মাহজাবিন নাফিসা

আহমদ ছফার নাম প্রথম শুনেছিলাম বিশ্ববিদ্যালয়ে উঠে, ক্লাসে স্যারের মুখে। কিছুদিন পর ফেসবুকেও তাঁকে খুঁজে পাই। আজ ফেসবুকে ‘আহমদ ছফা’ লিখে খুঁজলেই চোখে পড়ে তাঁর উদ্ধৃতি, পুরোনো সাক্ষাৎকার বা বক্তৃতার অংশ, বইয়ের ছবি, অথবা তাঁকে নিয়ে দীর্ঘ বিতর্ক। প্রায় দুই দশক আগে মৃত্যুবরণ করলেও এখনো তিনি আলোচনায় থাকেন। অথচ জীবদ্দশায় গণমানুষের মধ্যে তাঁর এত পাঠক ছিল না। তাঁর গন্ডি ছিল সীমিত। তবে সাম্প্রতিক সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বদৌলতে তিনি সকলের কাছে পৌছে গেছেন।
জন্মদিনে আহমদ ছফাকে স্মরণ করার সহজ উপায় হতে পারত তাঁর সাহিত্যকীর্তির তালিকা করা। বাংলা সাহিত্যে ঔপন্যাসিক, প্রাবন্ধিক, চিন্তাবিদ হিসেবে তাঁর অবদান অনন্য। কিন্তু মৃত্যুর দুই দশক পরও তাঁর নাম সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ফিরে আসে। অনেক তরুণের কাছে আহমদ ছফার সঙ্গে প্রথম পরিচয় বইয়ের দোকানে নয়, নিউজফিডে। তাঁকে নিয়ে দেখা যায় ফটোকার্ড, কোনো মন্তব্য বা কেউ হয়তো তাঁর উদ্ধৃতি শেয়ার করেছেন। আবার বিশ্ববিদ্যালয়, রাষ্ট্র বা বুদ্ধিজীবীদের নিয়ে কোনো ঘটনায়ও তাঁর মন্তব্যও তুলে ধরেন অনেকেই।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নতুন করে পরিচয় হওয়ার পর এমন অনেকেই তাঁর বই পড়া শুরু করেছেন, যারা এর আগে তাঁর নাম শোনেননি। তাই মনে হয়, ফেসবুক কি আহমদ ছফাকে পুনর্জন্ম দিয়েছে?
ভাইরাল হওয়ার পেছনে
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আহমদ ছফার সবচেয়ে বেশি ছড়িয়ে পড়া বিষয়গুলোর বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ছফা তাঁর নির্ভীকতার জন্য বেশি জনপ্রিয়। কোনো নির্দিষ্ট ঘটনা নয়, তিনি পুরো সমাজের চরিত্রকে নিয়ে লিখেছিলেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সমাজ নিয়ে তাঁর ব্যঙ্গ, বুদ্ধিজীবীদের ভূমিকা নিয়ে কঠোর সমালোচনা, সংস্কৃতি ও রাষ্ট্র নিয়ে তাঁর বিশ্লেষণ কিংবা লেখক হিসেবে আপসহীন অবস্থান—তরুণদের অনুপ্রেরণা দেয়।
গাভী বিত্তান্ত নিয়ে আলোচনা প্রায় প্রতি বছরই নতুন করে শুরু হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ও শিক্ষক রাজনীতির ব্যঙ্গচিত্র হিসেবে লেখা এই উপন্যাসটি প্রকাশের পর যেমন বিতর্ক তৈরি করেছিল, এখনও তেমনি আছে। একইভাবে বুদ্ধিবৃত্তির নতুন বিন্যাস, যদ্যপি আমার গুরু কিংবা তাঁর বিভিন্ন প্রবন্ধ থেকে ছোট ছোট অংশ নিয়মিত সামাজিকমাধ্যমে ঘুরে বেড়ায়।
