বই আলোচনা
ড. মোহাম্মদ রেজাউল করিম

বাংলাদেশের মানুষের কাছে রাজনীতি অত্যন্ত আকর্ষণীয় বিষয়। রাষ্ট্রের বিন্যাস আর গঠনকাঠামো বুঝতে চাওয়া পাঠকের সংখ্যা প্রচুর। এ ধরনের বিষয়কে কেন্দ্র করে প্রতি বছর বেশ কিছু বই প্রকাশিত হয়। তবে বিগত কয়েক দশকে রাজনীতিকে কেন্দ্র করেই বিশেষ বিষয়কেন্দ্রিক বই প্রকাশের প্রবণতা বেড়েছে। এই ধারাবাহিকতায় সাম্প্রতিক সংযোজন কে এম মঈনুদ্দিনের ‘বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি: সংবিধান প্রথা বাস্তবতা’। এই বইয়ে লেখক বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি পদের রূপান্তর, সাংবিধানিক অবস্থান, ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট এবং প্রাতিষ্ঠানিক সীমাবদ্ধতার তুলনামূলক বিশ্লেষণ উপস্থাপন করেছেন। রাষ্ট্রপতির পদকে কেন্দ্র করে রচিত এমন বিস্তারিত গবেষণাভিত্তিক গ্রন্থ বাংলা ভাষায় খুবই বিরল। এ কারণে বইটি গবেষক, শিক্ষার্থী, নীতিনির্ধারক এবং আগ্রহী পাঠকদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ ‘রেফারেন্স’ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
রাষ্ট্রপতি পদের দায়িত্ব, ক্ষমতা ও মর্যাদা সম্পর্কিত তাত্ত্বিক আলোচনার পাশাপাশি এর প্রায়োগিক দিকগুলোর বিশ্লেষণও বইটিতে চমৎকারভাবে উঠে এসেছে, যা গবেষণামনস্ক পাঠকের জ্ঞানচর্চাকে সমৃদ্ধ করবে। সর্বোপরি, বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় রাষ্ট্রপতির পদের বিভিন্ন দিকের তাত্ত্বিক ও প্রাতিষ্ঠানিক বিশ্লেষণে লেখকের গভীরতা ও বিশ্লেষণধর্মী দক্ষতা লক্ষণীয়।
দশটি অধ্যায়ে বিন্যস্ত এই বইয়ে রাষ্ট্রপতি পদের ঐতিহাসিক বিবর্তন, শাসনতান্ত্রিক প্রেক্ষাপট, সাংবিধানিক ক্ষমতা, আইন প্রণয়ন প্রক্রিয়া, বিচার বিভাগে রাষ্ট্রপতির ভূমিকা এবং নির্বাহী বিভাগের সঙ্গে সম্পর্কিত বিষয়গুলোর তাত্ত্বিক ও তুলনামূলক বিশ্লেষণ রয়েছে। পাশাপাশি বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় রাষ্ট্রপতির প্রভাব এবং রাষ্ট্রপতির ক্ষমতার পুনর্বিন্যাস নিয়ে জনমতের প্রতিফলনও আলোচিত হয়েছে। এর মাধ্যমে বইটি রাষ্ট্রপতি পদটিকে গভীরভাবে বোঝার সুযোগ তৈরি করে দেয়।
বইটির বঙ্গভবন-সংক্রান্ত অধ্যায়টি বিশেষভাবে উল্লেখ্য। একটি ভবন কীভাবে কখনো প্রতীকী অর্থে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়, আবার কখনো কেবল আনুষ্ঠানিক প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরিত হয়—তার ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষণ এ বইয়ে পাওয়া যায়। প্রতিটি অধ্যায়ে উঠে এসেছে প্রখ্যাত তাত্ত্বিকদের ধারণা, বিভিন্ন দেশের সাংবিধানিক অভিজ্ঞতা এবং শাসনব্যবস্থার তুলনামূলক আলোচনার মাধ্যমে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি বিষয়ক জ্ঞানচর্চাকে এক বিস্তৃত পরিসরে স্থাপন করা হয়েছে।
