হানিফ রাশেদীন

আমাদের প্রতিবাদী গানের ইতিহাস দীর্ঘ। ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ ও স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে সংগীত রাজপথে মানুষকে উদ্বুদ্ধ করেছে। প্রতিটি আন্দোলনেই প্রতিবাদী গান নিজস্ব স্বর ও স্বকীয়তা নিয়ে হাজির হয়েছে। চব্বিশের গণঅভ্যুত্থান সেই ধারায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে র্যাপ গান।
রূপক বা শৈল্পিক বর্ণনার বদলে র্যাপ বাস্তবতাকে প্রায় মুখের ভাষায় তুলে ধরে। এই প্রকাশভঙ্গিই একে অন্য সংগীত ধারা থেকে আলাদা করেছে। চব্বিশের জুলাইয়ে রাজপথের সংঘর্ষ, শোক, ক্ষোভ ও প্রতিরোধের প্রতিক্রিয়া তাৎক্ষণিকভাবে উঠে এসেছে র্যাপ গানে। আন্দোলনে জনসম্পৃক্ততা ও গতি সঞ্চারে এই সংগীত ধারা সাংস্কৃতিক চালিকাশক্তির ভূমিকা পালন করে।
চব্বিশের জুলাইয়ে র্যাপের দ্রুত বিস্তারে বড় ভূমিকা রেখেছে ডিজিটাল যোগাযোগব্যবস্থা। ডিজিটাল পরিসরে আন্দোলনের বার্তা মুহূর্তেই ছড়িয়ে পড়ে দেশ-বিদেশের লাখো মানুষের কাছে। একসময় গান মানুষের কাছে পৌঁছাতে রেডিও, টেলিভিশন, অ্যালবাম বা সাংস্কৃতিক পরিবেশনার ওপর নির্ভর করতে হতো। এখন ইউটিউব, ফেসবুক, টিকটকসহ বিভিন্ন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম একটি গানকে কয়েক মিনিটের মধ্যে লাখো মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে পারে। ফলে এ আন্দোলনে র্যাপ জনমত গঠনের কার্যকর সাংস্কৃতিক হাতিয়ার হয়ে ওঠে।
জুলাইয়ের র্যাপ গান তাৎক্ষণিক আবেগ ধারণ করেছে। কোথাও রাষ্ট্রীয় সহিংসতার বিরুদ্ধে ক্ষোভ, কোথাও প্রাণহানির বেদনা, কোথাও ভয় অতিক্রমের প্রত্যয়, আবার কোথাও নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন উচ্চারিত হয়েছে। এক উত্তাল সময়ের ভাষ্য।
একটি গণআন্দোলনকে শুধু রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহ দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না। সরকারি নথি, আদালতের দলিল কিংবা সংবাদ প্রতিবেদন ঘটনার তথ্য সংরক্ষণ করে; গান সংরক্ষণ করে মানুষের আবেগ ও অনুভূতি। একটি প্রজন্ম কীভাবে তার সময়কে দেখেছে, অনুভব করেছে আর নিজের অবস্থান প্রকাশ করেছে; জুলাইয় অভ্যুত্থানে র্যাপ গান তারই এক সাংস্কৃতিক সাক্ষ্য।
দুই
চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানে সময় রাজপথ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও জনপরিসরে র্যাপ গান ছিল অন্যতম আলোচিত সাংস্কৃতিক অনুষঙ্গ। সবচেয়ে বেশি সাড়া জাগায় র্যাপার হান্নান হোসাইনের ‘আওয়াজ উডা’। ১৮ জুলাই প্রকাশিত এ গানের জন্য ২৫ জুলাই তাঁকে গ্রেপ্তার করা হলে গানটি আরও ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। প্রশ্ন ওঠে—একজন র্যাপারকে কেন গ্রেপ্তার করা হলো? তাঁর গানে কী এমন আছে? উত্তর খুঁজতে গিয়েই অনেকের কাছে স্পষ্ট হয়, র্যাপ আন্দোলনের অন্যতম প্রকাশভঙ্গি। ‘আওয়াজ উডা’ মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও সাংস্কৃতিক প্রতিরোধের প্রশ্ন নতুন করে সামনে আনে।
রাজপথের সহিংসতা, রক্তপাত ও মানুষের ক্ষোভ এই গানে সরাসরি উচ্চারিত হয়েছে। বারবার ফিরে আসা ‘আওয়াজ উডা বাংলাদেশ’ শুধু একটি কোরাস নয়; প্রতিবাদে মুখ খোলার আহ্বান। ভয় ও নীরবতা ভেঙে অন্যায়ের বিরুদ্ধে সম্মিলিত কণ্ঠ তোলার ডাক। ‘আওয়াজ উডা’—এই পুনরাবৃত্ত উচ্চারণ গানটিকে মানুষের মুখে মুখে পৌঁছে দেয় এবং আন্দোলনকারীদের মধ্যে সংহতির অনুভূতি জাগিয়ে তোলে।
কোনো শৈল্পিক আড়াল নয়, মুখের ভাষায় প্রতিবাদ—‘রাস্তায় এত রক্ত কাগো... আওয়াজ উডা বাংলাদেশ/ আমার ভাই-বোন মারসে কেডা...’। এখানে শিল্পী আন্দোলনের সহিংস বাস্তবতাকে অলংকারের আড়ালে না রেখে সরাসরি তুলে ধরেছেন। গানটি শুনলে মনে হয়, ঘটনাস্থলে উপস্থিত একজন তরুণ নিজের চোখে দেখা ঘটনার বর্ণনা করছেন; এই প্রকাশভঙ্গিই গানটিকে দ্রুত মানুষের মুখে মুখে পৌঁছে দেয়।
আবু সাঈদ নিহত হন ১৬ জুলাই। দুই দিন পর, ১৮ জুলাই প্রকাশিত ‘আওয়াজ উডা’ গানে হান্নান বলেন, ‘আবু সাঈদরে গুল্লি করলি... এবার রাস্তায় লাখো সাঈদ...’। এখানে আবু সাঈদ শুধু একজন নিহত শিক্ষার্থীর নাম নন; তিনি সম্মিলিত প্রতিরোধের প্রতীক। আবু সাঈদকে আন্দোলনের প্রতীক হিসেবে প্রথম সুস্পষ্টভাবে প্রতিষ্ঠা করেন হান্নান ‘আওয়াজ উডা’ গানে।
আরেকটি বৈশিষ্ট্য হলো সমষ্টিগত ভাষা। পুরো গানজুড়ে ‘আমি’র বদলে সামনে আসে ‘আমরা’ ও ‘বাংলাদেশ’। ব্যক্তিগত প্রতিক্রিয়া নয়, মানুষের সম্মিলিত কণ্ঠই বেশি জোরালো হয়েছে এ গানে।
সেজানের ‘কথা ক’ ইতিহাসের সঙ্গে বর্তমানের সংলাপ। জুলাই অভ্যুত্থানের অধিকাংশ র্যাপ তাৎক্ষণিক ক্ষোভ, শোক ও প্রতিরোধের ভাষ্য। সেজানের এ গানটি জুলাইয়ের ঘটনাপ্রবাহকে দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের বিস্তৃত প্রেক্ষাপটে তুলে ধরে। রাষ্ট্র, সমাজ ও নাগরিক—তিন পক্ষকেই আত্মসমালোচনার মুখোমুখি দাঁড় করায়।
‘৫২-র তে ২৪-এ তফাত কই রে?’—গানের শুরুতেই এই প্রশ্ন। ভাষা আন্দোলন ও জুলাইয়ের ছাত্র আন্দোলনকে এক করে দেখানো হয়নি; বরং জানতে চাওয়া হয়েছে—স্বাধীনতার এত বছর পরও কেন একই প্রশ্ন ফিরে আসে; রাষ্ট্র ইতিহাস থেকে কী শিখেছে? এ প্রশ্ন স্বাধীনতার প্রতিশ্রুতি কতটা বাস্তবায়িত হয়েছে, তারই হিসাব।
