মাসুদ পারভেজ

সাহিত্যচর্চার মাধ্যমে বাংলা ভাষাকে বৈশ্বিক পরিচয় প্রদানের ক্ষেত্রে রবীন্দ্রনাথের ভূমিকাকে অস্বীকার করার উপায় নেই–ইতিহাস অন্তত সে কথাই বলে।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বিবিধ পরিচয় নিয়ে বাংলা শিল্পসাহিত্য ও সংস্কৃতির জগতে এক অনন্য নজির হয়ে আছেন। তাঁর নিজস্ব সৃষ্টি যেমন তাঁর পরিচয়ের স্মারক, তেমনি তাঁর সৃষ্টিকর্ম থেকেও অনেক শিল্প নির্মিত হয়েছে। তার মধ্যে চলচ্চিত্র অন্যতম।
মূলত রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কথাসাহিত্য অর্থাৎ ছোটগল্প ও উপন্যাস থেকে চলচ্চিত্র নির্মিত হওয়ার সংখ্যা বেশি। তবে তাঁর নাটক থেকেও চলচ্চিত্র নির্মাণ করা হয়েছে। যেহেতু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বাংলা ভাষার লেখক তাই এই ভাষাতেই চলচ্চিত্র নির্মাণের আধিক্য লক্ষ করা যায়। এখানে একটি বিষয় খেয়াল করা যায় যে, রবীন্দ্রনাথ যেহেতু অবিভক্ত ভারতের সাহিত্যিক ছিলেন এবং তাঁর মৃত্যু হয়েছে ভারত স্বাধীনের পূর্বে তাই তিনি ভারত, পাকিস্তান কিংবা বাংলাদেশের লেখক না হয়ে সর্বভারতীয় লেখক হয়েছেন। মৃত্যুর পর তাঁর নামের সঙ্গে স্বাধীন ভারতীয় পরিচয় লিপিবদ্ধ হয়েছে।
১৯৪৭-পরবর্তী সময়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভারতীয় পরিচয় দুই ধরনের জটিলতা তৈরি করেছে। প্রথমত, তাঁর ধর্মীয় পরিচয় ও দ্বিতীয়ত, তাঁর জাতীয়তার পরিচয়। এই পরিচয়ের জন্য রবীন্দ্রনাথকে বারবার খণ্ডিত করার হীন চেষ্টা করা হয়েছে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, পাকিস্তান আমলে রবীন্দ্রনাথ বড়ো নাকি ইকবাল বড়ো, বাংলাদেশ পর্বে মুসলমানের নজরুল বনাম হিন্দুর রবীন্দ্রনাথ। এইসব বিষয় ও কুতর্ক বুদ্ধিবৃত্তিক জগতে যদিও কোনো অর্থ তৈরি করে না তবু এর একধরনের সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রভাব আছে। তখন প্রশ্ন তৈরি হয়, সামাজিক ও রাজনৈতিক এই প্রভাব কাদের জন্য এবং কারা এর প্রচারণা চালায়?
ঐতিহাসিকভাবে লক্ষ করা যায়, পাকিস্তান পর্বে রবীন্দ্রনাথকে সরকারিভাবে নিষিদ্ধ ও অস্বীকার করার যে ঘটনা তা কোনো নিছক ঘটনা নয়। এর সঙ্গে ধর্মভিত্তিক জাতীয়তাবাদী রাজনীতি যেমন আছে, তেমন আছে বাঙালি সংস্কৃতিকে অস্বীকার করার প্রবণতা। বাঙালি সংস্কৃতির সঙ্গে তা তাঁর সম্পৃক্তি প্রসঙ্গে প্রশ্ন আসে, কোন বাঙালি, কলকাতার নাকি বাংলাদেশের? অর্থাৎ হিন্দু বাঙালি নাকি মুসলমান বাঙালি। এরকম একটি প্রশ্ন রবীন্দ্রনাথকে খণ্ডিত করেছে। যার ফল লক্ষ করা যায়, বাংলাদেশের চলচ্চিত্র অঙ্গনে।
বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে রবীন্দ্র সাহিত্যের উপস্থিতি নেই বললেই চলে। এর কারণ কী? এবার এই বিষয়ের খোঁজ করা যাক।
রবীন্দ্র সাহিত্য থেকে চলচ্চিত্রায়ন বেশ পুরনো দিনের ঘটনা। ঠাকুরের ‘মানভঞ্জন’ নামক ছোটোগল্প অবলম্বনে ১৯২৩ সালে নির্বাক চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন নরেশচন্দ্র মিত্র। এটি রবীন্দ্র সাহিত্যের প্রথম চলচ্চিত্রায়ন। এই গল্প অবলম্বনে ১৯৩০ সালে ‘গিরিবালা’ নামক চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন মধু বসু। এটিও নির্বাক চলচ্চিত্র।