সামাজিকমাধ্যমে ভাইরাল হওয়া অধিকাংশ উদ্ধৃতিগুলো এমন, যেগুলো পড়লে মনে হয় তিনি যেন আজকের বাংলাদেশ নিয়েই লিখছেন। অথচ সেগুলোর বেশির ভাগই লেখা হয়েছে দুই, তিন কিংবা চার দশক আগে।
বাংলাদেশকে পড়ার এক ভিন্ন মানচিত্র
আহমদ ছফার লেখাকে শুধু সাহিত্য হিসেবে পড়লে তাঁর গুরুত্বের অনেকটাই অধরা থেকে যায়। তিনি সমাজকে পড়ার চেষ্টা করেছেন। তাঁর কাছে উপন্যাস, প্রবন্ধ কিংবা স্মৃতিকথা—সবই ছিল মানুষের আচরণ, ক্ষমতার প্রকৃতি এবং জাতির মানসিকতা বোঝার মাধ্যম।
বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে লিখতে গিয়ে তিনি কেবল একটি প্রতিষ্ঠানের সংকট দেখেননি, দেখেছেন জ্ঞানচর্চার অবক্ষয়। বুদ্ধিজীবীদের সমালোচনা করতে গিয়ে তিনি কোনো ব্যক্তিকে আক্রমণ করেননি, বুদ্ধিবৃত্তিক সততা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। আবার সংস্কৃতি নিয়ে লিখতে গিয়ে তিনি শুধু গান, কবিতা বা নাটকের কথা বলেননি। দেখিয়েছেন একটি জাতির আত্মপরিচয় কীভাবে গড়ে ওঠে।
তাঁর এই জাতিগত বিশ্লেষণের কারণেই তাঁর লেখার বিষয়গুলো আজও প্রাসঙ্গিক মনে হয়। তাই শিক্ষা, সংস্কৃতির বাণিজ্যিকীকরণ বা ক্ষমতার সঙ্গে বুদ্ধিজীবীদের সম্পর্ক—প্রতিটি আলোচনায় তিনি ২০২৬ সালেও প্রাসঙ্গিক।
জনপ্রিয় নাকি সহজলভ্য
আহমদ ছফা জীবদ্দশায় অপরিচিত ছিলেন—এই ধারণা ভুল। সাহিত্যপাড়া, বিশ্ববিদ্যালয় ও বুদ্ধিবৃত্তিক পরিমণ্ডলে তিনি ছিলেন অত্যন্ত পরিচিত এবং প্রভাবশালী একজন লেখক। তাঁর বই নিয়ে বিতর্ক হয়েছে, তাঁর বক্তব্য নিয়ে আলোচনা হয়েছে, তাঁর ব্যক্তিত্ব নিয়ে অসংখ্য স্মৃতিচারণ লেখা হয়েছে।
কিন্তু তিনি সর্বজনের লেখক ছিলেন না। সাধারণ পাঠক তাঁর লেখা পড়তে চাইলে কিছুটা প্রস্তুতি দরকার হতো। ফলে সাধারণ পাঠকের বড় একটি অংশ হয়তো তাঁর নাম জানলেও তাঁর বই কম পড়েছেন।
তবে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম সেই দূরত্ব কমিয়ে দিয়েছে। এখন ছোট একটি ভিডিও বা ফটোকার্ডের জন্য বাঙালি পাঠক প্রায় সবাই জানেন তিনি কি নিয়ে লিখেছেন। ফলে ফেসবুক আহমদ ছফাকে নতুন করে জনপ্রিয় করেনি, তাঁকে নতুন পাঠকের নাগালে এনে দিয়েছে। এরপর তাঁর চিন্তা ও প্রাসঙ্গিকতার জন্য অনেকেই তাঁর বই পরতে আগ্রহ বোধ করেন।
এটাই তাঁর তথাকথিত ‘পুনর্জন্ম’। এটি একজন লেখকের নয়, একজন পাঠকের জন্ম।
ভাইরাল হওয়ার বিপদ
