বাবা হারানোর শোক থেকে প্রিন্স মাহমুদের লেখা জেমসের কণ্ঠে সেই অমর গান

প্রকাশ : ২১ জুন ২০২৬, ১৭: ০৯
প্রিন্স মাহমুদের ব্যক্তিগত শোক থেকে জেমসের কণ্ঠে অমর হয়ে ওঠা ‘বাবা’। স্ট্রিম গ্রাফিক

বাবা দিবস এলে আমরা স্বাভাবিকভাবেই আবেগীয় আবহে ডুবে যাই। ফেসবুকের ওয়ালজুড়ে বাবার সঙ্গে তোলা ছবি কিংবা পুরোনো স্মৃতির রোমন্থন চোখে পড়ে। কিন্তু যাদের বাবা নেই? তাঁদের জন্য দিনটি তীব্র হাহাকারের। বাবা মানে বটগাছ, যার ছায়া মাথার ওপর থাকলে যেকোনো ঝড়ের বিরুদ্ধে বুক টান করে দাঁড়িয়ে থাকা যায়। এই নির্ভরতার জায়গাটি যখন ধসে পড়ে, তখন পৃথিবী যে কতটা শূন্য হয়ে যায়, তার দলিল জেমসের গাওয়া ‘বাবা’ গানটি।

প্রিন্স মাহমুদের কথা ও সুরে ‘বাবা’ গানটি গত ২৭ বছর ধরে প্রতিটি সন্তানের মনে এক অদ্ভুত শূন্যতা তৈরি করেছে। এই গান সৃষ্টির পেছনে রয়েছে গীতিকারের জীবনের বিষাদমাখা গল্প।

১৯৯৬-৯৭ সালের কথা। তরুণ প্রিন্স মাহমুদ তখন মা-বাবাকে হারিয়ে ভয়াবহ শূন্যতার ভেতর দিয়ে যাচ্ছেন। খুলনার বাড়ির ছাদে গভীর রাতে আকাশের নক্ষত্রপুঞ্জের দিকে তাকিয়েও কোনো সান্ত্বনা খুঁজে পাচ্ছিলেন না। সেই চরম একাকিত্ব আর বুকের ভেতর জমানো হাহাকার থেকেই জন্ম নেয় ‘মা’ ও ‘বাবা’ গানের সুর ও কথা। যদিও গানগুলো তৈরি হয়েছিল আলাদা আলাদা সময়ে।

প্রিন্স মাহমুদের গান-সৃষ্টির প্রক্রিয়াটি খানিক আলাদা। তিনি সাধারণত আগে সুর করেন, তারপর সেই সুরের মূর্ছনায় লিরিক সাজান। ‘বাবা’ গানটির ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম হয়নি। সুরের প্রতিটি ভাঁজে তিনি বাবার স্মৃতিগুলোকে ধারণ করেছিলেন।

মজার ব্যাপার হলো, জেমস শুরুতে গানটি গাইতে দ্বিধায় ছিলেন। কারণ, কিছুদিন আগেই প্রিন্স মাহমুদের কথা-সুরে ‘মা’ রেকর্ড করেছেন। তাঁর হয়তো মনে হচ্ছিল, একই কণ্ঠে ‘মা’ ও ‘বাবা’ গান দুটি একই আবেগ ও ঘরানার হয়ে যাবে। তাঁর আশঙ্কা ছিল, শ্রোতারা হয়তো একই আবেগীয় প্রেক্ষাপটে ফেলে ‘বাবা’কে পুনরাবৃত্তি হিসেবে মনে করতে পারেন। তাই তিনি প্রিন্স মাহমুদের কাছে অন্য গান চাইলেন।

কনসার্টে 'বাবা' গাইছেন জেমস।
কনসার্টে 'বাবা' গাইছেন জেমস।

তখন স্টুডিওতে আরেক গায়ক হাসান আবিদুর রেজা জুয়েলও ছিলেন। জুয়েল ততোদিনে প্রিন্স মাহমুদের লেখা-সুরে ‘বিদায় শব্দটা কেন এত যন্ত্রণাময়...’ গাওয়া শুরু করেছেন। যদিও এটি তখনও রিলিজ হয়নি। পরে ২০০১ সালে প্রিন্স মাহমুদের কথা-সুর-ব্যবস্থাপনায় ‘চিঠির উত্তর দিও’ অ্যালবামে ‘বিদায় যন্ত্রণাময়’ শিরোনামে তা রিলিজ হয়।

মূল প্রসঙ্গে ফেরা যাক। প্রিন্স মাহমুদ তখন জুয়েলকে প্রস্তাব দিলেন ‘বাবা’ গাইবার জন্য। আর ‘বিদায় যন্ত্রণাময়’ গানটি জেমসকে দিয়ে দেবেন বলে ঠিক করলেন।

কিন্তু পরবর্তী রেকর্ডিং সেশনের চিত্রপট ছিল বেশ নাটকীয়। জেমস ও জুয়েল দুজনেই স্টুডিওতে এলেন। জেমস ‘বিদায় যন্ত্রণা’ গাইবার জন্য প্রস্তুত হওয়ার সময় প্রিন্সকে জানালেন, ‘বাবা’ গানটি তিনি আরেকবার শুনতে চান। মন দিয়ে শুনলেন। তৎক্ষণাৎ নিজের সিদ্ধান্ত বদলে ফেললেন। জানালেন, বাবা গানটি তিনিই গাইবেন। এদিকে জুয়েলও গানটি ভালোভাবে তুলে ফেলেছিলেন। শেষ পর্যন্ত জুয়েল তাঁর আগের গান ‘বিদায় যন্ত্রণাময়’-এই ফিরে গেলেন। এভাবেই এমন নাটকীয় পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে ‘বাবা’ গানটি চলে এল জেমসের কণ্ঠে।