এরপর ১৯৪৭ সালে এই একই গল্প থেকে হিন্দি ভাষায় সবাক চলচ্চিত্র বানান মধু বসু। এই সময়ে খেয়াল করলে দেখা যায় যে, যখন রবীন্দ্রসাহিত্য থেকে চলচ্চিত্র নির্মাণ শুরু হয়েছে তখন বাংলাদেশে অর্থাৎ তৎকালীন পূর্ববঙ্গে চলচ্চিত্র নির্মাণ শুরু হয়নি। ১৯৪৭ সালে ইংরেজ ঔপনিবেশিক শাসন থেকে মুক্তি ও দেশ ভাগের পর ১৯৫৬ সালে বাংলাদেশে (পূর্ব পাকিস্তান) প্রথম চলচ্চিত্র ‘মুখ ও মুখোশ’ নির্মিত হয়। ফলে সময়ের হিসেবে বলা যায়, যখন থেকে বাংলাদেশে বাংলা ভাষার চলচ্চিত্র নির্মাণ শুরু হয়েছে তারও অনেক আগে রবীন্দ্রসাহিত্য অবলম্বনে চলচ্চিত্র নির্মাণ করা হয়।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জীবদ্দশায় তাঁর সাহিত্য অবলম্বনে ‘মানভঞ্জন’ (১৯২৩), ‘বিসর্জন (১৯২৮), ‘বিচারক’ (১৯২৮), ‘দালিয়া’ (১৯৩০), ‘নৌকাডুবি’ (১৯৩২), ‘নটীর পূজা’ (১৯৩২), ‘চিরকুমার সভা’ (১৯৩২), ‘গোরা’ (১৯৩৮), ‘চোখের বালি’ (১৯৩৮) চলচ্চিত্র নির্মিত হয়। এটা গেল ঔপনিবেশিক কালের ঘটনা।
স্বাধীন ভারতে রবীন্দ্র সাহিত্য থেকে চলচ্চিত্র নির্মাণের ক্ষেত্রে তপন সিংহ, সত্যজিৎ রায়, ঋতুপর্ণ ঘোষ গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব। তপন সিংহ ও সত্যজিৎ রায় গত শতাব্দীর ষাটের দশকে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সাহিত্য অবলম্বনে চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন। সেই সময় বাংলাদেশ স্বাধীন রাষ্ট্র না হলেও বাংলা ভাষায় চলচ্চিত্র নির্মিত হয়। ওই সময়ে এই অঞ্চলের সাংস্কৃতিক রাজনীতিতে একটি গুরুতর ঘটনা ঘটে, তা হলো সরকারিভাবে রবীন্দ্রনাথকে নিষিদ্ধ করার পাঁয়তারা। অর্থাৎ রবীন্দ্র সাহিত্য, সংগীতের ওপর একধরনের নিষেধাজ্ঞা।
ব্যাপারটা খেয়াল করা দরকার, যে সময়ে কেবল বাংলা চলচ্চিত্র হাঁটি হাঁটি পা পা করছে সেই সময়ে রবীন্দ্রনাথকে নিষিদ্ধের ফরমান জারি করা হয়েছে। ফলে নির্মাতারা হযতোবা রবীন্দ্রনাথ বিষয়ে ঝুঁকি নিতে চায়নি। কিন্তু এই ফরমানের বিপরীতে রবীন্দ্র শিল্পসাহিত্য চর্চা ঠিকই চলতে থাকে। তখন প্রশ্ন তৈরি হয়, রবীন্দ্র শিল্পসাহিত্যের ভোক্তা কারা? এটা কি নির্দিষ্ট বৃত্তের মধ্যে আবদ্ধ? এই রবীন্দ্র বলয়ের বাইরে কারা অবস্থান করছে? তাদের অবস্থান কি অচেতন নাকি প্রতিক্রিয়া?
ধরা যাক, ষাটের দশকে রবীন্দ্রসাহিত্য থেকে চলচ্চিত্র নির্মাণ না করা কোনো একটা রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়ার ফল। কারণ এই সময়ে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘পদ্মা নদীর মাঝি’ উপন্যাস অবলম্বনে ‘জাগো হুয়া সাভেরা’ (১৯৫৯) নামক উর্দুভাষার চলচ্চিত্র নির্মিত হয়। ফলে সাহিত্য থেকে চলচ্চিত্র নির্মাণের ক্ষেত্রে সমস্যা নয়। সমস্যাটি হলো রবীন্দ্রসাহিত্য থেকে চলচ্চিত্র নির্মাণের ক্ষেত্রে। কারণ ষাটের দশকে জহির রায়হান, খান আতার মতো নির্মাতারা চলচ্চিত্র নির্মাণের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তখন প্রশ্ন জাগে, রবীন্দ্রনাথের ধর্মীয় পরিচয় কারণেই এই কি সমস্যা?
ব্যাপারটিকে একবাক্যে স্বীকার করাও যাবে না, আবার অস্বীকারও করা যাবে না। কারণ হিন্দু পুরাণ ও ‘মনসামঙ্গল কাব্য’ অবলম্বনে জহির রায়হান ১৯৬৬ সালে ‘বেহুলা’ চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন–যা দর্শক নন্দিত ও ব্যবসা সফল হয়। যদি হিন্দু বিদ্বেষের কারণে রবীন্দ্র সাহিত্যের চলচ্চিত্রায়ন না হয় তবে ‘বেহুলা’র ক্ষেত্রেও তেমনটি ঘটতো। কিন্তু তেমনটি হয়নি। আর তাই রবীন্দ্রনাথ এখানে যতটা না ধর্মীয় বাইনারি তার চেয়ে বেশি রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ। কারণ সে সময় ভাষাভিত্তিক জাতীয়তাবাদী আত্মপরিচয় নির্মাণের যে ঝোঁক পূর্ব পাকিস্তানের মধ্যবিত্ত বাঙালির ওপর ভর করে তার কেন্দ্রমূল হলো রবীন্দ্রনাথ। তার চেয়ে বড় আইকন বাংলা ভাষী কিংবা বাঙালির মধ্যে আর কে ছিল?