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম আহমদ ছফাকে শুধু নতুন পাঠকের কাছে পৌঁছেই দেয়নি, তৈরি করেছে সংকটও। তাঁর নামে অসংখ্য উদ্ধৃতি বা গল্প ঘুরে বেড়ায়। এর বেশিরভাগ তাঁর লেখা থেকে নেওয়া হলেও, কিছু বিকৃত, অসম্পূর্ণ কিংবা ভুলভাবে তাঁর নামে প্রচারিত কথাও প্রচলিত হয়ে যায়। তখন সেই বাক্যটি হয়তো আলোচনার জন্ম দেয়, কিন্তু তার পেছনের যুক্তি, প্রেক্ষাপট কিংবা বিশ্লেষণটি হারিয়ে যায়।
এটি শুধু আহমদ ছফার ক্ষেত্রে নয়, প্রায় সব বড় চিন্তাবিদের ক্ষেত্রেই ঘটছে। ছফার ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও স্পষ্ট, কারণ তাঁর লেখার ভাষা সরাসরি, তীক্ষ্ণ এবং উদ্ধৃতিযোগ্য। একটি বাক্য আলাদা করলেও তা পাঠকের মনে দাগ কাটে। অথচ সেই বাক্যের আগে-পরে কী যুক্তি ছিল, সেটিই তাঁকে বোঝার আসল চাবিকাঠি।
এখনও অস্বস্তিতে ফেলেন আহমদ ছফা
আহমদ ছফা জীবদ্দশায় যেমন প্রশংসিত হয়েছেন, তেমনি সমালোচিতও হয়েছেন। তিনি এমন একজন লেখক ছিলেন, যিনি খুব কমই কাউকে খুশি রাখার চেষ্টা করেছেন।
রাষ্ট্র নিয়ে লিখতে গিয়ে তিনি রাষ্ট্রকেই প্রশ্ন করেছেন। বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে লিখতে গিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়কেই অস্বস্তিতে ফেলেছেন। বুদ্ধিজীবীদের নিয়ে লিখতে গিয়ে বুদ্ধিজীবীদেরই কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছেন। আবার নিজের প্রিয় মানুষদেরও সমালোচনা করতে দ্বিধা করেননি।
তাঁর লেখায় তিনি বারবার ‘বুদ্ধিবৃত্তিক সততা’র কথা বলেছেন। একজন লেখক, শিক্ষক কিংবা চিন্তাবিদের প্রথম দায়িত্ব সত্যের প্রতি, ক্ষমতার প্রতি নয়—এই বিশ্বাস তিনি বিভিন্ন লেখা ও সাক্ষাৎকারে স্পষ্ট করেছেন। তাই তাঁর লেখা পড়তে গিয়ে পাঠক বারবার নিজের অবস্থান নিয়েও ভাবতে বাধ্য হন। আর প্রশ্ন করার ক্ষমতাই তাঁকে সময়ের বাইরে নিয়ে গেছে।
হুমায়ূন আহমদ থেকে নতুন প্রজন্ম—ছফাকে খোঁজার পথ
গত এক দশকে নতুন প্রজন্মের অনেক পাঠক আহমদ ছফার কাছে পৌঁছেছেন আরেক জনপ্রিয় লেখক হুমায়ূন আহমেদের সূত্র ধরে।
যদ্যপি আমার গুরু বইয়ে হুমায়ূন আহমদকে নিয়ে তাঁর স্মৃতিচারণ, দুজনের সম্পর্ক, পারস্পরিক শ্রদ্ধা, মতভেদ এবং ব্যক্তিগত ঘটনাগুলো সামাজিক মাধ্যমে বহুবার আলোচনায় এসেছে। আবার হুমায়ূন আহমেদের বিভিন্ন সাক্ষাৎকারেও আহমদ ছফার কথা উঠে এসেছে। এই সূত্র ধরেই অনেক তরুণ প্রথম জানতে পেরেছেন বাংলা সাহিত্যে এমন একজন লেখকের কথা, যাঁর প্রভাব তাঁর সমসাময়িক অনেক লেখকের ওপরও ছিল।
