leadT1ad

ম্যাক্সিম গোর্কির প্রবন্ধ / জাভেদ হুসেনের অনুবাদ

ঘড়ি

জাভেদ হুসেন
লেখা: ম্যাক্সিম গোর্কি

প্রকাশ : ১৮ জুন ২০২৬, ১৭: ২০
ম্যাক্সিম গোর্কি। স্ট্রিম গ্রাফিক

নিস্তব্ধ রাতের নিঃসঙ্গতায় ঘড়ির একটানা সুন্দর আওয়াজ শোনা এক অদ্ভুত অভিজ্ঞতা। সেই আওয়াজ একঘেয়ে। অংকের হিসেবে নির্ভুল। সেই শব্দ প্রতিনিয়ত একটিমাত্র সত্য জানিয়ে যাচ্ছে— জীবনের গতি অবিরাম।

রাতের এই অন্ধকারে পৃথিবী ডুবে আছে। পৃথিবী স্বপ্ন দেখছে। সবকিছু স্থির। শুধু শীতল কঠোর ঘড়িটিই মানুষকে সেকেন্ড পার হয়ে যাওয়ার কথা মনে করিয়ে দেয়। দোলক দুলছে। তার প্রতি দোলনে জীবন এক সেকেন্ড করে ছোট হয়ে আসছে। এই সেকেন্ড, সময়ের এই ক্ষুদ্র কণা, আমাদের প্রত্যেকের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু সে বয়ে যায়। বয়ে গেলে আর কখনো ফিরে আসে না। এই সেকেন্ড কোত্থেকে এল? আর যায় কোথায়? কেউ উত্তর দেয় না.... আরও অনেক প্রশ্ন আছে যার উত্তর পাওয়া যায় না। অনেক গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। অথচ এই সব প্রশ্নের উত্তরের ওপর নির্ভর করে আমাদের জীবনের সুখ।

কেমন করে বাঁচলে মনে হবে যে আমরা বৃথা বাঁচিনি? কেমন হলে হারাবে না আমাদের বিশ্বাস আর ইচ্ছাশক্তি? কেমন করে বাঁচব যাতে বুদ্ধিবৃত্তি আর অনুভূতি ছাড়া একটা সেকেন্ডও পার না হয়? ঘড়ি কি এর কোনো উত্তর দেবে না? ওহ! এই অন্তহীন গতি! ঘড়ি কি নিজেও এর অর্থ জানে?

২.

পৃথিবীতে ঘড়ির চেয়ে শান্ত সমাহিত আর কিছুই নেই। আমাদের জন্মের মুহূর্তে, উদগ্রীব যৌবনের স্বপ্নের ফুল কুড়োনোর কালে সে একইভাবে টিকটিক করত। জন্মের দিন থেকেই মানুষ অন্তিম লগ্নের দিকে এগিয়ে চলছে। আর যখন সে মৃত্যুশয্যায় শুয়ে, তখনও ঘড়ি জন্মমুহুর্তের মতোই শীতল ভাবলেশহীনন হয়ে তার সেকেন্ডগুলো গুনে চলবে।

এই নিরুত্তাপ গুনে যাওয়ায় কখনও কি তার মনে হয় যে সে সব জানে? এই সব জানায় সে কি ক্লান্ত? এই গুনে চলার ক্লান্তিহীন সুরে তো কখনো উত্তেজনা স্পর্শ করে না। তার কাছে তো পবিত্র বলে কিছু নেই।

টিক-টিক! তুমি যদি ভাবো যে এই নিরন্তর গতির মানে কী, তবে অযোগ্যতা লজ্জা তোমাকে দাবিয়ে দেবে। কিন্তু এই চেতনা তো তোমাকে জাগিয়েও তুলতে পারে। সে তো তোমাকে জীবনের সঙ্গে লড়াইয়ে নামাতে পারে! যে জীবন তোমাকে অপমান করে, তার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করো।

ঘড়ি আমাদের প্রতি উদাসীন। যদি আমরা বাঁচতে চাই, তবে আমাদের অন্য একটি ঘড়ি সংগ্রহ করতে হবে। সে ঘড়ি হবে অনুভূতি ও চিন্তায় কানায় কানায় পূর্ণ। জীবনের সেই একঘেয়ে, নিরস, শীতল টিকটিক শব্দ হতাশায় আমাদের প্রাণকে রুদ্ধ করে দেয়।

৩.

