দোহারের ইকরাশি গ্রামের শান্তি রানী পাল। বয়স ৯২ বছর। বয়সের ভারে অনেকটাই নুয়ে পড়েছেন। চোখের আলো কমে গেছে, গলার স্বরও ভেঙে গেছে; তবু সংসারের চাকাকে সচল রাখতে আদি পেশা হিসেবে কুমারের কাজ করে যাচ্ছেন তিনি।
স্ট্রিম সংবাদদাতা

শান্তি রানী পাল। বয়স ৯২ বছর। বয়সের ভারে অনেকটাই নুয়ে পড়েছেন। চোখের আলো কমে গেছে, গলার স্বরও ভেঙে গেছে; তবু সংসারের চাকাকে সচল রাখতে আদি পেশা হিসেবে কুমারের কাজ করে যাচ্ছেন তিনি।
দোহারের ইকরাশি গ্রামের পাল বাড়িতে পা রাখতেই চোখে পড়বে এমন দৃশ্য। যে বয়সে নাতি-নাতনিদের সঙ্গে গল্প করে কিংবা একটু আয়েশ করে সময় কাটানোর কথা, সেই বয়সেও শান্তি রানী পাল অবিরাম লড়ে যাচ্ছেন কাদা-জলের সঙ্গে। দোহার উপজেলার রাইপাড়া ইউনিয়নের ইকরাশি গ্রামের এই পালপাড়ায় শান্তি রানীর মতো অনেকেই সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত মাটি ছেনে তৈরি করেন নানা তৈজসপত্র।
শান্তি রানীর স্কুলে যাওয়ার সুযোগ হয়নি। আগে বাবার বাড়িতে, আর বিয়ের পর স্বামীর সংসারে এসেও মাটির কাজ করতে হয়েছে। তিনি দোহার উপজেলার রাইপাড়া ইউনিয়নের ইকরাশি গ্রামের জীবন পালের স্ত্রী। প্রায় ৩৫ বছর আগে স্বামী মারা গেলে সংসারের দায়িত্ব তাঁর কাঁধে এসে পড়ে।
তখন দুই ছেলে প্রাণকৃষ্ণ পাল ও পুল্লাদ পাল ঢাকার তাঁতিবাজার এলাকায় অলংকার তৈরির কাজ করত। কিছুদিন পর অলংকার তৈরির কাজ কমে গেলে ছেলেরা ঢাকা ছেড়ে বাড়িতে ফিরে এসে মায়ের সঙ্গে মাটির জিনিসপত্র তৈরির কাজ শুরু করেন।

শান্তি রানী পাল জানান, ‘যতক্ষণ এ দেহে প্রাণ আছে, ততক্ষণ কাজ করে যেতে হবে। সেই ১৯৫০ সালের দুর্ভিক্ষের কথা আজও মনে পড়ে। এখনো পেটের ভাতের জন্য কাজ করতে হচ্ছে। আমাদের দেখার কেউ নেই। সরকার আসে, সরকার যায়—আমাদের খবর কেউ নেয় না। এখন সব জিনিসেরই দাম বেশি। ২০ বছর আগে যে দামে মাটি কিনেছি এখন তা তিনগুণের বেশি দাম। কিন্তু আমাদের জিনিসপত্রের দাম আগের তুলনায় বাড়েনি। যখন কাচারীঘাটে লঞ্চ টার্মিনাল ছিল তখন দূর-দুরান্তের মানুষজন মাটির তৈরি তৈজসপত্র কিনতে আসত।’
একটা সময় ছিল যখন ইকরাশি পালবাড়িতে ঘর-গৃহস্থালির সব পণ্যই তৈরি হতো। ঠিলা, কলস, রসের হাঁড়ি, মুড়ির খোলা, পিঠার ছাঁচ, বাসন-কোসন, বদনা, হাতা ও ভাতের হাঁড়িসহ নানা সাইজের মাটির পাত্রে ভরে থাকত আঙিনা। দূরদূরান্ত থেকে মানুষ আসত মাটির জিনিস কিনতে। কিন্তু প্লাস্টিক ও মেলামাইন সামগ্রীর দাপটে সেই দিন এখন অতীত। মাটির দাম আগের চেয়ে তিনগুণ বাড়লেও পালদের তৈরি পণ্যের দাম সেই অনুপাতে বাড়েনি।
