শহীদুল জহির কি সত্যিই ‘তৃতীয় শ্রেণি’র লেখক

স্ট্রিম গ্রাফিক

শহীদুল জহিরকে পড়তে গেলে প্রথমেই মনে হয়, আমরা যেন বহুদিনের চেনা কোনো মহল্লায় ঢুকে পড়েছি। কিন্তু কয়েক পা এগোলে বোঝা যায়, যাকে এতদিন চেনা বলে ভেবেছিলাম, তার ভেতরেই অনেকখানি অচেনা জমে আছে।

গলিটি প্রথমে চেনা মনে হয়; কিন্তু কান পাতলেই তার ভেতর এমন সব পুরনো কথার শব্দ পাওয়া যায়, চেনা পথকেও তা আর পুরো চেনা থাকতে দেয় না। দরজা আছে, কিন্তু দরজার ফাঁক দিয়ে যে আলো ঢোকে, তা কেবল ঘর আলোকিত করে না; মানুষের না-দেখা মুখও তুলে ধরে। নদী আছে, কিন্তু সে-নদীর হাওয়া কেবল বাতাস নয়, দূরাগত বাঁশির সুরের মতো মর্মে এসে লাগে। মৃত্যু আছে, কিন্তু মৃত্যু শেষ নয়; বরং তা যেন জীবনের নতুন পৃষ্ঠা খুলে দেয়। মুখ আছে, কিন্তু সে মুখের দিকে তাকিয়ে আমরা কেবল চেহারা দেখি না। দেখি সে-চেহারায় জমে থাকা লজ্জা, আকাঙ্ক্ষা, ভয়, অপমান, স্মৃতি।

শহীদুল জহিরের কথাসাহিত্যে সরল গল্প নেই। আছে এক ধরনের আবহ। যেন কেউ কথা বলছে, অথচ সেই কথার ভেতর আরও অনেকের কণ্ঠ লেগে আছে। কেউ একটি ঘটনা বলছে, কিন্তু ঘটনাটি যত বলা হচ্ছে, ততই তার নিচ থেকে উঠে আসছে আরেক ঘটনা, আরেক সময়, আরেক ভয়, আরেক নীরবতা। সমাজ সেখানে সরাসরি কথা বলে না; কথা বলে জনশ্রুতির মধ্যে, মুখ ফিরিয়ে নেওয়ার মধ্যে, অর্ধেক-স্মৃতির মধ্যে, এমনকি চুপ করে থাকার মধ্যেও। এই চুপ করে থাকাকে আবার শূন্যতাও বলা যাবে না। হয়তো তা জমে থাকা বয়ান, যা তখনও ভাষা পায়নি।

শহীদুল জহিরকে তাঁর সাহিত্যকে তাৎক্ষণিক মূল্যায়নে ভুল হবে। কারণ তিনি এমন লেখক, প্রথম পাঠেই যাঁর সাহিত্য নিজের সব দরজা খুলে দেয় না। পাঠককে তিনি হয়তো সহজ প্রবেশাধিকার দেন, কিন্তু তাকে আর আগের চোখে দেখতে দেন না। তাঁর সাহিত্য যেন বলে—দেখো, কিন্তু সাবধানে দেখো; কারণ যা দেখতে যাচ্ছ, তা কেবলই একটি কাহিনিমাত্র নয়, বহুদিন ধরে একটি সমাজের ভেতরে জমে থাকা না-বলা ইতিহাস। সম্ভবত এই জায়গা থেকেই ‘তৃতীয় শ্রেণির লেখক’ ধরনের তাৎক্ষণিক মূল্যায়নের প্রশ্নটি আসে।

কোনো লেখককে অপছন্দ করা যায়, তাঁর ভাষাকে বোরিং বলা যায়, তাঁর আখ্যানকে জটিল বলা যায়; কিন্তু তাঁকে সাহিত্যিকভাবে খারিজ করতে হলে তাঁর টেক্সটের ভিতর দিয়ে যেতে হয়। কারণ তাঁর সাহিত্য কাহিনির সার-সংক্ষেপে ধরা পড়ে না; ধরা পড়ে মুখের দিকে তাকানোর মুহূর্তে, মৃত্যুর আগে ফিরে আসা বাসনায়, পূর্ণিমার অস্বস্তিকর আলোয়, নদীর হাওয়ায়, মহল্লার চুপ করে থাকা মানুষের চোখে।

এই লুকোনো, অর্ধেক-বলা, অস্বস্তিকর অথচ গভীর মানবিক অঞ্চলটিতে পাওয়া শহীদুল জহিরকে। তাঁর কথাশিল্পকে।

