ফাবিহা বিনতে হক

প্রতি বছর বাবা দিবস এলেই ফেসবুকের হোমপেজ ভরে যায় বাবাকে নিয়ে লেখা সুন্দর সুন্দর কথা আর স্মৃতিতে। বাবা সুপারম্যান, বাবা সব আবদার পূরণ করেছেন; এমন অনেককিছু। আমি কখনও তেমন লিখেছি কি-না মনে পড়ে না, লেখার কথা না। বাবাকে সুপারম্যান হিসেবে দেখে আমরা অভ্যস্ত না। ঠিক যেমনটা অভ্যস্ত না ‘বাবা’কে ‘বাবা’ বলে ডাকতে। আমরা তাঁকে ‘আব্বু’ বলে সম্বোধন করি।
আমার বাবাকে ‘বাবা’ থেকে বেশি ‘স্বপ্নবান’ মানুষ হিসেবে দেখেছি। দেখেছি ‘গম্ভীর’, ‘আত্মমগ্ন’ মানুষ হিসেবে। ছোটবেলায় দেখতাম আব্বু কলেজ যাচ্ছেন, ফিরে নামাজ পড়ছেন, আমাদের নিয়ে খেতে বসছেন আর অবসর সময়ে বই পড়ছেন। তারপর অনেকগুলো দিন তাঁকে দেখেছি লেখালেখি করে যেতে বিপুল মনোযোগে। সেই মনোযোগে আমরা বিঘ্ন ঘটালে স্বাভাবিকভাবেই তিনি বিরক্ত হতেন। সবচেয়ে বিরক্ত হতেন তাঁর লেখার সাদা কাগজে আমি যদি কিছু লিখে দিয়ে আসতাম তখন। অর্থহীন কথা লিখে আব্বুর লেখা কোনো গল্প অথবা কোনো উপন্যাস লেখার কাগজ আমি নষ্ট করতাম। কেন এই কাজ করতাম, জানি না। শুধু ছোট ছিলাম বলেই কি? নাকি আব্বুর মতো আমিও লিখতে চাইতাম বলে? আজকাল মনে হয়, দ্বিতীয় উত্তরটাই সবচেয়ে যুক্তিসংগত।
আমার বাবাকে আমি কখনোই ‘খুব ভালো বাবা’ ভাবতাম না। তিনি আমাদের প্রতি কিছু বিষয়ে ভীষণ কঠোর ছিলেন বলে মনে হতো। যেমন ছোটবেলায় একবার কারও গাছের মেহেদি পাতা না বলেই নিয়ে এসেছি বাটার জন্য। অথচ মেহেদি কীভাবে পাটায় বাটতে হয়, জানি না। কাঠের পিড়ির মধ্যে অল্প কিছু পাতা নিয়ে বোতল দিয়ে বাটার চেষ্টা করছি।
আব্বু জিজ্ঞেস করলেন, যার গাছের পাতা তাকে জিজ্ঞেস করে নিয়েছি কি-না। আমি বললাম, না। তিনি বেশ ধমকে দিলেন। এভাবে না বলে কারও জিনিস নেওয়া ঠিক না বলে। মেহেদি গাছের মালিককে এ ব্যাপারে না জানিয়ে আসলে তিনি আমার সঙ্গে কথা বলবেন না বলেও হুমকি দিলেন। আমার যত দূর মনে পড়ে, ‘কথা বন্ধ’ করার হুমকি তিনি বহুবার আমাদের দিয়েছেন।
আরেকবার আমাদের বাসা সহকারীকে আমি ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিলাম। আমি তখন বেশ ছোট, ক্লাস ওয়ানে বা টু-এ পড়ি। আমার মা বড় বড় অভিযোগের দায়ভার দিতেন আব্বুর ওপর। তিনি শাস্তি হিসেবে বললেন, বাসার সহকারীকে ‘সরি’ বলতে হবে। আমি বাধ্য হয়েই সরি বললাম। আর ধরে নিলাম, এমন কাজ করলে বারবার এ ধরনের বিচারের মুখে পড়তে হবে।
ক্লাস ফাইভ বা সিক্সে থাকতে একবার স্কুলের ম্যাগাজিনের জন্য গল্প বা কবিতা চাওয়া হলো শিক্ষার্থীদের থেকে। আমার বাবা যেহেতু লেখেন, বাচ্চাদের জন্য লেখা কি তাঁর জন্য কঠিন কিছু? তিনিই লিখে দেবেন। মেয়ের জন্য এতটুকু বাবা-মা কী করেন না? আমার আব্বু লিখলেন না। তিনি বলে দিলেন, এটা তো ডিজঅনেস্টি। তুমি যেমন পারো, তেমন লিখবে। আমার লেখা তো চাওয়া হয়নি।’
হতাশ হলাম। ভাবলাম সবার বাবা ভালো, শুধু আমার বাবা ছাড়া!