টিকটিক, টিকটিক। ঘড়ির এই ক্লান্তিহীন তাড়াহুড়োর মধ্যে বিশ্রামের কোনো অবকাশ নেই। দিনশেষে বর্তমান বলতে আমরা কী বুঝি? এক নবজাতক মুহূর্তের পিছু পিছু আসে অন্য মুহূর্ত। সে আসতেই প্রথম মুহূর্ত অতীতে হারিয়ে যায়।

টিকটি, আর হঠাৎ করেই আমরা সুখী। টিকটিক, আর আমাদের হৃদয়ে কে যে ঢেলে দেয় দুঃখের বিষ। আমাদের জীবনের প্রতিটি সেকেন্ড যদি নতুন আর সৃজনশীল কিছু দিয়ে পূর্ণ না করি তবে এই বিষ সারা জীবন আমাদের হৃদয়ে ঠাই করে নেওয়ার হুমকি দেয়। ভোগান্তির মধ্যে এক ধরনের সম্মোহনী শক্তি আছে। সে খুব বিপজ্জনক। যদি আমাদের মধ্যে আসন পাতে, তবে আমরা মানুষের ডাকের মূল্য ভুলে যাই। তখন মনে হয় এই জগৎ ভোগান্তি ছাড়া যেন আর কিছু নয়। তখন মানুষের প্রতি ভালবাসা তার দাবি হারিয়ে ফেলে। তাই ভোগান্তিকে গুরুত্বপূর্ণ কিছু হিসেবে দেখা বোকামি। না, তারচেয়ে বরং প্রাণকে আরও অন্য কিছু দিয়ে পূর্ণ করা যাক। সে কি সম্ভব না?

ভোগান্তি এক মূল্যহীন সম্পদ। আর জীবন নিয়ে অন্যের কাছে অভিযোগ করে কী হবে? সান্ত্বনার মধ্যে মানুষ যা খোঁজে, তা খুব কমই থাকে। জীবন আরও সমৃদ্ধ, আরও আকর্ষণীয় হয় যদি মানুষ তার প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে একা লড়াই করার চেষ্টা করে। কেবল লড়াইয়ের মাধ্যমেই জীবনের নিরস হতাশাজনক মুহূর্তগুলো অদৃশ্য হয়ে যায়।

টিকটিক! মানুষের জীবন হাস্যকর রকম ছোট। সবচেয়ে ভালো কীভাবে বাঁচা যায়? কেউ কেউ জেদ করে জীবন থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়। বাকিরা নিজেদের জীবনের প্রতি উৎসর্গ করে পুরোপুরি। জীবনের শেষে জীবন থেকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়া মানুষগুলো স্মৃতি থেকে একেবারে বঞ্চিত রয়ে যায়। পরের মানুষেরাই বরং ঋদ্ধ। সবাই তো দিনশেষে মারা যায়। কারও হাতেই কিছু অবশিষ্ট থাকে না। তবে হ্যাঁ, যদি আনন্দের সাথে অন্যদের হৃদয়ে কিছু ভালবাসা রেখে যেতে পারি… তাই রয়ে যায়। এই দিয়ে যাওয়া মানুষের মৃত্যুর সময় ঘড়ি তার সেকেন্ডগুলো গুনবে। টিক-টিক! আর সেই সেকেন্ডগুলোর মধ্যেই নতুন মানুষ জন্ম নেবে।

টিকটিক! টিকটিক! জয় হোক শক্তিশালী প্রাণের, সাহসী মানুষের! যারা তাদের জীবন উৎসর্গ করে সত্য, ন্যায়বিচার আর সৌন্দর্যের জন্য!