তাঁকে ‘তৃতীয় শ্রেণির লেখক’ বলা যায় কি না—এই প্রশ্নে যাওয়ার আগে তাই আরেকটি প্রশ্ন দরকার: আমরা একজন লেখককে পড়ি কী দিয়ে? শুধু কাহিনি দিয়ে? শুধু ভাষার সহজতা দিয়ে? শুধু পাঠকের আরাম দিয়ে? যদি তাই হয়, শহীদুল জহির হয়তো জটিল, ধীর অথবা গম্ভীর, অস্বস্তিকর। কিন্তু সাহিত্য যদি মানুষের অদৃশ্য অভিজ্ঞতার শিল্প হয়, যদি সাহিত্য সেই সব জিনিসের ভাষা হয় যা সমাজ সরাসরি বলতে পারে না—তাহলে শহীদুল জহির বাংলা কথাসাহিত্যের এক প্রয়োজনীয় নাম।

তিনি কেবল দৃশ্যমান বাস্তবতার নয়, বাস্তবতার নিচে জমে থাকা সামূহিক চাপের লেখক। একটি ঘটনা তাঁর কাছে শেষ নয়; ঘটনার পর মানুষ কীভাবে বাঁচে, তাতেই তাঁর আগ্রহ। একটি মৃত্যু তাঁর কাছে সমাপ্তি নয়; মৃত্যুর মুখে দাঁড়িয়ে জীবনের যে অসম্পূর্ণতা দেখা দেয়, সেটাই তাঁর বিষয়। একটি মুখ তাঁর কাছে চেহারা নয়; স্বীকৃতির নৈতিক জায়গা। একটি নদী তাঁর কাছে কেবল বিপুল জলপ্রবাহ নয়; স্মৃতি, ভাঙন, গন্ধ, হারানো জনপদের হাওয়া। একটি মহল্লা তাঁর কাছে পটভূমি নয়; মানুষের মুখে মুখে তৈরি হওয়া ইতিহাসের অনানুষ্ঠানিক মহাফেজখানা।

শহীদুল জহিরের কাছে যেতে হলে প্রথমে মুখের দিকে তাকাতে হয়। তাঁর এক উপন্যাসের নামই যেন তাঁর সাহিত্যিক-পদ্ধতির দরজা খুলে দেয়—মুখের দিকে দেখি। ‘মুখ দেখি’ নয়, ‘মুখের দিকে দেখি।’ এই ‘দিকে’ শব্দটি ছোট, কিন্তু লেখকের দৃষ্টিকে গভীর করে। মুখ দেখা মানে কেবল চোখের কাজ নয়; মুখের দিকে তাকানো মানে একজন মানুষের অস্তিত্বের দিকে ফিরতে রাজি হওয়া। আমরা কাদের মুখ দেখি? কাদের মুখ এড়িয়ে যাই? কারা সমাজে উপস্থিত থেকেও অদৃশ্য? শহীদুল জহির এই প্রশ্নের উত্তর বক্তৃতায় দেন না; দৃশ্যে দেন।

মুখের দিকে দেখির প্রচ্ছদ
মুখের দিকে দেখির প্রচ্ছদ

মেরি, চানমিঞা, দরজার ফাঁক দিয়ে ঢুকে পড়া আলো—এই সবকিছু একসঙ্গে মিলিয়ে তিনি এমন এক মুহূর্ত নির্মাণ করেন, যেখানে দেখা নিজেই ঘটনা হয়ে ওঠে। দরজার ফাঁক দিয়ে আলো ঢোকে; কিন্তু তা শুধু ঘর আলোকিত করে না, মানুষের না-দেখা মুখও তুলে ধরে। কেউ কারও মুখের দিকে তাকায়; কিন্তু সে তাকানো কেবল চোখের নয়, স্বীকৃতির। মানুষের জীবনে কখনো কখনো এতটুকু দৃষ্টি—কেউ আমাকে দেখল—এই অনুভূতিই অস্তিত্বের প্রমাণ হয়ে দাঁড়ায়। যাকে সমাজ দেখে না, তাকে সাহিত্য যদি দেখে, তবে সেই দেখাই নৈতিক কাজ।

শহীদুল জহিরের মানবিকতা এখানেই। তিনি মানুষকে সুন্দর করে মানবিক করেন না; অসম্পূর্ণ রেখেই মানবিক করেন। তাঁর চরিত্রদের মুখে দাগ আছে, ভয় আছে, লজ্জা আছে, অবহেলার ছায়া আছে, কখনো হাস্যকরতা আছে, কখনো দেহের বিব্রতকর সত্য আছে। তিনি এসব মুছে দেন না। কারণ মুছে দিলে মানুষকে বাইরে থেকে দেখতে পরিষ্কার লাগে, কিন্তু সত্য কমে যায়। শহীদুল জহির মানুষের মুখ পরিষ্কার করেন না; আলোয় আনেন। আলোটি কোমল নয়, তবু দরকারি।

এই দেখার রাজনীতি অন্যভাবে ফিরে আসে জীবন ও রাজনৈতিক বাস্তবতা-তে। নামটিই যেন সোজা কিন্তু অস্বস্তিকর এক ঘোষণা—জীবন এবং রাজনৈতিক বাস্তবতা আলাদা নয়। রাজনীতি কেবল রাষ্ট্রের মঞ্চে থাকে না; থাকে মানুষের ঘরে, পাড়ায়, কথার ভঙ্গিতে, চুপ করে থাকার মধ্যে, কারও নাম না নেওয়ার অভ্যাসে, কোনো ঘটনার পরে সবাই জানে অথচ কেউ বলে না—এই সামাজিক অভিনয়ে। শহীদুল জহির রাজনীতিকে স্লোগান থেকে নামিয়ে মানুষের স্নায়ুতে বসান।

