মাহজাবিন নাফিসা

রবীন্দ্রনাথের ছবি প্রথম দেখেছিলাম বাসার বুকশেলফের ‘গল্পগুচ্ছে’। স্কুলে ভর্তি হওয়ার পর থেকে তো বাংলা বইয়ে একটা ছড়া-কবিতা ও ছোটগল্প থাকতই। সব মিলিয়ে তাই ছোটবেলা থেকেই খটখটে সাধু ভাষায় তাঁর বেশ কিছু লেখা পড়া হয়েছে। সেখান থেকেই তাঁকে চেনা।
তারপর একদিন যখন তাঁর গান শুনলাম, মনে হল, ‘ইনি গানও লিখেছেন!’ তখন ফেসবুক বা ইন্টারনেট কোনটাই না থাকায় অনেক অবসর ছিল, তাই অবাক হওয়ারও সুযোগ ছিল এই কথা ভেবে যে, একই লেখকের হাতে লেখা হয়েছে ‘গুপ্তধন’, ‘ডাকঘর’ বা ‘কঙ্কাল’।
সেসময় কঠিন ভাষায় যা-ই পড়তাম মনে হত রবীন্দ্রনাথের লেখা! কিছুটা বড় হওয়ার পর পড়েছি ‘চোখের বালি’। বিখ্যাত শিল্পীদের গলায় তাঁর গান তো গুনেইছি। কিন্তু, ধীরে ধীরে এইসব অভ্যাসের জায়গা দখল করল ইউটিউব, রিলস। এরপর কি তিনি আসলেই হারিয়ে গেছেন?
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কখনোই শুধু একটি কাজের জন্য পরিচিত ছিলেন না। তবে, বর্তমান প্রজন্মের কাছে রবীন্দ্রনাথ পড়ার মতো তেমন সময় নেই। তাদের কাছে সাহিত্য পড়ার সময়ই কম, তাঁর ওপর এত কঠিন ভাষা পড়তে তারা বেশির ভাগই আগ্রহ বোধ করেন না।
কয়েকজন তরুণের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বর্তমান গানের যুগে রবীন্দ্রসংগীত ‘বোরিং’। এরপরেও, রবীন্দ্রনাথ কিন্তু তাদের পিছু ছাড়েননি। ফিউশান গান, উক্তি এমনকি মিম—সবকিছুতেই বারবার তিনি ফিরে আসেন। এমনকি না জেনেই অনেকে তাঁর গান শোনেন বা তাঁকে উদ্ধৃত করেন। শুধু একজন কবি বা সাহিত্যিক নন; তিনি একইসঙ্গে গান, বর্ষার বিকেল। আজকের অনেক তরুণ আছেন, যারা ‘গোরা’ বা ‘ঘরে বাইরে’ কখনো পড়েননি। ঐশ্বরিয়া রায়ের বদৌলতে হয়তো ‘চোখের বালি’র কাহিনি কিছুটা জানেন। ‘শেষের কবিতা’র কয়েকটি বিখ্যাত লাইন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকেই মুখস্থ। কিন্তু ‘মায়াবনবিহারিনী’, ‘তুমি রবে নীরবে’ বা ‘পুরানো সেই দিনের কথা’—এই গানগুলোর সঙ্গে তাঁদের একধরনের সম্পর্ক তৈরি হয়েছে মূলত নতুন করে এই গানগুলো বিভিন্ন ব্যান্ডের শিল্পীদের গাওয়ার কারণে।
এটাই সম্ভবত তরুণদের কাছে রবীন্দ্রনাথকে বোঝার সবচেয়ে আকর্ষণীয় জায়গা।

নতুন প্রজন্ম তাঁকে আগের প্রজন্মের মতো সবসময় ‘পড়ে’ আবিষ্কার করছে না। বরং অনেক সময় তারা তাঁকে আগে ‘শুনছে’, সেটাও কোন ব্যান্ডের তাঁকে উৎসর্গ করে গাওয়া গান। অর্থাৎ বর্তমান শিল্পীদের গলায় তারা এই গান গুলো শুনছে, পরে কোনো একদিন জানা গেল, প্রায়ই শোনা সেই গানটি আসলে রবীন্দ্রসঙ্গীত। কিন্তু তাতেই কি রবীন্দ্রনাথ কম প্রাসঙ্গিক হয়ে যাচ্ছেন?