ফলে খুব সঙ্গত কারণে পাকিস্তান সরকার রবীন্দ্রনাথকে বর্জনের আহ্বান জানায়। কারণ রবীন্দ্রনাথ এখানে জাতীয় চেতনা উন্মেষের প্রতীক হিসেবে পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালির মনে ক্রিয়া করে। যার প্রমাণ পাওয়া যায়, জহির রায়হানের ‘জীবন থেকে নেয়া’ (১৯৭০) চলচ্চিত্রে ‘আমার সোনার বাংলা’ গানটিকে ব্যবহার করার মধ্য দিয়ে।
উনসত্তরের গণ আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে নির্মিত এই চলচ্চিত্রে রবীন্দ্রনাথকে হাজির করছেন জহির রায়হান। কেন তিনি ‘আমার সোনার বাংলা’ গানটিকে চলচ্চিত্রে ব্যবহার করলেন? তখনও তো বাংলাদেশ স্বাধীন রাষ্ট্র হয়নি এবং এটা জাতীয় সংগীতের মর্যাদাও পায়নি। এখানেই ঘটে গেল ঘটনা। এই চলচ্চিত্রের যারা দর্শক তারা সবাই এক গানটির সঙ্গে পরিচিত হলো। হতে পারে তারা নিম্নজীবী নিরক্ষর যাদের রবীন্দ্র সংগীতের শ্রোতা হওয়ার পরিস্থিতি নেই, কিন্তু ঠিকই দেশাত্মবোধক চেতনায় উজ্জীবিত হলো। বাঙালি জাতীয় চেতনা সৃষ্টির ক্ষেত্রে রবীন্দ্র সংগীত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায় আনা হলো।
অপরপক্ষে যারা রবীন্দ্রবিরোধীরা এই কারণেই রবীন্দ্রনাথকে বয়কট করার পক্ষে থাকলো। তখন প্রশ্ন আসে, পাকিস্তান-উত্তর স্বাধীন বাংলাদেশেও কেন রবীন্দ্রসাহিত্যভিত্তিক চলচ্চিত্র পাওয়া গেল না? সত্তর দশকের ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক চলচ্চিত্র নির্মাণের ধারা লক্ষ করা যায়। পঁচাত্তর পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক ক্ষমতার পালা বদল ও সামরিক শাসনের ফলে বাংলাদেশের শিল্প সাহিত্য অঙ্গনেও এর প্রভাব পড়ে। এই পরিপ্রেক্ষিতে লক্ষ করা যায়, ইসলামি ও আরবীয় লোককাহিনিভিত্তিক চলচ্চিত্র নির্মাণের একটি ধারা। তখন চলচ্চিত্রে রবীন্দ্রনাথকে বর্জনের চিত্র পাওয়া যায়। কিন্তু এতে রবীন্দ্রনাথের ধর্মীয় পরিচয় কিন্তু ফ্যাক্ট হয়ে ওঠে না। কারণ প্রায় একই সময়ে শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের সাহিত্য অবলম্বনে ‘দেবদাস’ (১৯৮২), ‘কাশীনাথ’ অবলম্বনে ‘বড় বাড়ির মেয়ে’ (১৯৮৩), ‘রামের সুমতি’ (১৯৮৫), ‘শুভদা’ (১৯৮৬), ‘শ্রীকান্ত’ (১৯৮৭), ‘স্বামী’ (১৯৮৭) ও ‘বিরাজ বৌ’ (১৯৮৮) নির্মিত হয়।
পুরো আশির দশকজুড়ে বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে আরবীয় আখ্যান ও লোককাহিনির পাশাপাশি শরৎ সাহিত্য থেকে চলচ্চিত্র নির্মাণের প্রেক্ষাপট লক্ষ করা যায়। কিন্তু রবীন্দ্রসাহিত্য নেই! তবে বাংলাদেশের শিল্পকলার অন্যান্য অঙ্গন যেমন থিয়েটার, সংগীত কিংবা নৃত্যে কিন্তু ঠিকই রবীন্দ্রনাথ প্রভাবের সঙ্গে বিরাজ করে। এর কারণ কী?
ভারতীয় চলচ্চিত্রে তপন সিংহ কিংবা সত্যজিৎ রায় ষাটের দশকে রবীন্দ্রসাহিত্য থেকে চলচ্চিত্র নির্মাণের যে ধারা তৈরি করেন তা বাংলাদেশে একদম নেই বললেই চলে। এফডিসির নির্মাতারা তো এদিকে হাঁটলেন না এমনকি স্বাধীন ধারার নির্মাতারাও সেদিকে দৃষ্টি ফেরাননি। তবে কলকাতার চলচ্চিত্রে পুনরায় রবীন্দ্রনাথের আগমন ঘটল ঋতুপর্ণ ঘোষের হাত ধরে। তখন বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের ক্ষেত্রে চাষী নজরুল ইসলাম রবীন্দ্র সাহিত্য থেকে নির্মাণ করেন ‘শাস্তি’ (২০০৪) ও ‘সুভা’ (২০০৬) চলচ্চিত্র। যদিও সত্তর ও আশির দশকে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘নৌকাডুবি’র ছায়া অবলম্বনে সাইফুল আজম কাসেম ‘সোহাগ’ ও ‘ক্ষুধিত পাষাণ’ অবলম্বনে কাজী হায়াৎ ‘রাজবাড়ী’ (১৯৮৪) চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন, কিন্তু তারা কোথাও রবীন্দ্রনাথের নাম ব্যবহার করেননি। এটা কি রবীন্দ্রবিরোধিতার রাজনীতি থেকে নিজেদের বাঁচাতে তারা এই পন্থা অবলম্বন করেন নাকি অন্যকিছু?
