সুন্দরবনে রবীন্দ্রনাথ: হ্যামিলটনের সমবায়ের খোঁজে কবির যাত্রা

প্রকাশ : ০৮ মে ২০২৬, ১৭: ২০
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। সংগৃহীত ছবি

রবীন্দ্রনাথকে আমরা যতটা কবি হিসেবে চিনি, ততটা হয়তো চিনি না কৃষি, গ্রাম ও সমবায় নিয়ে ভাবুক একজন মানুষ হিসেবে। সাহিত্য, সংগীত, শিক্ষা কিংবা শিল্পচিন্তার বাইরে তিনি বারবার ফিরে গেছেন গ্রামের কাছে। কারণ, খুব কাছ থেকে দেখেছিলেন বাংলার গ্রামীণ জীবনের দারিদ্র্য, রোগব্যাধি, সামাজিক ভাঙন আর অসহায়তা।

এই কারণেই ১৯৩২ সালের শেষ দিকে, বয়স যখন সত্তর পেরিয়েছে, তখনও তিনি ছুটে গিয়েছিলেন সুন্দরবনের প্রত্যন্ত গোসাবায়। একজন স্কটিশ সাহেবের আমন্ত্রণে। সেই সাহেবের নাম স্যার ড্যানিয়েল ম্যাকিনন হ্যামিলটন। তিনি সুন্দরবনের গভীরে গড়ে তুলেছিলেন সমবায়ভিত্তিক কৃষি ও গ্রামীণ উন্নয়নের অভিনব পরীক্ষাগার। সেই পরীক্ষাই দেখতে গিয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ।

১৯৩২ সালের ২৯ ডিসেম্বর রবীন্দ্রনাথ পশ্চিমবঙ্গের শিয়ালদহ থেকে ট্রেনে ক্যানিং পৌঁছান। সেখান থেকে স্টিমারে নদীপথে গোসাবা। তখনকার সুন্দরবন আজকের মতো পর্যটনকেন্দ্র নয়। বরং বাঘ, ম্যালেরিয়া, নোনাজল আর জঙ্গলঘেরা এক দুর্গম অঞ্চল। সেই জায়গাতেই তিনি পৌঁছেছিলেন কৌতূহল নিয়ে। কীভাবে একজন স্কটিশ ব্যবসায়ী সুন্দরবনের ভেতরে সমবায়ভিত্তিক উন্নয়নের এক মডেল দাঁড় করালেন, সেটি দেখার জন্য।

হ্যামিলটন তাঁর এলাকার জন্য ১ টাকার কাগজের নোটও চালু করেছিলেন।
হ্যামিলটন তাঁর এলাকার জন্য ১ টাকার কাগজের নোটও চালু করেছিলেন।

গোসাবায় পৌঁছে রবীন্দ্রনাথ উঠেছিলেন বিদ্যা নদীর ধারে কাঠের তৈরি একটি বাংলোয়। স্থানীয়ভাবে সেটি আজও ‘বেকন বাংলো’ নামে পরিচিত। সুন্দরবনে রবীন্দ্রস্মৃতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চিহ্নগুলোর একটি এই বাংলো। কথিত আছে, তখন বাংলোটির চারপাশ ছিল নদী, কেওড়া-গরানের বন আর নির্জনতা ঘেরা। রবীন্দ্রনাথ হ্যামিলটনের সমবায় প্রকল্প ঘুরে দেখেছিলেন, মানুষের সঙ্গে কথা বলেছিলেন, কৃষিকাজের পদ্ধতি দেখেছিলেন।

আজও পশ্চিমবঙ্গের গোসাবায় গেলে সেই বাংলোর কথা স্থানীয়রা গর্ব করে বলেন। বহু পর্যটক সেখানে যান শুধু এই কারণে যে রবীন্দ্রনাথ একসময় এই ঘরে ছিলেন। যদিও সময়ের সঙ্গে বাংলোটির অনেক পরিবর্তন হয়েছে, তবু সেটি এখনও এক ঐতিহাসিক স্মৃতিচিহ্ন। একসময় সেখানে কবির ব্যবহৃত কিছু আসবাব ও স্মারক ছিল বলেও জানা যায়, যদিও তার অধিকাংশই আর সংরক্ষিত নেই।