সম্ভবত না। এই অভিযোজনক্ষমতাই তাঁর সবচেয়ে বড় শক্তি। কারণ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সময় বদলেছে, মানুষের মনোযোগের ধরন বদলেছে, বিনোদন গ্রহণের পদ্ধতি বদলেছে, কিন্তু রবীন্দ্রসংগীত হারিয়ে যায়নি। বর্ষা এলেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ভরে যায় রবীন্দ্রসংগীতে। বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুষ্ঠানে এখনও ‘ফাগুন হাওয়ায় হাওয়ায়’ শোনা যায়। মন খারাপ হলে তরুণরা এখনও রবীন্দ্রসঙ্গীত শুনছে বা বৃষ্টি নিয়ে বানানো ছোট ভিডিওর পেছনেও রবীন্দ্রসংগীত ব্যাকগ্রাউন্ড হিসেবে বাজছে।
এমনকি যারা প্রকাশ্যে ‘রবীন্দ্রসংগীত শুনি না’ বলে আধুনিক হওয়ার চেষ্টা করেন, তাঁদের গানের তালিকাতেও কোনো না কোনো রবীন্দ্রসংগীত পাওয়া যায়। কারণ গানগুলো শুধু ‘শুদ্ধ সংগীত’ হিসেবে নয়, এগুলো এখন আবেগের ভাষা হয়ে গেছে।
এখানেই আসে নতুনভাবে গাওয়া রবীন্দ্রসংগীতের প্রসঙ্গ।
বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছেন, এমন বিভিন্ন বর্ষের শিক্ষার্থীদের প্রশ্ন করলে জানা যায়, তারা রবীন্দ্র-সাহিত্য পড়তে তেমন আগ্রহী নন। গানগুলোও তেমন শোনা হয়না। পাঠ্যবই এর বাইরে তাঁর কোনো বই না পড়া দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী মৌরি জানান, ‘এত স্লো গান তেমন ভালো লাগে না। কিন্তু মাঝে মধ্যে রিলসে ফিউশন করা ক্লিপগুলো ব্যবহার করি।’
একসময় রবীন্দ্রসংগীত মানেই ছিল হারমোনিয়াম, নির্দিষ্ট গায়কি, নির্দিষ্ট পরিবেশনা। এখন সেখানে এসেছে নতুন বাদ্যযন্ত্র, স্বল্পস্বরের সংগীত বিন্যাস, আধুনিক উপস্থাপনা। যুক্ত হয়েছে ‘লো-ফি’ও। এগুলো নিয়ে বিতর্কও কম নয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেককেই ক্ষোভ প্রকাশ করতে দেখা যায় এভাবে—‘রবীন্দ্রনাথকে নষ্ট করা হচ্ছে’, ‘গানের মৌলিকতা নষ্ট হচ্ছে’ বা ‘এসব খুবই বিরক্তিকর’।
কিন্তু মজার বিষয় হলো, সেই তথাকথিত ‘বিরক্তিকর’ সংস্করণগুলোই আবার হাজার হাজার তরুণ শুনছেন। রাত জেগে পড়তে বসে শুনছেন বা দূরের পথে যেতে যেতে শুনছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ক্যাপশন, বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, প্রেম-বিচ্ছেদ, নান্দনিক ছবি—সবকিছুরই অংশ তিনি। কোনো বিদায় অনুষ্ঠানে তো ‘পুরোনো সেই দিনের কথা’ বাঁধা একটি গান।
এর কারণ সুরের বিন্যাস বদলালেও, গানগুলোর ভেতরের অনুভূতিটা এখনো কাজ করে। পুরোনো অনুভূতির সঙ্গে নতুন প্রজন্ম নিজেদের ভাষা আর রুচি মিলিয়ে সেগুলোকে নতুনভাবে গ্রহণ করছে।

হয়তো এ কারণেই রবীন্দ্রসংগীত বারবার ফিরে আসে। অনেক গান জনপ্রিয় হয়, কিছুদিন শোনা যায়, তারপর হারিয়ে যায়। কিন্তু রবীন্দ্রসংগীত থেকে যায়। কারণ এগুলো শুধু গান নয়, এগুলো বাঙালির সাংস্কৃতিক স্মৃতির অংশ।
