leadT1ad

তেল বাণিজ্য বুঝতে চাইলে যে বইটি পড়তেই হবে

এআই জেনারেটেড ছবি

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যেদিন ভেনেজুয়েলা আক্রমণ করে দেশটির প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে সস্ত্রীক তুলে নিয়ে এলেন এবং ভেনেজুয়েলার তেল ব্যবস্থাপনা ‘আমেরিকা চালাবে’ বলে ঘোষণা দিলেন, তার দুদিন বাদে আমার হাতে একটি বই এল।

এল মানে বইটি নিজেই হেঁটে হেঁটে এল এমন নয়, প্রিয় আঞ্জু আপা বইটি আমার হাতে দিলেন—‘তেল বাণিজ্যের আদ্যোপান্ত বুঝতে চাস? এটা পড়!’

আমি বইটি নেড়েচেড়ে দেখলাম। ‘দ্য প্রাইজ’, লেখক ড্যানিয়েল ইয়ারজিন। ঢাউস আকৃতির বই। ৮০০ পৃষ্ঠার বেশি। প্রথম প্রকাশ ১৯৯১। প্রকাশক সায়মন অ্যান্ড শুস্টার।

আপা বললেন, ‘জ্বালানি তেলের বাইবেল এটা, বুঝলি। পড়ে দেখ, মজা পাবি। আমাজন থেকে অর্ডার করে কিনেছিলাম।’

‘আরে, বইটি তো পুলিৎজার পুরস্কারও পেয়েছিল দেখছি!’

আপা বললেন, ‘হ্যাঁ, ১৯৯২ সালে নন-ফিকশন ক্যাটাগরিতে পুরস্কার পেয়েছে।’

পরের দুই তিন দিন বলা যায় বুঁদ হয়ে থাকলাম বইটি নিয়ে। সত্যিই বিস্ময়কর এই বই। তেল যে কেবল একটি জ্বালানি নয়, বরং এটি ক্ষমতা, যুদ্ধ এবং বিশ্ব অর্থনীতির প্রধান নিয়ন্ত্রক, তা বোঝার জন্য দ্য প্রাইজ পড়া অপরিহার্য। ১৯৯১ সালে প্রকাশিত গ্রন্থটি কেবল তেলের ইতিহাস নয়, বরং গত দেড় শ বছরের বিশ্ব রাজনীতির এক নিখুঁত ব্যবচ্ছেদ।

পরবর্তী সময়ে বইটি নিয়ে আঞ্জু আপার সঙ্গে খানিক আলাপও হলো। আপা বললেন, ইয়ারজিন বইটির শুরু করেছেন ১৮৫৯ সালে পেনসিলভেনিয়ায় এডুইন ড্রেকের প্রথম তেল খনি আবিষ্কারের গল্প দিয়ে। তবে বইটির প্রথম আকর্ষণীয় অংশ হলো জন ডি রকফেলার এবং তার ‘স্ট্যান্ডার্ড অয়েল’ কোম্পানির উত্থান। তাই না?

দ্য প্রাইজ বইয়ের প্রচ্ছদ। ছবি: বুকরিডস থেকে নেওয়া
দ্য প্রাইজ বইয়ের প্রচ্ছদ। ছবি: বুকরিডস থেকে নেওয়া

আমি বললাম, হ্যাঁ, ঠিকই বলেছ। কীভাবে রকফেলার তেলের ওপর একাধিপত্য বিস্তার করে আধুনিক পুঁজিবাদের ভিত্তি গড়েছিলেন, তা ইয়ারজিন বেশ মুন্সিয়ানার সঙ্গে দেখিয়েছেন। প্রশংসা করতে হয় ভদ্রলোকের লেখার।

দুদিন হলো ভালোই শীত পড়েছে। আপা চায়ে চুমুক দিতে দিতে বললেন, প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের জয়-পরাজয় যে তেলের সরবরাহ নিশ্চিত করার ক্ষমতার ওপর নির্ধারিত হয়েছিল, তা জানতামই না, যদি না ইয়ারজিনের এই বইটা পড়তাম।

আমি বললাম, বিস্ময়কর কি জানো? ব্রিটিশ নৌবাহিনী জ্বালানি হিসেবে কয়লার পরিবর্তে তেলের ব্যবহার শুরু করেছিল, এটা প্রথম জানলাম দ্য প্রাইস পড়ে।

আমাকে আরও বিস্মিত করে দিয়ে আপা বললেন, চ্যাপ্টার ১৭ ও ১৮ কি মনে আছে তোর? হিটলারের জার্মানি আর সাম্রাজ্যবাদী জাপান কেমন মরিয়া হয়ে উঠেছিল তেলের খনির দখল নিতে! কি সুন্দর করে বর্ণনা করেছেন ওই দুই চ্যাপ্টারে তাই না?

আমি বললাম, শোনো আপা! আরও একটি বিষয় বলে রাখা প্রয়োজন। বইটির একটি বড় অংশ জুড়ে রয়েছে মধ্যপ্রাচ্যের তেলের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার লড়াই। ১৯৭৩ সালের আরব-ইসরায়েল যুদ্ধ এবং পরবর্তীতে আরব দেশগুলোর তেল নিষেধাজ্ঞা কীভাবে পশ্চিমা বিশ্বকে স্তব্ধ করে দিয়েছিল, তার রোমাঞ্চকর বিবরণ দিয়েছেন ইয়ারজিন। এখান থেকেই শুরু হয় ‘এনার্জি সিকিউরিটি’ বা জ্বালানি নিরাপত্তার আধুনিক ধারণা।

আঞ্জু আপা বললেন, ১৯৯০-এর দশকে লেখা বইটি এখনো কেন প্রাসঙ্গিক, বল তো? এটা পড়লে বুঝতে পারবি, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ কেন থামছে না, কিংবা মধ্যপ্রাচ্য কেন অস্থির থাকে, কারা অস্থির করে রাখে। ইয়ারজিন দেখিয়েছেন, তেলের ওপর নিয়ন্ত্রণ মানেই ক্ষমতার ওপর নিয়ন্ত্রণ। এটি জাতীয় নিরাপত্তার প্রধান স্তম্ভ এবং এটি বিশ্ব অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি।

Ad 300x250

সম্পর্কিত