বইটির অন্যতম শক্তি এর সুসংহত তাত্ত্বিক ভিত্তি। এতে প্রাতিষ্ঠানিকতাবাদ, সাংবিধানিকতাবাদ এবং সাংবিধানিক প্রথা বা রাজনৈতিক রীতিনীতির আন্তঃসম্পর্ককে কেন্দ্র করে একটি সমন্বিত বিশ্লেষণমূলক কাঠামো নির্মাণ করা হয়েছে। পাশাপাশি বিভিন্ন তাত্ত্বিক ধারণাকে সহজ ও স্পষ্ট ভাষায় ব্যাখ্যা করা হয়েছে।
রাষ্ট্রপতি শব্দের ব্যুৎপত্তিগত বিশ্লেষণ, আধা-রাষ্ট্রপতিশাসিত ব্যবস্থা, প্রধানমন্ত্রী-প্রধান সরকার ব্যবস্থা, আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব, অভিশংসন, বাস্তববাদী ও আইনি দৃষ্টিভঙ্গি, স্বেচ্ছাধীন ক্ষমতা, পরামর্শনির্ভর ক্ষমতা, রাষ্ট্রীয় দায়মুক্তি, রাষ্ট্রপতির অধ্যাদেশ, আদেশ, ঘোষণা, বিদেশি রাষ্ট্রদূতের পরিচয়পত্র, রাষ্ট্রীয় শিষ্টাচার, পদমর্যাদাক্রম, ‘মহামান্য’ সম্বোধনের রীতি, রাজনৈতিক বন্দোবস্ত, সংবিধান সংশোধন এবং প্রতি-স্বাক্ষর-এর মতো ধারণাগুলোর তাত্ত্বিক ও প্রায়োগিক তাৎপর্য স্পষ্টভাবে তুলে ধরা হয়েছে। এসব ধারণার ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট, সাংবিধানিক ব্যাখ্যা এবং বাস্তব প্রয়োগের আলোচনা বইটির উপস্থাপনাকে আরও সমৃদ্ধ করেছে।
সংসদীয় শাসনব্যবস্থায় প্রধানমন্ত্রী প্রকৃত নির্বাহী ক্ষমতার অধিকারী ও সরকারপ্রধান হলেও রাষ্ট্রপতির পদকে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ মর্যাদার পদ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। বাংলাদেশের সংবিধানে রাষ্ট্রপতির পদটিও একই মর্যাদা ধারণ করে; তবে তাঁর ভূমিকা প্রধানত আনুষ্ঠানিক ও সাংবিধানিক। তা সত্ত্বেও রাষ্ট্রপতি রাষ্ট্রীয় ধারাবাহিকতা, সাংবিধানিক বৈধতা এবং জাতীয় ঐক্যের প্রতীক হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
লেখকের বিশ্লেষণে দেখা যায়, বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতির স্বেচ্ছাধীন ক্ষমতা অত্যন্ত সীমিত। বিশেষত প্রধানমন্ত্রী নিয়োগের ক্ষেত্রে কিছু পরিস্থিতিতে রাষ্ট্রপতির বিচার-বিবেচনার সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে; তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রে তাঁকে প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করতে হয়। বাস্তব রাজনৈতিক চর্চায় এই সীমিত বিবেচনামূলক ক্ষমতাও সাংবিধানিক বিধান, সংসদীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা এবং রাজনৈতিক বাস্তবতার দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়। মূলত এই বিশ্লেষণই বইটির অন্যতম কেন্দ্রীয় যুক্তি।
লেখক বিভিন্ন সময়ে দায়িত্ব পালনকারী রাষ্ট্রপতিদের সিদ্ধান্ত, রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট এবং প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা পর্যালোচনা করে দেখিয়েছেন যে, স্বাধীনতার পর প্রায় ছয় দশকে বাংলাদেশের ২২ জন ব্যক্তি রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেছেন। অন্যদিকে, ভারতের প্রায় আট দশকের ইতিহাসে মাত্র ১৫ জন ব্যক্তি রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেছেন। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতির ঘন ঘন পরিবর্তনের পেছনে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা, দুর্বল প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ এবং প্রশাসনিক রূপান্তরের ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। কখনও সংসদীয়, কখনও রাষ্ট্রপতিশাসিত ব্যবস্থার প্রবর্তন ও পুনঃপ্রবর্তনের ফলে রাষ্ট্রপতি প্রতিষ্ঠানটি একটি স্থিতিশীল সাংবিধানিক চরিত্র অর্জন করতে পারেনি।
লেখক আরও দেখিয়েছেন যে, দলীয় সমর্থনে নির্বাচিত রাষ্ট্রপতিরা ক্ষমতার পালাবদলের পর ভিন্ন রাজনৈতিক বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েছেন। ফলে তাঁদের অনেকের বক্তব্য, অবস্থান ও আচরণে সময়ের সঙ্গে পরিবর্তন এসেছে। রাষ্ট্রপতির পদের আনুষ্ঠানিকতা, রাজনৈতিক নিরপেক্ষতার প্রত্যাশা এবং বাস্তব রাজনৈতিক সম্পর্কের মধ্যে যে টানাপোড়েন সৃষ্টি হয়, তা বইটির বিভিন্ন আলোচনায় সুস্পষ্টভাবে উঠে এসেছে।
প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমান এবং রাষ্ট্রপতি বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরীর সম্পর্ক বিশ্লেষণের মাধ্যমে লেখক এই দ্বন্দ্বের একটি তাৎপর্যপূর্ণ উদাহরণ তুলে ধরেছেন। তাঁর মতে, প্রধানমন্ত্রীর প্রতি ব্যক্তিগত শ্রদ্ধা থাকা সত্ত্বেও রাষ্ট্রপতি চৌধুরী সরকারের কিছু নীতিগত অবস্থানে হতাশ ছিলেন; কিন্তু সাংবিধানিক কাঠামোর মধ্যে তাঁর কার্যকর হস্তক্ষেপের সুযোগ ছিল সীমিত। রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া থেকে বিচ্ছিন্নতার অনুভূতি তাঁকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল। এ ধরনের বহু ঘটনার আলোচনার মাধ্যমে রাষ্ট্রপতির পদের উত্থান-পতন ও সীমাবদ্ধতার বিশ্লেষণ একটি নতুন মাত্রা পেয়েছে।
সংসদীয় ব্যবস্থায় বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশে প্রধানমন্ত্রীর হাতে ক্ষমতার অতিরিক্ত কেন্দ্রীভবন রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক সংকট মোকাবিলায় বিকল্প পথকে সীমাবদ্ধ করে দিতে পারে। এ প্রেক্ষাপটে রাষ্ট্রপতি বিশেষ পরিস্থিতিতে—যেমন সরকার গঠন-সংক্রান্ত অনিশ্চয়তা বা সাংবিধানিক অচলাবস্থার সময়ে—একটি সাংবিধানিক রেফারেন্স পয়েন্ট ও মধ্যস্থতাকারী ভূমিকা পালন করতে পারেন। লেখক দেখিয়েছেন যে, ভারত, যুক্তরাজ্য ও জার্মানির মতো সুপ্রতিষ্ঠিত গণতন্ত্রে দলীয় অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র, কার্যকর সংসদীয় কমিটি, শক্তিশালী বিরোধী দল এবং সুপ্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক সংস্কৃতি প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার ওপর একটি কার্যকর ভারসাম্য সৃষ্টি করে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এসব প্রাতিষ্ঠানিক উপাদান এখনো পর্যাপ্তভাবে বিকশিত হয়নি। ফলে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য প্রতিষ্ঠার প্রশ্নটি গবেষক ও সাধারণ জনগণের আলোচনায় গুরুত্ব পেয়েছে।