আজকাল বইমেলা কিংবা কফিশপে অনেককে রবীন্দ্রনাথের বই হাতে ছবি তুলতে দেখা যায়। ‘শেষের কবিতা’ বা ‘গীতাঞ্জলি’ হাতে এসথেটিক ছবি হয়তো সবাই একবার হলেও তুলেছে। বই পড়া না থাকায় তাই অনেক সময়ই দেখা যায় ছবির মুডের সঙ্গে বইয়ের মিল নেই। ট্র্যাজেডির বই হাতে নিয়ে কেউ হাসি মুখে পোজ দিচ্ছে।
সমস্যাটা অবশ্য বই হাতে ছবি তোলায় নয়। নান্দনিকতা সবসময়ই ছিল, শুধু মাধ্যম বদলেছে। কিন্তু এর ফলে অনেক সময় রবীন্দ্রনাথকে জানার বদলে ‘দেখানো’ বেশি হয়। তাতেও কিন্তু তিনি হারিয়ে যাননি।
ফলে আজকের প্রজন্মের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের সম্পর্কটাও বেশ অদ্ভুত। তিনি একইসঙ্গে জনপ্রিয়, তবে এর গভীরতা কম। খুব তাঁর উপস্থিতি দৃশ্যমান, তবে তাঁকে চেনার মাধ্যমে নয়। আনুষ্ঠানিকভাবে রবীন্দ্রসঙ্গীত শোনেন বা শিখেন অথবা নিজ আগ্রহে তাঁর বই পড়েন, এই প্রজন্মে এই সংখ্যা খুবই কম।
তবু তাঁকে এড়িয়ে যাওয়া যায় না। ফেসবুকের বিভিন্ন মিম পেইজে তাঁর উক্তি বা ছবি ব্যবহার করে কনটেন্ট বানানো প্রতিদিনের ব্যাপার। হয়তো একটি কথা তিনি বলেননি, তবুও সেই মজার লাইনটির সঙ্গে তাঁর ছবি জুড়ে দেওয়া হচ্ছে যেন মিম’টায় একটু ‘ভাব আসে’। এমনকি, ২০২২ এ ফেসবুক রিলসে ‘তায়দার’ নামে এক তরুণ হিপ-হপ আর্টিস্ট ‘রবীন্দ্র ক্লাব সঙ্গীত’ নামে একটি র্যাপ গান রিলিজ করেন যা এখনো ভাইরাল ও জনপ্রিয়। ‘#call_me_robindro’ লিখে খুজলেই এর ক্লিপ পাওয়া যায়।
সম্ভবত এটাই রবীন্দ্রনাথের সবচেয়ে বড় সাফল্য। তিনি শুধু গ্রন্থাগারের তাকের লেখক হয়ে থাকেননি। তিনি একধরনের সাংস্কৃতিক অভ্যাস হয়ে গেছেন। একধরনের সমষ্টিগত বাঙালি অনুভূতি হয়ে গেছেন। প্রতিটি প্রজন্ম তাঁকে নতুনভাবে ব্যবহার করছে, নতুনভাবে শুনছে, নতুনভাবে বুঝছে।

রবীন্দ্রনাথের ছবি প্রথম দেখেছিলাম বাসার বুকশেলফের ‘গল্পগুচ্ছে’। স্কুলে ভর্তি হওয়ার পর থেকে তো বাংলা বইয়ে একটা ছড়া-কবিতা ও ছোটগল্প থাকতই। সব মিলিয়ে তাই ছোটবেলা থেকেই খটখটে সাধু ভাষায় তাঁর বেশ কিছু লেখা পড়া হয়েছে। সেখান থেকেই তাঁকে চেনা।
তারপর একদিন যখন তাঁর গান শুনলাম, মনে হল, ‘ইনি গানও লিখেছেন!’ তখন ফেসবুক বা ইন্টারনেট কোনটাই না থাকায় অনেক অবসর ছিল, তাই অবাক হওয়ারও সুযোগ ছিল এই কথা ভেবে যে, একই লেখকের হাতে লেখা হয়েছে ‘গুপ্তধন’, ‘ডাকঘর’ বা ‘কঙ্কাল’।
সেসময় কঠিন ভাষায় যা-ই পড়তাম মনে হত রবীন্দ্রনাথের লেখা! কিছুটা বড় হওয়ার পর পড়েছি ‘চোখের বালি’। বিখ্যাত শিল্পীদের গলায় তাঁর গান তো গুনেইছি। কিন্তু, ধীরে ধীরে এইসব অভ্যাসের জায়গা দখল করল ইউটিউব, রিলস। এরপর কি তিনি আসলেই হারিয়ে গেছেন?