চাষী নজরুল ইসলামের পর বাংলাদেশে নির্মাতা কাজী হায়াৎ ২০০৬ সালে তৈরি করেন ‘কাবুলিওয়ালা’ চলচ্চিত্র। এরপর নার্গিস আক্তার ‘সমাপ্তি’ অবলম্বনে নির্মাণ করেন ‘অবুঝ বউ’ (২০১০)। মোটাদাগে বাংলাদেশে রবীন্দ্রসাহিত্যে থেকে নির্মিত চলচ্চিত্র এগুলোই। রবীন্দ্রসংগীত, সাহিত্য, নাটক ইত্যাদি বাংলাদেশে পাঠক ও দর্শকপ্রিয়তা পেলেও তার সাহিত্য থেকে চলচ্চিত্র সেভাবে নির্মিত হলো না কেন?
এ প্রসঙ্গে বলা যায়, বাঙালি শহুরে মধ্যবিত্ত যে প্রক্রিয়ায় রবীন্দ্রচর্চা করে কিংবা রবীন্দ্রনাথের ভোক্তা হয় তারা বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের দর্শক হয়ে ওঠেনি। ফলে রবীন্দ্র সাহিত্যের চলচ্চিত্রায়ন নিয়ে বাংলাদেশের সাধারণ চলচ্চিত্রমোদী দর্শকদের কাছে পৌঁছানোর চিন্তা ও চেষ্টা কোনওটাই এফডিসির নির্মাতার করেননি। তখন খোঁজ করা দরকার, রবীন্দ্রনাথের যে সাহিত্য থেকে ‘সুভা’, ‘শাস্তি’ ও ‘কাবুলিওয়ালা’ নির্মিত হলো সেগুলো কেন করা হলো? অর্থাৎ বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই আখ্যানগুলোকে নির্মাতারা কেন প্রাসঙ্গিক মনে করলেন? ধরা যাক, ‘শাস্তি’ গল্পটির কথা।
এই গল্পের গ্রামীণ কৃষক প্রজা ও জমিদারের পারস্পরিক চিত্র বাংলাদেশের (পূর্ববঙ্গ) মানুষের কাছে তার নিজের জীবনের বাস্তবতার চিত্রকে হাজির করতে পারে; পরিবারে নারীকেন্দ্রিক দ্বন্দ্ব বাংলাদেশের গ্রামীণ যৌথ পরিবারের চিত্রকে উপস্থাপন করে তাদের মনোজগতে প্রভাব ফেলতে পারে; পুরুষের আধিপত্যবাদী মনোভাবকে দেখাতে পারে।
যদিও ‘শাস্তি’ গল্পটির কাহিনি ঔপনিবেশিক কালের তবে স্বাধীন বাংলাদেশের নারীদের ক্ষেত্রেও তা এখনও প্রাসঙ্গিক। হয়তোবা চাষী নজরুল ইসলাম এই বিষয়টিকে প্রাধান্য দিতে চেয়েছেন। যদিও এই গল্পে চন্দরার মনস্তত্ত্ব একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। আর এখানেই বিষয়টি খোলাসা হয় এভাবে—ঋতুপর্ণ ঘোষ রবীন্দ্রসাহিত্যের চলচ্চিত্রায়নে মনস্তাত্ত্বিক বিষয়কে যেভাবে প্রাধান্য দিয়েছেন, বাংলাদেশের চলচ্চিত্র নির্মাতারা হয়তোবা সেভাবে ভাবেননি। যার ফলে রবীন্দ্রসাহিত্য বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে আজও অধরা। এই বাইরে রবীন্দ্রবিরোধী রাজনৈতিক বলয় তো আছেই!