শান্তি রানী পালের সন্তান পুল্লাদ পাল জানান, ‘এ অঞ্চলে বিয়েশাদিতে দই খাওয়ানোর প্রচলন থাকার কারণে দইয়ের পাতিল বেশি বিক্রি হয়ে থাকে। পাশাপাশি মাটির পাতিল, হাতানি ইত্যাদি তৈরি হয়ে থাকে। একসময় শীতকালে গ্রামীণ মেলায় এখনকার তৈরি জিনিসপত্রের ব্যাপক চাহিদা থাকায় আমরা মেলায় নিয়ে বিক্রি করতাম খেলনাসহ নানা সামগ্রী। এখন সেটা নেই। সপ্তাহে একদিন উপজেলার জয়পাড়া হাটে বিক্রি করে থাকি।’
ইকরাশি গ্রামে ১৩টি পাল পরিবারের মধ্যে ১০টি পরিবার এই পেশায় আছেন। অভাব-অনটন আর চাহিদার ঘাটতিতে তিনটি পরিবার পেশা বদলে ফেলেছে। কেউ পাড়ি জমিয়েছেন প্রবাসে, কেউ ঢাকায় চাকরি করছেন। বর্তমানে ১০টি পরিবার কোনোমতে এই বাপ-দাদার পেশাকে আঁকড়ে ধরে আছে। আর এই টিকে থাকার লড়াইয়ে ভূমিকা রাখছেন মূলত বাড়ির নারীরা।

পেশা পরিবর্তন করেছেন এমন মানুষদের একজন নন্দদুলাল পাল। স্ট্রিমের সঙ্গে কথা বলার সময় তাঁর কণ্ঠে ফুটে উঠেছে হতাশা। তিনি বলেন, ‘একসময়ে কুমারের কাজ করেই চলত জীবন-জীবিকা। প্লাস্টিক সামগ্রীর চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় মাটির জিনিসের চাহিদা না থাকায় বাধ্য হয়ে আমরা অন্য পেশা বেছে নিয়েছি। সরকার যদি এই পেশার মানুষজনকে পৃষ্ঠপোষকতা করত, তাহলে বাপ-দাদার পেশাকে টিকিয়ে রাখার জন্য সবাই চেষ্টা করত।
মৃৎশিল্পের এই সংকট নিয়ে দোহার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মাঈদুল ইসলাম স্ট্রিমকে বলেন, ‘মৃৎশিল্পকে টিকিয়ে রাখার জন্য বিভিন্ন সময় সরকার নানা উদ্যোগ গ্রহণ করে থাকে। সরকার ক্ষুদ্র শিল্পের সঙ্গে সম্পৃক্তদের সহজ শর্তে ঋণ দিয়েও সহযোগিতা করে থাকে। ইকরাশির গ্রামের মৃৎশিল্পীদের মধ্যে কারো ঋণের প্রয়োজন হলে আমি প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা করব।’
শান্তি রানীর ঝাপসা চোখ আর দুর্বল হাত হয়ত আর বেশিদিন মাটির চাকা ঘোরাতে পারবে না। একই সঙ্গে চাহিদা কমে যাওয়ায় ও কাঁচামালের দাম বাড়ায় ইকরাশির মৃৎশিল্প টিকে থাকা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। স্থানীয় শিল্পীরা বলছেন, পৃষ্ঠপোষকতা না পেলে এই পেশায় টিকে থাকা আরও কঠিন হয়ে পড়বে।

শান্তি রানী পাল। বয়স ৯২ বছর। বয়সের ভারে অনেকটাই নুয়ে পড়েছেন। চোখের আলো কমে গেছে, গলার স্বরও ভেঙে গেছে; তবু সংসারের চাকাকে সচল রাখতে আদি পেশা হিসেবে কুমারের কাজ করে যাচ্ছেন তিনি।
দোহারের ইকরাশি গ্রামের পাল বাড়িতে পা রাখতেই চোখে পড়বে এমন দৃশ্য। যে বয়সে নাতি-নাতনিদের সঙ্গে গল্প করে কিংবা একটু আয়েশ করে সময় কাটানোর কথা, সেই বয়সেও শান্তি রানী পাল অবিরাম লড়ে যাচ্ছেন কাদা-জলের সঙ্গে। দোহার উপজেলার রাইপাড়া ইউনিয়নের ইকরাশি গ্রামের এই পালপাড়ায় শান্তি রানীর মতো অনেকেই সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত মাটি ছেনে তৈরি করেন নানা তৈজসপত্র।
