গাভী বিত্তান্ত: ৩১ বছর পরও কেন ক্ষমতার রাজনীতির সঙ্গে এত প্রাসঙ্গিক

কাজী নিশাত তাবাসসুম
কাজী নিশাত তাবাসসুম

এআই জেনারেটেড ছবি

আহমদ ছফার ৮৪তম জন্মদিন আজ। তাঁকে স্মরণ করতে গিয়ে বারবার ফিরে যাই আমার স্কুলজীবনের সেই দিনগুলোতে, যখন বই পড়ার আগ্রহটা কেবল গভীর হচ্ছে, নতুন নতুন লেখক আবিষ্কারের আনন্দে দিন কাটে।

ছফার সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয় তাঁর লেখা উপন্যনাস অর্ধেক নারী, অর্ধেক ঈশ্বরী বইয়ের মাধ্যমে। বইটির নামই আমাকে প্রথম মুগ্ধ করেছিল। নামের ভেতরে ছিল এক অদ্ভুত রহস্য, এক অজানা কৌতূহল, যা আমাকে বইটি খুলতে বাধ্য করেছিল। তখনও বুঝিনি, এই লেখক শুধু গল্প বলেন না, তিনি মানুষের মন, সমাজ আর সময়কে এমনভাবে পাঠ করেন, যা পাঠককে দীর্ঘদিন ভাবিয়ে রাখে।

এরপর পড়ি গাভীবিত্তান্ত । নাম দেখে প্রথমে মনে হয়েছিল, হয়ত গাভীকে ঘিরেই কোনো গল্প। কিন্তু পড়তে পড়তে উপলব্ধি করলাম, গাভী এখানে কেবল একটি উপলক্ষ। গাভীর আড়ালে তিনি এমন এক সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক বাস্তবতাকে ব্যঙ্গ, কৌতুক আর তীক্ষ্ণ পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে তুলে ধরেছেন, যা পাঠ শেষ হওয়ার পরও দীর্ঘসময় মনে থেকে যায়।

গাভীবিত্তান্ত প্রকাশের ৩১ বছর পরও সেই উপন্যাসের আয়নায় আমরা যেন আজকের সমাজকেই দেখি। চরিত্র বদলেছে, সময় বদলেছে, কিন্তু ক্ষমতার রূপ, তোষামোদ, সুবিধাবাদ আর প্রাতিষ্ঠানিক সংকটের অনেক চিত্র যেন একই রয়ে গেছে। মনে হয়, আহমদ ছফা শুধু তাঁর সময়কে লেখেননি, তিনি ভবিষ্যতের জন্যও দলিল রেখে গেছেন।

বইটি পড়লে মনে হয়, এটি যেন বর্তমান সময়ের কোনো বিশ্ববিদ্যালয় বা রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের গল্প। শিক্ষক নিয়োগে অনিয়ম, উপাচার্য নিয়োগকে ঘিরে রাজনৈতিক প্রভাব, ক্ষমতার অপব্যবহার, তোষামোদ, দলীয় আনুগত্য এবং যোগ্যতার অবমূল্যায়ন এসব বিষয় আজও আমাদের সমাজে বারবার আলোচনায় আসে।

উপন্যাসটির কেন্দ্রবিন্দু একটি বিশ্ববিদ্যালয়। এটি ক্ষমতার রাজনীতিতে আক্রান্ত যে কোনো প্রতিষ্ঠানের প্রতীক। এখানে দেখা যায়, একজন শিক্ষকের জ্ঞান, গবেষণা বা সততার চেয়ে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে তাঁর রাজনৈতিক অবস্থান, ব্যক্তিগত সম্পর্ক কিংবা ক্ষমতাবানদের প্রতি আনুগত্য। প্রশাসনিক পদগুলোও যেন যোগ্যতার নয়, আনুগত্যের পুরস্কারে পরিণত হয়। ফলে প্রতিষ্ঠানের মূল উদ্দেশ্য জ্ঞানচর্চা ও মুক্তবুদ্ধির বিকাশ ক্রমেই দুর্বল হয়ে পড়ে।

আহমদ ছফা তাঁর স্বভাবসুলভ ব্যঙ্গরসের মাধ্যমে দেখিয়েছেন, আবু জুনায়েদের মতো সহজ-সরল ব্যক্তি যখন একটি প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ পদে গিয়ে নৈতিকতা হারায়, তখন সেই সংকট শুধু একটি পদে সীমাবদ্ধ থাকে না, ধীরে ধীরে পুরো প্রতিষ্ঠানকে গ্রাস করে। উপাচার্য থেকে শুরু করে বিভাগীয় প্রধান, শিক্ষক নিয়োগ বোর্ড কিংবা প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত সবখানেই ব্যক্তিস্বার্থ ও ক্ষমতার হিসাব প্রাধান্য পায়। এই চিত্রটি কেবল বিশ্ববিদ্যালয়ের নয়, রাষ্ট্রের নানা প্রতিষ্ঠানেও আমরা একই ধরনের প্রবণতা দেখতে পাই।