রবীন্দ্রনাথের এই সফরকে শুধু সৌজন্য সাক্ষাৎ হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এটা মূলত এক চিন্তার সঙ্গে আরেক চিন্তার সাক্ষাৎ। একদিকে কবির ‘স্বদেশী সমাজ’ ও পল্লি পুনর্গঠনের ধারণা, অন্যদিকে হ্যামিলটনের সমবায়ভিত্তিক কৃষি ও অর্থনৈতিক মডেল।

সুন্দরবনের প্রত্যন্ত এলাকায় হ্যামিলটনের আগমন নতুন দিগন্ত খুলে দেয়। ছবি: সংগৃহীত
সুন্দরবনের প্রত্যন্ত এলাকায় হ্যামিলটনের আগমন নতুন দিগন্ত খুলে দেয়। ছবি: সংগৃহীত

রবীন্দ্রনাথের গ্রাম নিয়ে ভাবনার শুরু অনেক আগে থেকেই। জমিদার পরিবারের সন্তান হিসেবে তাঁকে শিলাইদহ, পতিসর, শাহজাদপুরসহ পূর্ববঙ্গের বিভিন্ন জমিদারি তদারকির দায়িত্ব নিতে হয়েছিল। সেই সূত্রে তিনি গ্রামবাংলাকে কাছ থেকে দেখেন। পদ্মার চরে নৌকায় ঘুরে ঘুরে তিনি যে কৃষকের মুখ দেখেছেন, সেই মুখ তাঁর সাহিত্যেও এসেছে, চিঠিপত্রেও এসেছে, আবার সমাজভাবনাতেও এসেছে।

১৯০৪ সালে লেখা রবীন্দ্রনাথ ‘স্বদেশী সমাজ’–এ বলেছিলেন, গ্রামের উন্নয়ন সরকারের দয়ার ওপর ছেড়ে দিলে হবে না। গ্রামের মানুষকে নিজেদের সংগঠিত হতে হবে। তাঁর ভাষায়, সমাজকে বাঁচাতে হলে সমাজকেই জেগে উঠতে হবে। এই ভাবনার মধ্যেই ছিল পরবর্তী সময়ে তাঁর সমবায় দর্শনের ভিত্তি।

রবীন্দ্রনাথের কাছে সমবায় ছিল পারস্পরিক আস্থা গড়ে তোলার পদ্ধতি। তিনি মনে করতেন, গ্রামের মানুষ যখন যৌথভাবে কাজ করবে, তখন তাঁদের আত্মবিশ্বাস বাড়বে। একা একজন কৃষক হয়তো বাজারে ন্যায্য দাম পাবে না, কিন্তু সমবায়ভিত্তিক সংগঠন পেলে সে শক্তি অর্জন করতে পারে। তাই তিনি কৃষিঋণ, যৌথ গোলা, সেচব্যবস্থা, উন্নত বীজ, কৃষি শিক্ষার সঙ্গে সমবায়কে যুক্ত করতে চেয়েছিলেন।

হ্যামিলটনের কৃষির জাদুতে উন্নয়নের স্রোত বইতে শুরু করেছিল সেই বিশ শতকের শুরুর পর্বে।
হ্যামিলটনের কৃষির জাদুতে উন্নয়নের স্রোত বইতে শুরু করেছিল সেই বিশ শতকের শুরুর পর্বে।

পতিসরে তিনি কৃষকদের জন্য সমবায় ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। রবীন্দ্রনাথ চেয়েছিলেন কম সুদে ঋণের ব্যবস্থা করতে। একই সঙ্গে তিনি কৃষিকে আধুনিক করার কথাও ভাবছিলেন। তিনি বিদেশ থেকে উন্নত ধানের বীজ আনিয়েছিলেন, কৃষিবিদদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন, এমনকি তাঁর ছেলে রথীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে আমেরিকায় কৃষিবিজ্ঞান পড়তেও পাঠিয়েছিলেন।