এভাবে আমার শৈশব কেটে গেল। কিছুটা বড় হলাম। জীবন ও জগৎ বুঝতে শেখার চেষ্টা করছি। কৈশোরকালের যেসব পাঠ সাধারণত কিশোর-কিশোরীদের না দিয়েই এই জটিল সময়ে পাঠিয়ে দেওয়া হয়, তিনি এই ভুল করলেন না। আমাকে বুঝিয়েছিলেন, সামনে কী কী হতে পারে। কখনও কোনো দুষ্টু বালক কোনো প্রস্তাব দিলে কীভাবে চিন্তা করতে হবে, সেটাও বুঝিয়েছিলেন। ‘এই বয়সে আমি কীভাবে ভাবতে পারি’ সেটা যেমন তিনি বলেছেন আবার ‘কীভাবে ভাবা উচিত’ সেটাও বলেছেন।
আব্বুকে নিয়ে আমার সবচেয়ে সুন্দর স্মৃতিও হয়তো অন্যদের চেয়ে আলাদা। প্রতি শুক্রবার বই কিনতে যেতেন মোড়ের একটা দোকানে। সেখানে ঈদসংখ্যা, সাপ্তাহিক পত্রিকাসহ আরও অনেক নামকরা বই কিনতে পাওয়া যেত। আমিও আব্বুর হাত ধরে সেই দোকানে যেতাম, কিনে আনতাম ঠাকুমার ঝুলি থেকে শুরু করে শিশুদের যত রূপকথার বই আছে সব। বই কেনা নিয়ে আব্বু কখনো কার্পণ্য করেননি। তিনি বই পড়ার সময় পাশে দাঁড়িয়ে বলতাম, ‘আমি কবে এই বইগুলো পড়তে পারব?’
আব্বু বলতেন, ‘বড় হও, তারপর।’
বাসার পুরনো অনেক বইয়ে এখনো আমার ও আমার ভাইয়ের আঁকিবুঁকি আছে। আব্বুর সেই একান্ত ভুবন নিয়ে ছোটবেলা থেকেই আমাদের কৌতূহলের সীমা ছিল না। এ কারণেই বারবার তাঁর জগতে আমরা ছোট ছোট পা ফেলতে চেয়েছি। পেরেছি কি?
মনে আছে একবার বিটিভিতে ‘নেকলেস’ গল্পের ওপর নাটক দেখানো হয়েছিল। নাটকটা দেখে ছোট্ট মনে ভীষণ দাগ কেটে যায়। আব্বু যেহেতু নাটকটা দেখেননি, তাঁকে এর কাহিনি বলতেই হবে। আমিও আব্বু কলেজ থেকে ফিরলে বলতে শুরু করলাম। আম্মু বললেন, তোমার আব্বু টায়ার্ড, পরে বলো। আব্বু আমাকে থামালেন না। খুব আগ্রহ নিয়ে শুনলেন।
সেই দিনের কথা মনে করে এখন বুঝি, নেকলেস গল্পটা তিনি জানতেন, কিন্তু আমার আগ্রহ দমাতে চাননি বলেই ধৈর্য ধরে পুরোটা শুনেছিলেন।
ক্লাস এইটে স্কুলের ম্যাগাজিন আমার একটা গল্প বের হলো। নাম, সমাপ্তি।
আব্বু লেখা পড়ে দারুণ খুশি। শুধু মেয়ের কাগজে লেখা বের হয়েছে বলে না। লেখাটা তাঁর ভালোও লেগেছিল বলে। সবাইকে ডেকে ডেকে সেই লেখা দেখাচ্ছেন। একই কাজ তিনি করেছেন যেদিন প্রথমবার আমার লেখা একটি আর্টিকেল জাতীয় দৈনিকে বের হলো। পত্রিকায় বের হওয়া সব লেখার কপি তিনি কিনেছেন, যত্ন করে রেখে দিয়েছেন।
