তালপাতায় লেখা পাণ্ডুলিপি থেকে পলাশীর যুদ্ধক্ষেত্রের নকশা—সবই আছে জাতীয় আরকাইভসে

প্রকাশ : ০৯ জুন ২০২৬, ২৩: ৪০
স্ট্রিম গ্রাফিক

আজ ৯ জুন, আন্তর্জাতিক আর্কাইভস দিবস। ইতিহাস ও ঐতিহ্যের স্মারকগুলো সংরক্ষণের গুরুত্ব সাধারণ মানুষের মাঝে ছড়িয়ে দিতে প্রতিবছর বিশ্বজুড়ে দিবসটি পালন করা হয়। মূলত প্রাচীন নথি, দলিলাদি এবং আমাদের জাতীয় ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অংশগুলো যাতে হারিয়ে না যায়, তা নিশ্চিত করাই এই দিবসটির মূল লক্ষ্য।

ইতিহাস হলো জাতির শেকড়। সেই শেকড়ের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে প্রতিটি দেশের নিজস্ব আর্কাইভস বা মহাফেজখানা থাকে। কিন্তু সাধারণ মানুষের কাছে আর্কাইভের গুরুত্ব তুলে ধরার উদ্দেশ্যে ২০০৮ সাল থেকে ‘ইন্টারন্যাশনাল কাউন্সিল অন আর্কাইভস’ আনুষ্ঠানিকভাবে এই দিবসটি পালন শুরু করে।

যেভাবে এলো স্মৃতি সংরক্ষণের ধারণা

মানুষ আদিকাল থেকেই নিজের ইতিহাসকে ধরে রাখতে চেয়েছে। ভারতীয় উপমহাদেশে সুলতানি ও মুঘল আমলে নথিপত্র গুছিয়ে রাখার এই জায়গাটিকে বলা হতো ‘মহাফেজখানা’। সেখানে সরকারি সব দলিল ও প্রশাসনিক নথিপত্র যত্ন করে জমা রাখা হতো।

তবে আধুনিক আর্কাইভের ধারণা প্রথম শুরু হয় ফ্রান্সে। ১৭৯৪ সালে ফরাসি বিপ্লবের সময় সরকারি আদেশের মাধ্যমে সব পুরোনো সরকারি ও ব্যক্তিগত নথি কেন্দ্রীয়ভাবে এক জায়গায় জমা রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এর ধারাবাহিকতায় ১৭৯৬ সালে ফ্রান্সে তৈরি হয় বিশ্বের প্রথম ‘আর্কাইভ ডিপার্টমেন্ট’।

আমাদের এই উপমহাদেশে ব্রিটিশরা আসার পর রেকর্ড রাখার পদ্ধতি আরও আধুনিক হয়। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ছিল পুরোপুরি লেখনী ও রেকর্ডনির্ভর। তাদের প্রশাসনের প্রতিটি কাজের জন্য প্রচুর দলিলপত্র তৈরি করতে হতো। কলকাতায় ১৭১২ সালে ফোর্ট উইলিয়াম দুর্গ প্রতিষ্ঠার সময় থেকেই এই রেকর্ড রাখার কাজ শুরু হয়েছিল। ১৭৭৬ সালে বাংলায় ব্রিটিশ শাসন শক্ত হলে রাইটার বা করণিকদের কাজ অনেক বেড়ে যায়। এই লেখকদের বসার জন্য যে ভবনটি তৈরি করা হয়েছিল, সেটিই আজকের বিখ্যাত ‘রাইটার্স বিল্ডিং এই ভবন বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের সচিবালয় হিসেবে পরিচিত।

‘কাগজের জ্বালায় বাঁচি না!’

১৮৬০ সালে ব্রিটিশ ভারত সরকারের মহা-হিসাবরক্ষক এক প্রতিবেদনে লেখেন—‘কাগজের জ্বালায় বাঁচি না।’ কারণ, সেখানে ফাইলপত্র এত বেশি ছিল যে এগুলোকে না সরালে বসার জায়গা নিয়ে সমস্যা হবে। তাই নথিগুলোকে একটি সংরক্ষণাগারে সরিয়ে নেওয়ার পরামর্শ দেন।

বাংলাদেশ জাতীয় আর্কাইভসের সবচেয়ে পুরোনো নথিটি ১৭৬০ সালের। তখনো কোম্পানি বাংলার দেওয়ানি পায়নি, কিন্তু চট্টগ্রামের রাজস্ব আদায় করত। সেই চিঠিতে কালেক্টর ফোর্ট উইলিয়ামকে জানিয়েছিলেন যে চট্টগ্রাম বনজ সম্পদে সমৃদ্ধ। এখানকার কাঠ জাহাজ তৈরিতে দারুণ কাজে লাগবে।

