ad

আরবের বীর আমির হামজা যখন জাভানিজ ‘নায়ক’

মাহমুদুর রহমান
মাহমুদুর রহমান

প্রকাশ : ১৫ মে ২০২৬, ১৩: ৫৩
‘হামজানামা’। সংগৃহীত ছবি

আমির হামজাকে অনেকেই চেনেন। তিনি মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর চাচা। আমির হামজার অভিযানের গল্প ‘হামজানামা’ নামেই পরিচিত। ভারতীয় উপমহাদেশের পাশাপাশি পারস্যেও দারুণ জনপ্রিয় তাঁর অভিযানের গল্প।

পারস্যের প্রভাবেই উপমহাদেশে এসেছিল এই গল্প। বাদশাহ আকবর রীতিমতো তাঁর ‘কিতাবখানা’য় এই কাহিনি নিয়ে বই তৈরি করেছিলেন। সেই বইয়ে ছিল মিনিয়েচার। মজার ব্যাপার হলো আমির হামজার গল্প ‘মেনাক আমির হামজা’ নামে ইন্দোনেশিয়ার জাভা অঞ্চলে পরিচিত।

আমির হামজার জীবনে ছিল যুদ্ধ। তার মধ্যেই ছিল প্রেম। তাঁর বীরত্ব ও প্রেমঘন অভিযান নিয়েই হামজার গল্প। এই কাহিনিগুলোতে আমির হামজা ও তাঁর সঙ্গীরা ইসলামের শত্রুদের বিরুদ্ধে লড়াই করেন। আমির হামজার গল্প সমগ্র মুসলিম বিশ্বেই অত্যন্ত জনপ্রিয়।

মিনিয়েচারে হামজানামা। সংগৃহীত ছবি
মিনিয়েচারে হামজানামা। সংগৃহীত ছবি

পারস্য ভাষার সংস্করণ ‘হামজানামা’ রীতিমতো সচিত্র। প্রচুর মিনিয়েচার আছে তাতে। ১৫৬২ খ্রিষ্টাব্দে তৃতীয় মোগল বাদশাহ আকবরও ‘হামজানামা’র সচিত্র সংস্করণ করার নির্দেশ দেন। ১৪ খণ্ডের এই বইয়ে ১৪০০ পূর্ণ পৃষ্ঠার মিনিয়েচার রাখা হয়। সম্পূর্ণ করতে সময় লেগেছিল ১৫ বছর। কিন্তু এখানেই শেষ নয়। পূর্ব এশিয়ার বেশ কিছু ভাষায় ‘হামজানামা’ অনূদিত হয়।

ধারণা করা হয়, ‘হামজানামা’ প্রথমে মালয় ভাষার মাধ্যমে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় ছড়িয়ে পড়ে। এরপর জাভানিজ, বুগিস ও মাকাসারসহ অন্যান্য আঞ্চলিক ভাষায় অনূদিত হয়। মালয় ইতিহাসগ্রন্থ ‘সুলালাত আল-সালাতিন’ বা ‘সেজারাহ মেলায়ু’তে উল্লিখিত একটি ঘটনাকে আমলে নিতে হয়।

১৫১১ খ্রিষ্টাব্দে পর্তুগিজরা মালাক্কা আক্রমণ করে। আক্রমণের আগের রাতে মালাক্কার অভিজাতরা সুলতান মাহমুদ শাহের কাছে যান। তাঁরা হিকায়াত মুহাম্মদ হানাফিয়াহ পাঠ করার অনুরোধ করেন।

মুহাম্মদ হানাফিয়া ছিলেন মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর নাতি হাসান ও হোসেনের সৎ ভাই। হিকায়াত মুহাম্মদ হানাফিয়া মূলত হানাফিয়ার বীরত্বের গল্প। মালাক্কার অভিজাতরা বিশ্বাস করতেন, হানাফিয়ার অভিজ্ঞতা শোনার মাধ্যমে তারা আক্রমণকারীদের মোকাবেলায় সাহস সঞ্চয় করতে পারবেন।

আরবি লিপিতে হামজানামা। সংগৃহীত ছবি
আরবি লিপিতে হামজানামা। সংগৃহীত ছবি

সুলতান তাদের দৃঢ়তা পরীক্ষা করতে বলেন, ‘আমরা এই মহান বীরের গল্প শোনার যোগ্য নই। তবে এর পরিবর্তে হিকায়াত আমির হামজা শুনতে পারি।’ কিন্তু মালয় অভিজাতরা প্রতিবাদ করে এবং তাদের অনুরোধে অনড় থাকে। শেষ পর্যন্ত সুলতান মাহমুদ শাহ অনুরোধ মেনে নেন এবং হিকায়াত মুহাম্মদ হানাফিয়াহ পাঠের অনুমতি দেন। তবে এই ঘটনা থেকে বোঝা যায় মালাক্কায় আমির হামজার কাহিনিও পরিচিত ছিল।