‘ছাত্র দিসে ভাষা আইন্না, দ্যাশ বানাইসে ছাত্ররা’—এই পঙ্ক্তি দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ছাত্রসমাজের ভূমিকাকে স্মরণ করিয়ে দেয়। ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে বিভিন্ন গণতান্ত্রিক আন্দোলনের সেই ধারাবাহিকতাকেই শিল্পী বর্তমানের সঙ্গে যুক্ত করেছেন। এর পরের পঙ্ক্তি—‘যেই হাতে কলম-খাতা, ওই হাতে দেস হাতকড়া’—তীব্র এক বৈপরীত্য তৈরি করে। এই চিত্রকল্প শিক্ষার্থীদের প্রতি রাষ্ট্রের দমনমূলক মনোভাবকে স্পষ্ট করে।
গানটি রাষ্ট্রক্ষমতার নৈতিক ভিত্তিকে চ্যালেঞ্জ করে। ‘রাজায় যহন প্রজার জান লয়, জিগা তাইলে রাজা কার?’—এই পঙ্ক্তি তাৎক্ষণিক ঘটনার গণ্ডি ছাড়িয়ে শাসকের দায়বদ্ধতার প্রসঙ্গ সামনে আনে। রাষ্ট্রের বৈধতা শুধু আইনি কর্তৃত্বে নয়; নাগরিকের নিরাপত্তা, ন্যায়বিচার ও অধিকার নিশ্চিত করার মধ্য দিয়েই প্রতিষ্ঠিত হয়।
‘কথা ক’ গানটি মূলত প্রশ্নের ওপর নির্মিত। বারবার ফিরে আসা ‘কথা ক’ এই আহ্বান শুধু রাষ্ট্রের প্রতি নয়, সমাজ ও সাধারণ মানুষের প্রতিও। অন্যায়ের মুখে মানুষ কথা বলবে, নাকি নীরব থাকবে—গানটি সেই প্রশ্নও সামনে আনে। গানটি নীরবতা ভেঙে কথা বলার সাংস্কৃতিক আহ্বান।
র্যাপার এমসিসি-ই ম্যাক ও জিকে কিবরিয়ার যৌথ পরিবেশনায় ‘প্রশ্ন’ গানটি জুলাইয়ের ছাত্র আন্দোলনে বিশেষভাবে আলোচনায় আসে। ‘মইরা যামু কি হইছে?’, ‘১৬ বছর কি হইছে?’, ‘আর স্বাধীনতার কি হইছে?’—এমন প্রশ্নের মধ্য দিয়ে গানটি দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক বাস্তবতা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও রাষ্ট্র-নাগরিক সম্পর্কের সংকট তুলে ধরে। এসব প্রশ্নের উদ্দেশ্য উত্তর খোঁজা নয়; বরং স্বাধীনতার প্রতিশ্রুতি, নাগরিক অধিকার ও রাষ্ট্রের দায়বদ্ধতা নিয়ে নতুন করে ভাবতে উদ্বুদ্ধ করা।
গানটি গণমাধ্যম, প্রশাসন ও ক্ষমতার সম্পর্ককেও সামনে আনে। ‘টিভিতে নেতাটা বলে, বিপক্ষদের সাজানো’ কিংবা ‘ভাই-বোন কবরে, ভুয়া নিউজ খবরে, মিডিয়াটা দখলে’—এ ধরনের উচ্চারণে শিল্পী শুধু রাজনৈতিক ক্ষমতাই নয়, তথ্যপ্রবাহ ও জনমত গঠনের প্রক্রিয়াও সমালোচনার মুখে দাঁড় করিয়েছেন।
র্যাপটির আরেকটি দিক এর মানবিক আবেদন। ‘এতো লাশের কি হইবো?’—এই প্রশ্নটি শুধু নিহত মানুষের সংখ্যা নয়; প্রতিটি মৃত্যুর মানবিক অভিঘাতের কথাও মনে করিয়ে দেয়। একইভাবে ‘কত মায়ের বাধন, লাল সাদা কাফন’ চিত্রকল্পে ব্যক্তিগত শোক জাতীয় বেদনায় রূপ নেয়।
