আহমদ ছফার যেসব প্রশ্ন এখনও আমাদের তাড়া করে

আহমদ ছফা। স্কেচ: এআই

আহমদ ছফাকে শুধু একজন কথাসাহিত্যিক হিসেবে পড়লে তাঁর গুরুত্বের বড় একটি অংশ অধরা থেকে যায়। আবার তাঁকে কেবল রাজনৈতিক ভাষ্যকার হিসেবে দেখলেও তাঁর চিন্তার পূর্ণতা ধরা পড়ে না। সাহিত্য, রাষ্ট্র, সমাজ, শিক্ষা, সংস্কৃতি ও জাতীয় পরিচয়—এসবকে তিনি কখনো বিচ্ছিন্নভাবে দেখেননি। একই বুদ্ধিবৃত্তিক বাস্তবতার বিভিন্ন দিক হিসেবে বিবেচনা করেছেন। এ কারণেই তাঁর লেখা সময়ের গণ্ডি পেরিয়ে আজও নতুন করে পড়ার দাবি রাখে।

আহমদ ছফাকে ঘিরে দীর্ঘদিন ধরে দুটি বিপরীত প্রবণতা দেখা যায়। একদল তাঁর প্রায় প্রতিটি মূল্যায়নকে প্রশ্নাতীত সত্য হিসেবে গ্রহণ করেন। আরেকদল তাঁকে কেবল বিতর্কপ্রিয় বা স্ববিরোধী লেখক হিসেবে দেখেন। এই দুই দৃষ্টিভঙ্গির কোনোটিই তাঁকে সম্পূর্ণ বোঝার জন্য যথেষ্ট নয়। কারণ আহমদ ছফার গুরুত্ব তাঁর চিন্তার নির্ভুলতায় নয়, প্রশ্ন করার সাহসে।

তিনি এমন একজন চিন্তক, যাঁর সঙ্গে আজও তর্ক করা যায়। তাঁর লেখার সঙ্গে একমত হওয়া যেমন সম্ভব, তেমনি যুক্তি দিয়ে দ্বিমত পোষণ করাও সম্ভব। প্রকৃত চিন্তাবিদেরা চূড়ান্ত উত্তর দিয়ে যান না। তাঁরা এমন কিছু প্রশ্ন রেখে যান, যা প্রতিটি প্রজন্মকে নতুন করে ভাবতে শেখায়। আহমদ ছফার স্থায়ী গুরুত্ব এখানেই।

আজকের বাংলাদেশে তাঁর কয়েকটি প্রশ্ন বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক। রাষ্ট্র কি স্বাধীন বুদ্ধিজীবী চায়? বিশ্ববিদ্যালয় কি জ্ঞানচর্চার কেন্দ্র, নাকি সনদের কারখানা? সংস্কৃতি কি ক্ষমতার সমালোচক, নাকি অলংকার? জাতীয়তাবাদ কি আত্মসমালোচনাকে ধারণ করতে পারে?

রাষ্ট্র বদলায়, সরকার বদলায়, প্রযুক্তি বদলায়, প্রজন্মও বদলে যায়। কিন্তু যে সমাজ প্রশ্ন করার সাহস হারায়, তার সংকটের প্রকৃতি খুব একটা বদলায় না। আহমদ ছফাকে নতুন করে পাঠ করার প্রয়োজন এখানেই।

রাষ্ট্র কি স্বাধীন বুদ্ধিজীবী চায়

রাষ্ট্র শুধু সরকার বা প্রশাসনের সমষ্টি নয়। আহমদ ছফার কাছে রাষ্ট্র এমন একটি শক্তি; যা সমাজের চিন্তা, শিক্ষা, সংস্কৃতি ও জনমতকে প্রভাবিত করে। তাই তিনি রাষ্ট্রকে বোঝার জন্য শুধু রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহ নয়; বিশ্ববিদ্যালয়, সাহিত্য, সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান এবং বুদ্ধিজীবীদের ভূমিকাকেও সমান গুরুত্ব দিয়েছেন।

আহমদ ছফার মতে, রাষ্ট্র শুধু আইন বা প্রশাসনের ওপর ভর করে টিকে থাকে না। সমাজের চিন্তাশীল মানুষের সমর্থনও তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু লেখক, শিক্ষক বা গবেষক যখন স্বাধীনভাবে মত প্রকাশ না করে ক্ষমতাসীনদের অবস্থানকেই সমর্থন করেন, তখন রাষ্ট্রের কাজ আরও সহজ হয়ে যায়। তাই ছফা মনে করতেন, একজন বুদ্ধিজীবীর সবচেয়ে বড় দায়িত্ব ক্ষমতার প্রতি নয়; নিজের বিবেকের প্রতি দায়বদ্ধ থাকা।