এরপর কেটে যায় প্রায় তিন দশক। ১৮৮৯ সালে এলফিনস্টোন কলেজের অধ্যাপক জিডব্লিউ ফরেস্টক সরকারের পররাষ্ট্র দপ্তরের নথিপত্র খতিয়ে দেখার কাজ শুরু করেন। এর আগে তিনি বম্বে রেকর্ডস অফিসে আর্কিভিস্ট হিসেবে কাজ করেছিলেন। তিনি সরকারের কাছে একটি কেন্দ্রীয় সংরক্ষণাগার তৈরির আবেদন জানান। তাঁর চেষ্টার ফলে ১৮৯১ সালে কলকাতায় ‘ইম্পেরিয়াল রেকর্ড ডিপার্টমেন্ট’ প্রতিষ্ঠিত হয়।

পরবর্তী সময়ে ১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর করাচিতে ‘ন্যাশনাল আর্কাইভস অব পাকিস্তান’ প্রতিষ্ঠিত হয়। তবে পূর্ব পাকিস্তানের যেসব নথি করাচিতে পৌঁছাতে পারেনি, সেগুলো স্থানীয় রেকর্ডরুমে জমা থাকে। জেলা প্রশাসকের রেকর্ডরুম বা সচিবালয়ের ফাইল কেবিনেটে জমতে থাকে হাজারো নথির স্তূপ।

বাংলাদেশ জাতীয় আর্কাইভসের পথচলা

মুক্তিযুদ্ধের মূল্যবান দলিলসহ দেশের সরকারি নথিপত্র সংরক্ষণের গুরুত্ব উপলব্ধি করে, ১৯৭২ সালে সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশ সরকার শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনে ‘আর্কাইভস ও গ্রন্থাগার পরিদপ্তর’ প্রতিষ্ঠা করে। দেশের ইতিহাস ও ঐতিহ্যকে সুরক্ষিত রাখাই ছিল এর প্রধান লক্ষ্য।

শুরুতে এলিফ্যান্ট রোডের একটি ভাড়া বাড়িতে এর কার্যক্রম চললেও, ১৯৮৫ সালে এটি শেরেবাংলা নগরের জাতীয় গ্রন্থাগার ভবনে সরিয়ে নেওয়া হয়। অবশেষে ২০০৪ সালে আগারগাঁওয়ে এর নিজস্ব আধুনিক ভবন নির্মিত হয়, যেখানে বর্তমানে প্রশাসনিক ও নথিপত্র সংরক্ষণের কাজ চলছে।

তবে যেকোনো পুরোনো নথিই কিন্তু আর্কাইভে ঠাঁই পায় না। ২০২১ সালে পাস হওয়া ‘বাংলাদেশ জাতীয় আর্কাইভস আইন’ অনুযায়ী, নথির ঐতিহাসিক, রাজনৈতিক বা সাংস্কৃতিক গুরুত্ব থাকতে হবে। এতে বলা হয়েছে, আর্কাইভসামগ্রীর ঐতিহাসিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক কিংবা সাংস্কৃতিক তাৎপর্য থাকতে হবে। এর মধ্যে নানা রকমের নথি, পাণ্ডুলিপি, পত্রিকা, চিঠি, নিবন্ধন, বই, মানচিত্র, তালিকা, নকশা, আলোকচিত্র, দলিল (হাতে লেখা বা আঁকা বা অন্য কোনোভাবে উপস্থাপিত), সরকারি দপ্তরের কাজের অংশ হিসেবে প্রস্তুত করা কাগজপত্র, রাষ্ট্রীয় চুক্তি, সমঝোতা স্মারক, কমিশন রিপোর্ট, সিনেমাটোগ্রাফ, ফিল্ম, রেকর্ডিং, টেপ, ডিস্ক থেকে বিশিষ্টজনের হাতের লেখা পর্যন্ত বিপুল বিচিত্র জিনিসপত্র রয়েছে এই আর্কাইভসামগ্রীর তালিকায়।

আইনগতভাবে একটি নথির বয়স সরকারি ক্ষেত্রে ২৫ বছর এবং বেসরকারি ও ব্যক্তিগত ক্ষেত্রে ৩০ বছর হলে আর্কাইভে রাখা যায়।