এই উপন্যাসে ইতিহাস উচ্চকিত নয়। সেখানে কোনো বক্তৃতার দাপট নেই, তবু ভয়ের দীর্ঘ ছায়া আছে। কোনো রাজনৈতিক ঘটনার পর সমাজ কীভাবে তা বহন করে—এই জিজ্ঞাসাই উপন্যাসের ভিতরকার স্পন্দন। যে সময় চলে গেছে, তা কি সত্যিই চলে যায়? মানুষ কি স্বাধীনতার পরই মুক্ত হয়ে ওঠে? যে মহল্লা কোনো সহিংসতা, বিশ্বাসঘাতকতা, আতঙ্ক বা নীরবতার সাক্ষী, সে মহল্লা কি পরদিন থেকে আগের মতো থাকে? শহীদুল জহির জানেন, থাকে না। দেয়াল মনে রাখে, রাস্তা মনে রাখে, মানুষ ভুলে থাকার অভিনয় করে, কিন্তু ভুলে যায় না।

জীবন ও রাজনৈতিক বাস্তবতার প্রচ্ছদ। ছবি: উইকিপিডিয়া
জীবন ও রাজনৈতিক বাস্তবতার প্রচ্ছদ। ছবি: উইকিপিডিয়া

এখানেই তাঁর রাজনৈতিক শিল্পের শক্তি। তিনি রাজনীতিকে ঘটনামাত্র রাখেন না; মানুষের আচরণের ভেতর প্রবেশ করান। কেউ কথা বলে না—তবু বোঝা যায় ভয় আছে। কেউ অপরাধ স্বীকার করে না—তবু নীরবতা অনেক সময় স্বীকারোক্তির চেয়েও ভারী হয়ে ওঠে। এই ভার ধরতে যে গদ্য দরকার, তা সহজপাচ্য হতে পারে না। কারণ ভয় কখনো সোজা কথা বলে না; স্মৃতি কখনো পরিষ্কার বাক্যে ফিরে আসে না।

সে রাতে পূর্ণিমা ছিল যেন সেই স্মৃতিরই আরেক আলো। শিরোনামটি যত সরল, ভেতর তত গভীর। ‘সে রাতে’—একটি অতীত, কিন্তু তা তারিখ নয়; মানুষের মনে আটকে থাকা সময়। ‘পূর্ণিমা ছিল’—আলো, কিন্তু শান্তির আলো নয়। পূর্ণিমার আলো সাধারণত রূপকথা, প্রেম, প্রকৃতির সৌন্দর্য ডাকে; শহীদুল জহিরের পূর্ণিমা তেমন নয়। তাঁর পূর্ণিমা স্মৃতির আলো—যা অন্ধকার সরায় না, বরং অন্ধকারের রেখা দৃশ্যমান করে। যে ক্ষত চাপা ছিল, আলোতে সে স্পষ্ট হয়। যে ভয়ের কথা কেউ বলতে চায় না, পূর্ণিমা তাকে মুখ দেয়।

মুক্তিযুদ্ধ এই উপন্যাসে স্মারক নয়; ভেতরের অনিদ্রা। রাষ্ট্র যুদ্ধকে দিবস, পতাকা, ভাষণ, স্মৃতিস্তম্ভে স্থির করতে চায়। মানুষ যুদ্ধকে বহন করে ঘুমে, জনশ্রুতিতে, নীরবতায়, অপরাধবোধে, কোনো নাম উচ্চারণের ভয়-লজ্জায়। শহীদুল জহির যুদ্ধক্ষেত্রের চেয়ে যুদ্ধের পরবর্তী মানুষের ভিতর বেশি আগ্রহী। তিনি জানেন, যুদ্ধ শেষ হওয়ার পরও যুদ্ধ মানুষের মধ্যে বেঁচে থাকতে পারে। গৌরব থাকে, কিন্তু তার পাশে থাকে ভয়; বীরত্ব থাকে, কিন্তু তার পাশে থাকে ক্ষত; স্মরণ থাকে, কিন্তু তার পাশে থাকে ভুলে যাওয়ার কৌশল। এই অস্বস্তিকর পূর্ণতা থেকেই তাঁর মুক্তিযুদ্ধ-চেতনা আলাদা।