ঋতুপর্ণ ঘোষের ‘অসুখ’ সিনেমাটা আমার ভীষণ প্রিয়। সেই সিনেমায় বাবা ও মেয়ের সম্পর্কের সমীকরণের সঙ্গে আমাদের সম্পর্কের মিল খুঁজে পাই। বাবা চরিত্রে অভিনয় করা সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ও তাঁর ‘সেলিব্রিটি’ মেয়ের ছবি ছাপা হওয়া সব পত্রিকার পেপার কাটিং করেন। মেয়ের সিনেমা দেখেন। তাঁর মেয়ের নামে লেখা সংবাদগুলো খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পড়েন। আমার কাজের বেলায় আব্বুও ঠিক তেমন মানুষ। আব্বু যখন আগ্রহের সঙ্গে আমাদের জন্য কিছু করেন, আমরা যতটা খুশি হই, তার চেয়ে বেশি অবাক হই। কীভাবে এই ভালোবাসার সঙ্গে বোঝাপড়া করব বুঝতে পারি না। তাঁর ভালোবাসার ভাষা— আমরা সুস্থ আছি কি না আম্মুর কাছ থেকে খোঁজ নেওয়া কিংবা বড় মাছটা আমার জন্য রেখে দেওয়া। মৌসুমি ফল কিনে বাসার সবাইকে বারবার খাওয়ার জন্য বলা। একটা ভালো সিনেমা দেখে আমাদের নিয়ে সেই সিনেমা আবার দেখা। অনেক ভালো ভালো গান, কবিতা কিংবা সিনেমার খোঁজ আমরা আব্বুর কাছ থেকেই পেয়েছি। স্লামডগ মিলিওনিয়ার, ফরেস্ট গাম্প কিংবা পরিবারের সবাইকে নিয়ে সিনেমা হলে গিয়ে ‘আয়নাবাজি’ সিনেমা দেখা, ‘ডুব’ দেখা সবই আব্বুর উৎসাহে।
আব্বু কখনও বলেননি, তোমাকে এই কাজই করতে হবে, ভালো রেজাল্ট না করলে সমাজে মুখ দেখাতে পারব না। বেড়ে ওঠার যে বাড়তি চাপ ছেলেমেয়েরা তাঁর বাবা-মা থেকে মাঝে মাঝে পায়, তার কোনোটাই আমরা পেয়েছি বলে আমার মনে পড়ে না।
আমার বাবাকে আমরা দেখেছি সংসারের প্রতি উদাসীন একজন মানুষ হিসেবে। অথচ সংসারের কোনো দায়িত্ব পালনে পিছপা হননি কোনোদিন। আব্বু-আম্মুর প্রতিদিন মধ্যবিত্ত সংসারের টানাপোড়েনে পড়তে হলেও আমাদের হয়নি।
আমার বাবা অন্যদের মতো সুপারম্যান ছিলেন না। তাঁর স্বপ্নের ভার তিনি নিজেই বয়ে বেরিয়েছেন। স্বপ্ন পূরণের লক্ষ্যে নিজেই অক্লান্ত পরিশ্রম করেছেন, করে যাচ্ছেন এখনও।
কিন্তু আব্বু আমাদের একটা অন্য জগতের ঠিকানা দিয়েছেন। সেই ঠিকানায় বাস করতে পারছি বলে ‘বেঁচে থাকাটাকে’ মন্দ মনে হয় না।

প্রতি বছর বাবা দিবস এলেই ফেসবুকের হোমপেজ ভরে যায় বাবাকে নিয়ে লেখা সুন্দর সুন্দর কথা আর স্মৃতিতে। বাবা সুপারম্যান, বাবা সব আবদার পূরণ করেছেন; এমন অনেককিছু। আমি কখনও তেমন লিখেছি কি-না মনে পড়ে না, লেখার কথা না। বাবাকে সুপারম্যান হিসেবে দেখে আমরা অভ্যস্ত না। ঠিক যেমনটা অভ্যস্ত না ‘বাবা’কে ‘বাবা’ বলে ডাকতে। আমরা তাঁকে ‘আব্বু’ বলে সম্বোধন করি।
