ (১৯৬১) গ্রন্থে দেখিয়েছিলেন যে ঔপনিবেশিকতা শাসনযন্ত্রের সঙ্গে বিদায় নেয় না। ঔপনিবেশিক শাসন মনের ভেতর, রুচির ভেতর, আত্মমূল্যায়নের ভেতর অবশিষ্ট থাকে। এডওয়ার্ড সাঈদ ওরিয়েন্টালিজম (১৯৭৮) গ্রন্থে দেখালেন, প্রাচ্য সম্পর্কে জ্ঞানের যে বিপুল ভাণ্ডার ইউরোপ নির্মাণ করেছিল তা শুধু বিদ্যাচর্চা না, ইহা আধিপত্যেরই একটি রূপ। বিল অ্যাশক্রফট, গ্যারেথ গ্রিফিথস ও হেলেন টিফিন দি এম্পায়ার রাইটস ব্যাক (১৯৮৯) গ্রন্থে প্রক্রিয়াটির দুটি পর্যায় চিহ্নিত করেছেন: অ্যাব্রোগেশন অর্থাৎ সাম্রাজ্যিক মানদণ্ডের কর্তৃত্ব অস্বীকার এবং অ্যাপ্রোপ্রিয়েশন। অর্থাৎ সেই ভাষা ও রূপকে নিজের প্রয়োজনে রূপান্তরিত করে গ্রহণ। সাহিত্যে প্রশ্নটি কেন জরুরি? কারণ সাহিত্য অভিজ্ঞতাকে সংগঠিত করার যন্ত্র। কোন কাহিনি বলার যোগ্য, কোন চরিত্র নায়ক হওয়ার উপযুক্ত, কোন সমাপ্তি যথার্থ সে সমস্ত সিদ্ধান্ত রূপকাঠামোর ভেতরেই নিহিত থাকে। যখন একটি সমাজ পরের ছাঁচে নিজের আখ্যান রচনা করতে শেখে তখন তার অভিজ্ঞতার যে অংশ সেই ছাঁচে আঁটে না তা অপ্রকাশিত থেকে যায় কিংবা আরও নিষ্ঠুরভাবে অগুরুত্বপূর্ণ বলে গণ্য হয়। ঔপনিবেশিক শিক্ষাব্যবস্থার গভীরতম কাজটি ভূখণ্ড দখল নয়, রুচির অনুক্রম নির্মাণ। কোনটি ‘শিল্প’ আর কোনটি ‘লোকজ কৌতূহল’ সেই বিভাজন প্রতিষ্ঠা করা।
সাহিত্যের বর্গবিভাজনটিও ঔপনিবেশিক রাজনীতির সাংস্কৃতিক অবদমনেরই একটি রূপ। কাব্য, নাটক, উপন্যাস, প্রবন্ধ এই বহুবিভাজনটি একটি নির্দিষ্ট ইউরোপীয় কাঠামোগত সাহিত্যের ইতিহাসের ফল। যা মুদ্রণযন্ত্র, গ্রন্থবাণিজ্য ও বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যতালিকার সঙ্গে যুক্ত হয়ে স্থায়িত্ব লাভ করেছে। সর্বজনীন নিয়ম হিসেবে আরোপিত হলে যেসব রচনারীতি একাধিক বর্গে যুগপৎ বিচরণ করে যেমন মঙ্গলকাব্য, যা একই সঙ্গে আখ্যান, গীত ও পরিবেশনা সেগুলি ‘অপরিণত’ অথবা ‘সংকর’ আখ্যা পায়। শ্রেণিকরণের অভ্যন্তরেই মূল্যায়ন প্রচ্ছন্ন থাকে। তাই বি-উপনিবেশায়নের প্রথম কাজ পাল্টা-উত্তর দেওয়া নয় উল্টো সেখানে প্রশ্নটিকেই সন্দেহ করা। যেমন: এই মাপকাঠি কে বানাল, কার সুবিধার জন্য বানাল।
কেনীয় লেখক নগুগি ওয়া থিয়োঙ্গোর ডিকলোনাইজিং দ্য মাইন্ড (১৯৮৬) বি-উপনিবেশায়ন-চিন্তার একটি নির্ণায়ক দলিল। তাঁর কেন্দ্রীয় প্রতিপাদ্য ছিল “ভাষা সংস্কৃতিকে বহন করে, আর সংস্কৃতি, বিশেষত মৌখিক আখ্যান ও সাহিত্যের মধ্য দিয়ে সেই সমগ্র মূল্যবোধের ভাণ্ডারকে বহন করে যার সাহায্যে আমরা নিজেদের এবং পৃথিবীতে নিজেদের অবস্থানকে উপলব্ধি করি।” ইংরেজিকে তিনি অভিহিত করেছেন ‘সাংস্কৃতিক বোমা নামে। যে অস্ত্র একটি জনগোষ্ঠীর নিজের নাম ও ঐতিহ্যের প্রতি বিশ্বাস ধ্বংস করে। তত্ত্বের প্রয়োগ ছিল বাস্তব ও ব্যয়বহুল। ১৯৭৭ সালে গিকুয়ু ভাষায় রচিত ঙ্গাহিকা ন্দিন্দা কামিরিথু গ্রামে খোলা প্রাঙ্গণে অভিনীত হয়। অভিনেতা ছিলেন কৃষক ও শ্রমিক আর পরিণামে লেখকের কারাবাস। নগুগির অবস্থান বাংলার পরিপ্রেক্ষিতে হুবহু প্রযোজ্য নয় এবং পার্থক্যটি লক্ষ করা জরুরি। কেনিয়ায় ঔপনিবেশিক আঘাত পড়েছিল ভাষার উপর। গিকুয়ু বিদ্যালয়ে নিষিদ্ধ ছিল। ইংরেজি ছিল উন্নতির একমাত্র সোপান। বাংলায় ভাষা টিকে গিয়েছিল। উনিশ শতকে বাংলা গদ্য বিকশিত হয়েছে, মুদ্রণযন্ত্র বাংলা গ্রন্থ প্রকাশ করেছে, নাটক বাংলাতেই রচিত হয়েছে। আমাদের ক্ষেত্রে আঘাতটি পড়েছিল ভাষার উপর নয়, রূপের উপর। উপনিবেশ আমাদের ভাষা কাড়েনি। উল্টো কেড়ে নিয়েছে সেই ভাষায় কী করা যাবে আর কী করা যাবে না সেই স্বাধীনতার বিধান। ফলে বাংলায় বি-উপনিবেশায়নের প্রশ্নটি প্রধানত আঙ্গিকের প্রশ্ন এবং সেখানেই সেলিম আল দীনের নাট্যচিন্তার তাৎপর্য নিহিত।
লেবেদেফের প্রেক্ষাগৃহ দীর্ঘায়ু পায়নি কিন্তু তাঁর আনীত স্থাপত্য রয়ে গেল ভারতীয় নাট্যচিন্তায়। সম্মুখভাগে খিলান, দর্শক ও অভিনেতার মধ্যে অদৃশ্য চতুর্থ দেয়াল আর আলোকিত মঞ্চের বিপরীতে অন্ধকার প্রেক্ষাগার। ১৮৩১ সালে প্রসন্নকুমার ঠাকুরের হিন্দু থিয়েটার প্রতিষ্ঠিত হলো যেখানে শেক্সপিয়র ও ইংরেজিতে অনূদিত সংস্কৃত নাটক অভিনীত হতো। বাংলা নাটক একটিও নয়। বেলগাছিয়া থিয়েটারে (১৮৫৮-৬১) ১৮৫৯ সালে মঞ্চস্থ হলো মাইকেল মধুসূদন দত্তের শর্মিষ্ঠা। ভারতীয় নাট্যের ইতিহাসে প্রথম অর্কেস্ট্রা সেখানেই। ১৮৭২ সালে ন্যাশনাল থিয়েটার প্রথম সাধারণ্যের জন্য উন্মুক্ত হয়। টিকিট-নির্ভর বাংলা রঙ্গমঞ্চ যাত্রা শুরু করল দীনবন্ধু মিত্রের নীলদর্পণ দিয়ে। পরের বছর বেঙ্গল থিয়েটার যেখানে প্রথম পেশাদার অভিনেত্রীরা মঞ্চে এলেন।
লক্ষণীয় যে, প্রেক্ষাগৃহ প্রতিবাদেরও ক্ষেত্র হয়ে উঠেছিল। নীলদর্পণ (১৮৬০) নীলকরদের অত্যাচারের যে চিত্র অঙ্কন করল তা ঔপনিবেশিক প্রশাসনকে বিচলিত করেছিল। ১৮৭৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে গ্রেট ন্যাশনাল থিয়েটারে গজদানন্দ ও যুবরাজ নামে এক ব্যঙ্গনাট্য মঞ্চস্থ হয়। পুলিশ অভিনয় রুদ্ধ করলে পরের সপ্তাহে সেটি হনুমান চরিত্র নামে প্রত্যাবর্তন করে। পরিণামে প্রণীত হয় নাট্যাভিনয় নিয়ন্ত্রণ আইন- ১৮৭৬, যার বলে নীলদর্পণ, আনন্দমঠ ও চন্দ্রশেখর বাজেয়াপ্ত হয়। পশ্চিমবঙ্গ ১৯৬২ সালে আইনটি রদ করে এবং কেন্দ্রীয়ভাবে তা অপ্রচলিত ঘোষিত হয় ২০১৮ সালে।