যে অন্ধ ডাকে আমরা জীবনের পথে পা বাড়াই, যে অন্ধ ডাকে শেষ হয় জীবন… আমাদের কি এই অন্ধত্বের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করা উচিত নয়? যদি তুমি জীবনকে ভালোবাসো তবে বেঁচে থাকার সময় তোমার ভবিষ্যৎ স্মৃতিকে শক্তিশালী করো। আর রহস্যময় সময়ের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করো। জীবনে তোমার ভূমিকা নিয়ে ভাবো। একটি ইট তৈরি হয়েছিল। তারপর থেকে সে দেয়ালে নিশ্চল হয়ে রইল। তারপর তা ধুলো হয়ে অদৃশ্য হলো। কেবল ইট হওয়াটা কি নিরস ও কুৎসিত নয়? ইটের মতো হয়ো না তুমি। তোমার সমস্ত ঝোড়ো অনুভূতি চেখে দেখতে দীর্ঘশ্বাস ফেলো!

৪.

টিক-টিক! তুমি যদি ভাবো যে এই নিরন্তর গতির মানে কী, তবে অযোগ্যতা লজ্জা তোমাকে দাবিয়ে দেবে। কিন্তু এই চেতনা তো তোমাকে জাগিয়েও তুলতে পারে। সে তো তোমাকে জীবনের সঙ্গে লড়াইয়ে নামাতে পারে! যে জীবন তোমাকে অপমান করে, তার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করো।

প্রকৃতি যখন মানুষকে সোজা হয়ে দাঁড়াতে শেখাল, সঙ্গে সে তাকে একটি লাঠি দিল—স্বপ্ন। আর তখন থেকেই সে সহজাতভাবে দূর থেকে আরও দূরে যেতে চায়। এই আকাঙ্ক্ষাকে সচেতন করো। মানুষকে শেখাও যে মানবতার প্রকৃত সুখ দূর থেকে আরও দূরে যাওয়ায়। নিজেদের ক্ষমতাহীনতার জন্য দোষারোপ কোরো না। অভিযুক্ত করে তুমি কেবল করুণা পেতে পারো। সব মানুষই অসুখী। কিন্তু সবচেয়ে অসুখী তারা যারা নিজেদের অসুখের বড়াই করে।

দূরে যাওয়ার আকাঙ্ক্ষাই জীবনের সবচেয়ে বড় লক্ষ্য। তোমার পুরো জীবন যেন এমন এক আকাঙ্ক্ষা হয়। আর তখন সবচেয়ে মহিমাময় মুহুর্তলো তোমার প্রাপ্য হবে।

৫.

টিক-টিক! যে দুর্দশাগ্রস্ত, তাকে কেন আলো দেওয়া হয়? আর যার পথ লুকানো, মানুষকে কেন জীবন দেওয়া হয়? এই প্রশ্ন প্রাচীনকালের আইয়ুব ঈশ্বরের কাছে রেখেছিলেন। আজ আর এমন সাহসী মানুষ নেই যারা ঈশ্বরের কাছাকাছি পর্যায়ে গিয়ে ঈশ্বরের সাথে কথা বলতে ভয় পায় না। মানুষ নিজেদের খুব ছোট, খুব তুচ্ছ মনে করে। তারা জীবনকে যথেষ্ট ভালোবাসে না, নিজেদেরও না। তারা ব্যথাকে ভয় পায়। কারণ তারা জানে তারা মৃত্যুর কাছ থেকে পালাতে পারবে না। কেবল নিজের কাজ সম্পন্ন করার আনন্দই মৃত্যুর ভয় দূর করতে পারে।

টিক-টিক! আর মানুষের যা অবশিষ্ট থাকে তা হলো তার কাজ। তার সময়গুলো ভেঙে পড়ে। সঙ্গে তলিয়ে যায় সময়ের সঙ্গে বেড়ে ওঠা আকাঙ্ক্ষা। একটি সেকেন্ড ঠেলে সরিয়ে জায়গা করে নেয় অন্য নব্জাতক সেকেন্ড। জীবনের পরিমাপ! নিষ্ঠুর সময়!