এই অভ্যুত্থানে সংগীত শুধু র্যাপ গানেই সীমাবদ্ধ ছিল না। দেশাত্মবোধক, গণসংগীত ও বিভিন্ন প্রতিবাদী গানও মিছিল, সমাবেশ এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নতুন করে উচ্চারিত হয়েছে। একদিকে পুরোনো গান আন্দোলনকে দেশের দীর্ঘ সংগ্রামের ইতিহাসের সঙ্গে যুক্ত করেছে, অন্যদিকে নতুন র্যাপ গান সমকালীন অভিজ্ঞতা, ক্ষোভ ও প্রতিবাদের ভাষা নির্মাণ করেছে।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের র্যাপ গান একটি প্রজন্মের সময়, প্রতিবাদ, ক্ষোভ ও স্বপ্নের সাংস্কৃতিক দলিল। সময়ের সঙ্গে হয়তো অনেক স্লোগান হারিয়ে যাবে, ব্যানার-ফেস্টুন মুছে যাবে; কিন্তু এই গানগুলো ফিরিয়ে আনবে ২০২৪ সালের সেই উত্তাল জুলাইয়ের স্মৃতি। একটি প্রজন্মের সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার হয়ে থাকবে।

আমাদের প্রতিবাদী গানের ইতিহাস দীর্ঘ। ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ ও স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে সংগীত রাজপথে মানুষকে উদ্বুদ্ধ করেছে। প্রতিটি আন্দোলনেই প্রতিবাদী গান নিজস্ব স্বর ও স্বকীয়তা নিয়ে হাজির হয়েছে। চব্বিশের গণঅভ্যুত্থান সেই ধারায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে র্যাপ গান।
রূপক বা শৈল্পিক বর্ণনার বদলে র্যাপ বাস্তবতাকে প্রায় মুখের ভাষায় তুলে ধরে। এই প্রকাশভঙ্গিই একে অন্য সংগীত ধারা থেকে আলাদা করেছে। চব্বিশের জুলাইয়ে রাজপথের সংঘর্ষ, শোক, ক্ষোভ ও প্রতিরোধের প্রতিক্রিয়া তাৎক্ষণিকভাবে উঠে এসেছে র্যাপ গানে। আন্দোলনে জনসম্পৃক্ততা ও গতি সঞ্চারে এই সংগীত ধারা সাংস্কৃতিক চালিকাশক্তির ভূমিকা পালন করে।
চব্বিশের জুলাইয়ে র্যাপের দ্রুত বিস্তারে বড় ভূমিকা রেখেছে ডিজিটাল যোগাযোগব্যবস্থা। ডিজিটাল পরিসরে আন্দোলনের বার্তা মুহূর্তেই ছড়িয়ে পড়ে দেশ-বিদেশের লাখো মানুষের কাছে। একসময় গান মানুষের কাছে পৌঁছাতে রেডিও, টেলিভিশন, অ্যালবাম বা সাংস্কৃতিক পরিবেশনার ওপর নির্ভর করতে হতো। এখন ইউটিউব, ফেসবুক, টিকটকসহ বিভিন্ন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম একটি গানকে কয়েক মিনিটের মধ্যে লাখো মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে পারে। ফলে এ আন্দোলনে র্যাপ জনমত গঠনের কার্যকর সাংস্কৃতিক হাতিয়ার হয়ে ওঠে।
জুলাইয়ের র্যাপ গান তাৎক্ষণিক আবেগ ধারণ করেছে। কোথাও রাষ্ট্রীয় সহিংসতার বিরুদ্ধে ক্ষোভ, কোথাও প্রাণহানির বেদনা, কোথাও ভয় অতিক্রমের প্রত্যয়, আবার কোথাও নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন উচ্চারিত হয়েছে। এক উত্তাল সময়ের ভাষ্য।