নাট্যচিন্তার রূপান্তরটি মঞ্চেই সীমাবদ্ধ না থেকে তার প্রকাশ পেয়েছিল ছাপাখানায় ও পাঠশালায়। মুদ্রণযন্ত্র নাটককে পরিবেশনার আসর থেকে তুলে এনে গ্রন্থের পৃষ্ঠায় স্থাপন করল ফলে নাট্য হয়ে উঠল প্রথমত পাঠ্য এবং দ্বিতীয়ত দৃশ্য। বিদ্যাসাগরের হাতে বাংলা গদ্যে ইংরেজি-অনুসারী যতিব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হলো ফলে বাক্যের শ্বাসপ্রশ্বাস নির্ধারণের অধিকার পাঠকের হস্ত থেকে লেখকের হস্তে অর্পিত হয়ে যায়। কলেজের পাঠ্যতালিকায় শেক্সপিয়র ও ইউরোপীয় নাট্যতত্ত্ব প্রবেশ করল আর যাত্রা-পাঁচালি-কবিগান স্থান পেল ‘লোকসংস্কৃতি নামক পৃথক ও নিম্নতর কোঠায়। সুতরাং ঔপনিবেশিক অবস্থার প্যাঁচটি স্পষ্ট। মঞ্চ ঔপনিবেশিকতাবিরোধী বক্তব্য ধারণ করেছে এবং তা ধারণ করেছে ঔপনিবেশিক পাত্রেই। বিষয়ে প্রতিরোধ, আঙ্গিকে আত্মসমর্পণ। অ্যারিস্টটলীয় ঘটনাবিন্যাস, দ্বন্দ্বকেন্দ্রিক কাঠামো, অঙ্ক ও দৃশ্যের বিভাজন, চরিত্রের মনস্তাত্ত্বিক অখণ্ডতা, বাস্তবের অনুকরণ সমস্ত কিছুকে নাটকের স্বাভাবিক নিয়ম বলে গ্রহণ করা হলো। যা ছিল একটি বিশেষ ভৌগোলিক-ঐতিহাসিক ঐতিহ্যের বৈশিষ্ট্য ফলে তা পেল সর্বজনীন বিধানের মর্যাদা।
তবে কি ইউরোপ আসার পূর্বে এদেশে নাট্য ছিল না? উত্তর নির্ভর করে ‘নাটক’ শব্দটির সংজ্ঞা কে নির্ধারণ করছে তার উপর। সেলিম আল দীন ১৯৯৫ সালে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে যে অভিসন্দর্ভের জন্য পিএইচ ডি লাভ করেন যা পরে মধ্যযুগের বাংলা নাট্য (১৯৯৬) নামে গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়েছিল সেখানে তিনি একটি সূক্ষ্ম অথচ নির্ণায়ক পার্থক্য নির্দেশ করেছেন। প্রাচীন ও মধ্যযুগের বাংলায় ‘নাটক’ শব্দটি প্রায় দুর্লভ কিন্তু নাট্য প্রচুর। গান, পাঁচালি, লীলা, গীত, যাত্রা, গম্ভীরা, এইসব নামে যা প্রচলিত ছিল তার অভ্যন্তরে আখ্যান আছে, চরিত্র আছে, সংলাপ আছে, অভিনয় আছে, দর্শক আছে। অনুপস্থিত ছিল ইউরোপীয় বর্গবিভাজন।
চতুর্দশ শতকের শেষার্ধে রচিত বড়ু চণ্ডীদাসের শ্রীকৃষ্ণকীর্তন দৃষ্টান্ত হিসেবে গ্রহণযোগ্য। ১৯০৯ সালে বসন্তরঞ্জন রায় বিদ্বদ্বল্লভ বাঁকুড়ার এক গোয়ালঘর থেকে পুঁথিটি উদ্ধার করেন। ১৯১৬ সালে বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষৎ তা প্রকাশ করে। ৪১৮টি বাংলা পদ ও ১৩৩টি সংস্কৃত শ্লোক, তেরোটি খণ্ডে বিন্যস্ত। তিনটি চরিত্র- রাধা, কৃষ্ণ ও বড়াই এবং পয়ার ও ত্রিপদীতে রচিত সংলাপ-প্রতিসংলাপ। রচনাটিকে গীতিকাব্য বলা চলে আবার নাট্যও বলা চলে ফলে এই বিভাজনটিই সেখানে অপ্রযোজ্য।
মঙ্গলকাব্যের পরিবেশনা-পদ্ধতি আরও তাৎপর্যপূর্ণ। চণ্ডীমঙ্গল বা মনসামঙ্গল গায়েন ও দোহারের সহযোগে রাত্রির পর রাত্রি ধরে গীত হতো। গায়েন কখনো বর্ণনাকারী, কখনো চরিত্র, পরক্ষণে পুনরায় বর্ণনাকারী অর্থাৎ একই শরীরে অবিচ্ছিন্ন যাতায়াত। ইউরোপীয় অভিনয়তত্ত্বে যা অসংগতি বলে বিবেচ্য মধ্যযুগীয় বাংলার পরিবেশনায় তাই স্বাভাবিক ব্যাকরণ। যাত্রার ক্ষেত্রেও অনুরূপ।
বৃন্দাবন দাসের চৈতন্যভাগবত (১৫৪৮) থেকে জানতে পারি যে, শ্রীচৈতন্য রুক্মিণীর ভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন যাকে গবেষকেরা কৃষ্ণযাত্রার সূচনাবিন্দু গণ্য করেন। যাত্রা অভিনীত হতো সমতল ভূমিতে সেখানে কোন উচ্চ মঞ্চ ছিল না, যবনিকা ছিল না, দর্শক চতুর্দিকে পরিবেষ্টন করে বসত। অধিকারী নামে যিনি দল পরিচালনা করতেন তিনি একই সঙ্গে কথক, গানের ব্যাখ্যা দিতেন, দৃশ্যের সংযোগ ঘটাতেন এবং তা প্রায়শই তাৎক্ষণিক রচনায়।
তালিকা আরও দীর্ঘ। মালদহ ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ অঞ্চলের গম্ভীরায় শিব ও তাঁর নাতির কথোপকথনের আড়ালে বৎসরের দুঃখদুর্দশার সামাজিক ভাষ্য নির্মিত হয়। আলকাপে হাস্যরস, সংগীত ও নৃত্যের সমন্বয়ে সমাজসমালোচনা চলে। রংপুর-দিনাজপুরের কুশানগানে রামায়ণের আখ্যান মূল গায়েন ও দোয়ারকির প্রশ্নোত্তরে বিস্তৃত হয়। পদাবলি কীর্তনের আখর ও তুক-এ কথক পালার অভ্যন্তরে প্রবেশ করেন, ব্যাখ্যা দেন, আবেগ বর্ধিত করেন, শ্রোতার সঙ্গে প্রত্যক্ষ সংলাপে যান। পুঁথিপাঠের আসরে একজন পাঠক বহু কণ্ঠস্বর ধারণ করেন অন্যদিকে শ্রোতারা মন্তব্য করেন, পাঠ স্থগিত হয়, পুনরায় চলে। সর্বত্র চতুর্থ দেয়ালের অনুপস্থিতি ফলে দর্শক পরিবেশনার বহির্ভূত পর্যবেক্ষক না হয়ে অভ্যন্তরীণ অংশীদার হয়ে ওঠেন।
তত্ত্বের স্তরেও পার্থক্যটি মৌলিক। ভরতের নাট্যশাস্ত্র রসকে কেন্দ্রে রেখে নাট্যকে বোঝে ফলে তার লক্ষ্য হয়ে ওঠে দর্শকচিত্তে রসনিষ্পত্তি।
সেলিম আল দীন( ১৯৪৯-২০০৮) ১৯৭৪ সালে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগদান করে ১৯৮৬ সালে সেখানে দেশের প্রথম নাটক ও নাট্যতত্ত্ব বিভাগ প্রতিষ্ঠা করে প্রতিষ্ঠাতা সভাপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ঢাকা থিয়েটারের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য (১৯৭৩)। নাসিরউদ্দীন ইউসুফের সঙ্গে বাংলাদেশ গ্রাম থিয়েটারের সহপ্রতিষ্ঠাতা (১৯৮১-৮২) হিসেবে কাজ করেন। বাংলা নাট্যকোষ সংকলন ও থিয়েটার স্টাডিজ পত্রিকা সম্পাদনা করেছেন। তাঁর নাট্যযাত্রা এক লাফে দেশজ রীতিতে পৌঁছায়নি। সত্তরের দশকের গোড়ার রচনাগুলি যেমন, সর্পবিষয়ক গল্প (১৯৭২), জন্ডিস ও বিবিধ বেলুন, মুনতাসীর ফ্যান্টাসি ইত্যাদি আঙ্গিকে ইউরোপীয় আধুনিকতাবাদ ও অ্যাবসার্ড নাট্যের ছাপ বহন করে। সেই পর্বে তিনি নাগরিক মধ্যবিত্তের বিচ্ছিন্নতা নিয়ে লিখছিলেন আর লিখছিলেন সেই মঞ্চব্যাকরণেই যা পরবর্তীকালে তিনি অস্বীকার করবেন। আশির দশকে মোড় ঘুরল। কীর্তনখোলা থেকে কেরামতমঙ্গল সেখান থেকে চাকা প্রতিটি পদক্ষেপে বর্ণনার ভার বৃদ্ধি পাওয়ার পাশাপাশি সংলাপের একাধিপত্য হ্রাস পেল। আবার অন্যদিকে চরিত্রের মনস্তাত্ত্বিক অখণ্ডতার পরিবর্তে আখ্যানের প্রবাহ প্রধান হয়ে উঠল। বিবর্তনটি লক্ষ করা প্রয়োজন কারণ তা এই প্রমাণ করে যে তাঁর দেশজ-প্রত্যাবর্তন সহজাত প্রবৃত্তি ছিল না, ছিল অর্জিত সিদ্ধান্ত এবং বিদ্যাচর্চা ও আত্মসমালোচনার পরিণাম।