আবু বকর সিদ্দিক ও আলেকজানের সম্পর্কের মধ্যে যে শিল্প, প্রেম, গ্রাম ও ইতিহাসের সংঘাত দেখা যায়, তা শহীদুল জহিরের দৃষ্টিকে আরও ঘন করে। একটি মুখ আঁকতে চাওয়া মানে শুধু সৌন্দর্য ধরতে চাওয়া নয়; জীবনকে ধরে রাখতে চাওয়া। আলেকজানের মুখ প্রেমের মুখ, আবার শিল্পেরও মুখ; গ্রামীণ জীবনের মুখ, আবার ইতিহাসের আঘাতে বিপন্ন মানুষের মুখ। যুদ্ধ এসে সেই মুখ, সেই প্রেম, সেই আঁকার সম্ভাবনা—সবকিছুর ওপর ছায়া ফেলে। এখানে প্রেম ব্যক্তিগত থাকে না; ইতিহাস তাকে স্পর্শ করে। শিল্পও নির্দোষ থাকে না; সে-ও ক্ষতির সাক্ষী হয়ে ওঠে।

সে রাতে পূর্ণিমা ছিলর প্রচ্ছদ। ছবি: উইকিপিডিয়া
সে রাতে পূর্ণিমা ছিলর প্রচ্ছদ। ছবি: উইকিপিডিয়া

এভাবে শহীদুল জহির মানুষের জীবনের আলাদা আলাদা আবাসসমূহকে একত্র করে দেন। প্রেম রাজনীতি থেকে আলাদা নয়; দেহ স্মৃতি থেকে আলাদা নয়; মুখ ইতিহাস থেকে আলাদা নয়; শিল্প ক্ষতি থেকে আলাদা নয়। এই জটিলতা তাঁর শক্তি। তিনি জীবনকে সহজ করে পাঠকের হাতে দেন না। কারণ জীবন সহজ নয়।

আবু ইব্রাহিমের মৃত্যু এই জটিলতার আরেক অন্তরঙ্গ অধ্যায়। এখানে মৃত্যু আছে, কিন্তু মৃত্যু শেষ শব্দ নয়। মৃত্যু বরং জীবনের গোপন খাতা খুলে দেয়। আবু ইব্রাহিম কোনো বীর নন, কোনো মহৎ মানুষও নন। তিনি বয়সে ক্লান্ত, দেহে ক্ষয়গ্রস্ত, স্মৃতিতে আক্রান্ত, সামাজিক ভদ্রতার আড়ালে আটকে থাকা এক অসম্পূর্ণ মানুষ। তাঁর চারপাশে মফস্বলি রাস্তা, কালীবাড়ি রোড, বাড়ির প্রাঙ্গণ, গাছ, পুরোনো সম্পর্ক, হেলেনের মতো এক নারীর স্মৃতি—এসব মিলে মৃত্যু-আসন্ন জীবনের ভিতরে জমে থাকা অপূর্ণতাকে দৃশ্যমান করে।

এই উপন্যাসে শহীদুল জহির বার্ধক্যকে নিষ্প্রাণ করেন না। আমাদের সমাজ বয়সের সঙ্গে সঙ্গে মানুষের বাসনাকে মুছে ফেলতে চায়। যেন বৃদ্ধ মানুষ আর দেহী নয়, আকাঙ্ক্ষাহীন; যেন তার প্রেম শুধু অতীতের, দেহ শুধু রোগের, স্মৃতি শুধু ধর্মীয় বা পারিবারিক। শহীদুল জহির এই নিরাপদ ধারণায় আঘাত করেন। তিনি দেখান, বয়স দেহকে ক্ষয় করে, কিন্তু বাসনাকে সবসময় মুছে দেয় না; মৃত্যু কাছে আসে, কিন্তু জীবনের অস্বীকার করা ইচ্ছাগুলো তখনই কখনো সবচেয়ে জেদি হয়ে ওঠে। আবু ইব্রাহিমকে তাই একরকম করে দেখা যায় না। তিনি করুণ, আবার বিব্রতকর; হাস্যকর, আবার গভীর; দুর্বল, আবার প্রাণীসত্তায় উষ্ণ। তিনি মানুষ।

এই মানুষটিকে লেখক ক্ষমা করেন না, আবার বিচার করেও শেষ করেন না। এটিই তাঁর সংযম। দুর্বল লেখক আবু ইব্রাহিমকে হয় করুণার পাত্র বানাতেন, নয়তো নৈতিকভাবে নিন্দিত। শহীদুল জহির তার কোনোটাই করেন না। তিনি চরিত্রটিকে এমন আলোয় বসান, যেখানে তার দেহ, লজ্জা, স্মৃতি, হাস্যকরতা, আকাঙ্ক্ষা—সব একসঙ্গে দেখা যায়। এই একসঙ্গে দেখা খুব সহজ নয়। কারণ মানুষ সাধারণত নিজের মধ্যেই একাধিক মানুষ বহন করে। শহীদুল জহির সেই বহনটুকু লিখতে জানেন।

আবু ইব্রাহিমের মৃত্যুর প্রচ্ছদ। ছবি: উইকিপিডিয়া
আবু ইব্রাহিমের মৃত্যুর প্রচ্ছদ। ছবি: উইকিপিডিয়া