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কখনোই শুধু একটি কাজের জন্য পরিচিত ছিলেন না। তবে, বর্তমান প্রজন্মের কাছে রবীন্দ্রনাথ পড়ার মতো তেমন সময় নেই। তাদের কাছে সাহিত্য পড়ার সময়ই কম, তাঁর ওপর এত কঠিন ভাষা পড়তে তারা বেশির ভাগই আগ্রহ বোধ করেন না।
কয়েকজন তরুণের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বর্তমান গানের যুগে রবীন্দ্রসংগীত ‘বোরিং’। এরপরেও, রবীন্দ্রনাথ কিন্তু তাদের পিছু ছাড়েননি। ফিউশান গান, উক্তি এমনকি মিম—সবকিছুতেই বারবার তিনি ফিরে আসেন। এমনকি না জেনেই অনেকে তাঁর গান শোনেন বা তাঁকে উদ্ধৃত করেন। শুধু একজন কবি বা সাহিত্যিক নন; তিনি একইসঙ্গে গান, বর্ষার বিকেল। আজকের অনেক তরুণ আছেন, যারা ‘গোরা’ বা ‘ঘরে বাইরে’ কখনো পড়েননি। ঐশ্বরিয়া রায়ের বদৌলতে হয়তো ‘চোখের বালি’র কাহিনি কিছুটা জানেন। ‘শেষের কবিতা’র কয়েকটি বিখ্যাত লাইন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকেই মুখস্থ। কিন্তু ‘মায়াবনবিহারিনী’, ‘তুমি রবে নীরবে’ বা ‘পুরানো সেই দিনের কথা’—এই গানগুলোর সঙ্গে তাঁদের একধরনের সম্পর্ক তৈরি হয়েছে মূলত নতুন করে এই গানগুলো বিভিন্ন ব্যান্ডের শিল্পীদের গাওয়ার কারণে।
এটাই সম্ভবত তরুণদের কাছে রবীন্দ্রনাথকে বোঝার সবচেয়ে আকর্ষণীয় জায়গা।

নতুন প্রজন্ম তাঁকে আগের প্রজন্মের মতো সবসময় ‘পড়ে’ আবিষ্কার করছে না। বরং অনেক সময় তারা তাঁকে আগে ‘শুনছে’, সেটাও কোন ব্যান্ডের তাঁকে উৎসর্গ করে গাওয়া গান। অর্থাৎ বর্তমান শিল্পীদের গলায় তারা এই গান গুলো শুনছে, পরে কোনো একদিন জানা গেল, প্রায়ই শোনা সেই গানটি আসলে রবীন্দ্রসঙ্গীত। কিন্তু তাতেই কি রবীন্দ্রনাথ কম প্রাসঙ্গিক হয়ে যাচ্ছেন?