সেলিম আল দীনের তত্ত্বের নাম দ্বৈতাদ্বৈতবাদ। ভাবনাটির শিকড় বৈষ্ণব দর্শনের অচিন্ত্যভেদাভেদ ধারণায় যেখানে বস্তু ও ব্রহ্ম যুগপৎ ভিন্ন ও অভিন্ন। শিল্পক্ষেত্রে অর্থ দাঁড়ায়: কাব্য, নাটক, আখ্যান, নৃত্য, সংগীত পৃথক বর্গ নয় একই শিল্পসত্তার বিভিন্ন প্রকাশ। ইউরোপীয় নন্দনতত্ত্ব যে বিভাজনরেখাগুলি অঙ্কন করেছে সেগুলিকে তিনি সহস্র বৎসরের বাঙালি নন্দনভাবনার আলোকে অস্বীকার করেছেন। উল্লেখ্য যে, পঞ্চদশ শতক থেকেই দ্বৈতাদ্বৈত ভাবনার একটি ধারা বাংলায় প্রচলিত ছিল। সেলিম আল দীনের কৃতিত্ব উদ্ভাবনে নয়, পুনরাবিষ্কার ও প্রয়োগে। তত্ত্বের নাট্যিক রূপ কথানাট্য। নিজের বয়ানে: “বলতে বলতে নাটক, সেজন্যই কথানাট্য।” সৈয়দ শামসুল হক চাকা সম্পর্কে লিখেছেন, রচনাটি “নাটক, কবিতা, নাচ, গীত, উপন্যাস, উপকথা ও কথকতার সমাহার।” তত্ত্বের ঘোষণা এক বস্তু আর রচনার অভ্যন্তরে তার বাস্তবায়ন ভিন্ন বস্তু। সেলিম আল দীনের তাৎপর্য প্রধানত দ্বিতীয়টিতে। উনিশ শতকের নাট্যকারেরাও ঔপনিবেশিকতাবিরোধী বিষয় নির্বাচন করেছেন কিন্তু আঙ্গিকে অপরিবর্তিত থেকেছেন ফলে প্রতিরোধটি রচনার উপরিতলে সীমাবদ্ধ ছিল। সেলিম আল দীনের হস্তক্ষেপ গভীরতর কারণ তা রচনার অন্তর্গঠনে। তিনি নাট্যগঠনের বিভিন্ন স্তরে পরিবর্তনটির বিভাজন ও বিবর্তন দেখিয়েছেন।
বিভাজনের একক হিসেবে অঙ্ক ধারণাটি সময়ের বদ্ধ ও রৈখিক খণ্ডীকরণ নির্দেশ করে। প্রতিটি অঙ্ক উত্তেজনার একটি স্তর অতিক্রম করে পরবর্তী স্তরে পৌঁছায়। দৃশ্য ধারণাটি স্থানের ঐক্য অনুমান করে। সেলিম আল দীন উভয়ই পরিত্যাগ করেছেন। চাকা-য় বিন্যাস লম্বক ও তরঙ্গে। সোমদেবের কথাসরিৎসাগর (আনুমানিক ১০৬৩-৮১ খ্রি.) আঠারোটি লম্বক ও একশো চব্বিশটি তরঙ্গে বিন্যস্ত। শব্দ দুটির ব্যঞ্জনা ভিন্ন। লম্বক অর্থে শাখা বা স্কন্ধ, তরঙ্গ অর্থে ঢেউ। ঢেউ পূর্ববর্তী ঢেউয়ের প্রান্ত থেকে জন্ম নেয়, সীমারেখা নির্দেশ করে না। অঙ্ক ভাগ করে অন্যদিকে তরঙ্গ প্রবাহিত হয়।
বর্ণনা ও সংলাপের অনুপাত হিসেবে ইউরোপীয় নাট্যে সংলাপ সমস্ত ভার বহন করে। মঞ্চনির্দেশ সহায়ক, মুদ্রণে বন্ধনী বা বাঁকা হরফে চিহ্নিত, উচ্চারণের বাইরে। কথানাট্যে বর্ণনা উচ্চারিত হয়; তা পরিবেশনযোগ্য পাঠ, নির্দেশ নয়। ফলে নাট্য এমন সমস্ত বিষয় ধারণ করতে পারে যা সংলাপ একাকী পারে না যেমন: নিসর্গ, ঋতু, সমষ্টিগত স্মৃতি, অন্তর্লীন ভাবনা, দীর্ঘ কালান্তর। চাকা-য় বৈশাখের প্রভাত বর্ণিত হয় মহাকাব্যিক আয়তনে, “কাকেশ্বরীর পারে এলংজানি পূর্বদিকের সম্মুখে পশ্চিমে অবস্থান হেতু সূর্যালোকে স্থানে স্থানে ঝলমল করে।” অব্যবহিত পরেই আঞ্চলিক সংলাপ: “এ ভাই হামাকের চাকাটায় এট্টু ঝামেলা হয়েছে।” দুই ভাষাস্তরের মধ্যে অনুক্রম নেই।
কালের সংগঠনের ক্ষেত্রে অ্যারিস্টটলীয় ঐক্যতত্ত্ব ও উনিশ শতকের সুগঠিত নাটক সংকটের মুহূর্তে কালকে সংকুচিত করে। মঙ্গলকাব্যের কাল বংশপরম্পরাগত ও ঋতুচক্রীয়। সেলিম আল দীন দ্বিতীয় প্রকরণটি গ্রহণ করেছেন। চাকা-র কাঠামো সংকটের নয়, যাত্রাপথের। শবদেহ বহনকারী গাড়ি গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে চলে, চাকা ঘোরে, পরিসমাপ্তি আসে না। শিরোনামটি রূপকল্প ও গঠনতত্ত্ব একসঙ্গে ধারণ করে।
চরিত্রের ধারণায় ইউরোপীয় আধুনিক নাটকের নায়ক আত্মসচেতন ব্যক্তি, মনস্তাত্ত্বিক গভীরতাসম্পন্ন, নামাঙ্কিত ও অদ্বিতীয়। সেলিম আল দীনের চরিত্রেরা প্রায়শ পেশা দ্বারা চিহ্নিত যেমন: গাড়িয়াল, মিস্ত্রি, জেলে, তাঁতি, যাত্রাশিল্পী। চাকা-র কেন্দ্রীয় উপস্থিতিটি একটি নামহীন শবদেহ। ব্যক্তির পরিবর্তে সমষ্টি, চরিত্রের পরিবর্তে অবস্থান। বুর্জোয়া ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যের যে ধারণাকে ঘিরে ইউরোপীয় নাট্য গড়ে উঠেছে সেই ধারণার বিসর্জন এখানে আঙ্গিকগত সিদ্ধান্ত, সেই সঙ্গে রাজনৈতিকও বটে।
দ্বন্দ্বের পরিবর্তে রস হয়ে ওঠে পাশ্চাত্য ঘটনাবিন্যাসের চালিকাশক্তি সংঘাত; প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তির সংঘর্ষ থেকে চরম মুহূর্ত, সেখান থেকে নিষ্পত্তি। সেলিম আল দীনের অভিমত, প্রাচ্যে ট্র্যাজেডির সম্মুখীন হয়ে একাকী দাঁড়াতে হয় না। সংকট সমষ্টি ভাগ করে নেয় এবং নূতন পথ অন্বেষণ করে। তাঁর রচনায় তাই প্রতিনায়ক দুর্লভ, চরম মুহূর্ত অনুপস্থিত এবং সমাপ্তি সমাধানের পরিবর্তে অনুরণনে শেষ হয়।
সংগীত ও নৃত্যের অবস্থানের ক্ষেত্রে ইউরোপীয় বর্গব্যবস্থায় সংগীত ও নৃত্য নাটকের বহির্ভূত। সেগুলি যুক্ত হলে রচনাটি ভিন্ন শ্রেণিতে চলে যায় যথা গীতিনাট্য বা নৃত্যনাট্য। দ্বৈতাদ্বৈতবাদে বিভাজনটি অর্থহীন। সেলিম আল দীনের রচনায় গান কাহিনির বিরতি নয়, কাহিনির বহন আবার নৃত্য অলংকরণ নয়, বর্ণনার শারীরিক রূপ। কথা, নৃত্য ও গীতের ত্রয়ী বন্ধন তাঁর পদ্ধতির মূল সূত্র এবং সূত্রটি মঙ্গলকাব্য ও পাঁচালির আসর থেকেই গৃহীত। যে রচনা একইসঙ্গে শ্রুতিগ্রাহ্য ও দৃশ্যগ্রাহ্য, ইউরোপীয় শ্রেণীকরণে তার নাম নেই। সেলিম আল দীনের কাছে সেটিই নাট্যের স্বাভাবিক পূর্ণতা।
যতিচিহ্ন ও মুদ্রণরূপের ক্ষেত্রে বিদ্যাসাগরের হাতে প্রতিষ্ঠিত ইংরেজি-উদ্ভূত যতিব্যবস্থাকে সেলিম আল দীন ঔপনিবেশিক অবশেষ গণ্য করে বর্জন করেছেন। চাকা-য় অবশিষ্ট রইল তারকা, একদণ্ড, দ্বিদণ্ড ও পুঁথির চিহ্নসম্ভার। পরিণাম দ্বিবিধ যেমন: প্রথমত, পাঠের উপর লেখকের নিয়ন্ত্রণ শিথিল হয় অন্যদিকে বাক্যের বিরতি পাঠক নিজ নিঃশ্বাসে নির্ধারণ করেন। দ্বিতীয়ত, মুদ্রিত পৃষ্ঠাটি দেখতে পুঁথির অনুরূপ হয়ে ওঠে ফলে পাঠক পাঠের পূর্বেই একটি ভিন্ন ঐতিহ্যের সংকেত পান। আঙ্গিক এখানে চাক্ষুষ, পাঠপূর্ব।
মঙ্গলাচরণ ও কথকের আত্মপ্রকাশের ক্ষেত্রে আমরা দেখতে পাই ইউরোপীয় নাট্যকার পর্দার অন্তরালে অদৃশ্য থাকেন আর নাটক আরম্ভ হয় চরিত্রের বাক্যে। মধ্যযুগীয় বাংলা রচনা আরম্ভ হয় বন্দনা বা মঙ্গলাচরণে এবং শেষ হয় ভণিতায় যেখানে কবি স্বনাম উচ্চারণ করেন। চাকা-র সূচনা সেই রীতিতেই: “বেদনা সহমর্মিতার যুগল মন্থনে / দীর্ঘ পঞ্চদিবস রাত্রিতে এই ধবল রক্তিমাভ নাট্যকথামালা উদ্ভূত হল।” রচয়িতা রচনার অভ্যন্তরে উপস্থিত ফলে রচনার নির্মিতিপ্রক্রিয়া স্বীকৃত। বাস্তবতার ভ্রম সৃষ্টি করাই যেখানে লক্ষ্য নয় সেখানে ভ্রম ভাঙার আয়োজনও অপ্রয়োজনীয়।