ডলু নদীর হাওয়া ও অন্যান্য গল্প–তে এসে তাঁর সাহিত্য আরও ছড়িয়ে পড়ে। এখানে একদিকে লোকজ স্মৃতি, অন্যদিকে ক্ষুদ্র ইতিহাস; একদিকে নদী, বন্যা, মহামারী, অন্যদিকে বন্ধুত্ব, যাত্রা, হারানো মানুষের খোঁজ, শ্রম, কুটির শিল্প। গল্পগুলোর নামই যেন আলাদা আলাদা দরজা—‘কোথায় পাব তারে’, ‘আমাদের বকুল’, ‘মহল্লায় বান্দর, আবদুল হালিমের মা এবং আমরা’, ‘ইন্দুর-বিলাই খেলা’, ‘প্রথম বয়ান’, ‘ডলু নদীর হাওয়া’, ‘আমাদের কুটির শিল্পের ইতিহাস’। এখানে রাষ্ট্রীয় ইতিহাসের আড়ম্বর নেই; আছে মানুষের চলাচল, ঘরোয়া স্মৃতি, নদীর গন্ধ, ছোট জীবনের দীর্ঘ ছায়া।

‘কোথায় পাব তারে’ গল্পের ভেতর যে কথাবার্তার স্রোত, তা খুব শহীদুল জহিরীয়। আবদুল করিম, আঙুর ব্যাপারি, মৈমনসিংহে যাওয়া-না-যাওয়া, ভালুকা-ফুলবাড়িয়ার নাম, পথে দেখা, দরকষাকষি, অকারণ আলাপ—সবই যেন দৈনন্দিন। কিন্তু তাঁর হাতে দৈনন্দিনতা কখনো পুরো নিরীহ থাকে না। কথার মধ্যে আরেক কথা থাকে, যাওয়ার মধ্যে না-যাওয়া, মজার মধ্যে হাহাকার, লোকজ সুরের মধ্যে হারিয়ে যাওয়া মানুষ। তিনি বড় নাটক বানান না; ছোট কথোপকথনের মধ্যে নাটকের রক্ত খুঁজে পান।

‘প্রথম বয়ান’ নামটি বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। এখানে ‘প্রথম’ মানে শুধু ক্রমের শুরু নয়; বরং কোনো ঘটনার প্রথম ভাষা পাওয়া, প্রথম মুখে ওঠা, প্রথমবার সামাজিক স্মৃতিতে প্রবেশ করা। আর ‘বয়ান’ মানে শুধু গল্প বলা নয়; বয়ান মানে সাক্ষ্য, ব্যাখ্যা, স্মরণ, কখনো আত্মরক্ষা, কখনো অভিযোগ, কখনো লোকমুখে সত্য তৈরি হওয়ার সূচনা। শহীদুল জহিরের গল্পজগতে ঘটনা যতটা গুরুত্বপূর্ণ, ঘটনাকে কে কীভাবে বলে—তা অনেক সময় তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ একটি ঘটনা সমাজে বেঁচে থাকে তার বয়ানের ভেতর দিয়ে। কে প্রথম বলল, কে শুনল, কে বদলে বলল, কে বিশ্বাস করল, কে চুপ রইল—এসবের মধ্য দিয়েই সত্যের সামাজিক জীবন শুরু হয়।

এই দিক থেকে ‘প্রথম বয়ান’ শহীদুল জহিরের কথাশিল্পের কেন্দ্রে থাকা একটি বড় সূত্রকে সামনে আনে। তাঁর সাহিত্য বারবার দেখায়, সমাজে সত্য মুখে মুখে আসে, ভাঙে, বদলায়, সন্দেহে ঢেকে দেয়। কোনো একসময় তা বিশ্বাসে পরিণত হয়। একটি বয়ান কখনো শুধু বয়ান থাকে না; তা হয়ে ওঠে স্মৃতি, জনশ্রুতি, ইতিহাস, কিংবা সামাজিক বিচার। শহীদুল জহির এই বয়ানের জন্মমুহূর্তের লেখক—যেখানে ভাষা এখনো স্থির হয়নি, সত্য এখনো দলিল হয়নি, কিন্তু মানুষ ইতিমধ্যে বলতে শুরু করেছে।

অন্যদিকে ‘ডলু নদীর হাওয়া’ আমাদের তাঁর প্রকৃতি-চেতনার দিকে নিয়ে যায়। এখানে নদী সাজানো পটভূমি নয়; নদী স্মৃতির চলমান দেহ। হাওয়া কেবল বাতাস নয়; হাওয়া বহন করে ভাঙন, গন্ধ, হারানো দিন, মানুষজনের অপ্রকাশিত ইতিহাস। নদীর হাওয়া গায়ে লাগলে শুধু শরীর ঠান্ডা হয় না; কোনো পুরোনো জনপদ, কোনো ভাঙা উঠোন, কোনো শ্রমজীবী মানুষের অচেনা দীর্ঘশ্বাস এসে লাগে। শহীদুল জহির প্রকৃতিকে কাব্যিক করেন, কিন্তু অলংকার বানান না; একেবারে জীবনের সঙ্গে বেঁধে দেন।