শান্তি রানীর স্কুলে যাওয়ার সুযোগ হয়নি। আগে বাবার বাড়িতে, আর বিয়ের পর স্বামীর সংসারে এসেও মাটির কাজ করতে হয়েছে। তিনি দোহার উপজেলার রাইপাড়া ইউনিয়নের ইকরাশি গ্রামের জীবন পালের স্ত্রী। প্রায় ৩৫ বছর আগে স্বামী মারা গেলে সংসারের দায়িত্ব তাঁর কাঁধে এসে পড়ে।
তখন দুই ছেলে প্রাণকৃষ্ণ পাল ও পুল্লাদ পাল ঢাকার তাঁতিবাজার এলাকায় অলংকার তৈরির কাজ করত। কিছুদিন পর অলংকার তৈরির কাজ কমে গেলে ছেলেরা ঢাকা ছেড়ে বাড়িতে ফিরে এসে মায়ের সঙ্গে মাটির জিনিসপত্র তৈরির কাজ শুরু করেন।

শান্তি রানী পাল জানান, ‘যতক্ষণ এ দেহে প্রাণ আছে, ততক্ষণ কাজ করে যেতে হবে। সেই ১৯৫০ সালের দুর্ভিক্ষের কথা আজও মনে পড়ে। এখনো পেটের ভাতের জন্য কাজ করতে হচ্ছে। আমাদের দেখার কেউ নেই। সরকার আসে, সরকার যায়—আমাদের খবর কেউ নেয় না। এখন সব জিনিসেরই দাম বেশি। ২০ বছর আগে যে দামে মাটি কিনেছি এখন তা তিনগুণের বেশি দাম। কিন্তু আমাদের জিনিসপত্রের দাম আগের তুলনায় বাড়েনি। যখন কাচারীঘাটে লঞ্চ টার্মিনাল ছিল তখন দূর-দুরান্তের মানুষজন মাটির তৈরি তৈজসপত্র কিনতে আসত।’
একটা সময় ছিল যখন ইকরাশি পালবাড়িতে ঘর-গৃহস্থালির সব পণ্যই তৈরি হতো। ঠিলা, কলস, রসের হাঁড়ি, মুড়ির খোলা, পিঠার ছাঁচ, বাসন-কোসন, বদনা, হাতা ও ভাতের হাঁড়িসহ নানা সাইজের মাটির পাত্রে ভরে থাকত আঙিনা। দূরদূরান্ত থেকে মানুষ আসত মাটির জিনিস কিনতে। কিন্তু প্লাস্টিক ও মেলামাইন সামগ্রীর দাপটে সেই দিন এখন অতীত। মাটির দাম আগের চেয়ে তিনগুণ বাড়লেও পালদের তৈরি পণ্যের দাম সেই অনুপাতে বাড়েনি।
শান্তি রানী পালের সন্তান পুল্লাদ পাল জানান, ‘এ অঞ্চলে বিয়েশাদিতে দই খাওয়ানোর প্রচলন থাকার কারণে দইয়ের পাতিল বেশি বিক্রি হয়ে থাকে। পাশাপাশি মাটির পাতিল, হাতানি ইত্যাদি তৈরি হয়ে থাকে। একসময় শীতকালে গ্রামীণ মেলায় এখনকার তৈরি জিনিসপত্রের ব্যাপক চাহিদা থাকায় আমরা মেলায় নিয়ে বিক্রি করতাম খেলনাসহ নানা সামগ্রী। এখন সেটা নেই। সপ্তাহে একদিন উপজেলার জয়পাড়া হাটে বিক্রি করে থাকি।’
ইকরাশি গ্রামে ১৩টি পাল পরিবারের মধ্যে ১০টি পরিবার এই পেশায় আছেন। অভাব-অনটন আর চাহিদার ঘাটতিতে তিনটি পরিবার পেশা বদলে ফেলেছে। কেউ পাড়ি জমিয়েছেন প্রবাসে, কেউ ঢাকায় চাকরি করছেন। বর্তমানে ১০টি পরিবার কোনোমতে এই বাপ-দাদার পেশাকে আঁকড়ে ধরে আছে। আর এই টিকে থাকার লড়াইয়ে ভূমিকা রাখছেন মূলত বাড়ির নারীরা।