বইয়ের উপসংহারে লেখক রাষ্ট্রপতিকে একটি নৈতিক ও সাংবিধানিক রেফারেন্স পয়েন্ট হিসেবে বিবেচনা করার রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করেছেন। এ লক্ষ্যে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন প্রক্রিয়ার সংস্কার, দলীয় প্রভাব হ্রাস, সংসদের কার্যকারিতা বৃদ্ধি, গণমাধ্যমের সমালোচনামূলক ভূমিকা এবং সুশীল সমাজের সক্রিয় অংশগ্রহণের ওপর জোর আরোপ করা হয়েছে।
বইটির প্রচ্ছদও বিশেষভাবে দৃষ্টি আকর্ষণ করে। সবুজ পটভূমিতে সাদা ও লাল রঙের সমন্বয়ে বঙ্গভবনের প্রতীকী ব্যবহার রাষ্ট্রীয় ঐতিহ্য, ইতিহাস এবং প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষমতার বহুমাত্রিক তাৎপর্যকে তুলে ধরেছে। প্রচ্ছদে ব্যবহৃত বঙ্গভবনের চিত্রের নিচের অংশের অসম্পূর্ণ বা ছিন্ন বিন্যাস একটি অন্তর্নিহিত প্রতীকী বার্তা বহন করে, যার তাৎপর্য উপলব্ধি করতে পুরো বইটি পাঠ করা প্রয়োজন। বইটি পাঠকের মনে থাকা বহু প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার পাশাপাশি বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে গভীরতর উপলব্ধি গড়ে তুলতে সহায়তা করে।
সামগ্রিকভাবে, ‘বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি: সংবিধান প্রথা বাস্তবতা’ কেবল রাষ্ট্রপতি পদ সম্পর্কিত একটি তথ্যসমৃদ্ধ গ্রন্থ নয়; বরং বাংলাদেশের সাংবিধানিক বিকাশ, রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান এবং ক্ষমতার ভারসাম্য সম্পর্কিত বিতর্ককে নতুনভাবে অনুধাবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ গবেষণাভিত্তিক রেফারেন্স হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। রাষ্ট্রপতি প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে গভীর ও সমন্বিত ধারণা অর্জনের জন্য বইটি গবেষক, শিক্ষার্থী এবং সাধারণ পাঠক—সকলের জন্যই মূল্যবান সংযোজন।
বইয়ের নাম : বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি: সংবিধান, প্রথা, বাস্তবতা
লেখক: কে এম মঈনুদ্দিন
প্রকাশক: কথাপ্রকাশ
পৃষ্ঠা: ৩২৫
প্রকাশকাল: এপ্রিল ২০২৬

বাংলাদেশের মানুষের কাছে রাজনীতি অত্যন্ত আকর্ষণীয় বিষয়। রাষ্ট্রের বিন্যাস আর গঠনকাঠামো বুঝতে চাওয়া পাঠকের সংখ্যা প্রচুর। এ ধরনের বিষয়কে কেন্দ্র করে প্রতি বছর বেশ কিছু বই প্রকাশিত হয়। তবে বিগত কয়েক দশকে রাজনীতিকে কেন্দ্র করেই বিশেষ বিষয়কেন্দ্রিক বই প্রকাশের প্রবণতা বেড়েছে। এই ধারাবাহিকতায় সাম্প্রতিক সংযোজন কে এম মঈনুদ্দিনের ‘বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি: সংবিধান প্রথা বাস্তবতা’। এই বইয়ে লেখক বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি পদের রূপান্তর, সাংবিধানিক অবস্থান, ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট এবং প্রাতিষ্ঠানিক সীমাবদ্ধতার তুলনামূলক বিশ্লেষণ উপস্থাপন করেছেন। রাষ্ট্রপতির পদকে কেন্দ্র করে রচিত এমন বিস্তারিত গবেষণাভিত্তিক গ্রন্থ বাংলা ভাষায় খুবই বিরল। এ কারণে বইটি গবেষক, শিক্ষার্থী, নীতিনির্ধারক এবং আগ্রহী পাঠকদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ ‘রেফারেন্স’ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