‘আমাদের কুটির শিল্পের ইতিহাস’—এই নামের মধ্যেও তাঁর সাহিত্যিক রাজনীতি আছে। ইতিহাস বলতে আমরা সাধারণত বড় কিছুর কথা ভাবি—রাষ্ট্র, যুদ্ধ, ক্ষমতা, বিপ্লব, উন্নয়ন। শহীদুল জহির ইতিহাসকে নামিয়ে আনেন হাতে, কাজে, ঘরে, ক্ষুদ্র উৎপাদনে, পরিবারের শ্রমে। ‘আমাদের’ শব্দটি এখানে খুব গুরুত্বপূর্ণ। এটি রাষ্ট্রীয় ‘আমরা’ নয়; ছোট মানুষের, পাড়ার, পরিবারের, মুখে মুখে বেঁচে থাকা মানুষের ‘আমরা’। যে ইতিহাস বইয়ে লেখা হয় না, কিন্তু মানুষ বাঁচতে বাঁচতে তৈরি করে—শহীদুল জহির সেই ইতিহাসের লেখক।

এখানেই তাঁর কথাসাহিত্যের গণতন্ত্র। তিনি জানেন, জীবনের বড় অংশ ঘটে ছোট জায়গায়। মহল্লায়, নদীর ধারে, ঘরের ভিতরে, বন্যার জলে, মৃতপ্রায় মানুষের স্মৃতিতে, প্রান্তিক মানুষের মুখে, জনশ্রুতির ভিতরে। রাষ্ট্র যেসব জীবনকে অদৃশ্য রাখে, সাহিত্য সেগুলোকে দৃশ্যমান করতে পারে। শহীদুল জহির সেই কাজ করেন—শব্দ করে নয়, খুব ধীরে; কখনো আলো দিয়ে, কখনো নীরবতা দিয়ে।

তাঁর ভাষা এই ধীরতার জন্যই আলাদা। তাঁর গদ্যে যেন একা কেউ কথা বলে না। কেউ বলছে, কেউ শুনেছে, কেউ সন্দেহ করছে, কেউ জানে কিন্তু মুখ খুলছে না, কেউ ভুলে গেছে, কেউ ভুলকে সত্য করে ফেলেছে। বাংলাদেশের সামাজিক বাস্তবতায় সত্য অনেক সময় দলিলে জন্মায় না; জন্মায় মুখে মুখে। ‘শোনা যায়’, ‘লোকজন বলে’, ‘কারও মনে আছে’, ‘আসলে ঘটনা অন্যরকম’—এসব অনির্দিষ্ট সূত্র সামাজিক জীবনকে চালায়। জনশ্রুতি প্রমাণহীন হয়েও মানুষের আচরণ বদলে দেয়। লোকবিশ্বাস যুক্তিহীন হয়েও সম্পর্ক নিয়ন্ত্রণ করে। মৃত মানুষ অনুপস্থিত থেকেও জীবিতের সিদ্ধান্তে কাজ করে। শহীদুল জহির এই অদৃশ্য কার্যকারিতার ভাষা তৈরি করেছেন।

ডলু নদীর হাওয়া ও অন্যান্য গল্পর প্রচ্ছদ। ছবি: উইকিপিডিয়া
ডলু নদীর হাওয়া ও অন্যান্য গল্পর প্রচ্ছদ। ছবি: উইকিপিডিয়া

তাই তাঁকে কেবল ‘ম্যাজিক রিয়ালিস্ট’ বললে তাঁর ভেতরকার ‘ভিত’ হারিয়ে যায়। তাঁর রচনায় অভিনবত্ব আছে, কিন্তু তা কৌশলের আড়ম্বর নয়। বাংলাদেশের সমাজ নিজেই অভিনব ও অদ্ভুত—ধর্ম, লোকবিশ্বাস, জনশ্রুতি, রাজনৈতিক আতঙ্ক, পারিবারিক গোপনতা, নদী, বন্যা, দারিদ্র্য, মহল্লার নজরদারি, মৃতদের স্মৃতি—সব মিলে বাস্তবতা তৈরি করে। শহীদুল জহির এই বাস্তবতাকে বিস্তৃত করেন। তিনি দেখান, যা দেখা যায় সেটুকুই বাস্তব নয়; যা মানুষ বিশ্বাস করে, ভয় পায়, মুখে মুখে বদলায়, আড়াল করে, তবু যার প্রভাবে বেঁচে থাকে—সেটিও বাস্তব।

এই বাস্তবতা ধরার জন্য তাঁর বাক্য অনেক সময় নদীর মতো বাঁক নেয়। কখনো জনশ্রুতির মতো ঘুরে ঘুরে শক্তি পায়। কখনো স্মৃতির মতো বর্তমান থেকে অতীতে গিয়ে আবার বর্তমানেই ফিরে আসে। তাঁর গদ্য দ্রুত সারাংশের গদ্য নয়। দ্রুত পাঠে অসহজ লাগতে পারে; কিন্তু ধীরে পড়লে বোঝা যায়, এই গদ্য অভিজ্ঞতার ওজন বহন করছে। তিনি পাঠককে কাহিনি হাতে দেন না; কাহিনির তলদেশে নামতে বলেন।