এরপর ছফার বই পড়তে গিয়ে আবিষ্কার করেছেন নতুন ধাঁচের এক লেখককে। এভাবে একজন জনপ্রিয় লেখক থেকে আরেকজন গভীর চিন্তকের কাছে পৌঁছে যাওয়ার ঘটনাটিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা।
সময়ের চেয়ে বড় হয়ে ওঠার গল্প
একজন লেখকের প্রকৃত সাফল্য শুধু তাঁর বই কত কপি বিক্রি হয়েছে, তা দিয়ে বিচার করা যায় না। অনেক সময় তাঁর প্রকৃত মূল্য বোঝা যায় মৃত্যুর বহু বছর পর, যখন একেবারে ভিন্ন প্রজন্ম তাঁর লেখায় নিজের সময়কে খুঁজে পায়।
আহমদ ছফার ক্ষেত্রেও যেন সেটাই ঘটছে। তাঁর জন্মের আট দশকেরও বেশি সময় পরে এবং মৃত্যুর দুই দশকের বেশি সময় পেরিয়ে আজকের তরুণেরা আবার তাঁর লেখায় ফিরে যাচ্ছে। দেশ, সমাজ বা সংস্কৃতি নিয়ে একজন নির্ভীক লেখককে জানার আগ্রহে।
এটি কোনো নস্টালজিয়া নয়, এটি পুনরাবিষ্কার। একসময় তাঁকে খুঁজে পেতে বইয়ের দোকান, গ্রন্থাগার বা সাহিত্যচর্চার আড্ডায় যেতে হতো। এখন আহমদ ছফাই চলে আসেন পাঠকের নিউজফিডে, পাঠক মনে জন্ম নেয় কৌতুহল।

আহমদ ছফার নাম প্রথম শুনেছিলাম বিশ্ববিদ্যালয়ে উঠে, ক্লাসে স্যারের মুখে। কিছুদিন পর ফেসবুকেও তাঁকে খুঁজে পাই। আজ ফেসবুকে ‘আহমদ ছফা’ লিখে খুঁজলেই চোখে পড়ে তাঁর উদ্ধৃতি, পুরোনো সাক্ষাৎকার বা বক্তৃতার অংশ, বইয়ের ছবি, অথবা তাঁকে নিয়ে দীর্ঘ বিতর্ক। প্রায় দুই দশক আগে মৃত্যুবরণ করলেও এখনো তিনি আলোচনায় থাকেন। অথচ জীবদ্দশায় গণমানুষের মধ্যে তাঁর এত পাঠক ছিল না। তাঁর গন্ডি ছিল সীমিত। তবে সাম্প্রতিক সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বদৌলতে তিনি সকলের কাছে পৌছে গেছেন।
জন্মদিনে আহমদ ছফাকে স্মরণ করার সহজ উপায় হতে পারত তাঁর সাহিত্যকীর্তির তালিকা করা। বাংলা সাহিত্যে ঔপন্যাসিক, প্রাবন্ধিক, চিন্তাবিদ হিসেবে তাঁর অবদান অনন্য। কিন্তু মৃত্যুর দুই দশক পরও তাঁর নাম সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ফিরে আসে। অনেক তরুণের কাছে আহমদ ছফার সঙ্গে প্রথম পরিচয় বইয়ের দোকানে নয়, নিউজফিডে। তাঁকে নিয়ে দেখা যায় ফটোকার্ড, কোনো মন্তব্য বা কেউ হয়তো তাঁর উদ্ধৃতি শেয়ার করেছেন। আবার বিশ্ববিদ্যালয়, রাষ্ট্র বা বুদ্ধিজীবীদের নিয়ে কোনো ঘটনায়ও তাঁর মন্তব্যও তুলে ধরেন অনেকেই।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নতুন করে পরিচয় হওয়ার পর এমন অনেকেই তাঁর বই পড়া শুরু করেছেন, যারা এর আগে তাঁর নাম শোনেননি। তাই মনে হয়, ফেসবুক কি আহমদ ছফাকে পুনর্জন্ম দিয়েছে?