রাষ্ট্রপতি পদের দায়িত্ব, ক্ষমতা ও মর্যাদা সম্পর্কিত তাত্ত্বিক আলোচনার পাশাপাশি এর প্রায়োগিক দিকগুলোর বিশ্লেষণও বইটিতে চমৎকারভাবে উঠে এসেছে, যা গবেষণামনস্ক পাঠকের জ্ঞানচর্চাকে সমৃদ্ধ করবে। সর্বোপরি, বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় রাষ্ট্রপতির পদের বিভিন্ন দিকের তাত্ত্বিক ও প্রাতিষ্ঠানিক বিশ্লেষণে লেখকের গভীরতা ও বিশ্লেষণধর্মী দক্ষতা লক্ষণীয়।
দশটি অধ্যায়ে বিন্যস্ত এই বইয়ে রাষ্ট্রপতি পদের ঐতিহাসিক বিবর্তন, শাসনতান্ত্রিক প্রেক্ষাপট, সাংবিধানিক ক্ষমতা, আইন প্রণয়ন প্রক্রিয়া, বিচার বিভাগে রাষ্ট্রপতির ভূমিকা এবং নির্বাহী বিভাগের সঙ্গে সম্পর্কিত বিষয়গুলোর তাত্ত্বিক ও তুলনামূলক বিশ্লেষণ রয়েছে। পাশাপাশি বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় রাষ্ট্রপতির প্রভাব এবং রাষ্ট্রপতির ক্ষমতার পুনর্বিন্যাস নিয়ে জনমতের প্রতিফলনও আলোচিত হয়েছে। এর মাধ্যমে বইটি রাষ্ট্রপতি পদটিকে গভীরভাবে বোঝার সুযোগ তৈরি করে দেয়।
বইটির বঙ্গভবন-সংক্রান্ত অধ্যায়টি বিশেষভাবে উল্লেখ্য। একটি ভবন কীভাবে কখনো প্রতীকী অর্থে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়, আবার কখনো কেবল আনুষ্ঠানিক প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরিত হয়—তার ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষণ এ বইয়ে পাওয়া যায়। প্রতিটি অধ্যায়ে উঠে এসেছে প্রখ্যাত তাত্ত্বিকদের ধারণা, বিভিন্ন দেশের সাংবিধানিক অভিজ্ঞতা এবং শাসনব্যবস্থার তুলনামূলক আলোচনার মাধ্যমে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি বিষয়ক জ্ঞানচর্চাকে এক বিস্তৃত পরিসরে স্থাপন করা হয়েছে।
বইটির অন্যতম শক্তি এর সুসংহত তাত্ত্বিক ভিত্তি। এতে প্রাতিষ্ঠানিকতাবাদ, সাংবিধানিকতাবাদ এবং সাংবিধানিক প্রথা বা রাজনৈতিক রীতিনীতির আন্তঃসম্পর্ককে কেন্দ্র করে একটি সমন্বিত বিশ্লেষণমূলক কাঠামো নির্মাণ করা হয়েছে। পাশাপাশি বিভিন্ন তাত্ত্বিক ধারণাকে সহজ ও স্পষ্ট ভাষায় ব্যাখ্যা করা হয়েছে।
রাষ্ট্রপতি শব্দের ব্যুৎপত্তিগত বিশ্লেষণ, আধা-রাষ্ট্রপতিশাসিত ব্যবস্থা, প্রধানমন্ত্রী-প্রধান সরকার ব্যবস্থা, আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব, অভিশংসন, বাস্তববাদী ও আইনি দৃষ্টিভঙ্গি, স্বেচ্ছাধীন ক্ষমতা, পরামর্শনির্ভর ক্ষমতা, রাষ্ট্রীয় দায়মুক্তি, রাষ্ট্রপতির অধ্যাদেশ, আদেশ, ঘোষণা, বিদেশি রাষ্ট্রদূতের পরিচয়পত্র, রাষ্ট্রীয় শিষ্টাচার, পদমর্যাদাক্রম, ‘মহামান্য’ সম্বোধনের রীতি, রাজনৈতিক বন্দোবস্ত, সংবিধান সংশোধন এবং প্রতি-স্বাক্ষর-এর মতো ধারণাগুলোর তাত্ত্বিক ও প্রায়োগিক তাৎপর্য স্পষ্টভাবে তুলে ধরা হয়েছে। এসব ধারণার ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট, সাংবিধানিক ব্যাখ্যা এবং বাস্তব প্রয়োগের আলোচনা বইটির উপস্থাপনাকে আরও সমৃদ্ধ করেছে।