এ কারণেই শহীদুল জহির সার-সংক্ষেপে ধরা পড়েন না। জীবন ও রাজনৈতিক বাস্তবতা–র কাহিনি বলা যায়, কিন্তু তার রাজনৈতিক স্নায়ুচাপ বলা যায় না। সে রাতে পূর্ণিমা ছিল–এর ঘটনা বলা যায়, কিন্তু পূর্ণিমার আলোয় স্মৃতির যে কাঁপুনি, তা বলা যায় না। আবু ইব্রাহিমের মৃত্যু–র প্লট বলা যায়, কিন্তু মৃত্যুর আগে অসমাপ্ত বাসনার যে তাপ, তা সারাংশে ধরা যায় না। মুখের দিকে দেখি–র দৃশ্য বলা যায়, কিন্তু মুখের দিকে তাকানোর নৈতিক স্পন্দন বলা যায় না। ডলু নদীর হাওয়া–র গল্পের নাম বলা যায়, কিন্তু নদীর হাওয়ায় যে অনানুষ্ঠানিক ইতিহাসের গন্ধ আসে, তা বলা যায় না। সাহিত্য থাকে এই অ-বলা অংশে।

এখানেই ‘তৃতীয় শ্রেণির লেখক’ রায়টি দুর্বল হয়ে পড়ে। শহীদুল জহিরকে ছোট বলতেই পারেন কেউ। কিন্তু সাহিত্যিকভাবে তা প্রমাণ করতে হলে তাঁর ভাষার ভিতর দিয়ে যেতে হবে। দেখাতে হবে তাঁর বাক্য কোথায় ব্যর্থ, তাঁর স্মৃতি-নির্মাণ কেন কৃত্রিম, তাঁর মহল্লা কেন জীবন্ত নয়, তাঁর রাজনৈতিকতা কেন অর্থহীন, তাঁর বার্ধক্য-বাসনা কেন মানবিক জটিলতা তৈরি করে না, তাঁর মুখ-দৃষ্টি কেন নৈতিক অর্থ পায় না, তাঁর নদী-বন্যা-কুটির শিল্প কেন ক্ষুদ্র ইতিহাসের ভূগোল হয়ে উঠতে পারে না। এসব প্রশ্নের মুখোমুখি না হয়ে ‘তৃতীয় শ্রেণি’ বলা যায়, কিন্তু সেটি সমালোচনা হয় না।

তাঁকে বড় বলার ক্ষেত্রেও একই সততা দরকার। শহীদুল জহির নিখুঁত নন। তাঁর গদ্য কখনো অতিরিক্ত ঘন লাগে, পুনরাবৃত্তি কখনো ক্লান্তি আনে, আখ্যান অনেক পাঠকের সঙ্গে দূরত্ব তৈরি করে। কিন্তু এগুলো তাঁর শিল্পের সীমা, শিল্পের অনুপস্থিতি নয়। যে লেখক রাজনীতি, স্মৃতি, মহল্লা, মুখ, মৃত্যু, দেহ, বাসনা, নদী, জনশ্রুতি, লোকবিশ্বাস, ক্ষুদ্র ইতিহাস—এসব একসঙ্গে ধরতে চান, তাঁর রচনায় চাপ থাকবেই। প্রশ্ন হলো, সেই চাপ শিল্পে পরিণত হয়েছে কি না। শহীদুল জহিরের শ্রেষ্ঠ রচনাগুলোতে তা হয়েছে।

তাঁর সাহিত্য আসলে অদৃশ্য বাস্তবতার রক্তমাংস তৈরি করে। ইতিহাস হয়ে ওঠে পূর্ণিমার আলোয় জেগে থাকা ক্ষত। মৃত্যু হয়ে ওঠে আবু ইব্রাহিমের অসমাপ্ত জীবন। মুখ হয়ে ওঠে স্বীকৃতির নৈতিক ক্ষেত্র। নদীর হাওয়া হয়ে ওঠে লোকজ স্মৃতির বাহক। মহল্লা হয়ে ওঠে গোপন আর্কাইভ। জনশ্রুতি বা গুজব হয়ে ওঠে সমাজের অনানুষ্ঠানিক দলিল। নীরবতা হয়ে ওঠে অনুচ্চারিত ইতিহাসের ভাষা।

এ কারণেই তাঁর সাহিত্য মানবীয়, কিন্তু আবেগে ভাসা নয়। তিনি মানুষকে ভালোবাসেন, কিন্তু চোখ বুজে নয়। তিনি দেখেন মানুষ কীভাবে ভাঙে, লুকায়, কামনা করে, ভয় পায়, মৃতদের বয়ে বেড়ায়, একে অন্যের মুখের দিকে তাকাতে পারে না, আবার কখনো তাকিয়েও ফেলে। তাঁর চরিত্রদের মধ্যে অসৌন্দর্য আছে; সেই অসৌন্দর্যই তাদের সত্য করে। সাহিত্য যদি মানুষকে শুধু সুন্দর করে দেখায়, তবে মানুষকে কম দেখায়। শহীদুল জহির মানুষকে অসম্পূর্ণ দেখান, তাই বেশি দেখান।