আমার বাবাকে ‘বাবা’ থেকে বেশি ‘স্বপ্নবান’ মানুষ হিসেবে দেখেছি। দেখেছি ‘গম্ভীর’, ‘আত্মমগ্ন’ মানুষ হিসেবে। ছোটবেলায় দেখতাম আব্বু কলেজ যাচ্ছেন, ফিরে নামাজ পড়ছেন, আমাদের নিয়ে খেতে বসছেন আর অবসর সময়ে বই পড়ছেন। তারপর অনেকগুলো দিন তাঁকে দেখেছি লেখালেখি করে যেতে বিপুল মনোযোগে। সেই মনোযোগে আমরা বিঘ্ন ঘটালে স্বাভাবিকভাবেই তিনি বিরক্ত হতেন। সবচেয়ে বিরক্ত হতেন তাঁর লেখার সাদা কাগজে আমি যদি কিছু লিখে দিয়ে আসতাম তখন। অর্থহীন কথা লিখে আব্বুর লেখা কোনো গল্প অথবা কোনো উপন্যাস লেখার কাগজ আমি নষ্ট করতাম। কেন এই কাজ করতাম, জানি না। শুধু ছোট ছিলাম বলেই কি? নাকি আব্বুর মতো আমিও লিখতে চাইতাম বলে? আজকাল মনে হয়, দ্বিতীয় উত্তরটাই সবচেয়ে যুক্তিসংগত।
আমার বাবাকে আমি কখনোই ‘খুব ভালো বাবা’ ভাবতাম না। তিনি আমাদের প্রতি কিছু বিষয়ে ভীষণ কঠোর ছিলেন বলে মনে হতো। যেমন ছোটবেলায় একবার কারও গাছের মেহেদি পাতা না বলেই নিয়ে এসেছি বাটার জন্য। অথচ মেহেদি কীভাবে পাটায় বাটতে হয়, জানি না। কাঠের পিড়ির মধ্যে অল্প কিছু পাতা নিয়ে বোতল দিয়ে বাটার চেষ্টা করছি।
আব্বু জিজ্ঞেস করলেন, যার গাছের পাতা তাকে জিজ্ঞেস করে নিয়েছি কি-না। আমি বললাম, না। তিনি বেশ ধমকে দিলেন। এভাবে না বলে কারও জিনিস নেওয়া ঠিক না বলে। মেহেদি গাছের মালিককে এ ব্যাপারে না জানিয়ে আসলে তিনি আমার সঙ্গে কথা বলবেন না বলেও হুমকি দিলেন। আমার যত দূর মনে পড়ে, ‘কথা বন্ধ’ করার হুমকি তিনি বহুবার আমাদের দিয়েছেন।
আরেকবার আমাদের বাসা সহকারীকে আমি ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিলাম। আমি তখন বেশ ছোট, ক্লাস ওয়ানে বা টু-এ পড়ি। আমার মা বড় বড় অভিযোগের দায়ভার দিতেন আব্বুর ওপর। তিনি শাস্তি হিসেবে বললেন, বাসার সহকারীকে ‘সরি’ বলতে হবে। আমি বাধ্য হয়েই সরি বললাম। আর ধরে নিলাম, এমন কাজ করলে বারবার এ ধরনের বিচারের মুখে পড়তে হবে।
ক্লাস ফাইভ বা সিক্সে থাকতে একবার স্কুলের ম্যাগাজিনের জন্য গল্প বা কবিতা চাওয়া হলো শিক্ষার্থীদের থেকে। আমার বাবা যেহেতু লেখেন, বাচ্চাদের জন্য লেখা কি তাঁর জন্য কঠিন কিছু? তিনিই লিখে দেবেন। মেয়ের জন্য এতটুকু বাবা-মা কী করেন না? আমার আব্বু লিখলেন না। তিনি বলে দিলেন, এটা তো ডিজঅনেস্টি। তুমি যেমন পারো, তেমন লিখবে। আমার লেখা তো চাওয়া হয়নি।’
হতাশ হলাম। ভাবলাম সবার বাবা ভালো, শুধু আমার বাবা ছাড়া!