সংসদীয় শাসনব্যবস্থায় প্রধানমন্ত্রী প্রকৃত নির্বাহী ক্ষমতার অধিকারী ও সরকারপ্রধান হলেও রাষ্ট্রপতির পদকে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ মর্যাদার পদ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। বাংলাদেশের সংবিধানে রাষ্ট্রপতির পদটিও একই মর্যাদা ধারণ করে; তবে তাঁর ভূমিকা প্রধানত আনুষ্ঠানিক ও সাংবিধানিক। তা সত্ত্বেও রাষ্ট্রপতি রাষ্ট্রীয় ধারাবাহিকতা, সাংবিধানিক বৈধতা এবং জাতীয় ঐক্যের প্রতীক হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
লেখকের বিশ্লেষণে দেখা যায়, বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতির স্বেচ্ছাধীন ক্ষমতা অত্যন্ত সীমিত। বিশেষত প্রধানমন্ত্রী নিয়োগের ক্ষেত্রে কিছু পরিস্থিতিতে রাষ্ট্রপতির বিচার-বিবেচনার সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে; তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রে তাঁকে প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করতে হয়। বাস্তব রাজনৈতিক চর্চায় এই সীমিত বিবেচনামূলক ক্ষমতাও সাংবিধানিক বিধান, সংসদীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা এবং রাজনৈতিক বাস্তবতার দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়। মূলত এই বিশ্লেষণই বইটির অন্যতম কেন্দ্রীয় যুক্তি।
লেখক বিভিন্ন সময়ে দায়িত্ব পালনকারী রাষ্ট্রপতিদের সিদ্ধান্ত, রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট এবং প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা পর্যালোচনা করে দেখিয়েছেন যে, স্বাধীনতার পর প্রায় ছয় দশকে বাংলাদেশের ২২ জন ব্যক্তি রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেছেন। অন্যদিকে, ভারতের প্রায় আট দশকের ইতিহাসে মাত্র ১৫ জন ব্যক্তি রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেছেন। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতির ঘন ঘন পরিবর্তনের পেছনে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা, দুর্বল প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ এবং প্রশাসনিক রূপান্তরের ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। কখনও সংসদীয়, কখনও রাষ্ট্রপতিশাসিত ব্যবস্থার প্রবর্তন ও পুনঃপ্রবর্তনের ফলে রাষ্ট্রপতি প্রতিষ্ঠানটি একটি স্থিতিশীল সাংবিধানিক চরিত্র অর্জন করতে পারেনি।