সাহিত্যচর্চার মাধ্যমে বাংলা ভাষাকে বৈশ্বিক পরিচয় প্রদানের ক্ষেত্রে রবীন্দ্রনাথের ভূমিকাকে অস্বীকার করার উপায় নেই–ইতিহাস অন্তত সে কথাই বলে।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বিবিধ পরিচয় নিয়ে বাংলা শিল্পসাহিত্য ও সংস্কৃতির জগতে এক অনন্য নজির হয়ে আছেন। তাঁর নিজস্ব সৃষ্টি যেমন তাঁর পরিচয়ের স্মারক, তেমনি তাঁর সৃষ্টিকর্ম থেকেও অনেক শিল্প নির্মিত হয়েছে। তার মধ্যে চলচ্চিত্র অন্যতম।
মূলত রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কথাসাহিত্য অর্থাৎ ছোটগল্প ও উপন্যাস থেকে চলচ্চিত্র নির্মিত হওয়ার সংখ্যা বেশি। তবে তাঁর নাটক থেকেও চলচ্চিত্র নির্মাণ করা হয়েছে। যেহেতু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বাংলা ভাষার লেখক তাই এই ভাষাতেই চলচ্চিত্র নির্মাণের আধিক্য লক্ষ করা যায়। এখানে একটি বিষয় খেয়াল করা যায় যে, রবীন্দ্রনাথ যেহেতু অবিভক্ত ভারতের সাহিত্যিক ছিলেন এবং তাঁর মৃত্যু হয়েছে ভারত স্বাধীনের পূর্বে তাই তিনি ভারত, পাকিস্তান কিংবা বাংলাদেশের লেখক না হয়ে সর্বভারতীয় লেখক হয়েছেন। মৃত্যুর পর তাঁর নামের সঙ্গে স্বাধীন ভারতীয় পরিচয় লিপিবদ্ধ হয়েছে।
১৯৪৭-পরবর্তী সময়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভারতীয় পরিচয় দুই ধরনের জটিলতা তৈরি করেছে। প্রথমত, তাঁর ধর্মীয় পরিচয় ও দ্বিতীয়ত, তাঁর জাতীয়তার পরিচয়। এই পরিচয়ের জন্য রবীন্দ্রনাথকে বারবার খণ্ডিত করার হীন চেষ্টা করা হয়েছে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, পাকিস্তান আমলে রবীন্দ্রনাথ বড়ো নাকি ইকবাল বড়ো, বাংলাদেশ পর্বে মুসলমানের নজরুল বনাম হিন্দুর রবীন্দ্রনাথ। এইসব বিষয় ও কুতর্ক বুদ্ধিবৃত্তিক জগতে যদিও কোনো অর্থ তৈরি করে না তবু এর একধরনের সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রভাব আছে। তখন প্রশ্ন তৈরি হয়, সামাজিক ও রাজনৈতিক এই প্রভাব কাদের জন্য এবং কারা এর প্রচারণা চালায়?
ঐতিহাসিকভাবে লক্ষ করা যায়, পাকিস্তান পর্বে রবীন্দ্রনাথকে সরকারিভাবে নিষিদ্ধ ও অস্বীকার করার যে ঘটনা তা কোনো নিছক ঘটনা নয়। এর সঙ্গে ধর্মভিত্তিক জাতীয়তাবাদী রাজনীতি যেমন আছে, তেমন আছে বাঙালি সংস্কৃতিকে অস্বীকার করার প্রবণতা। বাঙালি সংস্কৃতির সঙ্গে তা তাঁর সম্পৃক্তি প্রসঙ্গে প্রশ্ন আসে, কোন বাঙালি, কলকাতার নাকি বাংলাদেশের? অর্থাৎ হিন্দু বাঙালি নাকি মুসলমান বাঙালি। এরকম একটি প্রশ্ন রবীন্দ্রনাথকে খণ্ডিত করেছে। যার ফল লক্ষ করা যায়, বাংলাদেশের চলচ্চিত্র অঙ্গনে।
বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে রবীন্দ্র সাহিত্যের উপস্থিতি নেই বললেই চলে। এর কারণ কী? এবার এই বিষয়ের খোঁজ করা যাক।
রবীন্দ্র সাহিত্য থেকে চলচ্চিত্রায়ন বেশ পুরনো দিনের ঘটনা। ঠাকুরের ‘মানভঞ্জন’ নামক ছোটোগল্প অবলম্বনে ১৯২৩ সালে নির্বাক চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন নরেশচন্দ্র মিত্র। এটি রবীন্দ্র সাহিত্যের প্রথম চলচ্চিত্রায়ন। এই গল্প অবলম্বনে ১৯৩০ সালে ‘গিরিবালা’ নামক চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন মধু বসু। এটিও নির্বাক চলচ্চিত্র।