এভাবে আমার শৈশব কেটে গেল। কিছুটা বড় হলাম। জীবন ও জগৎ বুঝতে শেখার চেষ্টা করছি। কৈশোরকালের যেসব পাঠ সাধারণত কিশোর-কিশোরীদের না দিয়েই এই জটিল সময়ে পাঠিয়ে দেওয়া হয়, তিনি এই ভুল করলেন না। আমাকে বুঝিয়েছিলেন, সামনে কী কী হতে পারে। কখনও কোনো দুষ্টু বালক কোনো প্রস্তাব দিলে কীভাবে চিন্তা করতে হবে, সেটাও বুঝিয়েছিলেন। ‘এই বয়সে আমি কীভাবে ভাবতে পারি’ সেটা যেমন তিনি বলেছেন আবার ‘কীভাবে ভাবা উচিত’ সেটাও বলেছেন।
আব্বুকে নিয়ে আমার সবচেয়ে সুন্দর স্মৃতিও হয়তো অন্যদের চেয়ে আলাদা। প্রতি শুক্রবার বই কিনতে যেতেন মোড়ের একটা দোকানে। সেখানে ঈদসংখ্যা, সাপ্তাহিক পত্রিকাসহ আরও অনেক নামকরা বই কিনতে পাওয়া যেত। আমিও আব্বুর হাত ধরে সেই দোকানে যেতাম, কিনে আনতাম ঠাকুমার ঝুলি থেকে শুরু করে শিশুদের যত রূপকথার বই আছে সব। বই কেনা নিয়ে আব্বু কখনো কার্পণ্য করেননি। তিনি বই পড়ার সময় পাশে দাঁড়িয়ে বলতাম, ‘আমি কবে এই বইগুলো পড়তে পারব?’
আব্বু বলতেন, ‘বড় হও, তারপর।’
বাসার পুরনো অনেক বইয়ে এখনো আমার ও আমার ভাইয়ের আঁকিবুঁকি আছে। আব্বুর সেই একান্ত ভুবন নিয়ে ছোটবেলা থেকেই আমাদের কৌতূহলের সীমা ছিল না। এ কারণেই বারবার তাঁর জগতে আমরা ছোট ছোট পা ফেলতে চেয়েছি। পেরেছি কি?
মনে আছে একবার বিটিভিতে ‘নেকলেস’ গল্পের ওপর নাটক দেখানো হয়েছিল। নাটকটা দেখে ছোট্ট মনে ভীষণ দাগ কেটে যায়। আব্বু যেহেতু নাটকটা দেখেননি, তাঁকে এর কাহিনি বলতেই হবে। আমিও আব্বু কলেজ থেকে ফিরলে বলতে শুরু করলাম। আম্মু বললেন, তোমার আব্বু টায়ার্ড, পরে বলো। আব্বু আমাকে থামালেন না। খুব আগ্রহ নিয়ে শুনলেন।
সেই দিনের কথা মনে করে এখন বুঝি, নেকলেস গল্পটা তিনি জানতেন, কিন্তু আমার আগ্রহ দমাতে চাননি বলেই ধৈর্য ধরে পুরোটা শুনেছিলেন।
ক্লাস এইটে স্কুলের ম্যাগাজিন আমার একটা গল্প বের হলো। নাম, সমাপ্তি।
আব্বু লেখা পড়ে দারুণ খুশি। শুধু মেয়ের কাগজে লেখা বের হয়েছে বলে না। লেখাটা তাঁর ভালোও লেগেছিল বলে। সবাইকে ডেকে ডেকে সেই লেখা দেখাচ্ছেন। একই কাজ তিনি করেছেন যেদিন প্রথমবার আমার লেখা একটি আর্টিকেল জাতীয় দৈনিকে বের হলো। পত্রিকায় বের হওয়া সব লেখার কপি তিনি কিনেছেন, যত্ন করে রেখে দিয়েছেন।
ঋতুপর্ণ ঘোষের ‘অসুখ’ সিনেমাটা আমার ভীষণ প্রিয়। সেই সিনেমায় বাবা ও মেয়ের সম্পর্কের সমীকরণের সঙ্গে আমাদের সম্পর্কের মিল খুঁজে পাই। বাবা চরিত্রে অভিনয় করা সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ও তাঁর ‘সেলিব্রিটি’ মেয়ের ছবি ছাপা হওয়া সব পত্রিকার পেপার কাটিং করেন। মেয়ের সিনেমা দেখেন। তাঁর মেয়ের নামে লেখা সংবাদগুলো খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পড়েন। আমার কাজের বেলায় আব্বুও ঠিক তেমন