লেখক আরও দেখিয়েছেন যে, দলীয় সমর্থনে নির্বাচিত রাষ্ট্রপতিরা ক্ষমতার পালাবদলের পর ভিন্ন রাজনৈতিক বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েছেন। ফলে তাঁদের অনেকের বক্তব্য, অবস্থান ও আচরণে সময়ের সঙ্গে পরিবর্তন এসেছে। রাষ্ট্রপতির পদের আনুষ্ঠানিকতা, রাজনৈতিক নিরপেক্ষতার প্রত্যাশা এবং বাস্তব রাজনৈতিক সম্পর্কের মধ্যে যে টানাপোড়েন সৃষ্টি হয়, তা বইটির বিভিন্ন আলোচনায় সুস্পষ্টভাবে উঠে এসেছে।
প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমান এবং রাষ্ট্রপতি বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরীর সম্পর্ক বিশ্লেষণের মাধ্যমে লেখক এই দ্বন্দ্বের একটি তাৎপর্যপূর্ণ উদাহরণ তুলে ধরেছেন। তাঁর মতে, প্রধানমন্ত্রীর প্রতি ব্যক্তিগত শ্রদ্ধা থাকা সত্ত্বেও রাষ্ট্রপতি চৌধুরী সরকারের কিছু নীতিগত অবস্থানে হতাশ ছিলেন; কিন্তু সাংবিধানিক কাঠামোর মধ্যে তাঁর কার্যকর হস্তক্ষেপের সুযোগ ছিল সীমিত। রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া থেকে বিচ্ছিন্নতার অনুভূতি তাঁকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল। এ ধরনের বহু ঘটনার আলোচনার মাধ্যমে রাষ্ট্রপতির পদের উত্থান-পতন ও সীমাবদ্ধতার বিশ্লেষণ একটি নতুন মাত্রা পেয়েছে।
সংসদীয় ব্যবস্থায় বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশে প্রধানমন্ত্রীর হাতে ক্ষমতার অতিরিক্ত কেন্দ্রীভবন রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক সংকট মোকাবিলায় বিকল্প পথকে সীমাবদ্ধ করে দিতে পারে। এ প্রেক্ষাপটে রাষ্ট্রপতি বিশেষ পরিস্থিতিতে—যেমন সরকার গঠন-সংক্রান্ত অনিশ্চয়তা বা সাংবিধানিক অচলাবস্থার সময়ে—একটি সাংবিধানিক রেফারেন্স পয়েন্ট ও মধ্যস্থতাকারী ভূমিকা পালন করতে পারেন। লেখক দেখিয়েছেন যে, ভারত, যুক্তরাজ্য ও জার্মানির মতো সুপ্রতিষ্ঠিত গণতন্ত্রে দলীয় অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র, কার্যকর সংসদীয় কমিটি, শক্তিশালী বিরোধী দল এবং সুপ্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক সংস্কৃতি প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার ওপর একটি কার্যকর ভারসাম্য সৃষ্টি করে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এসব প্রাতিষ্ঠানিক উপাদান এখনো পর্যাপ্তভাবে বিকশিত হয়নি। ফলে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য প্রতিষ্ঠার প্রশ্নটি গবেষক ও সাধারণ জনগণের আলোচনায় গুরুত্ব পেয়েছে।
বইয়ের উপসংহারে লেখক রাষ্ট্রপতিকে একটি নৈতিক ও সাংবিধানিক রেফারেন্স পয়েন্ট হিসেবে বিবেচনা করার রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করেছেন। এ লক্ষ্যে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন প্রক্রিয়ার সংস্কার, দলীয় প্রভাব হ্রাস, সংসদের কার্যকারিতা বৃদ্ধি, গণমাধ্যমের সমালোচনামূলক ভূমিকা এবং সুশীল সমাজের সক্রিয় অংশগ্রহণের ওপর জোর আরোপ করা হয়েছে।