সম্ভবত না। এই অভিযোজনক্ষমতাই তাঁর সবচেয়ে বড় শক্তি। কারণ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সময় বদলেছে, মানুষের মনোযোগের ধরন বদলেছে, বিনোদন গ্রহণের পদ্ধতি বদলেছে, কিন্তু রবীন্দ্রসংগীত হারিয়ে যায়নি। বর্ষা এলেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ভরে যায় রবীন্দ্রসংগীতে। বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুষ্ঠানে এখনও ‘ফাগুন হাওয়ায় হাওয়ায়’ শোনা যায়। মন খারাপ হলে তরুণরা এখনও রবীন্দ্রসঙ্গীত শুনছে বা বৃষ্টি নিয়ে বানানো ছোট ভিডিওর পেছনেও রবীন্দ্রসংগীত ব্যাকগ্রাউন্ড হিসেবে বাজছে।
এমনকি যারা প্রকাশ্যে ‘রবীন্দ্রসংগীত শুনি না’ বলে আধুনিক হওয়ার চেষ্টা করেন, তাঁদের গানের তালিকাতেও কোনো না কোনো রবীন্দ্রসংগীত পাওয়া যায়। কারণ গানগুলো শুধু ‘শুদ্ধ সংগীত’ হিসেবে নয়, এগুলো এখন আবেগের ভাষা হয়ে গেছে।
এখানেই আসে নতুনভাবে গাওয়া রবীন্দ্রসংগীতের প্রসঙ্গ।
বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছেন, এমন বিভিন্ন বর্ষের শিক্ষার্থীদের প্রশ্ন করলে জানা যায়, তারা রবীন্দ্র-সাহিত্য পড়তে তেমন আগ্রহী নন। গানগুলোও তেমন শোনা হয়না। পাঠ্যবই এর বাইরে তাঁর কোনো বই না পড়া দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী মৌরি জানান, ‘এত স্লো গান তেমন ভালো লাগে না। কিন্তু মাঝে মধ্যে রিলসে ফিউশন করা ক্লিপগুলো ব্যবহার করি।’
একসময় রবীন্দ্রসংগীত মানেই ছিল হারমোনিয়াম, নির্দিষ্ট গায়কি, নির্দিষ্ট পরিবেশনা। এখন সেখানে এসেছে নতুন বাদ্যযন্ত্র, স্বল্পস্বরের সংগীত বিন্যাস, আধুনিক উপস্থাপনা। যুক্ত হয়েছে ‘লো-ফি’ও। এগুলো নিয়ে বিতর্কও কম নয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেককেই ক্ষোভ প্রকাশ করতে দেখা যায় এভাবে—‘রবীন্দ্রনাথকে নষ্ট করা হচ্ছে’, ‘গানের মৌলিকতা নষ্ট হচ্ছে’ বা ‘এসব খুবই বিরক্তিকর’।
কিন্তু মজার বিষয় হলো, সেই তথাকথিত ‘বিরক্তিকর’ সংস্করণগুলোই আবার হাজার হাজার তরুণ শুনছেন। রাত জেগে পড়তে বসে শুনছেন বা দূরের পথে যেতে যেতে শুনছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ক্যাপশন, বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, প্রেম-বিচ্ছেদ, নান্দনিক ছবি—সবকিছুরই অংশ তিনি। কোনো বিদায় অনুষ্ঠানে তো ‘পুরোনো সেই দিনের কথা’ বাঁধা একটি গান।
এর কারণ সুরের বিন্যাস বদলালেও, গানগুলোর ভেতরের অনুভূতিটা এখনো কাজ করে। পুরোনো অনুভূতির সঙ্গে নতুন প্রজন্ম নিজেদের ভাষা আর রুচি মিলিয়ে সেগুলোকে নতুনভাবে গ্রহণ করছে।

হয়তো এ কারণেই রবীন্দ্রসংগীত বারবার ফিরে আসে। অনেক গান জনপ্রিয় হয়, কিছুদিন শোনা যায়, তারপর হারিয়ে যায়। কিন্তু রবীন্দ্রসংগীত থেকে যায়। কারণ এগুলো শুধু গান নয়, এগুলো বাঙালির সাংস্কৃতিক স্মৃতির অংশ।