শান্তিনিকেতনের পাশেই পরে তিনি গড়ে তোলেন শ্রীনিকেতন। এটা ছিল তাঁর পল্লি পুনর্গঠন প্রকল্পের কেন্দ্র। সেখানে কৃষিশিক্ষা, কারুশিল্প, স্বাস্থ্য, নারীর কাজের সুযোগ, প্রাথমিক শিক্ষা—সবকিছুকে একসঙ্গে যুক্ত করা হয়েছিল। তাঁর সহযোগী ছিলেন ব্রিটিশ কৃষিবিদ লিওনার্ড এলমহার্স্ট। রবীন্দ্রনাথ বুঝেছিলেন, বাস্তবে কাজ করা দরকার।

এই জায়গাতেই ড্যানিয়েল হ্যামিলটনের সঙ্গে তাঁর এক ধরনের বৌদ্ধিক মিল তৈরি হয়।

স্যার ড্যানিয়েল ম্যাকিনন হ্যামিলটনের জন্ম ১৮৬০ সালে স্কটল্যান্ডে। ব্যবসার কাজে ভারতবর্ষে এসে তিনি বাংলার গ্রামীণ দারিদ্র্য ও সুন্দরবনের ভয়াবহ জীবনযাত্রা দেখে বিচলিত হন। ইউরোপে তখন সমবায় আন্দোলনের উত্থান ঘটছে। বিশেষ করে স্কটল্যান্ড ও আয়ারল্যান্ডে কৃষিভিত্তিক সমবায়কে দারিদ্র্য দূর করার একটি কার্যকর পথ হিসেবে দেখা হচ্ছিল। হ্যামিলটন সেই ধারণা ভারতীয় বাস্তবতায় প্রয়োগ করতে চাইলেন।

১৯০৩ সালে তিনি গোসাবা, রাঙাবেলিয়া ও সাতজেলিয়ার বিশাল অঞ্চল ইজারা নেন। তখনকার সুন্দরবন ছিল বাঘ, কুমির, ম্যালেরিয়া আর নোনাজলের অঞ্চল। স্থায়ী বসতি খুব কম। প্রথম কাজ ছিল নদীর বাঁধ তৈরি, জঙ্গল পরিষ্কার, পুকুর খনন এবং বসতি স্থাপন। ধীরে ধীরে কৃষির উপযোগী করে তোলা হয় জমি।

কিন্তু হ্যামিলটনের বিশেষত্ব ছিল, তিনি পুরো সামাজিক কাঠামো বদলাতে চেয়েছিলেন। তিনি গড়ে তুললেন কৃষি সমবায় সমিতি, সমবায় ব্যাংক, ধান বিক্রয় সমিতি, চালকল, ডেইরি, ধর্মগোলা, তাঁতকেন্দ্র, স্কুল, হাসপাতাল এবং পশু চিকিৎসালয়।

গোসাবার কৃষকেরা সমবায়ের মাধ্যমে ধান বিক্রি করতেন। তাঁরা লাভের অংশও পেতেন। কৃষকদের ঋণ দেওয়া হতো। দুর্ভিক্ষ বা খাদ্যসংকটের সময় ‘ধর্মগোলা’ থেকে ধান বিতরণ করা হতো। কৃষি গবেষণার জন্য আলাদা ব্যবস্থাও ছিল। লোনাজমিতে কীভাবে ফলন বাড়ানো যায়, কীভাবে মিষ্টি পানির ব্যবহার বাড়ানো যায়, এসব নিয়ে পরীক্ষা চলত।

বিশ শতকের ত্রিশের দশকে ভারতের অধিকাংশ অঞ্চলে যখন কৃষিকাজ এখনও গরু-লাঙলনির্ভর, তখন গোসাবায় ট্র্যাক্টর ও পাম্প মেশিন ব্যবহার শুরু হয়েছিল। হ্যামিলটন অস্ট্রেলিয়া থেকে উন্নত জাতের ষাঁড় এনে গরুর সংকরায়নও করেছিলেন। তিনি মাছচাষ, হাঁস-মুরগি পালন ও কুটিরশিল্পকেও কৃষির অংশ হিসেবে দেখতেন।

এই খবরগুলো রবীন্দ্রনাথ আগেই শুনেছিলেন। তাই তিনি গোসাবায় গিয়ে মূলত দেখতে চেয়েছিলেন, সমবায়ভিত্তিক উন্নয়ন বাস্তবে কতটা কার্যকর।

সম্পর্কিত