অভিনয়রীতিতে দেখা যায় স্তানিস্লাভস্কি-উত্তর অভিনয়তত্ত্বে অভিনেতা চরিত্রের অভ্যন্তরে প্রবেশ করে সেখানেই অবস্থান করেন ফলে দর্শক বিস্মৃত হন যে সম্মুখে একজন অভিনেতা দণ্ডায়মান। বর্ণনাত্মক রীতিতে অভিনেতা একই দৃশ্যে কথক, চরিত্র ও ভাষ্যকার আবার কখনো নদীর বর্ণনা দিচ্ছেন, পরমুহূর্তে গাড়িয়াল হয়ে কথা বলছেন, পুনরায় সরে এসে ঘটনার উপর মন্তব্য করছেন। যাতায়াতে দর্শকের অবিশ্বাস-স্থগিতকরণ বারংবার ভঙ্গ হয় এবং তাই অভিপ্রেত। ব্রেখটের বিচ্ছিন্নকরণ-প্রভাবের সঙ্গে বাহ্যিক সাদৃশ্য আছে কিন্তু উৎস পৃথক। ব্রেখট এসেছেন রাজনৈতিক জাগরণের তাগিদ থেকে আর সেলিম আল দীন এসেছেন গায়েন ও অধিকারীর সহস্রাব্দপ্রাচীন অভ্যাস থেকে। বংশপরম্পরার পার্থক্য স্বীকার করাটাই বি-উপনিবেশায়নের কাজ।
সেলিম আল দীনের কীর্তনখোলা (১৯৮৬) নাটক নদীতীরের এক মেলার প্রেক্ষাপটে ভ্রাম্যমাণ যাত্রাদলের কাহিনি। সোনাই, বনশ্রীবালা, ছায়ারঞ্জন, ডালিমন, বশির, রুস্তম প্রান্তবাসী মানুষগুলির জীবিকা বদলায়, পরিচয় বদলায়। মেলার আলোকসজ্জার পার্শ্বেই দারিদ্র্য ও আত্মহননের অন্ধকার। নাটকটির আত্মপ্রতিফলনী গুণটি লক্ষণীয় যে, দেশজ পরিবেশনারীতির ক্ষয় নিয়ে রচনাটি শোক প্রকাশ করছে, সেই রীতিকেই সে নিজের আঙ্গিক হিসেবে গ্রহণ করেছে। মেলা এখানে পটভূমি নয়, গঠনতত্ত্ব। মেলার বহুস্বর, বিচ্ছিন্ন ঘটনাপুঞ্জ ও অকেন্দ্রিক বিন্যাস নাট্যের কাঠামোতেই সঞ্চারিত।
চাকা-য় কাজটি আরও সংহত। রচনা ১৯৯০, প্রথম প্রযোজনা ১৯৯১। কাহিনি সামান্য: এক গাড়িয়াল অজ্ঞাতপরিচয় শবদেহ নিয়ে গ্রাম হতে গ্রামান্তরে ঘোরে। মৃত মানুষটির স্বজন অন্বেষণ করে কিন্তু পায় না। উপরে বর্ণিত সব কয়টি সিদ্ধান্তই এখানে একযোগে ক্রিয়াশীল এবং সেগুলি বিষয়ের সঙ্গে অচ্ছেদ্য। শবদেহটির নাম নেই কারণ রাষ্ট্রীয় সহিংসতার নিহতদের নাম থাকে না। কাঠামোয় পরিসমাপ্তি নেই কারণ অন্বেষণের পরিসমাপ্তি নেই। কথক ও চরিত্র অভিন্ন কারণ শোকটি ব্যক্তিগত নয় সমষ্টির।
গঠনের একটি বিশদ দৃষ্টান্ত লক্ষণীয়। প্রথম লম্বকের সূচনায় কথক পাঠককে সম্বোধন করেন, পরিবেশ বর্ণনা করেন, ঋতু ও নদীর অবস্থান জানান। তৃতীয় তরঙ্গে সেই কথকই মিস্ত্রির সঙ্গে বাক্যালাপে প্রবৃত্ত হন। বর্ণনা থেকে সংলাপে উত্তরণের মুহূর্তে কোনো মঞ্চনির্দেশ নেই, উদ্ধৃতিচিহ্ন নেই, চরিত্রের নাম-লেবেল নেই। পাঠক নিজেই বুঝে নেন কণ্ঠস্বর বদলেছে। ইউরোপীয় নাট্যপাঠের মুদ্রণসংকেতগুলি অপসারিত হওয়ায় পাঠ্যটি পুনরায় শ্রুতিনির্ভর হয়ে ওঠে ফলে পড়ার পূর্বশর্ত হয়ে দাঁড়ায় শোনা। বি-উপনিবেশায়ন এখানে ঘোষণার বিষয় নয়, মুদ্রণপৃষ্ঠার আয়োজন। সময়টিও প্রাসঙ্গিক। ১৯৯০-৯১ বাংলাদেশে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের কাল। ইউরোপীয় ট্র্যাজেডির নায়ক উচ্চবংশীয়, তাঁর পতনে বিশ্বব্যবস্থা কম্পিত হয়। এখানে নায়ক অনামা, তাঁর মৃত্যুতে কিছুই কম্পিত হয় না এবং সেই নিস্পন্দতাই নাট্যের অভিযোগ।
পরবর্তী রচনাগুলিতে পদ্ধতিটি আরও বিস্তার পেয়েছে। হরগজ (১৯৯২) ঘূর্ণিঝড়-বিধ্বস্ত জনপদের কথা বলে। যৈবতী কন্যার মন (১৯৯৩) নারীর কামনা ও সামাজিক শাসনের সংঘাতকে মধ্যযুগীয় আখ্যানভঙ্গিতে ধারণ করে। হাতহদাই (১৯৯৭) উপকূলের জেলেজীবনকে কেন্দ্রে আনে। বনপাংশুল মান্দি জনগোষ্ঠীর ভূমি হারানোর ইতিহাস অবলম্বনে রচিত। নিমজ্জন (২০০২) বিশ্বজোড়া গণহত্যার স্মৃতি একত্র করে। যাঁরা ঔপনিবেশিক ও ঔপনিবেশোত্তর সাহিত্যে নিয়মিতভাবে পটভূমি হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছেন তাঁরা সেলিম আল দীনের রচনায় কাহিনির কেন্দ্রে এবং তাঁদের কথা কথিত হয়েছে এমন আঙ্গিকে যা তাঁদেরই সাংস্কৃতিক পরম্পরা থেকে উত্থিত।
নাট্যচিন্তার বি-উপনিবেশায়নের অর্থ ইউরোপ বর্জন নয়। অ্যারিস্টটল, ইবসেন কিংবা ব্রেখট পাঠ না করে বাংলা নাট্য অগ্রসর হবে, দাবিটি অবাস্তব ও অনাবশ্যক। অর্থটি ভিন্ন আর তা হলো ইউরোপকে একমাত্র মানদণ্ডের আসন থেকে অপসারণ। প্রশ্নটি “আমাদের নাটক ইউরোপীয় নাটকের অনুরূপ হলো কি না” নয়; প্রশ্নটি “আমাদের অভিজ্ঞতা প্রকাশের উপযুক্ত রূপ আমরা পেলাম কি না”।
সেলিম আল দীনের কাজ প্রশ্নটিকে বাংলাদেশের নাট্যচর্চার কেন্দ্রে এনেছে। তিনি প্রমাণ করেছেন যে মধ্যযুগীয় বাংলার আখ্যানরীতি জাদুঘরের দর্শনীয় বস্তু নয় সেখান থেকে বিংশ শতকের রাষ্ট্রীয় সহিংসতা, শ্রেণিবৈষম্য ও মানবিক নিঃসঙ্গতার কথা বলা সম্ভব। চাকা-র অনামা শবদেহ একাদশ শতকের তরঙ্গবিভাজনে ও পুঁথির যতিচিহ্নে বাহিত হয়েছে অথচ তা সম্পূর্ণ সমকালীন। রূপ ও বিষয়ের মিলনই সম্ভবত তাঁর বৃহত্তম যুক্তি। আবার ঐতিহ্য সেই মুহূর্তে জীবিত হয় যখন সে বর্তমানের ভার বহন করতে সক্ষম হয়।
চাকা ঘোরে, পথ ফুরায় না। বি-উপনিবেশায়নও তদ্রূপ শেষ হওয়ার নয়, চালিয়ে যাওয়ার।

১৭৯৫ সালের ২৭ নভেম্বর কলকাতার ডোমতলার (অধুনা এজরা স্ট্রিট) পঁচিশ নম্বর বাড়িতে গেরাসিম স্তেপানোভিচ লেবেদেফ নামে এক রুশ সংগীতজ্ঞ পর্দা তুললেন। মঞ্চস্থ হলো কাল্পনিক সংবদল। রিচার্ড পল জোড্রেলের ইংরেজি প্রহসন দ্য ডিসগাইজ-এর বঙ্গানুবাদ। এশীয় কোনো ভাষায় প্রসেনিয়াম মঞ্চে অভিনীত প্রথম নাটক। দুই শতাব্দী পরে ১৯৯১ সালে ঢাকা থিয়েটার মঞ্চে আনল সেলিম আল দীনের নাটক চাকা। সেখানে অঙ্ক নেই, দৃশ্য নেই, আছে লম্বক ও তরঙ্গ। একাদশ শতকের কাশ্মীরি কবি সোমদেবের কথাসরিৎসাগর থেকে গৃহীত বিভাজনরীতি। বিরামচিহ্ন হিসেবে বিদ্যাসাগর-প্রবর্তিত ইংরেজি-উদ্ভূত যতিব্যবস্থার পরিবর্তে ব্যবহৃত হলো পুঁথির তারকা, একদণ্ড আর দ্বিদণ্ড।
দুই নাটকের মঞ্চায়িত হওয়ার মুহূর্তের মধ্যবর্তী দূরত্বটাই আমাদের আলোচ্য। দূরত্বটা শুধু কালগত নয় তাঁর থেকেও বেশি চিন্তার কাঠামোগত। প্রশ্নটিও সরল নয়। কোন শর্তে একটি জাতি নিজের নাট্যভাষা নিজে নির্ধারণ করে আর কখন সে গৃহীত ছাঁচে নিজের অভিজ্ঞতাকে ঢালাই করতে বাধ্য হয়?