আজকাল বইমেলা কিংবা কফিশপে অনেককে রবীন্দ্রনাথের বই হাতে ছবি তুলতে দেখা যায়। ‘শেষের কবিতা’ বা ‘গীতাঞ্জলি’ হাতে এসথেটিক ছবি হয়তো সবাই একবার হলেও তুলেছে। বই পড়া না থাকায় তাই অনেক সময়ই দেখা যায় ছবির মুডের সঙ্গে বইয়ের মিল নেই। ট্র্যাজেডির বই হাতে নিয়ে কেউ হাসি মুখে পোজ দিচ্ছে।
সমস্যাটা অবশ্য বই হাতে ছবি তোলায় নয়। নান্দনিকতা সবসময়ই ছিল, শুধু মাধ্যম বদলেছে। কিন্তু এর ফলে অনেক সময় রবীন্দ্রনাথকে জানার বদলে ‘দেখানো’ বেশি হয়। তাতেও কিন্তু তিনি হারিয়ে যাননি।
ফলে আজকের প্রজন্মের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের সম্পর্কটাও বেশ অদ্ভুত। তিনি একইসঙ্গে জনপ্রিয়, তবে এর গভীরতা কম। খুব তাঁর উপস্থিতি দৃশ্যমান, তবে তাঁকে চেনার মাধ্যমে নয়। আনুষ্ঠানিকভাবে রবীন্দ্রসঙ্গীত শোনেন বা শিখেন অথবা নিজ আগ্রহে তাঁর বই পড়েন, এই প্রজন্মে এই সংখ্যা খুবই কম।
তবু তাঁকে এড়িয়ে যাওয়া যায় না। ফেসবুকের বিভিন্ন মিম পেইজে তাঁর উক্তি বা ছবি ব্যবহার করে কনটেন্ট বানানো প্রতিদিনের ব্যাপার। হয়তো একটি কথা তিনি বলেননি, তবুও সেই মজার লাইনটির সঙ্গে তাঁর ছবি জুড়ে দেওয়া হচ্ছে যেন মিম’টায় একটু ‘ভাব আসে’। এমনকি, ২০২২ এ ফেসবুক রিলসে ‘তায়দার’ নামে এক তরুণ হিপ-হপ আর্টিস্ট ‘রবীন্দ্র ক্লাব সঙ্গীত’ নামে একটি র্যাপ গান রিলিজ করেন যা এখনো ভাইরাল ও জনপ্রিয়। ‘#call_me_robindro’ লিখে খুজলেই এর ক্লিপ পাওয়া যায়।
সম্ভবত এটাই রবীন্দ্রনাথের সবচেয়ে বড় সাফল্য। তিনি শুধু গ্রন্থাগারের তাকের লেখক হয়ে থাকেননি। তিনি একধরনের সাংস্কৃতিক অভ্যাস হয়ে গেছেন। একধরনের সমষ্টিগত বাঙালি অনুভূতি হয়ে গেছেন। প্রতিটি প্রজন্ম তাঁকে নতুনভাবে ব্যবহার করছে, নতুনভাবে শুনছে, নতুনভাবে বুঝছে।

রবীন্দ্রনাথ যখন বাংলা সাহিত্যকে ‘জাতীয় সাহিত্য’ হিসেবে দেখার চেষ্টা করছেন, তখন বাংলা গদ্যসাহিত্যের যাত্রাই-বা কতদিন! তাঁর ভাষায় বলতে গেলে বলতে হয়, প্রায় একশত বছরের বাংলা সাহিত্য তখন ‘নববঙ্গসাহিত্য’! তখনও বিখ্যাত তাত্ত্বিক রেনে ওয়েলেক আর অস্টিন ওয়ারেন তাঁদের জাতীয় সাহিত্য পৃথকীকরণ নিয়ে ধারণাই দেননি।
২৯ মিনিট আগে
পুরো আশির দশকজুড়ে বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে আরবীয় আখ্যান ও লোককাহিনির পাশাপাশি শরৎ সাহিত্য থেকে চলচ্চিত্র নির্মাণের প্রেক্ষাপট লক্ষ করা যায়। কিন্তু রবীন্দ্রসাহিত্য নেই! তবে বাংলাদেশের শিল্পকলার অন্যান্য অঙ্গন যেমন থিয়েটার, সংগীত কিংবা নৃত্যে কিন্তু ঠিকই রবীন্দ্রনাথ প্রভাবের সঙ্গে বিরাজ করে। এর কারণ কী?
২ ঘণ্টা আগে
রবীন্দ্রনাথকে আমরা যতটা কবি হিসেবে চিনি, ততটা হয়তো চিনি না কৃষি, গ্রাম ও সমবায় নিয়ে ভাবুক একজন মানুষ হিসেবে। সাহিত্য, সংগীত, শিক্ষা কিংবা শিল্পচিন্তার বাইরে তিনি বারবার ফিরে গেছেন গ্রামের কাছে। কারণ, খুব কাছ থেকে দেখেছিলেন বাংলার গ্রামীণ জীবনের দারিদ্র্য, রোগব্যাধি, সামাজিক ভাঙন আর অসহায়তা।
২ ঘণ্টা আগে
লোককথা আছে, নিজের মৃত্যুদণ্ডের খবর শোনার পর ফরাসি রানি মেরি অ্যান্টোয়নেটের মাথার সব চুল নাকি এক রাতেই সাদা হয়ে গিয়েছিল।
৪ ঘণ্টা আগে