জাতীয় আর্কাইভসে সংরক্ষিত সবচেয়ে পুরোনো নথিটি ১৭৬০ সালের

ওয়েবসাইটে দেওয়া তথ্য অনুসারে, জাতীয় আর্কাইভসে ১৮৫৪ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত সময়কালের বিভিন্ন তথ্য নথিভুক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য অষ্টাদশ শতকের তালপাতায় লেখা পাণ্ডুলিপি, ১৭৫৭ সালে পলাশীর যুদ্ধক্ষেত্রের নকশা, ১৭৮০ সালে মেজর রেনালের আঁকা ঢাকার আদি মানচিত্র, ১৭৮৪ সালে টিপু সুলতানের সঙ্গে ইংরেজদের স্বাক্ষর করা চুক্তিপত্র, ১৮৫৭ সালে পাবনায় নীল বিদ্রোহের নথি এবং ১৮৭৮ সালের দুর্ভিক্ষের নথি।

এ ছাড়াও রয়েছে মাস্টারদা সূর্য সেনের ফাঁসির রায় ও ফাঁসির মঞ্চের ছবি, আবুল ফজলের আইন-ই-আকবরী, পুরানা পল্টনে জাতীয় ঈদগাহের জন্য বিভাগীয় কমিশনারের কাছে ঢাকার ম্যাজিস্ট্রেটের পাঠানো ৫০ বিঘা জমির দলিলসহ ১৮৩২ সাল থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত সব গেজেট, জেলা, বিভাগ, পরগনার মানচিত্র, বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের নথিসহ বহু নিদর্শন।

১৮৬০ সালে ব্রিটিশ ভারত সরকারের মহা-হিসাবরক্ষক এক প্রতিবেদনে লেখেন—‘কাগজের জ্বালায় বাঁচি না।’ কারণ, সেখানে ফাইলপত্র এত বেশি ছিল যে এগুলোকে না সরালে বসার জায়গা নিয়ে সমস্যা হবে। তাই নথিগুলোকে একটি সংরক্ষণাগারে সরিয়ে নেওয়ার পরামর্শ দেন।

এখানে আছে পূর্ব বাংলা সরকার, পূর্ব পাকিস্তান এবং বাংলাদেশ জাতীয় সংসদের নথিপত্র থেকে ঢাকা জেলার পুরোনো ম্যাপ, গুরুত্বপূর্ণ নদীর ম্যাপ, বিভিন্ন ঐতিহাসিক ম্যাপ, সরকারি প্রকাশনা, গেজেট, এস্টেট রেকর্ডস, ১৯৪৭ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সংবাদপত্র, রেডিও মনিটরিং রিপোর্ট, প্রাচীন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের তথ্যসহ বহু গুরুত্বপূর্ণ নথি।

জাতীয় আর্কাইভে এখন পর্যন্ত সংরক্ষিত নথিপত্রের পরিমাণ পাঁচ কোটি ছাড়িয়ে গেছে। এই বিশাল খড়ের গাদা থেকে তথ্য খুঁজে পাওয়ার জন্য রয়েছে ৬৫টি আলাদা ক্যাটালগ।

বাংলাদেশ জাতীয় আর্কাইভসের সবচেয়ে পুরোনো নথিটি ১৭৬০ সালের। তখনো কোম্পানি বাংলার দেওয়ানি পায়নি, কিন্তু চট্টগ্রামের রাজস্ব আদায় করত। সেই চিঠিতে কালেক্টর ফোর্ট উইলিয়ামকে জানিয়েছিলেন যে চট্টগ্রাম বনজ সম্পদে সমৃদ্ধ। এখানকার কাঠ জাহাজ তৈরিতে দারুণ কাজে লাগবে।

কীভাবে সংরক্ষণ করা হয়

কাগজের সাধারণ স্থায়িত্ব ধরা হয় ৩০০ বছর। তবে একে টিকিয়ে রাখতে বিশেষ বৈজ্ঞানিক ব্যবস্থার প্রয়োজন হয়। আর্কাইভের স্ট্যাক ব্লকের তাপমাত্রা ২০ থেকে ২২ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে রাখা হয়। ভেতরের আর্দ্রতা রাখা হয় ৫০ থেকে ৫৫ শতাংশের মধ্যে। কাগজকে দীর্ঘজীবী করতে অ্যাসিড মুক্ত করা হয়। এরপর সেগুলো মেটাল-ফ্রি বাক্সে ও বিশেষ মোবাইল শেলফে রাখা হয়। এখানে প্রতিনিয়ত নথির নবায়ন বা রেস্টোরেশনের কাজ চলে।

বর্তমানে জাতীয় আর্কাইভসের কিছু দলিল ডিজিটালাইজড করার কাজ শুরু হয়েছে। তবে এর জন্য একটি সুনির্দিষ্ট ও মানসম্মত নীতিমালা প্রয়োজন।

বিষয়:

ইতিহাস

সম্পর্কিত