বি-উপনিবেশায়ন শব্দটি প্রথমে রাজনৈতিক অর্থে প্রযুক্ত হয়েছিল। তারপর ঔপনিবেশিক শাসনের অবসান, পতাকা বদল, সংবিধান প্রণয়ন। ১৯৪৭ কিংবা ১৯৭১ সেই অর্থে বি-উপনিবেশায়নের তারিখ। কিন্তু ফ্রাঞ্জ ফানোঁ দ্য রেচেড অব দি আর্থ (১৯৬১) গ্রন্থে দেখিয়েছিলেন যে ঔপনিবেশিকতা শাসনযন্ত্রের সঙ্গে বিদায় নেয় না। ঔপনিবেশিক শাসন মনের ভেতর, রুচির ভেতর, আত্মমূল্যায়নের ভেতর অবশিষ্ট থাকে। এডওয়ার্ড সাঈদ ওরিয়েন্টালিজম (১৯৭৮) গ্রন্থে দেখালেন, প্রাচ্য সম্পর্কে জ্ঞানের যে বিপুল ভাণ্ডার ইউরোপ নির্মাণ করেছিল তা শুধু বিদ্যাচর্চা না, ইহা আধিপত্যেরই একটি রূপ। বিল অ্যাশক্রফট, গ্যারেথ গ্রিফিথস ও হেলেন টিফিন দি এম্পায়ার রাইটস ব্যাক (১৯৮৯) গ্রন্থে প্রক্রিয়াটির দুটি পর্যায় চিহ্নিত করেছেন: অ্যাব্রোগেশন অর্থাৎ সাম্রাজ্যিক মানদণ্ডের কর্তৃত্ব অস্বীকার এবং অ্যাপ্রোপ্রিয়েশন। অর্থাৎ সেই ভাষা ও রূপকে নিজের প্রয়োজনে রূপান্তরিত করে গ্রহণ। সাহিত্যে প্রশ্নটি কেন জরুরি? কারণ সাহিত্য অভিজ্ঞতাকে সংগঠিত করার যন্ত্র। কোন কাহিনি বলার যোগ্য, কোন চরিত্র নায়ক হওয়ার উপযুক্ত, কোন সমাপ্তি যথার্থ সে সমস্ত সিদ্ধান্ত রূপকাঠামোর ভেতরেই নিহিত থাকে। যখন একটি সমাজ পরের ছাঁচে নিজের আখ্যান রচনা করতে শেখে তখন তার অভিজ্ঞতার যে অংশ সেই ছাঁচে আঁটে না তা অপ্রকাশিত থেকে যায় কিংবা আরও নিষ্ঠুরভাবে অগুরুত্বপূর্ণ বলে গণ্য হয়। ঔপনিবেশিক শিক্ষাব্যবস্থার গভীরতম কাজটি ভূখণ্ড দখল নয়, রুচির অনুক্রম নির্মাণ। কোনটি ‘শিল্প’ আর কোনটি ‘লোকজ কৌতূহল’ সেই বিভাজন প্রতিষ্ঠা করা।
সাহিত্যের বর্গবিভাজনটিও ঔপনিবেশিক রাজনীতির সাংস্কৃতিক অবদমনেরই একটি রূপ। কাব্য, নাটক, উপন্যাস, প্রবন্ধ এই বহুবিভাজনটি একটি নির্দিষ্ট ইউরোপীয় কাঠামোগত সাহিত্যের ইতিহাসের ফল। যা মুদ্রণযন্ত্র, গ্রন্থবাণিজ্য ও বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যতালিকার সঙ্গে যুক্ত হয়ে স্থায়িত্ব লাভ করেছে। সর্বজনীন নিয়ম হিসেবে আরোপিত হলে যেসব রচনারীতি একাধিক বর্গে যুগপৎ বিচরণ করে যেমন মঙ্গলকাব্য, যা একই সঙ্গে আখ্যান, গীত ও পরিবেশনা সেগুলি ‘অপরিণত’ অথবা ‘সংকর’ আখ্যা পায়। শ্রেণিকরণের অভ্যন্তরেই মূল্যায়ন প্রচ্ছন্ন থাকে। তাই বি-উপনিবেশায়নের প্রথম কাজ পাল্টা-উত্তর দেওয়া নয় উল্টো সেখানে প্রশ্নটিকেই সন্দেহ করা। যেমন: এই মাপকাঠি কে বানাল, কার সুবিধার জন্য বানাল।
কেনীয় লেখক নগুগি ওয়া থিয়োঙ্গোর ডিকলোনাইজিং দ্য মাইন্ড (১৯৮৬) বি-উপনিবেশায়ন-চিন্তার একটি নির্ণায়ক দলিল। তাঁর কেন্দ্রীয় প্রতিপাদ্য ছিল “ভাষা সংস্কৃতিকে বহন করে, আর সংস্কৃতি, বিশেষত মৌখিক আখ্যান ও সাহিত্যের মধ্য দিয়ে সেই সমগ্র মূল্যবোধের ভাণ্ডারকে বহন করে যার সাহায্যে আমরা নিজেদের এবং পৃথিবীতে নিজেদের অবস্থানকে উপলব্ধি করি।” ইংরেজিকে তিনি অভিহিত করেছেন ‘সাংস্কৃতিক বোমা নামে। যে অস্ত্র একটি জনগোষ্ঠীর নিজের নাম ও ঐতিহ্যের প্রতি বিশ্বাস ধ্বংস করে। তত্ত্বের প্রয়োগ ছিল বাস্তব ও ব্যয়বহুল। ১৯৭৭ সালে গিকুয়ু ভাষায় রচিত ঙ্গাহিকা ন্দিন্দা কামিরিথু গ্রামে খোলা প্রাঙ্গণে অভিনীত হয়। অভিনেতা ছিলেন কৃষক ও শ্রমিক আর পরিণামে লেখকের কারাবাস। নগুগির অবস্থান বাংলার পরিপ্রেক্ষিতে হুবহু প্রযোজ্য নয় এবং পার্থক্যটি লক্ষ করা জরুরি। কেনিয়ায় ঔপনিবেশিক আঘাত পড়েছিল ভাষার উপর। গিকুয়ু বিদ্যালয়ে নিষিদ্ধ ছিল। ইংরেজি ছিল উন্নতির একমাত্র সোপান। বাংলায় ভাষা টিকে গিয়েছিল। উনিশ শতকে বাংলা গদ্য বিকশিত হয়েছে, মুদ্রণযন্ত্র বাংলা গ্রন্থ প্রকাশ করেছে, নাটক বাংলাতেই রচিত হয়েছে। আমাদের ক্ষেত্রে আঘাতটি পড়েছিল ভাষার উপর নয়, রূপের উপর। উপনিবেশ আমাদের ভাষা কাড়েনি। উল্টো কেড়ে নিয়েছে সেই ভাষায় কী করা যাবে আর কী করা যাবে না সেই স্বাধীনতার বিধান। ফলে বাংলায় বি-উপনিবেশায়নের প্রশ্নটি প্রধানত আঙ্গিকের প্রশ্ন এবং সেখানেই সেলিম আল দীনের নাট্যচিন্তার তাৎপর্য নিহিত।
লেবেদেফের প্রেক্ষাগৃহ দীর্ঘায়ু পায়নি কিন্তু তাঁর আনীত স্থাপত্য রয়ে গেল ভারতীয় নাট্যচিন্তায়। সম্মুখভাগে খিলান, দর্শক ও অভিনেতার মধ্যে অদৃশ্য চতুর্থ দেয়াল আর আলোকিত মঞ্চের বিপরীতে অন্ধকার প্রেক্ষাগার। ১৮৩১ সালে প্রসন্নকুমার ঠাকুরের হিন্দু থিয়েটার প্রতিষ্ঠিত হলো যেখানে শেক্সপিয়র ও ইংরেজিতে অনূদিত সংস্কৃত নাটক অভিনীত হতো। বাংলা নাটক একটিও নয়। বেলগাছিয়া থিয়েটারে (১৮৫৮-৬১) ১৮৫৯ সালে মঞ্চস্থ হলো মাইকেল মধুসূদন দত্তের শর্মিষ্ঠা। ভারতীয় নাট্যের ইতিহাসে প্রথম অর্কেস্ট্রা সেখানেই। ১৮৭২ সালে ন্যাশনাল থিয়েটার প্রথম সাধারণ্যের জন্য উন্মুক্ত হয়। টিকিট-নির্ভর বাংলা রঙ্গমঞ্চ যাত্রা শুরু করল দীনবন্ধু মিত্রের নীলদর্পণ দিয়ে। পরের বছর বেঙ্গল থিয়েটার যেখানে প্রথম পেশাদার অভিনেত্রীরা মঞ্চে এলেন।
লক্ষণীয় যে, প্রেক্ষাগৃহ প্রতিবাদেরও ক্ষেত্র হয়ে উঠেছিল। নীলদর্পণ (১৮৬০) নীলকরদের অত্যাচারের যে চিত্র অঙ্কন করল তা ঔপনিবেশিক প্রশাসনকে বিচলিত করেছিল। ১৮৭৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে গ্রেট ন্যাশনাল থিয়েটারে গজদানন্দ ও যুবরাজ নামে এক ব্যঙ্গনাট্য মঞ্চস্থ হয়। পুলিশ অভিনয় রুদ্ধ করলে পরের সপ্তাহে সেটি হনুমান চরিত্র নামে প্রত্যাবর্তন করে। পরিণামে প্রণীত হয় নাট্যাভিনয় নিয়ন্ত্রণ আইন- ১৮৭৬, যার বলে নীলদর্পণ, আনন্দমঠ ও চন্দ্রশেখর বাজেয়াপ্ত হয়। পশ্চিমবঙ্গ ১৯৬২ সালে আইনটি রদ করে এবং কেন্দ্রীয়ভাবে তা অপ্রচলিত ঘোষিত হয় ২০১৮ সালে।