বাবাকে নিয়ে স্মৃতিচারণ ও জেমসের গলায় গান হয়ে ওঠা

বাবার স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে স্ট্রিমের সঙ্গে আলাপচারিতায় প্রিন্স মাহমুদ জানান, ভোরবেলা ঘুম থেকে ওঠা, নিয়ম-নীতি মেনে চলা, সময়ের যথাযথ ব্যবহার, নৈতিকতা ও মূল্যবোধের চর্চা—এই সবকিছুই বাবার কাছ থেকে শিখেছেন। তাঁর বাবা ছিল ধৈর্য আর দায়িত্ববোধের অনন্য উদাহরণ। কিন্তু জীবনের সেই কঠিন সময়ে যখন মা এবং বাবাকে খুব অল্প সময়ের ব্যবধানে হারালেন, তখন সেই শূন্যতা তাঁকে ভয়াবহ পরিস্থিতির মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়েছিল। তিনি জানান, সেই সময় তিনি বাবার ওপরই নির্ভরশীল ছিলেন। তাই বাবাকে হারানোর বিষয়টি পুরো পৃথিবীটা হারিয়ে ফেলার মতোই ছিল। ঠিক যেমন তিনি লিখেছেন:

‘হঠাৎ অজানা ঝড়ে তোমায় হারালাম

মাথায় আকাশ ভেঙ্গে পড়ল’

বাঙালি পরিবারে বাবা ও সন্তানের সম্পর্ক বরাবরই কিছুটা ভিন্ন ধাঁচের হয়। সেখানে এক ধরনের আবেগীয় দূরত্ব থাকে। প্রিন্স মাহমুদ মনে করেন এই দূরত্বের পেছনে কাজ করে বাবার কঠোর অনুশাসন। ফলে সন্তানের মনে বাবার প্রতি ভালোবাসার পাশাপাশি একটা অদৃশ্য ভয়ও কাজ করে। তবে সেই দূরত্বের আড়ালে যে নির্ভরতা লুকিয়ে থাকে, তা কেবল হারানোর পরেই বোঝা যায়। প্রিন্স মাহমুদের মনে করেন, বাবার চলে যাওয়া মানেই হচ্ছে জীবনের ‘সান্ত্বনার জায়গা’ হারিয়ে ফেলা। পৃথিবীটা শূন্য হয়ে যাওয়া।

ভক্ত ও বাংলা গানের শ্রোতাদের মতো প্রিন্স মাহমুদও মনে করেন, জেমসের কণ্ঠের জাদুকরী স্পর্শ এই গানকে অন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে। বিশেষ করে সেই লাইনটি—‘শুধু শুনি না তোমার সেই দরাজ কণ্ঠে পড়া পবিত্র কোরআনের বাণী’—এটি গাওয়ার সময় জেমস যেভাবে তাঁর দরাজ কণ্ঠের ব্যবহার করেছেন, তা যেন সরাসরি প্রিন্স মাহমুদের বাবার গম্ভীর গলার প্রতিধ্বনি হয়ে বেজেছে। তিনি মনে করেন, জেমসের কণ্ঠের সেই বিশেষ এক্সপ্রেশন গানটির আবেগকে পূর্ণতা দিয়েছে। গানের সুর আর জেমসের গায়কী মিলে তৈরি করেছে হাহাকার, যা শ্রোতার হৃদয়ে আজও সমানভাবে আঘাত করে।

শেষ পর্যন্ত এই গান আসলে কী

হতে পারে এই গান সন্তানের পক্ষ থেকে বাবার উদ্দেশ্যে পাঠানো শেষ না হওয়া এক দীর্ঘ চিঠি। যে চিঠি পৌঁছায় না ঠিকই, কিন্তু হৃদয়ের প্রতিটি স্পন্দনে তা জীবন্ত হয়ে থাকে। গানটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় বাবা-সন্তানের সম্পর্কের সেই নিগূঢ় গভীরতার কথা, যা কোনো শব্দে পুরোপুরি ব্যাখ্যা করা সম্ভব নয়।

যারা বাবাকে হারিয়েছেন, এই গানের প্রতিটি লাইন তাঁদের ক্ষতকে তাজা করে দেয়। আবার শোকের মাঝেও এনে দেয় বাবার অস্তিত্বের প্রশান্তি। জেমসের কণ্ঠে ওই ‘দরাজ কণ্ঠে পড়া পবিত্র কোরআনের বাণী’র উল্লেখ যখন গানের সুরে ভেসে আসে, তখন যেন মৃত বাবার উপস্থিতি মূর্ত হয়ে ওঠে। এটিই শিল্পের সার্থকতা।

প্রিন্স মাহমুদের সেই খুলনার বাড়ির বিষণ্ন আকাশ আর জেমসের কণ্ঠের হাহাকার মিলে যে মেলবন্ধন তৈরি হয়েছে, তা কোনোদিন পুরোনো হওয়ার নয়। যতদিন পৃথিবীতে বাবা-সন্তানের রক্ত ও আত্মার সম্পর্ক থাকবে, ততদিন এই গানটি প্রতিটি সন্তানের বুকের ভেতর এক অবিনশ্বর দীর্ঘশ্বাস হয়ে বেঁচে থাকবে।

Ad 300x250

সম্পর্কিত