একটি গণআন্দোলনকে শুধু রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহ দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না। সরকারি নথি, আদালতের দলিল কিংবা সংবাদ প্রতিবেদন ঘটনার তথ্য সংরক্ষণ করে; গান সংরক্ষণ করে মানুষের আবেগ ও অনুভূতি। একটি প্রজন্ম কীভাবে তার সময়কে দেখেছে, অনুভব করেছে আর নিজের অবস্থান প্রকাশ করেছে; জুলাইয় অভ্যুত্থানে র্যাপ গান তারই এক সাংস্কৃতিক সাক্ষ্য।
দুই
চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানে সময় রাজপথ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও জনপরিসরে র্যাপ গান ছিল অন্যতম আলোচিত সাংস্কৃতিক অনুষঙ্গ। সবচেয়ে বেশি সাড়া জাগায় র্যাপার হান্নান হোসাইনের ‘আওয়াজ উডা’। ১৮ জুলাই প্রকাশিত এ গানের জন্য ২৫ জুলাই তাঁকে গ্রেপ্তার করা হলে গানটি আরও ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। প্রশ্ন ওঠে—একজন র্যাপারকে কেন গ্রেপ্তার করা হলো? তাঁর গানে কী এমন আছে? উত্তর খুঁজতে গিয়েই অনেকের কাছে স্পষ্ট হয়, র্যাপ আন্দোলনের অন্যতম প্রকাশভঙ্গি। ‘আওয়াজ উডা’ মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও সাংস্কৃতিক প্রতিরোধের প্রশ্ন নতুন করে সামনে আনে।
রাজপথের সহিংসতা, রক্তপাত ও মানুষের ক্ষোভ এই গানে সরাসরি উচ্চারিত হয়েছে। বারবার ফিরে আসা ‘আওয়াজ উডা বাংলাদেশ’ শুধু একটি কোরাস নয়; প্রতিবাদে মুখ খোলার আহ্বান। ভয় ও নীরবতা ভেঙে অন্যায়ের বিরুদ্ধে সম্মিলিত কণ্ঠ তোলার ডাক। ‘আওয়াজ উডা’—এই পুনরাবৃত্ত উচ্চারণ গানটিকে মানুষের মুখে মুখে পৌঁছে দেয় এবং আন্দোলনকারীদের মধ্যে সংহতির অনুভূতি জাগিয়ে তোলে।
কোনো শৈল্পিক আড়াল নয়, মুখের ভাষায় প্রতিবাদ—‘রাস্তায় এত রক্ত কাগো... আওয়াজ উডা বাংলাদেশ/ আমার ভাই-বোন মারসে কেডা...’। এখানে শিল্পী আন্দোলনের সহিংস বাস্তবতাকে অলংকারের আড়ালে না রেখে সরাসরি তুলে ধরেছেন। গানটি শুনলে মনে হয়, ঘটনাস্থলে উপস্থিত একজন তরুণ নিজের চোখে দেখা ঘটনার বর্ণনা করছেন; এই প্রকাশভঙ্গিই গানটিকে দ্রুত মানুষের মুখে মুখে পৌঁছে দেয়।
আবু সাঈদ নিহত হন ১৬ জুলাই। দুই দিন পর, ১৮ জুলাই প্রকাশিত ‘আওয়াজ উডা’ গানে হান্নান বলেন, ‘আবু সাঈদরে গুল্লি করলি... এবার রাস্তায় লাখো সাঈদ...’। এখানে আবু সাঈদ শুধু একজন নিহত শিক্ষার্থীর নাম নন; তিনি সম্মিলিত প্রতিরোধের প্রতীক। আবু সাঈদকে আন্দোলনের প্রতীক হিসেবে প্রথম সুস্পষ্টভাবে প্রতিষ্ঠা করেন হান্নান ‘আওয়াজ উডা’ গানে।
আরেকটি বৈশিষ্ট্য হলো সমষ্টিগত ভাষা। পুরো গানজুড়ে ‘আমি’র বদলে সামনে আসে ‘আমরা’ ও ‘বাংলাদেশ’। ব্যক্তিগত প্রতিক্রিয়া নয়, মানুষের সম্মিলিত কণ্ঠই বেশি জোরালো হয়েছে এ গানে।