নাট্যচিন্তার রূপান্তরটি মঞ্চেই সীমাবদ্ধ না থেকে তার প্রকাশ পেয়েছিল ছাপাখানায় ও পাঠশালায়। মুদ্রণযন্ত্র নাটককে পরিবেশনার আসর থেকে তুলে এনে গ্রন্থের পৃষ্ঠায় স্থাপন করল ফলে নাট্য হয়ে উঠল প্রথমত পাঠ্য এবং দ্বিতীয়ত দৃশ্য। বিদ্যাসাগরের হাতে বাংলা গদ্যে ইংরেজি-অনুসারী যতিব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হলো ফলে বাক্যের শ্বাসপ্রশ্বাস নির্ধারণের অধিকার পাঠকের হস্ত থেকে লেখকের হস্তে অর্পিত হয়ে যায়। কলেজের পাঠ্যতালিকায় শেক্সপিয়র ও ইউরোপীয় নাট্যতত্ত্ব প্রবেশ করল আর যাত্রা-পাঁচালি-কবিগান স্থান পেল ‘লোকসংস্কৃতি নামক পৃথক ও নিম্নতর কোঠায়। সুতরাং ঔপনিবেশিক অবস্থার প্যাঁচটি স্পষ্ট। মঞ্চ ঔপনিবেশিকতাবিরোধী বক্তব্য ধারণ করেছে এবং তা ধারণ করেছে ঔপনিবেশিক পাত্রেই। বিষয়ে প্রতিরোধ, আঙ্গিকে আত্মসমর্পণ। অ্যারিস্টটলীয় ঘটনাবিন্যাস, দ্বন্দ্বকেন্দ্রিক কাঠামো, অঙ্ক ও দৃশ্যের বিভাজন, চরিত্রের মনস্তাত্ত্বিক অখণ্ডতা, বাস্তবের অনুকরণ সমস্ত কিছুকে নাটকের স্বাভাবিক নিয়ম বলে গ্রহণ করা হলো। যা ছিল একটি বিশেষ ভৌগোলিক-ঐতিহাসিক ঐতিহ্যের বৈশিষ্ট্য ফলে তা পেল সর্বজনীন বিধানের মর্যাদা।
তবে কি ইউরোপ আসার পূর্বে এদেশে নাট্য ছিল না? উত্তর নির্ভর করে ‘নাটক’ শব্দটির সংজ্ঞা কে নির্ধারণ করছে তার উপর। সেলিম আল দীন ১৯৯৫ সালে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে যে অভিসন্দর্ভের জন্য পিএইচ ডি লাভ করেন যা পরে মধ্যযুগের বাংলা নাট্য (১৯৯৬) নামে গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়েছিল সেখানে তিনি একটি সূক্ষ্ম অথচ নির্ণায়ক পার্থক্য নির্দেশ করেছেন। প্রাচীন ও মধ্যযুগের বাংলায় ‘নাটক’ শব্দটি প্রায় দুর্লভ কিন্তু নাট্য প্রচুর। গান, পাঁচালি, লীলা, গীত, যাত্রা, গম্ভীরা, এইসব নামে যা প্রচলিত ছিল তার অভ্যন্তরে আখ্যান আছে, চরিত্র আছে, সংলাপ আছে, অভিনয় আছে, দর্শক আছে। অনুপস্থিত ছিল ইউরোপীয় বর্গবিভাজন।
চতুর্দশ শতকের শেষার্ধে রচিত বড়ু চণ্ডীদাসের শ্রীকৃষ্ণকীর্তন দৃষ্টান্ত হিসেবে গ্রহণযোগ্য। ১৯০৯ সালে বসন্তরঞ্জন রায় বিদ্বদ্বল্লভ বাঁকুড়ার এক গোয়ালঘর থেকে পুঁথিটি উদ্ধার করেন। ১৯১৬ সালে বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষৎ তা প্রকাশ করে। ৪১৮টি বাংলা পদ ও ১৩৩টি সংস্কৃত শ্লোক, তেরোটি খণ্ডে বিন্যস্ত। তিনটি চরিত্র- রাধা, কৃষ্ণ ও বড়াই এবং পয়ার ও ত্রিপদীতে রচিত সংলাপ-প্রতিসংলাপ। রচনাটিকে গীতিকাব্য বলা চলে আবার নাট্যও বলা চলে ফলে এই বিভাজনটিই সেখানে অপ্রযোজ্য।
মঙ্গলকাব্যের পরিবেশনা-পদ্ধতি আরও তাৎপর্যপূর্ণ। চণ্ডীমঙ্গল বা মনসামঙ্গল গায়েন ও দোহারের সহযোগে রাত্রির পর রাত্রি ধরে গীত হতো। গায়েন কখনো বর্ণনাকারী, কখনো চরিত্র, পরক্ষণে পুনরায় বর্ণনাকারী অর্থাৎ একই শরীরে অবিচ্ছিন্ন যাতায়াত। ইউরোপীয় অভিনয়তত্ত্বে যা অসংগতি বলে বিবেচ্য মধ্যযুগীয় বাংলার পরিবেশনায় তাই স্বাভাবিক ব্যাকরণ। যাত্রার ক্ষেত্রেও অনুরূপ।
বৃন্দাবন দাসের চৈতন্যভাগবত (১৫৪৮) থেকে জানতে পারি যে, শ্রীচৈতন্য রুক্মিণীর ভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন যাকে গবেষকেরা কৃষ্ণযাত্রার সূচনাবিন্দু গণ্য করেন। যাত্রা অভিনীত হতো সমতল ভূমিতে সেখানে কোন উচ্চ মঞ্চ ছিল না, যবনিকা ছিল না, দর্শক চতুর্দিকে পরিবেষ্টন করে বসত। অধিকারী নামে যিনি দল পরিচালনা করতেন তিনি একই সঙ্গে কথক, গানের ব্যাখ্যা দিতেন, দৃশ্যের সংযোগ ঘটাতেন এবং তা প্রায়শই তাৎক্ষণিক রচনায়।
তালিকা আরও দীর্ঘ। মালদহ ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ অঞ্চলের গম্ভীরায় শিব ও তাঁর নাতির কথোপকথনের আড়ালে বৎসরের দুঃখদুর্দশার সামাজিক ভাষ্য নির্মিত হয়। আলকাপে হাস্যরস, সংগীত ও নৃত্যের সমন্বয়ে সমাজসমালোচনা চলে। রংপুর-দিনাজপুরের কুশানগানে রামায়ণের আখ্যান মূল গায়েন ও দোয়ারকির প্রশ্নোত্তরে বিস্তৃত হয়। পদাবলি কীর্তনের আখর ও তুক-এ কথক পালার অভ্যন্তরে প্রবেশ করেন, ব্যাখ্যা দেন, আবেগ বর্ধিত করেন, শ্রোতার সঙ্গে প্রত্যক্ষ সংলাপে যান। পুঁথিপাঠের আসরে একজন পাঠক বহু কণ্ঠস্বর ধারণ করেন অন্যদিকে শ্রোতারা মন্তব্য করেন, পাঠ স্থগিত হয়, পুনরায় চলে। সর্বত্র চতুর্থ দেয়ালের অনুপস্থিতি ফলে দর্শক পরিবেশনার বহির্ভূত পর্যবেক্ষক না হয়ে অভ্যন্তরীণ অংশীদার হয়ে ওঠেন।
তত্ত্বের স্তরেও পার্থক্যটি মৌলিক। ভরতের নাট্যশাস্ত্র রসকে কেন্দ্রে রেখে নাট্যকে বোঝে ফলে তার লক্ষ্য হয়ে ওঠে দর্শকচিত্তে রসনিষ্পত্তি।
সেলিম আল দীন( ১৯৪৯-২০০৮) ১৯৭৪ সালে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগদান করে ১৯৮৬ সালে সেখানে দেশের প্রথম নাটক ও নাট্যতত্ত্ব বিভাগ প্রতিষ্ঠা করে প্রতিষ্ঠাতা সভাপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ঢাকা থিয়েটারের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য (১৯৭৩)। নাসিরউদ্দীন ইউসুফের সঙ্গে বাংলাদেশ গ্রাম থিয়েটারের সহপ্রতিষ্ঠাতা (১৯৮১-৮২) হিসেবে কাজ করেন। বাংলা নাট্যকোষ সংকলন ও থিয়েটার স্টাডিজ পত্রিকা সম্পাদনা করেছেন। তাঁর নাট্যযাত্রা এক লাফে দেশজ রীতিতে পৌঁছায়নি। সত্তরের দশকের গোড়ার রচনাগুলি যেমন, সর্পবিষয়ক গল্প (১৯৭২), জন্ডিস ও বিবিধ বেলুন, মুনতাসীর ফ্যান্টাসি ইত্যাদি আঙ্গিকে ইউরোপীয় আধুনিকতাবাদ ও অ্যাবসার্ড নাট্যের ছাপ বহন করে। সেই পর্বে তিনি নাগরিক মধ্যবিত্তের বিচ্ছিন্নতা নিয়ে লিখছিলেন আর লিখছিলেন সেই মঞ্চব্যাকরণেই যা পরবর্তীকালে তিনি অস্বীকার করবেন। আশির দশকে মোড় ঘুরল। কীর্তনখোলা থেকে কেরামতমঙ্গল সেখান থেকে চাকা প্রতিটি পদক্ষেপে বর্ণনার ভার বৃদ্ধি পাওয়ার পাশাপাশি সংলাপের একাধিপত্য হ্রাস পেল। আবার অন্যদিকে চরিত্রের মনস্তাত্ত্বিক অখণ্ডতার পরিবর্তে আখ্যানের প্রবাহ প্রধান হয়ে উঠল। বিবর্তনটি লক্ষ করা প্রয়োজন কারণ তা এই প্রমাণ করে যে তাঁর দেশজ-প্রত্যাবর্তন সহজাত প্রবৃত্তি ছিল না, ছিল অর্জিত সিদ্ধান্ত এবং বিদ্যাচর্চা ও আত্মসমালোচনার পরিণাম।