ভাইরাল হওয়ার পেছনে
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আহমদ ছফার সবচেয়ে বেশি ছড়িয়ে পড়া বিষয়গুলোর বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ছফা তাঁর নির্ভীকতার জন্য বেশি জনপ্রিয়। কোনো নির্দিষ্ট ঘটনা নয়, তিনি পুরো সমাজের চরিত্রকে নিয়ে লিখেছিলেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সমাজ নিয়ে তাঁর ব্যঙ্গ, বুদ্ধিজীবীদের ভূমিকা নিয়ে কঠোর সমালোচনা, সংস্কৃতি ও রাষ্ট্র নিয়ে তাঁর বিশ্লেষণ কিংবা লেখক হিসেবে আপসহীন অবস্থান—তরুণদের অনুপ্রেরণা দেয়।
গাভী বিত্তান্ত নিয়ে আলোচনা প্রায় প্রতি বছরই নতুন করে শুরু হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ও শিক্ষক রাজনীতির ব্যঙ্গচিত্র হিসেবে লেখা এই উপন্যাসটি প্রকাশের পর যেমন বিতর্ক তৈরি করেছিল, এখনও তেমনি আছে। একইভাবে বুদ্ধিবৃত্তির নতুন বিন্যাস, যদ্যপি আমার গুরু কিংবা তাঁর বিভিন্ন প্রবন্ধ থেকে ছোট ছোট অংশ নিয়মিত সামাজিকমাধ্যমে ঘুরে বেড়ায়।
সামাজিকমাধ্যমে ভাইরাল হওয়া অধিকাংশ উদ্ধৃতিগুলো এমন, যেগুলো পড়লে মনে হয় তিনি যেন আজকের বাংলাদেশ নিয়েই লিখছেন। অথচ সেগুলোর বেশির ভাগই লেখা হয়েছে দুই, তিন কিংবা চার দশক আগে।
বাংলাদেশকে পড়ার এক ভিন্ন মানচিত্র
আহমদ ছফার লেখাকে শুধু সাহিত্য হিসেবে পড়লে তাঁর গুরুত্বের অনেকটাই অধরা থেকে যায়। তিনি সমাজকে পড়ার চেষ্টা করেছেন। তাঁর কাছে উপন্যাস, প্রবন্ধ কিংবা স্মৃতিকথা—সবই ছিল মানুষের আচরণ, ক্ষমতার প্রকৃতি এবং জাতির মানসিকতা বোঝার মাধ্যম।
বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে লিখতে গিয়ে তিনি কেবল একটি প্রতিষ্ঠানের সংকট দেখেননি, দেখেছেন জ্ঞানচর্চার অবক্ষয়। বুদ্ধিজীবীদের সমালোচনা করতে গিয়ে তিনি কোনো ব্যক্তিকে আক্রমণ করেননি, বুদ্ধিবৃত্তিক সততা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। আবার সংস্কৃতি নিয়ে লিখতে গিয়ে তিনি শুধু গান, কবিতা বা নাটকের কথা বলেননি। দেখিয়েছেন একটি জাতির আত্মপরিচয় কীভাবে গড়ে ওঠে।
তাঁর এই জাতিগত বিশ্লেষণের কারণেই তাঁর লেখার বিষয়গুলো আজও প্রাসঙ্গিক মনে হয়। তাই শিক্ষা, সংস্কৃতির বাণিজ্যিকীকরণ বা ক্ষমতার সঙ্গে বুদ্ধিজীবীদের সম্পর্ক—প্রতিটি আলোচনায় তিনি ২০২৬ সালেও প্রাসঙ্গিক।
জনপ্রিয় নাকি সহজলভ্য
আহমদ ছফা জীবদ্দশায় অপরিচিত ছিলেন—এই ধারণা ভুল। সাহিত্যপাড়া, বিশ্ববিদ্যালয় ও বুদ্ধিবৃত্তিক পরিমণ্ডলে তিনি ছিলেন অত্যন্ত পরিচিত এবং প্রভাবশালী একজন লেখক। তাঁর বই নিয়ে বিতর্ক হয়েছে, তাঁর বক্তব্য নিয়ে আলোচনা হয়েছে, তাঁর ব্যক্তিত্ব নিয়ে অসংখ্য স্মৃতিচারণ লেখা হয়েছে।