মানুষ। আব্বু যখন আগ্রহের সঙ্গে আমাদের জন্য কিছু করেন, আমরা যতটা খুশি হই, তার চেয়ে বেশি অবাক হই। কীভাবে এই ভালোবাসার সঙ্গে বোঝাপড়া করব বুঝতে পারি না। তাঁর ভালোবাসার ভাষা— আমরা সুস্থ আছি কি না আম্মুর কাছ থেকে খোঁজ নেওয়া কিংবা বড় মাছটা আমার জন্য রেখে দেওয়া। মৌসুমি ফল কিনে বাসার সবাইকে বারবার খাওয়ার জন্য বলা। একটা ভালো সিনেমা দেখে আমাদের নিয়ে সেই সিনেমা আবার দেখা। অনেক ভালো ভালো গান, কবিতা কিংবা সিনেমার খোঁজ আমরা আব্বুর কাছ থেকেই পেয়েছি। স্লামডগ মিলিওনিয়ার, ফরেস্ট গাম্প কিংবা পরিবারের সবাইকে নিয়ে সিনেমা হলে গিয়ে ‘আয়নাবাজি’ সিনেমা দেখা, ‘ডুব’ দেখা সবই আব্বুর উৎসাহে।
আব্বু কখনও বলেননি, তোমাকে এই কাজই করতে হবে, ভালো রেজাল্ট না করলে সমাজে মুখ দেখাতে পারব না। বেড়ে ওঠার যে বাড়তি চাপ ছেলেমেয়েরা তাঁর বাবা-মা থেকে মাঝে মাঝে পায়, তার কোনোটাই আমরা পেয়েছি বলে আমার মনে পড়ে না।
আমার বাবাকে আমরা দেখেছি সংসারের প্রতি উদাসীন একজন মানুষ হিসেবে। অথচ সংসারের কোনো দায়িত্ব পালনে পিছপা হননি কোনোদিন। আব্বু-আম্মুর প্রতিদিন মধ্যবিত্ত সংসারের টানাপোড়েনে পড়তে হলেও আমাদের হয়নি।
আমার বাবা অন্যদের মতো সুপারম্যান ছিলেন না। তাঁর স্বপ্নের ভার তিনি নিজেই বয়ে বেরিয়েছেন। স্বপ্ন পূরণের লক্ষ্যে নিজেই অক্লান্ত পরিশ্রম করেছেন, করে যাচ্ছেন এখনও।
কিন্তু আব্বু আমাদের একটা অন্য জগতের ঠিকানা দিয়েছেন। সেই ঠিকানায় বাস করতে পারছি বলে ‘বেঁচে থাকাটাকে’ মন্দ মনে হয় না।
.png)

আমাদের সমাজে বাবারা সাধারণত কম কথা বলেন। তারা মায়ের মতো বারবার জিজ্ঞেস করেন না খেয়েছ কি না, রাতে ফিরতে দেরি হলে বারবার ফোনও করেন না। তবে সংসারের সবচেয়ে বড় দায়িত্বটি প্রায়শই তাদের কাঁধেই থাকে। ফলে অনেক সন্তানের কাছে বাবা হয়ে ওঠেন নীরব উপস্থিতি—যার গুরুত্ব বোঝা যায় বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে।
৩ ঘণ্টা আগে
স্বাধীনতার পর যে কয়জন কবি-সাহিত্যিক দেশের সাহিত্যজগতে পরিবর্তন এনেছেন তাঁদের মধ্যে রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ অন্যতম। কবির জন্ম থেকে বেড়ে ওঠা সবই ছিল দেশের অস্থির সময়ে।
৫ ঘণ্টা আগে
বাবা দিবস এলে আমরা স্বাভাবিকভাবেই আবেগীয় আবহে ডুবে যাই। ফেসবুকের ওয়ালজুড়ে বাবার সঙ্গে তোলা ছবি কিংবা পুরোনো স্মৃতির রোমন্থন চোখে পড়ে। কিন্তু যাদের বাবা নেই? তাঁদের জন্য দিনটি তীব্র হাহাকারের। বাবা মানে বটগাছ, যার ছায়া মাথার ওপর থাকলে যেকোনো ঝড়ের বিরুদ্ধে বুক টান করে দাঁড়িয়ে থাকা যায়। এই নির্ভরতার জা
৫ ঘণ্টা আগে
ভাতকাপড়ের দুশ্চিন্তা করেই সমস্ত জীবনটা কাটলো আপনার। কোনো শিল্প, কোনো সম্ভোগ, কোনো উদাসীনতা আপনাকে স্পর্শ করলো না।
১০ ঘণ্টা আগে