সেলিম আল দীনের তত্ত্বের নাম দ্বৈতাদ্বৈতবাদ। ভাবনাটির শিকড় বৈষ্ণব দর্শনের অচিন্ত্যভেদাভেদ ধারণায় যেখানে বস্তু ও ব্রহ্ম যুগপৎ ভিন্ন ও অভিন্ন। শিল্পক্ষেত্রে অর্থ দাঁড়ায়: কাব্য, নাটক, আখ্যান, নৃত্য, সংগীত পৃথক বর্গ নয় একই শিল্পসত্তার বিভিন্ন প্রকাশ। ইউরোপীয় নন্দনতত্ত্ব যে বিভাজনরেখাগুলি অঙ্কন করেছে সেগুলিকে তিনি সহস্র বৎসরের বাঙালি নন্দনভাবনার আলোকে অস্বীকার করেছেন। উল্লেখ্য যে, পঞ্চদশ শতক থেকেই দ্বৈতাদ্বৈত ভাবনার একটি ধারা বাংলায় প্রচলিত ছিল। সেলিম আল দীনের কৃতিত্ব উদ্ভাবনে নয়, পুনরাবিষ্কার ও প্রয়োগে। তত্ত্বের নাট্যিক রূপ কথানাট্য। নিজের বয়ানে: “বলতে বলতে নাটক, সেজন্যই কথানাট্য।” সৈয়দ শামসুল হক চাকা সম্পর্কে লিখেছেন, রচনাটি “নাটক, কবিতা, নাচ, গীত, উপন্যাস, উপকথা ও কথকতার সমাহার।” তত্ত্বের ঘোষণা এক বস্তু আর রচনার অভ্যন্তরে তার বাস্তবায়ন ভিন্ন বস্তু। সেলিম আল দীনের তাৎপর্য প্রধানত দ্বিতীয়টিতে। উনিশ শতকের নাট্যকারেরাও ঔপনিবেশিকতাবিরোধী বিষয় নির্বাচন করেছেন কিন্তু আঙ্গিকে অপরিবর্তিত থেকেছেন ফলে প্রতিরোধটি রচনার উপরিতলে সীমাবদ্ধ ছিল। সেলিম আল দীনের হস্তক্ষেপ গভীরতর কারণ তা রচনার অন্তর্গঠনে। তিনি নাট্যগঠনের বিভিন্ন স্তরে পরিবর্তনটির বিভাজন ও বিবর্তন দেখিয়েছেন।
বিভাজনের একক হিসেবে অঙ্ক ধারণাটি সময়ের বদ্ধ ও রৈখিক খণ্ডীকরণ নির্দেশ করে। প্রতিটি অঙ্ক উত্তেজনার একটি স্তর অতিক্রম করে পরবর্তী স্তরে পৌঁছায়। দৃশ্য ধারণাটি স্থানের ঐক্য অনুমান করে। সেলিম আল দীন উভয়ই পরিত্যাগ করেছেন। চাকা-য় বিন্যাস লম্বক ও তরঙ্গে। সোমদেবের কথাসরিৎসাগর (আনুমানিক ১০৬৩-৮১ খ্রি.) আঠারোটি লম্বক ও একশো চব্বিশটি তরঙ্গে বিন্যস্ত। শব্দ দুটির ব্যঞ্জনা ভিন্ন। লম্বক অর্থে শাখা বা স্কন্ধ, তরঙ্গ অর্থে ঢেউ। ঢেউ পূর্ববর্তী ঢেউয়ের প্রান্ত থেকে জন্ম নেয়, সীমারেখা নির্দেশ করে না। অঙ্ক ভাগ করে অন্যদিকে তরঙ্গ প্রবাহিত হয়।
বর্ণনা ও সংলাপের অনুপাত হিসেবে ইউরোপীয় নাট্যে সংলাপ সমস্ত ভার বহন করে। মঞ্চনির্দেশ সহায়ক, মুদ্রণে বন্ধনী বা বাঁকা হরফে চিহ্নিত, উচ্চারণের বাইরে। কথানাট্যে বর্ণনা উচ্চারিত হয়; তা পরিবেশনযোগ্য পাঠ, নির্দেশ নয়। ফলে নাট্য এমন সমস্ত বিষয় ধারণ করতে পারে যা সংলাপ একাকী পারে না যেমন: নিসর্গ, ঋতু, সমষ্টিগত স্মৃতি, অন্তর্লীন ভাবনা, দীর্ঘ কালান্তর। চাকা-য় বৈশাখের প্রভাত বর্ণিত হয় মহাকাব্যিক আয়তনে, “কাকেশ্বরীর পারে এলংজানি পূর্বদিকের সম্মুখে পশ্চিমে অবস্থান হেতু সূর্যালোকে স্থানে স্থানে ঝলমল করে।” অব্যবহিত পরেই আঞ্চলিক সংলাপ: “এ ভাই হামাকের চাকাটায় এট্টু ঝামেলা হয়েছে।” দুই ভাষাস্তরের মধ্যে অনুক্রম নেই।
কালের সংগঠনের ক্ষেত্রে অ্যারিস্টটলীয় ঐক্যতত্ত্ব ও উনিশ শতকের সুগঠিত নাটক সংকটের মুহূর্তে কালকে সংকুচিত করে। মঙ্গলকাব্যের কাল বংশপরম্পরাগত ও ঋতুচক্রীয়। সেলিম আল দীন দ্বিতীয় প্রকরণটি গ্রহণ করেছেন। চাকা-র কাঠামো সংকটের নয়, যাত্রাপথের। শবদেহ বহনকারী গাড়ি গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে চলে, চাকা ঘোরে, পরিসমাপ্তি আসে না। শিরোনামটি রূপকল্প ও গঠনতত্ত্ব একসঙ্গে ধারণ করে।
চরিত্রের ধারণায় ইউরোপীয় আধুনিক নাটকের নায়ক আত্মসচেতন ব্যক্তি, মনস্তাত্ত্বিক গভীরতাসম্পন্ন, নামাঙ্কিত ও অদ্বিতীয়। সেলিম আল দীনের চরিত্রেরা প্রায়শ পেশা দ্বারা চিহ্নিত যেমন: গাড়িয়াল, মিস্ত্রি, জেলে, তাঁতি, যাত্রাশিল্পী। চাকা-র কেন্দ্রীয় উপস্থিতিটি একটি নামহীন শবদেহ। ব্যক্তির পরিবর্তে সমষ্টি, চরিত্রের পরিবর্তে অবস্থান। বুর্জোয়া ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যের যে ধারণাকে ঘিরে ইউরোপীয় নাট্য গড়ে উঠেছে সেই ধারণার বিসর্জন এখানে আঙ্গিকগত সিদ্ধান্ত, সেই সঙ্গে রাজনৈতিকও বটে।
দ্বন্দ্বের পরিবর্তে রস হয়ে ওঠে পাশ্চাত্য ঘটনাবিন্যাসের চালিকাশক্তি সংঘাত; প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তির সংঘর্ষ থেকে চরম মুহূর্ত, সেখান থেকে নিষ্পত্তি। সেলিম আল দীনের অভিমত, প্রাচ্যে ট্র্যাজেডির সম্মুখীন হয়ে একাকী দাঁড়াতে হয় না। সংকট সমষ্টি ভাগ করে নেয় এবং নূতন পথ অন্বেষণ করে। তাঁর রচনায় তাই প্রতিনায়ক দুর্লভ, চরম মুহূর্ত অনুপস্থিত এবং সমাপ্তি সমাধানের পরিবর্তে অনুরণনে শেষ হয়।
সংগীত ও নৃত্যের অবস্থানের ক্ষেত্রে ইউরোপীয় বর্গব্যবস্থায় সংগীত ও নৃত্য নাটকের বহির্ভূত। সেগুলি যুক্ত হলে রচনাটি ভিন্ন শ্রেণিতে চলে যায় যথা গীতিনাট্য বা নৃত্যনাট্য। দ্বৈতাদ্বৈতবাদে বিভাজনটি অর্থহীন। সেলিম আল দীনের রচনায় গান কাহিনির বিরতি নয়, কাহিনির বহন আবার নৃত্য অলংকরণ নয়, বর্ণনার শারীরিক রূপ। কথা, নৃত্য ও গীতের ত্রয়ী বন্ধন তাঁর পদ্ধতির মূল সূত্র এবং সূত্রটি মঙ্গলকাব্য ও পাঁচালির আসর থেকেই গৃহীত। যে রচনা একইসঙ্গে শ্রুতিগ্রাহ্য ও দৃশ্যগ্রাহ্য, ইউরোপীয় শ্রেণীকরণে তার নাম নেই। সেলিম আল দীনের কাছে সেটিই নাট্যের স্বাভাবিক পূর্ণতা।
যতিচিহ্ন ও মুদ্রণরূপের ক্ষেত্রে বিদ্যাসাগরের হাতে প্রতিষ্ঠিত ইংরেজি-উদ্ভূত যতিব্যবস্থাকে সেলিম আল দীন ঔপনিবেশিক অবশেষ গণ্য করে বর্জন করেছেন। চাকা-য় অবশিষ্ট রইল তারকা, একদণ্ড, দ্বিদণ্ড ও পুঁথির চিহ্নসম্ভার। পরিণাম দ্বিবিধ যেমন: প্রথমত, পাঠের উপর লেখকের নিয়ন্ত্রণ শিথিল হয় অন্যদিকে বাক্যের বিরতি পাঠক নিজ নিঃশ্বাসে নির্ধারণ করেন। দ্বিতীয়ত, মুদ্রিত পৃষ্ঠাটি দেখতে পুঁথির অনুরূপ হয়ে ওঠে ফলে পাঠক পাঠের পূর্বেই একটি ভিন্ন ঐতিহ্যের সংকেত পান। আঙ্গিক এখানে চাক্ষুষ, পাঠপূর্ব।
মঙ্গলাচরণ ও কথকের আত্মপ্রকাশের ক্ষেত্রে আমরা দেখতে পাই ইউরোপীয় নাট্যকার পর্দার অন্তরালে অদৃশ্য থাকেন আর নাটক আরম্ভ হয় চরিত্রের বাক্যে। মধ্যযুগীয় বাংলা রচনা আরম্ভ হয় বন্দনা বা মঙ্গলাচরণে এবং শেষ হয় ভণিতায় যেখানে কবি স্বনাম উচ্চারণ করেন। চাকা-র সূচনা সেই রীতিতেই: “বেদনা সহমর্মিতার যুগল মন্থনে / দীর্ঘ পঞ্চদিবস রাত্রিতে এই ধবল রক্তিমাভ নাট্যকথামালা উদ্ভূত হল।” রচয়িতা রচনার অভ্যন্তরে উপস্থিত ফলে রচনার নির্মিতিপ্রক্রিয়া স্বীকৃত। বাস্তবতার ভ্রম সৃষ্টি করাই যেখানে লক্ষ্য নয় সেখানে ভ্রম ভাঙার আয়োজনও অপ্রয়োজনীয়।