পেশা পরিবর্তন করেছেন এমন মানুষদের একজন নন্দদুলাল পাল। স্ট্রিমের সঙ্গে কথা বলার সময় তাঁর কণ্ঠে ফুটে উঠেছে হতাশা। তিনি বলেন, ‘একসময়ে কুমারের কাজ করেই চলত জীবন-জীবিকা। প্লাস্টিক সামগ্রীর চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় মাটির জিনিসের চাহিদা না থাকায় বাধ্য হয়ে আমরা অন্য পেশা বেছে নিয়েছি। সরকার যদি এই পেশার মানুষজনকে পৃষ্ঠপোষকতা করত, তাহলে বাপ-দাদার পেশাকে টিকিয়ে রাখার জন্য সবাই চেষ্টা করত।
মৃৎশিল্পের এই সংকট নিয়ে দোহার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মাঈদুল ইসলাম স্ট্রিমকে বলেন, ‘মৃৎশিল্পকে টিকিয়ে রাখার জন্য বিভিন্ন সময় সরকার নানা উদ্যোগ গ্রহণ করে থাকে। সরকার ক্ষুদ্র শিল্পের সঙ্গে সম্পৃক্তদের সহজ শর্তে ঋণ দিয়েও সহযোগিতা করে থাকে। ইকরাশির গ্রামের মৃৎশিল্পীদের মধ্যে কারো ঋণের প্রয়োজন হলে আমি প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা করব।’
শান্তি রানীর ঝাপসা চোখ আর দুর্বল হাত হয়ত আর বেশিদিন মাটির চাকা ঘোরাতে পারবে না। একই সঙ্গে চাহিদা কমে যাওয়ায় ও কাঁচামালের দাম বাড়ায় ইকরাশির মৃৎশিল্প টিকে থাকা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। স্থানীয় শিল্পীরা বলছেন, পৃষ্ঠপোষকতা না পেলে এই পেশায় টিকে থাকা আরও কঠিন হয়ে পড়বে।
.png)
চিত্রশিল্পী তৌহিন হাসান ঘুরে দেখেছেন দেশ-বিদেশের বিখ্যাত সব আর্ট মিউজিয়াম ও আর্ট গ্যালারি। প্রতিটি সংগ্রহশালায় ক্যানভাস থেকে ক্যানভাসে তিনি খুঁজেছেন শিল্পের ভাষা; রঙ, আলো আর তুলির আঁচড়ে অনুভব করেছেন শিল্পীদের জীবন, সময় ও সৃষ্টির গল্প। সেই শিল্পভ্রমণের অভিজ্ঞতা নিয়ে শুরু হলো নতুন ধারাবাহিক ‘আর্ট মিউজ
২ ঘণ্টা আগে
ইন্টারনেটের হাজারো নেতিবাচকতার ভিড়ে প্রাণীদের ‘কিউট’ ভিডিও ছিল এক চিলতে স্বস্তি। কিন্তু এআই-এর যুগে সেই নির্ভেজাল বিশ্বাসে এখন ফাটল ধরেছে। কোনো ভিডিও দেখে হাসার বদলে আমাদের মনে আগে প্রশ্ন জাগছে, এটি কি আসল নাকি এআই দিয়ে তৈরি? অবিশ্বাসের এই ডিজিটাল চোরাবালিতে দাঁড়িয়ে প্রশ্ন উঠছে, আমাদের ছোট ছোট আনন্দ
১ দিন আগে
সমকালীন বাংলাদেশের বুদ্ধিবৃত্তিক জগতে এক অসাধারণ ব্যক্তিত্ব আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ। জনপ্রিয়তা ও মননশীলতার মেলবন্ধনের দুর্লভ উদাহরণ তিনি। সৃজনশীল ব্যক্তিত্বের পাশাপাশি তিনি একজন কর্মবীর। আজ তিনি সাতাশি বছর পূর্ণ করলেন।
২৫ জুলাই ২০২৬
এইতো কিছুদিন আগে কথা। অফিস থেকে বেরিয়ে বিশেষ একটি কাজে শাহবাগের উদ্দেশ্যে রিকশায় উঠেছিলাম। বিকেলের ব্যস্ত ঢাকার চিরচেনা যানজটে রিকশাটি একসময় থেমে গেল। চারপাশে শুধু হর্নের শব্দ, মানুষের কোলাহল আর অসংখ্য গাড়ির সারি। ঠিক সেই মুহূর্তেই কানে ভেসে এলো এক পরিচিত সুর ‘আলো আমার আলো ওগো, আলো ভুবনভরা’…!
২৫ জুলাই ২০২৬