এরপর ১৯৪৭ সালে এই একই গল্প থেকে হিন্দি ভাষায় সবাক চলচ্চিত্র বানান মধু বসু। এই সময়ে খেয়াল করলে দেখা যায় যে, যখন রবীন্দ্রসাহিত্য থেকে চলচ্চিত্র নির্মাণ শুরু হয়েছে তখন বাংলাদেশে অর্থাৎ তৎকালীন পূর্ববঙ্গে চলচ্চিত্র নির্মাণ শুরু হয়নি। ১৯৪৭ সালে ইংরেজ ঔপনিবেশিক শাসন থেকে মুক্তি ও দেশ ভাগের পর ১৯৫৬ সালে বাংলাদেশে (পূর্ব পাকিস্তান) প্রথম চলচ্চিত্র ‘মুখ ও মুখোশ’ নির্মিত হয়। ফলে সময়ের হিসেবে বলা যায়, যখন থেকে বাংলাদেশে বাংলা ভাষার চলচ্চিত্র নির্মাণ শুরু হয়েছে তারও অনেক আগে রবীন্দ্রসাহিত্য অবলম্বনে চলচ্চিত্র নির্মাণ করা হয়।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জীবদ্দশায় তাঁর সাহিত্য অবলম্বনে ‘মানভঞ্জন’ (১৯২৩), ‘বিসর্জন (১৯২৮), ‘বিচারক’ (১৯২৮), ‘দালিয়া’ (১৯৩০), ‘নৌকাডুবি’ (১৯৩২), ‘নটীর পূজা’ (১৯৩২), ‘চিরকুমার সভা’ (১৯৩২), ‘গোরা’ (১৯৩৮), ‘চোখের বালি’ (১৯৩৮) চলচ্চিত্র নির্মিত হয়। এটা গেল ঔপনিবেশিক কালের ঘটনা।
স্বাধীন ভারতে রবীন্দ্র সাহিত্য থেকে চলচ্চিত্র নির্মাণের ক্ষেত্রে তপন সিংহ, সত্যজিৎ রায়, ঋতুপর্ণ ঘোষ গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব। তপন সিংহ ও সত্যজিৎ রায় গত শতাব্দীর ষাটের দশকে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সাহিত্য অবলম্বনে চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন। সেই সময় বাংলাদেশ স্বাধীন রাষ্ট্র না হলেও বাংলা ভাষায় চলচ্চিত্র নির্মিত হয়। ওই সময়ে এই অঞ্চলের সাংস্কৃতিক রাজনীতিতে একটি গুরুতর ঘটনা ঘটে, তা হলো সরকারিভাবে রবীন্দ্রনাথকে নিষিদ্ধ করার পাঁয়তারা। অর্থাৎ রবীন্দ্র সাহিত্য, সংগীতের ওপর একধরনের নিষেধাজ্ঞা।
ব্যাপারটা খেয়াল করা দরকার, যে সময়ে কেবল বাংলা চলচ্চিত্র হাঁটি হাঁটি পা পা করছে সেই সময়ে রবীন্দ্রনাথকে নিষিদ্ধের ফরমান জারি করা হয়েছে। ফলে নির্মাতারা হযতোবা রবীন্দ্রনাথ বিষয়ে ঝুঁকি নিতে চায়নি। কিন্তু এই ফরমানের বিপরীতে রবীন্দ্র শিল্পসাহিত্য চর্চা ঠিকই চলতে থাকে। তখন প্রশ্ন তৈরি হয়, রবীন্দ্র শিল্পসাহিত্যের ভোক্তা কারা? এটা কি নির্দিষ্ট বৃত্তের মধ্যে আবদ্ধ? এই রবীন্দ্র বলয়ের বাইরে কারা অবস্থান করছে? তাদের অবস্থান কি অচেতন নাকি প্রতিক্রিয়া?
ধরা যাক, ষাটের দশকে রবীন্দ্রসাহিত্য থেকে চলচ্চিত্র নির্মাণ না করা কোনো একটা রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়ার ফল। কারণ এই সময়ে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘পদ্মা নদীর মাঝি’ উপন্যাস অবলম্বনে ‘জাগো হুয়া সাভেরা’ (১৯৫৯) নামক উর্দুভাষার চলচ্চিত্র নির্মিত হয়। ফলে সাহিত্য থেকে চলচ্চিত্র নির্মাণের ক্ষেত্রে সমস্যা নয়। সমস্যাটি হলো রবীন্দ্রসাহিত্য থেকে চলচ্চিত্র নির্মাণের ক্ষেত্রে। কারণ ষাটের দশকে জহির রায়হান, খান আতার মতো নির্মাতারা চলচ্চিত্র নির্মাণের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তখন প্রশ্ন জাগে, রবীন্দ্রনাথের ধর্মীয় পরিচয় কারণেই এই কি সমস্যা?
ব্যাপারটিকে একবাক্যে স্বীকার করাও যাবে না, আবার অস্বীকারও করা যাবে না। কারণ হিন্দু পুরাণ ও ‘মনসামঙ্গল কাব্য’ অবলম্বনে জহির রায়হান ১৯৬৬ সালে ‘বেহুলা’ চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন–যা দর্শক নন্দিত ও ব্যবসা সফল হয়। যদি হিন্দু বিদ্বেষের কারণে রবীন্দ্র সাহিত্যের চলচ্চিত্রায়ন না হয় তবে ‘বেহুলা’র ক্ষেত্রেও তেমনটি ঘটতো। কিন্তু তেমনটি হয়নি। আর তাই রবীন্দ্রনাথ এখানে যতটা না ধর্মীয় বাইনারি তার চেয়ে বেশি রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ। কারণ সে সময় ভাষাভিত্তিক জাতীয়তাবাদী আত্মপরিচয় নির্মাণের যে ঝোঁক পূর্ব পাকিস্তানের মধ্যবিত্ত বাঙালির ওপর ভর করে তার কেন্দ্রমূল হলো রবীন্দ্রনাথ। তার চেয়ে বড় আইকন বাংলা ভাষী কিংবা বাঙালির মধ্যে আর কে ছিল?