মালয় ঐতিহ্যে হিকায়াত মুহাম্মদ হানাফিয়াহ অধিক বীরত্বের প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। কিন্তু জাভানিজ সাহিত্যে আমির হামজার গল্পই বেশি জনপ্রিয়। খেয়াল করার মতো বিষয়, জাভায় আমির হামজাকে ‘মেনাক’ উপাধি দেয়া হয়—যা একটি প্রাচীন জাভানিজ উপাধি।

জাভানিজ ধারায় বীর, অভিজাত, রাজপুরুষদের এই নামে ডাকা হতো। সহজ করে বললে, মেনাক হলো জাভানিজ ‘নায়ক’ এবং এটি জাভানিজ নায়কদের আখ্যান বলার একটি ধারা। ‘হামজানামা’ জাভানিজ মেনাক ধারা অনুসারেই লেখা ও প্রচলিত হয়ে যায়।

মেনাক ধারায় আমির হামজার সঙ্গে দুইজন পানাকাওয়ান সঙ্গী যুক্ত করা হয়। এদের একজন মারমায়া (হামজানামার উমর উমাইয়া চরিত্রেও ওপর ভিত্তি করে তৈরি) এবং অন্যজন মারমাদি। পানাকাওয়ান মূলত নায়কের পার্শ্বচর। তারা নায়কের পরামর্শদাতা ও চতুর সহচর। এরা নানাভাবে নায়ককে সাহায্য করে। জাভানিজ পুতুল নাটকওয়ায়াংয়ে পানাকাওয়ানদের দেখা যায়।

২০১৮ সালের দিকে দুটি পাণ্ডুলিপি ডিজিটাইজ করে প্রকাশ করা হয়। এর দুটিই জাভানিজ, তবে দুটি ভিন্ন লিপিতে রচিত। ‘এমএসএস জাভ ৪৫’ নামের পাণ্ডুলিপিটি জাভানিজ লিপিতে লেখা। এই লিপিটি ভারতীয় (দক্ষিণ ব্রাহ্মী) উৎস থেকে উদ্ভূত এবং বাম থেকে ডানে পড়া হয়। পাণ্ডুলিপিটিতে জাভানিজ সন ১৭৩৫ (৪ জুন ১৮০৮ খ্রিস্টাব্দ) উল্লেখ আছে। আামির হামজার গল্প এতে ৮৫টি সর্গে পদ্যরূপে লেখা আছে।

জাভানিজ লিপিতে হামজানামা। সংগৃহীত ছবি
জাভানিজ লিপিতে হামজানামা। সংগৃহীত ছবি

‘এমএসএস জাভ ৭২’ নামে আরো একটি পাণ্ডুলিপি পাওয়া যায়। এটি পেগন লিপিতে লেখা। এই লিপি আরবি লিপির সঙ্গে জাভানিজ উচ্চারণের জন্য অতিরিক্ত সাতটি অক্ষর যুক্ত করে তৈরি, এবং ডান থেকে বামে পড়া হয়। প্রথম দুটি পৃষ্ঠা কালো কালি দিয়ে আঁকা অলংকৃত ফ্রেমে সজ্জিত। সেখানে একটি হীরা আকৃতির একটি আয়তক্ষেত্রের উপর স্থাপিত। এটি জাভানিজ অলংকরণের একটি বিশেষ শৈলী।

তৃতীয় একটি পাণ্ডুলিপিও পাওয়া গিয়েছে। ইয়োগ্যাকার্তা থেকে সংগৃহীত মেনাক আমির হামজার তৃতীয় একটি পাণ্ডুলিপি ব্রিটিশ লাইব্রেরিতে সংরক্ষিত আছে। এর ভূমিকায় উল্লেখ আছে যে এটি সুলতান প্রথম হামেংকুবুওয়ানার স্ত্রী—দ্বিতীয় হামেংকুবুওয়ানার মা রাটু আগেংয়ের (আনুমানিক ১৭৩০–১৮০৩ খ্রিস্টাব্দ) জন্য রচিত। ১৭৯২ সালের পরে কোনো এক সময়ে আখ্যানটি রচিত হয়। মেনাক আমির হামজার এটিই সবচেয়ে পাণ্ডুলিপিটি বলে গবেষকরা মনে করেন। পেগন লিপিতে লেখা এই পাণ্ডুলিপির ব্যাপ্তি প্রায় ৩ হাজার পৃষ্ঠা।

আমির হামজার এই জাভানিজ সংস্করণ প্রমাণ করে গল্প সবসময়ই বয়ে চলে। কাল ও স্থানে সীমাবদ্ধ থাকে না। সে কারণেই আরবের গল্প পারস্য হয়ে ভারত পার করে বাংলায় এসে পুঁথিতে যেমন বেঁচে থাকে, তেমনি জাভানিজ সংস্কৃতির সঙ্গেও আত্মীকরণ করে নেয়।

  • লেখাটি তৈরিতে স্ক্রল ডট ইনে প্রকাশিত অ্যানাবেল গ্যালপের নিবন্ধের সাহায্য নেয়া হয়েছে
Ad 300x250
লেটেস্ট
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত