জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০২৬

ও গণভোট

ক্লিক করুন

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি পুনর্বিবেচনার আহ্বান সিপিডির

স্ট্রিম প্রতিবেদক
স্ট্রিম প্রতিবেদক
ঢাকা

প্রকাশ : ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১৯: ২৯
শনিবার রাজধানীর ধানমন্ডিতে সিপিডি কার্যালয়ে প্রেস ব্রিফিংয়ে সংস্থার গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম। স্ট্রিম ছবি

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে অন্তর্বর্তী সরকারের করা বাণিজ্য চুক্তি পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানিয়েছে গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)। নতুন সরকারের সামনে অর্থনীতি, বাণিজ্য ও জ্বালানি খাতে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত সিদ্ধান্তের বিষয় তুলে ধরে সমন্বিত সংস্কার প্যাকেজও প্রস্তাব করেছে। এতে ব্যবসা খাতে দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণে ন্যায়পাল নিয়োগ এবং জীবাশ্ম জ্বালানিভিত্তিক নতুন বিদ্যুৎকেন্দ্র অনুমোদন না দেওয়ার সুপারিশ রয়েছে।

শনিবার (২৮ ফেব্রুয়ারি) রাজধানীর ধানমন্ডিতে সিপিডি কার্যালয়ে ‘নতুন সরকারের অর্থনৈতিক ও সামাজিক খাতে নীতি ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত: ১৮০ দিন ও তারপর’ শীর্ষক প্রেস ব্রিফিং হয়। সেখানে সংস্থার গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম পরবর্তী ৬ মাসের অগ্রাধিকার ও পরবর্তী করণীয় তুলে ধরেন।

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চুক্তি নিয়ে ‘হতভম্ব’ সিপিডি

ড. মোয়াজ্জেম বলেন, বিদায়ী অন্তর্বর্তী সরকার যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যে বাণিজ্য চুক্তি করেছে, তা দেখে তারা ‘হতভম্ব’ ও ‘স্তম্ভিত’। তার প্রশ্ন, একটি অনির্বাচিত সরকার কীভাবে এমন একটি চুক্তি করে যেতে পারে, যার দায়ভার বর্তাবে নির্বাচিত সরকারের ওপর।

গত ৯ ফেব্রুয়ারি ওয়াশিংটনের সঙ্গে ‘অ্যাগ্রিমেন্ট অন রিসিপ্রোকাল ট্রেড’ নামে চুক্তি সই হয়। এর তিন দিন পর ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদ শেষ হয়। নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে সরকার গঠন করেছে বিএনপি।

সিপিডি বলছে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনার শুরুতে জনসাধারণকে বলা হয়েছিল কেবল শুল্ক হার কমানো নিয়ে কথা চলছে। ট্রাম্পের পাল্টা শুল্ক ৩৫ থেকে ২০ শতাংশে নামিয়ে আনার বিষয়টি সামনে আনা হয়। কিন্তু চূড়ান্ত চুক্তির পরিধি শুল্কের বাইরে বিস্তৃত।

কর ন্যায্যতা নিশ্চিতে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের অধীনে একটি বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠন করা যেতে পারে, যারা কর অব্যাহতি, কর ফাঁকি ও কর ছাড় নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করবে।

ড. মোয়াজ্জেম বলেন, শুল্কসংক্রান্ত অংশটিও বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। তিনি সতর্ক করেন, বড় অর্থনীতির সঙ্গে শুল্ক বৈষম্য তৈরি হলে তারা বিকল্প বাজারে কম দামে পণ্য পাঠাতে পারে। এতে বাংলাদেশের রপ্তানি বাজারে প্রতিযোগিতা বাড়বে। একই সঙ্গে উচ্চমূল্যের প্রভাবে যুক্তরাষ্ট্রের ভোক্তাদের ওপর মূল্যস্ফীতির চাপ তৈরি হতে পারে। তার মতে, বাণিজ্য দরকষাকষি বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার কাঠামোর ভেতরে থেকেই হওয়া উচিত। বন্ধুত্বপূর্ণ আলোচনার মাধ্যমে চুক্তি পুনর্বিবেচনা বা সংশোধনের সুযোগ রয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

ব্যবসায় দুর্নীতিই প্রধান বাধা

বাণিজ্য ইস্যুর পাশাপাশি ব্যবসার পরিবেশের জন্য দুর্নীতিকে সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধকতা হিসেবে চিহ্নিত করেছে সিপিডি। ড. মোয়াজ্জেম বলেন, ব্যবসায়ীদের প্রায়ই সরকারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে অপ্রাতিষ্ঠানিক লেনদেনে জড়াতে হয়। এ প্রক্রিয়া দুর্নীতিকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিয়েছে।

দুর্নীতি প্রতিরোধে কর ন্যায়পাল, ব্যবসাজনিত ন্যায়পাল ও ব্যাংক ন্যায়পাল নিয়োগের সুপারিশ করে সংস্থাটি বলছে, অভিযোগ গ্রহণ, তদন্ত ও প্রতিকার ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করতে স্বাধীন ন্যায়পাল কাঠামো কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।

বর্তমানে বাংলাদেশের রাজস্ব-জিডিপি অনুপাত এশিয়ার মধ্যে সর্বনিম্ন জানিয়ে রাজস্ব খাতে সংস্কারের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। সংস্থাটি বলছে, নতুন সরকার এ হার ৪ শতাংশ থেকে ১০ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। কর ন্যায্যতা নিশ্চিতে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের অধীনে একটি বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠন করা যেতে পারে, যারা কর অব্যাহতি, কর ফাঁকি ও কর ছাড় নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করবে।

মূল্য সংযোজন করের স্তর ৮টি থেকে ধাপে ধাপে কমিয়ে ৩টি, পরে ২টি এবং দীর্ঘমেয়াদে একক হারে আনার সুপারিশও করা হয়।

উৎপাদনে না থাকলেও বেসরকারি কেন্দ্রকে সক্ষমতা ভাড়া পরিশোধ আর্থিক চাপ বাড়াচ্ছে বলে উল্লেখ করা হয়। এজন্য ভবিষ্যৎ ক্রয় চুক্তিতে ‘বিদ্যুৎ না দিলে অর্থ নয়’ শর্ত সংযোজনের প্রস্তাব দিয়েছে সংস্থাটি। পাশাপাশি নতুন জীবাশ্ম জ্বালানিভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র অনুমোদন না দেওয়ার আহ্বানও জানানো হয়েছে।

বিদ্যুৎ খাতে অতিরিক্ত সক্ষমতা নিয়ে উদ্বেগ

সিপিডির গবেষণায় বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতকে ঝুঁকিপূর্ণ খাত হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। সংস্থাটি বলেছে, অতিরঞ্জিত বিদ্যুৎ চাহিদা পূর্বাভাস ও জীবাশ্ম জ্বালানিতে দীর্ঘমেয়াদি নির্ভরতার কারণে আর্থিক চাপ বাড়ছে।

বর্তমান মহাপরিকল্পনায় ২০৪০ সালের মধ্যে বিদ্যুৎ চাহিদা ৪০ থেকে ৫০ গিগাওয়াট ধরা হলেও স্বাধীন বিশ্লেষণে সম্ভাব্য চাহিদা ৩০ গিগাওয়াটের কাছাকাছি উল্লেখ করা হয়েছে। প্রকৃত শিল্প ব্যবহার তথ্যের বদলে সামষ্টিক প্রবৃদ্ধির সঙ্গে চাহিদার সম্পর্ক ধরে উচ্চ লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করায় অতিরিক্ত উৎপাদন সক্ষমতা তৈরি হয়েছে বলে মত সিপিডির।

এ প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি) ও বিদ্যুৎ সেলকে কঠোর পরিসংখ্যানভিত্তিক পদ্ধতিতে চাহিদা নিরূপণ এবং সংশোধিত পূর্বাভাস স্বাধীনভাবে যাচাই করে সংসদে উপস্থাপনের সুপারিশ করা হয়েছে।

উৎপাদনে না থাকলেও বেসরকারি কেন্দ্রকে সক্ষমতা ভাড়া পরিশোধ আর্থিক চাপ বাড়াচ্ছে বলে উল্লেখ করা হয়। এজন্য ভবিষ্যৎ ক্রয় চুক্তিতে ‘বিদ্যুৎ না দিলে অর্থ নয়’ শর্ত সংযোজনের প্রস্তাব দিয়েছে সংস্থাটি। পাশাপাশি নতুন জীবাশ্ম জ্বালানিভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র অনুমোদন না দেওয়ার আহ্বানও জানানো হয়েছে।

নতুন সরকারের সামনে কাঠামোগত সংস্কারের সুবর্ণ সুযোগ রয়েছে জানিয়ে সিপিডি বলছে, তবে বাণিজ্য, রাজস্ব, জ্বালানি ও আর্থিক খাতে সিদ্ধান্ত নিতে হবে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়ে।

সম্পর্কিত