ফলে খুব সঙ্গত কারণে পাকিস্তান সরকার রবীন্দ্রনাথকে বর্জনের আহ্বান জানায়। কারণ রবীন্দ্রনাথ এখানে জাতীয় চেতনা উন্মেষের প্রতীক হিসেবে পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালির মনে ক্রিয়া করে। যার প্রমাণ পাওয়া যায়, জহির রায়হানের ‘জীবন থেকে নেয়া’ (১৯৭০) চলচ্চিত্রে ‘আমার সোনার বাংলা’ গানটিকে ব্যবহার করার মধ্য দিয়ে।
উনসত্তরের গণ আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে নির্মিত এই চলচ্চিত্রে রবীন্দ্রনাথকে হাজির করছেন জহির রায়হান। কেন তিনি ‘আমার সোনার বাংলা’ গানটিকে চলচ্চিত্রে ব্যবহার করলেন? তখনও তো বাংলাদেশ স্বাধীন রাষ্ট্র হয়নি এবং এটা জাতীয় সংগীতের মর্যাদাও পায়নি। এখানেই ঘটে গেল ঘটনা। এই চলচ্চিত্রের যারা দর্শক তারা সবাই এক গানটির সঙ্গে পরিচিত হলো। হতে পারে তারা নিম্নজীবী নিরক্ষর যাদের রবীন্দ্র সংগীতের শ্রোতা হওয়ার পরিস্থিতি নেই, কিন্তু ঠিকই দেশাত্মবোধক চেতনায় উজ্জীবিত হলো। বাঙালি জাতীয় চেতনা সৃষ্টির ক্ষেত্রে রবীন্দ্র সংগীত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায় আনা হলো।
অপরপক্ষে যারা রবীন্দ্রবিরোধীরা এই কারণেই রবীন্দ্রনাথকে বয়কট করার পক্ষে থাকলো। তখন প্রশ্ন আসে, পাকিস্তান-উত্তর স্বাধীন বাংলাদেশেও কেন রবীন্দ্রসাহিত্যভিত্তিক চলচ্চিত্র পাওয়া গেল না? সত্তর দশকের ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক চলচ্চিত্র নির্মাণের ধারা লক্ষ করা যায়। পঁচাত্তর পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক ক্ষমতার পালা বদল ও সামরিক শাসনের ফলে বাংলাদেশের শিল্প সাহিত্য অঙ্গনেও এর প্রভাব পড়ে। এই পরিপ্রেক্ষিতে লক্ষ করা যায়, ইসলামি ও আরবীয় লোককাহিনিভিত্তিক চলচ্চিত্র নির্মাণের একটি ধারা। তখন চলচ্চিত্রে রবীন্দ্রনাথকে বর্জনের চিত্র পাওয়া যায়। কিন্তু এতে রবীন্দ্রনাথের ধর্মীয় পরিচয় কিন্তু ফ্যাক্ট হয়ে ওঠে না। কারণ প্রায় একই সময়ে শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের সাহিত্য অবলম্বনে ‘দেবদাস’ (১৯৮২), ‘কাশীনাথ’ অবলম্বনে ‘বড় বাড়ির মেয়ে’ (১৯৮৩), ‘রামের সুমতি’ (১৯৮৫), ‘শুভদা’ (১৯৮৬), ‘শ্রীকান্ত’ (১৯৮৭), ‘স্বামী’ (১৯৮৭) ও ‘বিরাজ বৌ’ (১৯৮৮) নির্মিত হয়।
পুরো আশির দশকজুড়ে বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে আরবীয় আখ্যান ও লোককাহিনির পাশাপাশি শরৎ সাহিত্য থেকে চলচ্চিত্র নির্মাণের প্রেক্ষাপট লক্ষ করা যায়। কিন্তু রবীন্দ্রসাহিত্য নেই! তবে বাংলাদেশের শিল্পকলার অন্যান্য অঙ্গন যেমন থিয়েটার, সংগীত কিংবা নৃত্যে কিন্তু ঠিকই রবীন্দ্রনাথ প্রভাবের সঙ্গে বিরাজ করে। এর কারণ কী?
ভারতীয় চলচ্চিত্রে তপন সিংহ কিংবা সত্যজিৎ রায় ষাটের দশকে রবীন্দ্রসাহিত্য থেকে চলচ্চিত্র নির্মাণের যে ধারা তৈরি করেন তা বাংলাদেশে একদম নেই বললেই চলে। এফডিসির নির্মাতারা তো এদিকে হাঁটলেন না এমনকি স্বাধীন ধারার নির্মাতারাও সেদিকে দৃষ্টি ফেরাননি। তবে কলকাতার চলচ্চিত্রে পুনরায় রবীন্দ্রনাথের আগমন ঘটল ঋতুপর্ণ ঘোষের হাত ধরে। তখন বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের ক্ষেত্রে চাষী নজরুল ইসলাম রবীন্দ্র সাহিত্য থেকে নির্মাণ করেন ‘শাস্তি’ (২০০৪) ও ‘সুভা’ (২০০৬) চলচ্চিত্র। যদিও সত্তর ও আশির দশকে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘নৌকাডুবি’র ছায়া অবলম্বনে সাইফুল আজম কাসেম ‘সোহাগ’ ও ‘ক্ষুধিত পাষাণ’ অবলম্বনে কাজী হায়াৎ ‘রাজবাড়ী’ (১৯৮৪) চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন, কিন্তু তারা কোথাও রবীন্দ্রনাথের নাম ব্যবহার করেননি। এটা কি রবীন্দ্রবিরোধিতার রাজনীতি থেকে নিজেদের বাঁচাতে তারা এই পন্থা অবলম্বন করেন নাকি অন্যকিছু?
চাষী নজরুল ইসলামের পর বাংলাদেশে নির্মাতা কাজী হায়াৎ ২০০৬ সালে তৈরি করেন ‘কাবুলিওয়ালা’ চলচ্চিত্র। এরপর নার্গিস আক্তার ‘সমাপ্তি’ অবলম্বনে নির্মাণ করেন ‘অবুঝ বউ’ (২০১০)। মোটাদাগে বাংলাদেশে রবীন্দ্রসাহিত্যে থেকে নির্মিত চলচ্চিত্র এগুলোই। রবীন্দ্রসংগীত, সাহিত্য, নাটক ইত্যাদি বাংলাদেশে পাঠক ও দর্শকপ্রিয়তা পেলেও তার সাহিত্য থেকে চলচ্চিত্র সেভাবে নির্মিত হলো না কেন?