সেজানের ‘কথা ক’ ইতিহাসের সঙ্গে বর্তমানের সংলাপ। জুলাই অভ্যুত্থানের অধিকাংশ র্যাপ তাৎক্ষণিক ক্ষোভ, শোক ও প্রতিরোধের ভাষ্য। সেজানের এ গানটি জুলাইয়ের ঘটনাপ্রবাহকে দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের বিস্তৃত প্রেক্ষাপটে তুলে ধরে। রাষ্ট্র, সমাজ ও নাগরিক—তিন পক্ষকেই আত্মসমালোচনার মুখোমুখি দাঁড় করায়।
‘৫২-র তে ২৪-এ তফাত কই রে?’—গানের শুরুতেই এই প্রশ্ন। ভাষা আন্দোলন ও জুলাইয়ের ছাত্র আন্দোলনকে এক করে দেখানো হয়নি; বরং জানতে চাওয়া হয়েছে—স্বাধীনতার এত বছর পরও কেন একই প্রশ্ন ফিরে আসে; রাষ্ট্র ইতিহাস থেকে কী শিখেছে? এ প্রশ্ন স্বাধীনতার প্রতিশ্রুতি কতটা বাস্তবায়িত হয়েছে, তারই হিসাব।
‘ছাত্র দিসে ভাষা আইন্না, দ্যাশ বানাইসে ছাত্ররা’—এই পঙ্ক্তি দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ছাত্রসমাজের ভূমিকাকে স্মরণ করিয়ে দেয়। ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে বিভিন্ন গণতান্ত্রিক আন্দোলনের সেই ধারাবাহিকতাকেই শিল্পী বর্তমানের সঙ্গে যুক্ত করেছেন। এর পরের পঙ্ক্তি—‘যেই হাতে কলম-খাতা, ওই হাতে দেস হাতকড়া’—তীব্র এক বৈপরীত্য তৈরি করে। এই চিত্রকল্প শিক্ষার্থীদের প্রতি রাষ্ট্রের দমনমূলক মনোভাবকে স্পষ্ট করে।
গানটি রাষ্ট্রক্ষমতার নৈতিক ভিত্তিকে চ্যালেঞ্জ করে। ‘রাজায় যহন প্রজার জান লয়, জিগা তাইলে রাজা কার?’—এই পঙ্ক্তি তাৎক্ষণিক ঘটনার গণ্ডি ছাড়িয়ে শাসকের দায়বদ্ধতার প্রসঙ্গ সামনে আনে। রাষ্ট্রের বৈধতা শুধু আইনি কর্তৃত্বে নয়; নাগরিকের নিরাপত্তা, ন্যায়বিচার ও অধিকার নিশ্চিত করার মধ্য দিয়েই প্রতিষ্ঠিত হয়।
‘কথা ক’ গানটি মূলত প্রশ্নের ওপর নির্মিত। বারবার ফিরে আসা ‘কথা ক’ এই আহ্বান শুধু রাষ্ট্রের প্রতি নয়, সমাজ ও সাধারণ মানুষের প্রতিও। অন্যায়ের মুখে মানুষ কথা বলবে, নাকি নীরব থাকবে—গানটি সেই প্রশ্নও সামনে আনে। গানটি নীরবতা ভেঙে কথা বলার সাংস্কৃতিক আহ্বান।
র্যাপার এমসিসি-ই ম্যাক ও জিকে কিবরিয়ার যৌথ পরিবেশনায় ‘প্রশ্ন’ গানটি জুলাইয়ের ছাত্র আন্দোলনে বিশেষভাবে আলোচনায় আসে। ‘মইরা যামু কি হইছে?’, ‘১৬ বছর কি হইছে?’, ‘আর স্বাধীনতার কি হইছে?’—এমন প্রশ্নের মধ্য দিয়ে গানটি দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক বাস্তবতা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও রাষ্ট্র-নাগরিক সম্পর্কের সংকট তুলে ধরে। এসব প্রশ্নের উদ্দেশ্য উত্তর খোঁজা নয়; বরং স্বাধীনতার প্রতিশ্রুতি, নাগরিক অধিকার ও রাষ্ট্রের দায়বদ্ধতা নিয়ে নতুন করে ভাবতে উদ্বুদ্ধ করা।
গানটি গণমাধ্যম, প্রশাসন ও ক্ষমতার সম্পর্ককেও সামনে আনে। ‘টিভিতে নেতাটা বলে, বিপক্ষদের সাজানো’ কিংবা ‘ভাই-বোন কবরে, ভুয়া নিউজ খবরে, মিডিয়াটা দখলে’—এ ধরনের উচ্চারণে শিল্পী শুধু রাজনৈতিক ক্ষমতাই নয়, তথ্যপ্রবাহ ও জনমত গঠনের প্রক্রিয়াও সমালোচনার মুখে দাঁড় করিয়েছেন।