৬.

টিক-টিক! টিক-টিক! বৈপরীত্যে পূর্ণ এই বিশ্বে মিথ্যা আসলেই খুব ধূর্ত। যদি মানুষ একে অপরকে রক্ষা করার চেষ্টা করত, আর যদি প্রত্যেকের একজন প্রকৃত বন্ধু থাকত, তবে সবকিছু নিয়ে ভাবনার কিছু থাকত না। ব্যক্তি যত মহানই হোক, তার গুরুত্ব খুব কম। পারস্পরিক বোঝাপড়া প্রয়োজনীয়। আমরা যেভাবে নিজেদের প্রকাশ করি তা আমাদের চিন্তার মতো স্পষ্ট নয়। বন্ধুর কাছে নিজের হৃদয় খুলে দিতে গিয়ে মানুষ শব্দের অভাব অনুভব করে। একটি চিন্তার সঙ্গে জন্ম নেয় সেই চিন্তাকে মূর্ত করার গভীর আন্তরিক ইচ্ছা। কিন্তু অভাব হয় শব্দের।

তাই, চিন্তার প্রতি আরও মনোযোগ দাও! জন্ম নেওয়া চিন্তার সংখ্যা বাড়াতে সাহায্য করো। তোমার কষ্ট বৃথা যাবে না। তুমি সব জায়গায় চিন্তা খুঁজে পাবে। এমনকি পাথরের ফাটলেও। তারা সেখানে অপেক্ষা করে তোমার জন্য।

৭.

টিকটিক! টিকটিক! জয় হোক শক্তিশালী প্রাণের, সাহসী মানুষের! যারা তাদের জীবন উৎসর্গ করে সত্য, ন্যায়বিচার আর সৌন্দর্যের জন্য!

আমরা এই মানুষদের চিনি না। কারণ তারা পুরস্কারের পেছনে ছোটে না। আমরা দেখি না তারা সত্যের বেদীতে কী আনন্দের সাথে আপন হৃদয় উৎসর্গ করে। কিন্তু তারা জীবনের ওপর আলো ফেলে অন্ধদের দেখতে বাধ্য করে। অন্ধদের দেখতে শেখানো জরুরি। কারণ তাদের সংখ্যা অনেক বেশি। জীবনে নিজের অযোগ্যতা দেখার জন্য চোখ খুলতে হয়।

জয় হোক সেই মানুষের যে নিজের ইচ্ছার প্রভু! পুরো পৃথিবী তার হৃদয়ে বাস করে। তার প্রাণে বাস করে সমস্ত ব্যথা ও কষ্ট। পূর্ণ হৃদয় নিয়ে সে এই লড়াইয়ের জন্য তার সমস্ত সময় উৎসর্গ করে। আর তার জীবন ঝোড়ো আনন্দ, সুন্দর ক্রোধ ও গর্বিত জেদে ভরপুর।

নিজেকে ছাড় দিয়ো না। এই হলো পৃথিবীর সবচেয়ে মহিমাময় সত্য। জয় হোক সেই মানুষের যে নিজেকে ছাড় দিতে জানে না! বেঁচে থাকার মাত্র দুটি উপায় আছে— পচে যাওয়া অথবা পুড়ে যাওয়া। কাপুরুষ ও লোভীরা প্রথমটি বেছে নেয়। সাহসী ও উদাররা দ্বিতীয়টি।

আমাদের অস্তিত্বের মুহূর্তগুলো ফাঁকা। এসো আমরা নিজেদের ছাড় না দিয়ে জীবনকে পূর্ণ করি! জয় হোক সেই মানুষের যে নিজেকে ছাড় দিতে জানে না!

Ad 300x250

সম্পর্কিত