কিন্তু তিনি সর্বজনের লেখক ছিলেন না। সাধারণ পাঠক তাঁর লেখা পড়তে চাইলে কিছুটা প্রস্তুতি দরকার হতো। ফলে সাধারণ পাঠকের বড় একটি অংশ হয়তো তাঁর নাম জানলেও তাঁর বই কম পড়েছেন।
তবে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম সেই দূরত্ব কমিয়ে দিয়েছে। এখন ছোট একটি ভিডিও বা ফটোকার্ডের জন্য বাঙালি পাঠক প্রায় সবাই জানেন তিনি কি নিয়ে লিখেছেন। ফলে ফেসবুক আহমদ ছফাকে নতুন করে জনপ্রিয় করেনি, তাঁকে নতুন পাঠকের নাগালে এনে দিয়েছে। এরপর তাঁর চিন্তা ও প্রাসঙ্গিকতার জন্য অনেকেই তাঁর বই পরতে আগ্রহ বোধ করেন।
এটাই তাঁর তথাকথিত ‘পুনর্জন্ম’। এটি একজন লেখকের নয়, একজন পাঠকের জন্ম।
ভাইরাল হওয়ার বিপদ
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম আহমদ ছফাকে শুধু নতুন পাঠকের কাছে পৌঁছেই দেয়নি, তৈরি করেছে সংকটও। তাঁর নামে অসংখ্য উদ্ধৃতি বা গল্প ঘুরে বেড়ায়। এর বেশিরভাগ তাঁর লেখা থেকে নেওয়া হলেও, কিছু বিকৃত, অসম্পূর্ণ কিংবা ভুলভাবে তাঁর নামে প্রচারিত কথাও প্রচলিত হয়ে যায়। তখন সেই বাক্যটি হয়তো আলোচনার জন্ম দেয়, কিন্তু তার পেছনের যুক্তি, প্রেক্ষাপট কিংবা বিশ্লেষণটি হারিয়ে যায়।
এটি শুধু আহমদ ছফার ক্ষেত্রে নয়, প্রায় সব বড় চিন্তাবিদের ক্ষেত্রেই ঘটছে। ছফার ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও স্পষ্ট, কারণ তাঁর লেখার ভাষা সরাসরি, তীক্ষ্ণ এবং উদ্ধৃতিযোগ্য। একটি বাক্য আলাদা করলেও তা পাঠকের মনে দাগ কাটে। অথচ সেই বাক্যের আগে-পরে কী যুক্তি ছিল, সেটিই তাঁকে বোঝার আসল চাবিকাঠি।
এখনও অস্বস্তিতে ফেলেন আহমদ ছফা
আহমদ ছফা জীবদ্দশায় যেমন প্রশংসিত হয়েছেন, তেমনি সমালোচিতও হয়েছেন। তিনি এমন একজন লেখক ছিলেন, যিনি খুব কমই কাউকে খুশি রাখার চেষ্টা করেছেন।
রাষ্ট্র নিয়ে লিখতে গিয়ে তিনি রাষ্ট্রকেই প্রশ্ন করেছেন। বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে লিখতে গিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়কেই অস্বস্তিতে ফেলেছেন। বুদ্ধিজীবীদের নিয়ে লিখতে গিয়ে বুদ্ধিজীবীদেরই কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছেন। আবার নিজের প্রিয় মানুষদেরও সমালোচনা করতে দ্বিধা করেননি।
তাঁর লেখায় তিনি বারবার ‘বুদ্ধিবৃত্তিক সততা’র কথা বলেছেন। একজন লেখক, শিক্ষক কিংবা চিন্তাবিদের প্রথম দায়িত্ব সত্যের প্রতি, ক্ষমতার প্রতি নয়—এই বিশ্বাস তিনি বিভিন্ন লেখা ও সাক্ষাৎকারে স্পষ্ট করেছেন। তাই তাঁর লেখা পড়তে গিয়ে পাঠক বারবার নিজের অবস্থান নিয়েও ভাবতে বাধ্য হন। আর প্রশ্ন করার ক্ষমতাই তাঁকে সময়ের বাইরে নিয়ে গেছে।
হুমায়ূন আহমদ থেকে নতুন প্রজন্ম—ছফাকে খোঁজার পথ
গত এক দশকে নতুন প্রজন্মের অনেক পাঠক আহমদ ছফার কাছে পৌঁছেছেন আরেক জনপ্রিয় লেখক হুমায়ূন আহমেদের সূত্র ধরে।