বইটির প্রচ্ছদও বিশেষভাবে দৃষ্টি আকর্ষণ করে। সবুজ পটভূমিতে সাদা ও লাল রঙের সমন্বয়ে বঙ্গভবনের প্রতীকী ব্যবহার রাষ্ট্রীয় ঐতিহ্য, ইতিহাস এবং প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষমতার বহুমাত্রিক তাৎপর্যকে তুলে ধরেছে। প্রচ্ছদে ব্যবহৃত বঙ্গভবনের চিত্রের নিচের অংশের অসম্পূর্ণ বা ছিন্ন বিন্যাস একটি অন্তর্নিহিত প্রতীকী বার্তা বহন করে, যার তাৎপর্য উপলব্ধি করতে পুরো বইটি পাঠ করা প্রয়োজন। বইটি পাঠকের মনে থাকা বহু প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার পাশাপাশি বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে গভীরতর উপলব্ধি গড়ে তুলতে সহায়তা করে।
সামগ্রিকভাবে, ‘বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি: সংবিধান প্রথা বাস্তবতা’ কেবল রাষ্ট্রপতি পদ সম্পর্কিত একটি তথ্যসমৃদ্ধ গ্রন্থ নয়; বরং বাংলাদেশের সাংবিধানিক বিকাশ, রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান এবং ক্ষমতার ভারসাম্য সম্পর্কিত বিতর্ককে নতুনভাবে অনুধাবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ গবেষণাভিত্তিক রেফারেন্স হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। রাষ্ট্রপতি প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে গভীর ও সমন্বিত ধারণা অর্জনের জন্য বইটি গবেষক, শিক্ষার্থী এবং সাধারণ পাঠক—সকলের জন্যই মূল্যবান সংযোজন।
বইয়ের নাম : বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি: সংবিধান, প্রথা, বাস্তবতা
লেখক: কে এম মঈনুদ্দিন
প্রকাশক: কথাপ্রকাশ
পৃষ্ঠা: ৩২৫
প্রকাশকাল: এপ্রিল ২০২৬

ঘরে পানি আসায় ঝর্ণার জীবনে দুটো বড় পরিবর্তন হলো। এক. পরিবারের ডায়রিয়া, কলেরা বা গ্যাস্ট্রিকের মতো রোগবালাই কমে গেছে। ফলে চিকিৎসার খরচ কমে যাচ্ছে। দুই. পানির খোঁজে যে সময় নষ্ট হতো ঝর্ণার, সে সময় বাঁচতে শুরু করল।
৫ ঘণ্টা আগে
গতকাল রাত ১১টা ৩৬ মিনিটে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্ত কেঁপে ওঠে ভূমিকম্পে। আমি তখন ফেসবুকে স্ক্রল করছিলাম। আমি কিছু টের পাই নি। তবে সঙ্গে সঙ্গে আমার নিউজফিড ভরে গেল নতুন নতুন পোস্টে। অনেকেই লিখেছেন, ‘মাথাটা ঘুরে উঠল!’, ‘ভূমিকম্প হলো নাকি?’ আবার কেউ লিখছেন, ‘ভূমিকম্প টের পেয়েছেন কে কে?’
২০ ঘণ্টা আগে
৩১ মে, ২০২৬। মিরপুরের একটি বন্ধ কক্ষ থেকে উদ্ধার হলো সত্তরোর্ধ্ব নূরজাহান বেগমের মরদেহ। কয়েকদিন ধরে বাসায় তাঁর মৃতদেহ পড়ে ছিল, অথচ কেউ তা জানতে পারেনি। সংবাদটি প্রকাশ হওয়ার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে শুরু করে সর্বস্তরে ক্ষোভ, বেদনা এবং বিস্ময়ের সৃষ্টি হয়েছে। কিন্তু এই ঘটনার সবচেয়ে মর্মান্তিক দিক
২০ ঘণ্টা আগে
‘হ্যালো আপুরা, আজ আমার বেস্ট ফ্রেন্ডের বাসায় যাব। চলুন, আমার সঙ্গে আপনারাও রেডি হয়ে নিন।’ আমার ফোনের গ্যালারিতে এমন একটি ভিডিও খুঁজ়ে পেলাম। ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়ে আছে ১০ বছর বয়সী খালাতো বোন রাফিয়া। প্রথমে বেশ দামি কোরিয়ান টোনার মুখে মাখে। তারপর ত্বকের উজ্জ্বলতা বাড়ানোর বিশেষ সিরাম। রাফিয়া স্ক্রিনে
১ দিন আগে