আজকের বাংলাদেশে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষক নিয়োগ নিয়ে সময়ে সময়ে নানা বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। কোথাও স্বজনপ্রীতির অভিযোগ, কোথাও রাজনৈতিক পরিচয়কে অগ্রাধিকার দেওয়ার অভিযোগ, আবার কোথাও গবেষণা ও একাডেমিক যোগ্যতার চেয়ে প্রভাবশালী মহলের সুপারিশকে বেশি গুরুত্ব দেওয়ার সমালোচনা উঠেছে। শুধু বিশ্ববিদ্যালয় নয়, রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান, স্বায়ত্তশাসিত সংস্থা কিংবা বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক পদেও একই ধরনের প্রশ্ন বারবার সামনে এসেছে।

ক্ষমতার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ পদে রদবদল হওয়া গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু যখন সেই পরিবর্তনের প্রধান মানদণ্ড হয়ে দাঁড়ায় রাজনৈতিক আনুগত্য, তখন প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের ধারাবাহিকতা ও পেশাদারিত্ব হারাতে শুরু করে। একটি সরকারের আমলে যাঁরা গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকেন, সরকার পরিবর্তনের পর অনেক সময় তাঁদের সরিয়ে নতুন অনুগত্যদের বসানো হয়। ফলে প্রতিষ্ঠান ব্যক্তি ও দলের স্বার্থে পরিচালিত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়ে। গাভী বিত্তান্ত বহু আগেই এই প্রবণতার বিপদ সম্পর্কে সতর্ক করেছিল।

উপন্যাসটির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক উঠে এসেছে—‘মেধা বনাম আনুগত্যের দ্বন্দ্ব’। যে সমাজে মেধাবীরা বারবার উপেক্ষিত হন এবং অযোগ্যরা ক্ষমতার আশীর্বাদে গুরুত্বপূর্ণ পদে বসেন, সেখানে তরুণদের মধ্যেও হতাশা জন্ম নেয়। তারা বুঝতে শেখে পরিশ্রম বা যোগ্যতার চেয়ে ‘যোগাযোগ’ বেশি কার্যকর।

আহমদ ছফার উপন্যাসের চরিত্রগুলো কাল্পনিক হলেও তারা আমাদের চারপাশের পরিচিত মানুষদের প্রতিনিধিত্ব করে। তাই গাভী বিত্তান্ত পড়তে গিয়ে পাঠক প্রায়ই বাস্তবের সঙ্গে মিল খুঁজে পান। এই মিলই উপন্যাসটির স্থায়ী শক্তি।

সাহিত্যের কাজই হলো সমাজকে প্রশ্ন করতে শেখানো। গাভী বিত্তান্ত পাঠককে ভাবতে বাধ্য করে, যোগ্যতার মূল্য যদি কমে যায়, তবে একটি বিশ্ববিদ্যালয় কি সত্যিই বিশ্ববিদ্যালয় থাকে? প্রশাসন যদি দলীয় আনুগত্যে পরিচালিত হয়, তবে রাষ্ট্র কতটা কার্যকর হতে পারে? আর প্রতিষ্ঠান যদি নৈতিক নেতৃত্ব হারায়, তবে তার ভবিষ্যৎ কোথায়?

গাভী বিত্তান্ত আমাদের মনে করিয়ে দেয়, প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী করতে হলে ব্যক্তি নয়, নীতি, যোগ্যতা, সততা এসবকেই প্রাধান্য দিতে হবে। নইলে সময় বদলাবে, সরকার বদলাবে, ক্ষমতার পালাবদল হবে, কিন্তু প্রতিষ্ঠানের সংকট একই থেকে যাবে।

এই কারণেই তিন দশকের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও গাভী বিত্তান্ত কেবল একটি উপন্যাস নয় এটি আমাদের সমাজ, রাষ্ট্র এবং প্রাতিষ্ঠানিক জীবনের সামনে ধরা এক নির্মম আয়না। আর সেই আয়নায় আমরা আজও নিজেদের স্পষ্ট দেখতে পাই।

Ad 300x250

সম্পর্কিত