অভিনয়রীতিতে দেখা যায় স্তানিস্লাভস্কি-উত্তর অভিনয়তত্ত্বে অভিনেতা চরিত্রের অভ্যন্তরে প্রবেশ করে সেখানেই অবস্থান করেন ফলে দর্শক বিস্মৃত হন যে সম্মুখে একজন অভিনেতা দণ্ডায়মান। বর্ণনাত্মক রীতিতে অভিনেতা একই দৃশ্যে কথক, চরিত্র ও ভাষ্যকার আবার কখনো নদীর বর্ণনা দিচ্ছেন, পরমুহূর্তে গাড়িয়াল হয়ে কথা বলছেন, পুনরায় সরে এসে ঘটনার উপর মন্তব্য করছেন। যাতায়াতে দর্শকের অবিশ্বাস-স্থগিতকরণ বারংবার ভঙ্গ হয় এবং তাই অভিপ্রেত। ব্রেখটের বিচ্ছিন্নকরণ-প্রভাবের সঙ্গে বাহ্যিক সাদৃশ্য আছে কিন্তু উৎস পৃথক। ব্রেখট এসেছেন রাজনৈতিক জাগরণের তাগিদ থেকে আর সেলিম আল দীন এসেছেন গায়েন ও অধিকারীর সহস্রাব্দপ্রাচীন অভ্যাস থেকে। বংশপরম্পরার পার্থক্য স্বীকার করাটাই বি-উপনিবেশায়নের কাজ।
সেলিম আল দীনের কীর্তনখোলা (১৯৮৬) নাটক নদীতীরের এক মেলার প্রেক্ষাপটে ভ্রাম্যমাণ যাত্রাদলের কাহিনি। সোনাই, বনশ্রীবালা, ছায়ারঞ্জন, ডালিমন, বশির, রুস্তম প্রান্তবাসী মানুষগুলির জীবিকা বদলায়, পরিচয় বদলায়। মেলার আলোকসজ্জার পার্শ্বেই দারিদ্র্য ও আত্মহননের অন্ধকার। নাটকটির আত্মপ্রতিফলনী গুণটি লক্ষণীয় যে, দেশজ পরিবেশনারীতির ক্ষয় নিয়ে রচনাটি শোক প্রকাশ করছে, সেই রীতিকেই সে নিজের আঙ্গিক হিসেবে গ্রহণ করেছে। মেলা এখানে পটভূমি নয়, গঠনতত্ত্ব। মেলার বহুস্বর, বিচ্ছিন্ন ঘটনাপুঞ্জ ও অকেন্দ্রিক বিন্যাস নাট্যের কাঠামোতেই সঞ্চারিত।
চাকা-য় কাজটি আরও সংহত। রচনা ১৯৯০, প্রথম প্রযোজনা ১৯৯১। কাহিনি সামান্য: এক গাড়িয়াল অজ্ঞাতপরিচয় শবদেহ নিয়ে গ্রাম হতে গ্রামান্তরে ঘোরে। মৃত মানুষটির স্বজন অন্বেষণ করে কিন্তু পায় না। উপরে বর্ণিত সব কয়টি সিদ্ধান্তই এখানে একযোগে ক্রিয়াশীল এবং সেগুলি বিষয়ের সঙ্গে অচ্ছেদ্য। শবদেহটির নাম নেই কারণ রাষ্ট্রীয় সহিংসতার নিহতদের নাম থাকে না। কাঠামোয় পরিসমাপ্তি নেই কারণ অন্বেষণের পরিসমাপ্তি নেই। কথক ও চরিত্র অভিন্ন কারণ শোকটি ব্যক্তিগত নয় সমষ্টির।
গঠনের একটি বিশদ দৃষ্টান্ত লক্ষণীয়। প্রথম লম্বকের সূচনায় কথক পাঠককে সম্বোধন করেন, পরিবেশ বর্ণনা করেন, ঋতু ও নদীর অবস্থান জানান। তৃতীয় তরঙ্গে সেই কথকই মিস্ত্রির সঙ্গে বাক্যালাপে প্রবৃত্ত হন। বর্ণনা থেকে সংলাপে উত্তরণের মুহূর্তে কোনো মঞ্চনির্দেশ নেই, উদ্ধৃতিচিহ্ন নেই, চরিত্রের নাম-লেবেল নেই। পাঠক নিজেই বুঝে নেন কণ্ঠস্বর বদলেছে। ইউরোপীয় নাট্যপাঠের মুদ্রণসংকেতগুলি অপসারিত হওয়ায় পাঠ্যটি পুনরায় শ্রুতিনির্ভর হয়ে ওঠে ফলে পড়ার পূর্বশর্ত হয়ে দাঁড়ায় শোনা। বি-উপনিবেশায়ন এখানে ঘোষণার বিষয় নয়, মুদ্রণপৃষ্ঠার আয়োজন। সময়টিও প্রাসঙ্গিক। ১৯৯০-৯১ বাংলাদেশে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের কাল। ইউরোপীয় ট্র্যাজেডির নায়ক উচ্চবংশীয়, তাঁর পতনে বিশ্বব্যবস্থা কম্পিত হয়। এখানে নায়ক অনামা, তাঁর মৃত্যুতে কিছুই কম্পিত হয় না এবং সেই নিস্পন্দতাই নাট্যের অভিযোগ।
পরবর্তী রচনাগুলিতে পদ্ধতিটি আরও বিস্তার পেয়েছে। হরগজ (১৯৯২) ঘূর্ণিঝড়-বিধ্বস্ত জনপদের কথা বলে। যৈবতী কন্যার মন (১৯৯৩) নারীর কামনা ও সামাজিক শাসনের সংঘাতকে মধ্যযুগীয় আখ্যানভঙ্গিতে ধারণ করে। হাতহদাই (১৯৯৭) উপকূলের জেলেজীবনকে কেন্দ্রে আনে। বনপাংশুল মান্দি জনগোষ্ঠীর ভূমি হারানোর ইতিহাস অবলম্বনে রচিত। নিমজ্জন (২০০২) বিশ্বজোড়া গণহত্যার স্মৃতি একত্র করে। যাঁরা ঔপনিবেশিক ও ঔপনিবেশোত্তর সাহিত্যে নিয়মিতভাবে পটভূমি হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছেন তাঁরা সেলিম আল দীনের রচনায় কাহিনির কেন্দ্রে এবং তাঁদের কথা কথিত হয়েছে এমন আঙ্গিকে যা তাঁদেরই সাংস্কৃতিক পরম্পরা থেকে উত্থিত।
নাট্যচিন্তার বি-উপনিবেশায়নের অর্থ ইউরোপ বর্জন নয়। অ্যারিস্টটল, ইবসেন কিংবা ব্রেখট পাঠ না করে বাংলা নাট্য অগ্রসর হবে, দাবিটি অবাস্তব ও অনাবশ্যক। অর্থটি ভিন্ন আর তা হলো ইউরোপকে একমাত্র মানদণ্ডের আসন থেকে অপসারণ। প্রশ্নটি “আমাদের নাটক ইউরোপীয় নাটকের অনুরূপ হলো কি না” নয়; প্রশ্নটি “আমাদের অভিজ্ঞতা প্রকাশের উপযুক্ত রূপ আমরা পেলাম কি না”।
সেলিম আল দীনের কাজ প্রশ্নটিকে বাংলাদেশের নাট্যচর্চার কেন্দ্রে এনেছে। তিনি প্রমাণ করেছেন যে মধ্যযুগীয় বাংলার আখ্যানরীতি জাদুঘরের দর্শনীয় বস্তু নয় সেখান থেকে বিংশ শতকের রাষ্ট্রীয় সহিংসতা, শ্রেণিবৈষম্য ও মানবিক নিঃসঙ্গতার কথা বলা সম্ভব। চাকা-র অনামা শবদেহ একাদশ শতকের তরঙ্গবিভাজনে ও পুঁথির যতিচিহ্নে বাহিত হয়েছে অথচ তা সম্পূর্ণ সমকালীন। রূপ ও বিষয়ের মিলনই সম্ভবত তাঁর বৃহত্তম যুক্তি। আবার ঐতিহ্য সেই মুহূর্তে জীবিত হয় যখন সে বর্তমানের ভার বহন করতে সক্ষম হয়।
চাকা ঘোরে, পথ ফুরায় না। বি-উপনিবেশায়নও তদ্রূপ শেষ হওয়ার নয়, চালিয়ে যাওয়ার।
.png)

কবিতা হলো দুনিয়া দেখার উপায়। যখন কোনো কবিতা থেকে চোখ তুলে দেখবেন আপনার চারপাশের দুনিয়াটাকে আর আগের মতো থাকে না। নতুন অর্থ নিয়ে দুনিয়া জেগে ওঠে। ভালো কবিতা বোঝার সবচেয়ে সহজ উপায় হলো কবিতাটা পড়ার পর যদি বুঝতে পারেন, এটা পড়ার পর আপনি আর আগের মানুষটি নেই, তবে তা নতুন কবিতা। এটা পড়ার পর যদি আপনার ম
২০ ঘণ্টা আগে
ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের হুগলি জেলার শ্রীরামপুর শহরটি ঐতিহাসিক ফ্রেডরিক নগর বা ‘দিনেমার নগর’ নামে পরিচিত। কলকাতার হাওড়া থেকে মাত্র ৫ রুপিতে লোকাল ট্রেনে টিকেট কেটে যাওয়া যায় গঙ্গা নদীর ধারঘেঁষা এই ঐতিহাসিক স্থানে। এখানেই রয়েছে ‘কেরি জাদুঘর’। উইলয়াম কেরির নিজের মুখের ভাষা বাংলা ছিল না, তবুও মানুষ
১৭ আগস্ট ২০২৬
প্রথম ইউরোপ ভ্রমণ শুরু হয়েছিল যুক্তরাজ্যের লিডস শহর থেকে, ২০২২ সালের মার্চে। শহরটি রাজধানী লন্ডন থেকে প্রায় তিন শ কিলোমিটার উত্তর-পশ্চিমে এয়ার নদীর তীরে। এটি উত্তর ইংল্যান্ডের একটি প্রধান অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্র। শহরের মূল কেন্দ্রের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে ব্রোঞ্জের নানারকম ভাস্কর্
১৬ আগস্ট ২০২৬
আইয়ুব বাচ্চুর কথা পড়লে আপনার মনের ক্যানভাসে প্রথমে ঠিক কী ভেসে ওঠে? সেই বিখ্যাত রুপালি গিটার? মঞ্চ কাঁপানো গিটার সলো? অনেকে হয়তো গুনগুন করে উঠবেন ‘চলো বদলে যাই’, ‘ফেরারী মন’ কিংবা ‘মাধবী’র মতো কোনো কালজয়ী সুরের চরণ। কিন্তু এই চেনা ছবিগুলোর ভিড়ে আমার স্মৃতির দরজায় সবার আগে কড়া নাড়ে একটি মাত্র শব্দ—