তাঁর সমালোচনার লক্ষ্য শুধু রাষ্ট্র ছিল না। তিনি সেই বুদ্ধিজীবীদেরও প্রশ্ন করেছেন, যারা নৈতিক স্বাধীনতার বদলে ক্ষমতার সুবিধা-অসুবিধা বিবেচনা করে নিজেদের অবস্থান নির্ধারণ করেন। তাঁর কাছে স্বাধীন বুদ্ধিজীবীর প্রথম দায়িত্ব নিজের বিবেকের কাছে দায়বদ্ধ থাকা। রাষ্ট্রের সমালোচনা করলেই কেউ স্বাধীন হন না। আবার রাষ্ট্রকে সমর্থন করলেই তিনি অনিবার্যভাবে অসৎ হয়ে যান না।

ডিজিটাল যুগে এই প্রশ্ন আরও জটিল হয়েছে। রাজনৈতিক প্রভাবের পাশাপাশি করপোরেট শক্তি, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং জনমতের চাপও বুদ্ধিজীবীদের অবস্থানকে প্রভাবিত করছে। ফলে যুক্তির চেয়ে পরিচয়, আর মতের চেয়ে আনুগত্য অনেক ক্ষেত্রেই বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে। আহমদ ছফার শিক্ষা হলো—একটি রাষ্ট্রের নৈতিক শক্তি নির্ভর করে সে কতটা সমালোচনাকে ধারণ করতে পারে। আর একজন বুদ্ধিজীবীর সততা নির্ভর করে, তিনি নিজের পক্ষের বিরুদ্ধেও সত্য উচ্চারণ করতে পারেন কি না।

বিশ্ববিদ্যালয় কি জ্ঞানচর্চার কেন্দ্র, নাকি সনদের কারখানা

গত কয়েক দশকে দেশে উচ্চশিক্ষার বিস্তার উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা বেড়েছে। উচ্চশিক্ষায় প্রবেশাধিকারও আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বিস্তৃত হয়েছে। কিন্তু একই সঙ্গে একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে এসেছে—এই বিস্তার কি জ্ঞানচর্চারও বিস্তার ঘটিয়েছে?

বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজ শুধু তথ্য সরবরাহ বা দক্ষ জনশক্তি তৈরি করা নয়। এমন মানুষ গড়ে তোলা, যারা প্রতিষ্ঠিত ধারণাকে প্রশ্ন করার সাহস রাখে। শিক্ষা তখনই অর্থবহ, যখন তা মানুষের স্বাধীন বিচারবোধ গড়ে তোলে।

পরীক্ষাকেন্দ্রিক শিক্ষা ও সনদনির্ভর মানসিকতা জ্ঞানচর্চার পরিসর সংকুচিত করে। আজ তথ্যের অভাব নেই। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে তথ্য আরও সহজলভ্য। কিন্তু গভীর পাঠ, মৌলিক গবেষণা ও স্বাধীন চিন্তার চর্চা আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

আহমদ ছফার বিশ্ববিদ্যালয়-ভাবনার কেন্দ্রবিন্দু ছিল স্বাধীন চিন্তার বিকাশ। তাঁর মতে, বিশ্ববিদ্যালয়ের সাফল্য শুধু দক্ষ পেশাজীবী তৈরিতে নয়; স্বাধীনভাবে চিন্তা করতে পারে এমন মানুষ গড়ে তোলায়। যে বিশ্ববিদ্যালয় কর্মসংস্থানের উপযোগী জনশক্তি তৈরি করে, কিন্তু স্বাধীন ও সমালোচনামূলক চিন্তার মানুষ গড়ে তুলতে পারে না, সে তার মৌলিক দায়িত্ব পূরণ করে না। কারণ বিশ্ববিদ্যালয় শুধু সনদ দেওয়ার প্রতিষ্ঠান নয়; সমাজের বুদ্ধিবৃত্তিক বিবেক গড়ে তোলার অন্যতম প্রধান ক্ষেত্র।

সংস্কৃতি কি ক্ষমতার সমালোচক, নাকি অলংকার

আহমদ ছফার কাছে সংস্কৃতি ছিল সমাজের বিবেক। সাহিত্য, শিল্প ও সংস্কৃতির কাজ ক্ষমতার প্রশংসা করা নয়; বরং প্রয়োজন হলে তাকে প্রশ্ন করা। এ কারণেই তিনি শুধু রাষ্ট্রের সমালোচনা করেননি। সমালোচনা করেছেন সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান, সাহিত্যিক গোষ্ঠী এবং সেই মানসিকতারও, যেখানে সৃজনশীলতার চেয়ে আনুগত্য বেশি মূল্য পায়।

ছফার মতে, কোনো সমাজে সাংস্কৃতিক চর্চা যখন ক্ষমতার প্রভাবমুক্ত থাকতে পারে না, তখন তার সমালোচনামূলক শক্তি ক্ষয় হতে শুরু করে। লেখক বা শিল্পী তখন সত্যের চেয়ে স্বীকৃতি, প্রভাব বা প্রতিষ্ঠানের অনুমোদনকে বেশি গুরুত্ব দেন। ফলে সংস্কৃতি সমাজের বিবেক না হয়ে ক্ষমতার অলংকারে পরিণত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়ে।