শেষ পর্যন্ত তাঁর সাহিত্য আমাদের চোখ বদলে দেয়। আমরা আর ইতিহাসকে শুধু বইয়ের পাতা ভাবি না; মানুষের মুখে, ভয়-নীরবতায়, ভুলে যাওয়ার ভানেও ইতিহাস দেখি। আমরা আর মহল্লাকে শুধু বসতি ভাবি না; বুঝি, মহল্লাও মনে রাখে। আমরা আর মৃত্যুকে শুধু সমাপ্তি ভাবি না; দেখি, মৃত্যু কখনো জীবনের অব্যক্ত অংশ খুলে দেয়। আমরা আর মুখকে শুধু চেহারা ভাবি না; বুঝি, মুখের দিকে তাকানো মানে মানুষকে স্বীকার করা। আমরা আর নদীর হাওয়াকে শুধু প্রকৃতি ভাবি না; তাতে শুনি ভাঙন, বন্যা, শ্রম, লোকজ জীবনের অদৃশ্য দীর্ঘশ্বাস।

সাহিত্য শুধু আখ্যান দিলে তার কাজ সীমিত; সাহিত্য যদি দেখার পদ্ধতি বদলে দেয়, তবে সে ভাষার ইতিহাসে জায়গা নেয়। শহীদুল জহির সেই বিরল কথাশিল্পীদের একজন, যিনি পাঠককে কাহিনি থেকে সরিয়ে আখ্যানের ভেতরের শিরা-উপশিরায় নিয়ে যান। তিনি শেখান, সমাজ যা বলে তার চেয়ে বেশি অর্থ লুকিয়ে থাকে যা সে বলে না তাতে। তিনি শেখান, বড় ইতিহাস বুঝতে হলে ছোট মানুষের মুখের দিকে তাকাতে হয়। তিনি শেখান, বাস্তবতা শুধু দৃশ্যমান নয়; স্মৃতি, ভয়, গুজব, আকাঙ্ক্ষা, নীরবতা, না-দেখা মুখ—এসব দিয়েও বাস্তবতা তৈরি হয়।

তাই শহীদুল জহিরকে কোনো চটজলদি বাক্যে শেষ করা যায় না। তাঁকে পড়তে হয় ধীরে—দরজার ফাঁক দিয়ে আসা আলোয়, পূর্ণিমার অস্বস্তিকর উজ্জ্বলতায়, আবু বকর সিদ্দিকের আঁকতে-চাওয়া মুখে, আলেকজানের ভাগ্যে, আবু ইব্রাহিমের মৃত্যুর আগে ফিরে আসা বাসনায়, মেরি ও চানমিঞার মুখোমুখি মুহূর্তে, প্রথম বয়ানের জন্ম নিতে থাকা ভাষায়, ডলু নদীর হাওয়ায়, কুটির শিল্পের ক্ষুদ্র ইতিহাসে, মহল্লার চুপ থাকা মানুষের চোখে। তাঁকে পড়তে হয় বারবার। কারণ প্রথম পাঠে তাঁর গল্প দেখা যায়; দ্বিতীয় পাঠে আবহ; তৃতীয় পাঠে ভাষা; চতুর্থ পাঠে নীরবতা; তারপর একসময় বোঝা যায়—এই লেখক আমাদের পরিচিত বাস্তবতার ভিতরে আরেক বাস্তবতা বসিয়ে দিয়েছেন।

সেই বাস্তবতা দৃশ্যমান নয়, কিন্তু কার্যকর। অস্বস্তিকর, কিন্তু সত্য। ধীর, কিন্তু জীবন্ত।

যেনতেন কথা দিয়ে শহীদুল জহিরকে ছোট করা যায়। কিন্তু তাঁর টেক্সটের সামনে দাঁড়ালে সেই কথাকে প্রমাণে পরিণত হতে হয়। সেখানে সহজ রায় টেকে না। কারণ তাঁর সাহিত্য আমাদের কেবল গল্প শোনায় না; আমাদের চোখের কাছে একটি আয়না ধরে। সেই আয়নায় আমরা শুধু চরিত্র দেখি না, নিজেদেরও দেখি—আমাদের স্মৃতি, ভয়, নীরবতা, আকাঙ্ক্ষা, অস্বীকার, না-দেখা মুখ, চাপা ইতিহাস।

আর একবার সত্যিই মুখের দিকে তাকালে, কোনো মানুষকেই সহজে ‘তৃতীয় শ্রেণি’ বলা যায় না। কোনো লেখককে তো নয়ই।

  • সৈকত আরেফিন: প্রাবন্ধিক ও গবেষক
Ad 300x250

সম্পর্কিত