এ প্রসঙ্গে বলা যায়, বাঙালি শহুরে মধ্যবিত্ত যে প্রক্রিয়ায় রবীন্দ্রচর্চা করে কিংবা রবীন্দ্রনাথের ভোক্তা হয় তারা বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের দর্শক হয়ে ওঠেনি। ফলে রবীন্দ্র সাহিত্যের চলচ্চিত্রায়ন নিয়ে বাংলাদেশের সাধারণ চলচ্চিত্রমোদী দর্শকদের কাছে পৌঁছানোর চিন্তা ও চেষ্টা কোনওটাই এফডিসির নির্মাতার করেননি। তখন খোঁজ করা দরকার, রবীন্দ্রনাথের যে সাহিত্য থেকে ‘সুভা’, ‘শাস্তি’ ও ‘কাবুলিওয়ালা’ নির্মিত হলো সেগুলো কেন করা হলো? অর্থাৎ বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই আখ্যানগুলোকে নির্মাতারা কেন প্রাসঙ্গিক মনে করলেন? ধরা যাক, ‘শাস্তি’ গল্পটির কথা।
এই গল্পের গ্রামীণ কৃষক প্রজা ও জমিদারের পারস্পরিক চিত্র বাংলাদেশের (পূর্ববঙ্গ) মানুষের কাছে তার নিজের জীবনের বাস্তবতার চিত্রকে হাজির করতে পারে; পরিবারে নারীকেন্দ্রিক দ্বন্দ্ব বাংলাদেশের গ্রামীণ যৌথ পরিবারের চিত্রকে উপস্থাপন করে তাদের মনোজগতে প্রভাব ফেলতে পারে; পুরুষের আধিপত্যবাদী মনোভাবকে দেখাতে পারে।
যদিও ‘শাস্তি’ গল্পটির কাহিনি ঔপনিবেশিক কালের তবে স্বাধীন বাংলাদেশের নারীদের ক্ষেত্রেও তা এখনও প্রাসঙ্গিক। হয়তোবা চাষী নজরুল ইসলাম এই বিষয়টিকে প্রাধান্য দিতে চেয়েছেন। যদিও এই গল্পে চন্দরার মনস্তত্ত্ব একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। আর এখানেই বিষয়টি খোলাসা হয় এভাবে—ঋতুপর্ণ ঘোষ রবীন্দ্রসাহিত্যের চলচ্চিত্রায়নে মনস্তাত্ত্বিক বিষয়কে যেভাবে প্রাধান্য দিয়েছেন, বাংলাদেশের চলচ্চিত্র নির্মাতারা হয়তোবা সেভাবে ভাবেননি। যার ফলে রবীন্দ্রসাহিত্য বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে আজও অধরা। এই বাইরে রবীন্দ্রবিরোধী রাজনৈতিক বলয় তো আছেই!

রবীন্দ্রনাথ যখন বাংলা সাহিত্যকে ‘জাতীয় সাহিত্য’ হিসেবে দেখার চেষ্টা করছেন, তখন বাংলা গদ্যসাহিত্যের যাত্রাই-বা কতদিন! তাঁর ভাষায় বলতে গেলে বলতে হয়, প্রায় একশত বছরের বাংলা সাহিত্য তখন ‘নববঙ্গসাহিত্য’! তখনও বিখ্যাত তাত্ত্বিক রেনে ওয়েলেক আর অস্টিন ওয়ারেন তাঁদের জাতীয় সাহিত্য পৃথকীকরণ নিয়ে ধারণাই দেননি।
৬ মিনিট আগে
আজকের প্রজন্মের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের সম্পর্কটাও বেশ অদ্ভুত। তিনি একইসঙ্গে জনপ্রিয়, তবে এর গভীরতা কম। খুব তাঁর উপস্থিতি দৃশ্যমান, তবে তাঁকে চেনার মাধ্যমে নয়। আনুষ্ঠানিকভাবে রবীন্দ্রসঙ্গীত শোনেন বা শিখেন অথবা নিজ আগ্রহে তাঁর বই পড়েন, এই প্রজন্মে এই সংখ্যা খুবই কম।
৪২ মিনিট আগে
রবীন্দ্রনাথকে আমরা যতটা কবি হিসেবে চিনি, ততটা হয়তো চিনি না কৃষি, গ্রাম ও সমবায় নিয়ে ভাবুক একজন মানুষ হিসেবে। সাহিত্য, সংগীত, শিক্ষা কিংবা শিল্পচিন্তার বাইরে তিনি বারবার ফিরে গেছেন গ্রামের কাছে। কারণ, খুব কাছ থেকে দেখেছিলেন বাংলার গ্রামীণ জীবনের দারিদ্র্য, রোগব্যাধি, সামাজিক ভাঙন আর অসহায়তা।
১ ঘণ্টা আগে
লোককথা আছে, নিজের মৃত্যুদণ্ডের খবর শোনার পর ফরাসি রানি মেরি অ্যান্টোয়নেটের মাথার সব চুল নাকি এক রাতেই সাদা হয়ে গিয়েছিল।
৩ ঘণ্টা আগে