আজ এই প্রশ্ন আরও জটিল। রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতার পাশাপাশি করপোরেট প্রভাব এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের জনপ্রিয়তার সংস্কৃতিও শিল্প-সাহিত্যকে প্রভাবিত করছে। দৃশ্যমানতা অনেক সময় গভীরতার চেয়ে বেশি মূল্য পাচ্ছে। এই বাস্তবতায় আহমদ ছফার শিক্ষা হলো—একজন লেখকের সবচেয়ে বড় দায় ক্ষমতার প্রতি নয়; সত্যের প্রতি।

জাতীয়তাবাদ কি আত্মসমালোচনাকে ধারণ করতে পারে

আহমদ ছফার কাছে জাতীয়তাবাদ কেবল আবেগ বা রাজনৈতিক স্লোগান ছিল না। এটি ছিল আত্মপরিচয় বোঝার একটি প্রক্রিয়া। তিনি বাঙালি সমাজ, তার ইতিহাস ও সংস্কৃতিকে গভীরভাবে ভালোবেসেছেন। কিন্তু সেই ভালোবাসা কখনো অন্ধ আত্মপ্রশংসায় পরিণত হয়নি। তাঁর মতে, যে জাতি নিজের দুর্বলতা নিয়ে সৎভাবে কথা বলতে পারে না, সে তার শক্তিকেও দীর্ঘদিন ধরে রাখতে পারে না।

এ কারণেই তিনি ইতিহাসকে রাজনৈতিক বৈধতার উৎস হিসেবে নয়; আত্মসমালোচনার মাধ্যম হিসেবে দেখেছেন। ইতিহাসের কাজ শুধু গৌরবগাঁথা রচনা নয়। সাফল্য ও ব্যর্থতা—দুটিকেই সমান সততার সঙ্গে মূল্যায়ন করা।

ইতিহাস ও জাতীয় পরিচয় নিয়ে বিতর্ক কোনো গণতান্ত্রিক সমাজেই অস্বাভাবিক নয়। সমস্যা তৈরি হয় তখন, যখন ইতিহাস অনুসন্ধান ও গবেষণার বিষয় না হয়ে রাজনৈতিক অবস্থান প্রমাণের হাতিয়ারে পরিণত হয়। তখন ইতিহাসের বহুমাত্রিকতা হারিয়ে যায়। আত্মসমালোচনার পরিবর্তে প্রাধান্য পায় আত্মপ্রশংসা। আহমদ ছফার জাতীয়তাবোধ এই প্রবণতার বিপরীতে দাঁড়ায়। তাঁর কাছে দেশপ্রেম মানে শুধু অতীতের গৌরব উদ্যাপন নয়; নিজের সমাজের সীমাবদ্ধতা ও ব্যর্থতাকেও সত্যনিষ্ঠভাবে দেখার সাহস। কারণ আত্মসমালোচনা ছাড়া কোনো জাতির আত্মপরিচয় পূর্ণতা পায় না।

আহমদ ছফাকে নতুন করে পড়ার প্রয়োজন তাঁর সব মতের সঙ্গে একমত হওয়ার জন্য নয়। প্রয়োজন এই কারণে যে, তিনি আমাদের এমন কিছু প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করান, যেগুলো এড়িয়ে গিয়ে কোনো সমাজ দীর্ঘদিন সুস্থ থাকতে পারে না। রাষ্ট্র, বিশ্ববিদ্যালয়, সংস্কৃতি কিংবা জাতীয়তাবাদ—প্রতিটি ক্ষেত্রেই তিনি স্বাধীন চিন্তা, আত্মসমালোচনা এবং বুদ্ধিবৃত্তিক সততার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন।

সময় বদলেছে। প্রযুক্তি বদলেছে। সমাজের চেহারাও বদলেছে। কিন্তু স্বাধীনভাবে চিন্তা করার প্রয়োজন আজও সমানভাবে রয়ে গেছে। বরং এমন এক সময়ে, যখন দ্রুত প্রতিক্রিয়া অনেক ক্ষেত্রেই গভীর বিশ্লেষণের জায়গা দখল করে নিচ্ছে, তখন আহমদ ছফাকে নতুন করে পাঠ করা মানে শুধু একজন লেখককে স্মরণ করা নয়; নিজেকে প্রশ্ন করার সাহস ফিরে পাওয়া।

আহমদ ছফার উত্তরাধিকার কোনো নির্দিষ্ট মতবাদ নয়; স্বাধীনভাবে ভাবার সাহস। যতদিন সেই সাহসের প্রয়োজন থাকবে, ততদিন তিনি আমাদের জনপরিসরে প্রাসঙ্গিক থাকবেন।

Ad 300x250

সম্পর্কিত