যদ্যপি আমার গুরু বইয়ে হুমায়ূন আহমদকে নিয়ে তাঁর স্মৃতিচারণ, দুজনের সম্পর্ক, পারস্পরিক শ্রদ্ধা, মতভেদ এবং ব্যক্তিগত ঘটনাগুলো সামাজিক মাধ্যমে বহুবার আলোচনায় এসেছে। আবার হুমায়ূন আহমেদের বিভিন্ন সাক্ষাৎকারেও আহমদ ছফার কথা উঠে এসেছে। এই সূত্র ধরেই অনেক তরুণ প্রথম জানতে পেরেছেন বাংলা সাহিত্যে এমন একজন লেখকের কথা, যাঁর প্রভাব তাঁর সমসাময়িক অনেক লেখকের ওপরও ছিল।
এরপর ছফার বই পড়তে গিয়ে আবিষ্কার করেছেন নতুন ধাঁচের এক লেখককে। এভাবে একজন জনপ্রিয় লেখক থেকে আরেকজন গভীর চিন্তকের কাছে পৌঁছে যাওয়ার ঘটনাটিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা।
সময়ের চেয়ে বড় হয়ে ওঠার গল্প
একজন লেখকের প্রকৃত সাফল্য শুধু তাঁর বই কত কপি বিক্রি হয়েছে, তা দিয়ে বিচার করা যায় না। অনেক সময় তাঁর প্রকৃত মূল্য বোঝা যায় মৃত্যুর বহু বছর পর, যখন একেবারে ভিন্ন প্রজন্ম তাঁর লেখায় নিজের সময়কে খুঁজে পায়।
আহমদ ছফার ক্ষেত্রেও যেন সেটাই ঘটছে। তাঁর জন্মের আট দশকেরও বেশি সময় পরে এবং মৃত্যুর দুই দশকের বেশি সময় পেরিয়ে আজকের তরুণেরা আবার তাঁর লেখায় ফিরে যাচ্ছে। দেশ, সমাজ বা সংস্কৃতি নিয়ে একজন নির্ভীক লেখককে জানার আগ্রহে।
এটি কোনো নস্টালজিয়া নয়, এটি পুনরাবিষ্কার। একসময় তাঁকে খুঁজে পেতে বইয়ের দোকান, গ্রন্থাগার বা সাহিত্যচর্চার আড্ডায় যেতে হতো। এখন আহমদ ছফাই চলে আসেন পাঠকের নিউজফিডে, পাঠক মনে জন্ম নেয় কৌতুহল।
.png)

আহমদ ছফাকে শুধু একজন কথাসাহিত্যিক হিসেবে পড়লে তাঁর গুরুত্বের বড় একটি অংশ অধরা থেকে যায়। আবার তাঁকে কেবল রাজনৈতিক ভাষ্যকার হিসেবে দেখলেও তাঁর চিন্তার পূর্ণতা ধরা পড়ে না। সাহিত্য, রাষ্ট্র, সমাজ, শিক্ষা, সংস্কৃতি ও জাতীয় পরিচয়—এসবকে তিনি কখনো বিচ্ছিন্নভাবে দেখেননি।
৩৩ মিনিট আগে
আহমদ ছফার ৮৪তম জন্মদিন আজ। তাঁকে স্মরণ করতে গিয়ে বারবার ফিরে যাই আমার স্কুলজীবনের সেই দিনগুলোতে, যখন বই পড়ার আগ্রহটা কেবল গভীর হচ্ছে, নতুন নতুন লেখক আবিষ্কারের আনন্দে দিন কাটে।
১ ঘণ্টা আগে
এই গবেষণার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত নন এমন গবেষকেরাও এই আবিষ্কার নিয়ে বেশ উচ্ছ্বসিত। ইংল্যান্ডের সাউদাম্পটন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাচীন প্রত্নতত্ত্ববিদ আরমান্দো ফালকুচি বলেন, ‘মানব ইতিহাসের ৪ লাখ থেকে ২ লাখ বছর আগের সময়টা নিয়ে সাধারণত খুব কম আলোচনা বা গবেষণা হয়। এই আবিষ্কার সেই অজানা অধ্যায়কে আমাদের সামনে নতু
১ ঘণ্টা আগে
সাঁওতালদের বঞ্চনার গল্পটা বেশ পুরনো। ১৮৫৫ সালের সাঁওতাল বিদ্রোহ উপমহাদেশের ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে এক বৃহৎ গণঅভ্যুত্থান হিসেবে ইতিহাসে স্মরণীয়।
৪ ঘণ্টা আগে