র্যাপটির আরেকটি দিক এর মানবিক আবেদন। ‘এতো লাশের কি হইবো?’—এই প্রশ্নটি শুধু নিহত মানুষের সংখ্যা নয়; প্রতিটি মৃত্যুর মানবিক অভিঘাতের কথাও মনে করিয়ে দেয়। একইভাবে ‘কত মায়ের বাধন, লাল সাদা কাফন’ চিত্রকল্পে ব্যক্তিগত শোক জাতীয় বেদনায় রূপ নেয়।
এই অভ্যুত্থানে সংগীত শুধু র্যাপ গানেই সীমাবদ্ধ ছিল না। দেশাত্মবোধক, গণসংগীত ও বিভিন্ন প্রতিবাদী গানও মিছিল, সমাবেশ এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নতুন করে উচ্চারিত হয়েছে। একদিকে পুরোনো গান আন্দোলনকে দেশের দীর্ঘ সংগ্রামের ইতিহাসের সঙ্গে যুক্ত করেছে, অন্যদিকে নতুন র্যাপ গান সমকালীন অভিজ্ঞতা, ক্ষোভ ও প্রতিবাদের ভাষা নির্মাণ করেছে।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের র্যাপ গান একটি প্রজন্মের সময়, প্রতিবাদ, ক্ষোভ ও স্বপ্নের সাংস্কৃতিক দলিল। সময়ের সঙ্গে হয়তো অনেক স্লোগান হারিয়ে যাবে, ব্যানার-ফেস্টুন মুছে যাবে; কিন্তু এই গানগুলো ফিরিয়ে আনবে ২০২৪ সালের সেই উত্তাল জুলাইয়ের স্মৃতি। একটি প্রজন্মের সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার হয়ে থাকবে।
.png)

চব্বিশের গণ অভ্যুত্থান নিয়ে এরই মধ্যে বেশকিছু গবেষণা হয়েছে। আজকের লেখায় গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী তিনটি গবেষণা নিয়ে আলোচনা করব। গবেষণাগুলোতে এই গণঅভ্যুত্থানকে তিনটি ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে গবেষকরা বিশ্লেষণ করেছেন।
৪ ঘণ্টা আগে
২০০৫ সালে প্রথমবারের মতো দেশের বাইরে পা রেখেছিলেন। গন্তব্য ছিল ভারতের রাজধানী দিল্লি। সেখান থেকেই শুরু হয়েছিল দীর্ঘ পথচলা, যা দুই দশক পর এসে পৌঁছেছে ১০০ দেশ ভ্রমণের মাইলফলকে। আফ্রিকার দেশ জাম্বিয়ায় পা রেখে এই মাইলফলক স্পর্শ করেছেন বাংলাদেশের ভ্রমণপিপাসু তানভীর অপু।
৬ ঘণ্টা আগে
৫ আগস্ট ২০২৪। সকাল ১১টা। ঢাকা-আরিচা মহাসড়কে মানুষের ভিড়, মিছিল আর স্লোগান। দেশজুড়ে তখন খুনের বন্যা। যা দেখিনি, তা-ই দেখছি—চোখের সামনে। দলে দলে কোত্থেকে আসছে এত মানুষ? ভেতরে ভেতরে একটা অভ্যুত্থান ঘটে গেছে।
৮ ঘণ্টা আগে
২০২৬ সালের মে মাসেই প্রায় ৮ হাজার কর্মী ছাঁটাই করেছিল মেটা। গত দুই বছরে গুগলও ছাঁটাই করেছে প্রায় ১২ হাজার কর্মী। তাহলে কী এমন বদলে গেল যে এখন মেটা, গুগল, ব্ল্যাকরকের মতো প্রতিষ্ঠানগুলোই ২৬৫ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করছে শুধু টেকনিশিয়ান আর দক্ষ শ্রমিক তৈরির জন্য?
১০ ঘণ্টা আগে