ভ্রমণ-কাহিনি

হ্যামিলনে গিয়ে মনে হলো, বাঁশিওয়ালার গল্প যেন আজও শেষ হয়নি

২৬ জুন এলেই জার্মানির হ্যামিলন শহরকে ঘিরে ফিরে আসে শতাব্দীপ্রাচীন রহস্যের স্মৃতি। কিংবদন্তি ও নথি অনুযায়ী, ১২৮৪ সালের এই দিনেই শহর থেকে রহস্যজনকভাবে হারিয়ে গিয়েছিল ১৩০ জন শিশু। ঠিক কী ঘটেছিল, তার নির্ভরযোগ্য উত্তর আজও মেলেনি। তবে রহস্যময় বাঁশিওয়ালা আর শিশুদের সেই অন্তর্ধানের গল্প শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে লোককাহিনি, সাহিত্য ও ইতিহাসের অমীমাংসিত অধ্যায় হয়ে বেঁচে আছে। সেই রহস্যময় শহর হ্যামিলন ঘুরে এসেছেন ভূ-পর্যটক তারেক অণু।

প্রকাশ : ২৬ জুন ২০২৬, ১৭: ৪৮
হ্যামিলনের শহরে। ছবি লেখকের সৌজন্যে

১২৮৪ সাল। মধ্যযুগের জার্মানির ছায়া ঘেরা, পাখি ডাকা, শান্তিময় খুদে এক পাহাড়ি শহর হ্যামিলনে দেখা দিল আচমকা মহা উপদ্রব—ইঁদুর! হাজার হাজার, লাখ লাখ ইঁদুরের পাল। তাদের অত্যাচারে বেড়াল তো বেড়াল, মানুষের অস্তিত্ব টেকানোই দায় হয়ে পড়ল সেই পাহাড় ঘেরা উপত্যকায়। অবশেষে রূপকথার গল্পের মতো দেখা দিলেন মহান ত্রাতা, নানা বর্ণের ডোরাকাটা রংচঙে নকশাদার পোশাক পরা এক বাঁশিওয়ালা। নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থের বিনিময়ে সে আশ্বাস দিল বিনাশ করে ছাড়বে ইঁদুরের দলকে।

প্রতিশ্রুতি মোতাবেক ব্যবস্থার অংশ হিসেবে ঝোলা থেকে এক অদ্ভুত বাঁশি বের করলেন। অদ্ভুত সুর সৃষ্টি করে চলল অবিরত, সেই মোহনীয় সুরেই মাতোয়ারা হয়ে দিক-বিদিক ভুলে ইঁদুরের দল শুরু করল তার পিছু চলা। এক পর্যায়ে খরস্রোতা ভাইজার নদীর কিনারে এসে চতুর বাঁশিওয়ালার চালে সমস্ত ইঁদুরের পাল লাফিয়ে পড়তে লাগল বহমান হিমশীতল জলে। খড়কুটোর মতো ভেসে গেল ইঁদুর, দূর কোন অঞ্চলে অথবা খরস্রোতা অথৈ জলের নিচে ঘটল সলিল সমাধি। হামিলন ইঁদুর মুক্ত হলো।

এবার পাওনা চুকানোর পালা। কিন্তু বেকে বসল শহরের নগরকর্তা। প্রতিশ্রুতিবদ্ধ অর্থের চেয়ে অনেক কম দিয়েই বিদায় করতে চাইলেন সেই বাঁশিওয়ালাকে। সেই বা নেবে কেন এত কম মজুরি! দু’কথা নগরকর্তাকে শুনিয়ে অদ্ভুত লোকটা বলে গেল, এর প্রতিশোধ নেবে সে। হ্যামিলনের লোককে কাঁদিয়ে ছাড়বে।

হ্যামিলন শহরে। ছবি লেখকের সৌজন্যে
হ্যামিলন শহরে। ছবি লেখকের সৌজন্যে

অবশেষে সেন্ট জন ও পলের দিবসে (ধর্মীয় উৎসবের উপলক্ষ) শহরের সকলে তখন গির্জায়। অতর্কিতে সেখানের হাজির হলো বাঁশিওয়ালা। পরনে সেদিন তার শিকারির সবুজ বেশ, হাতের কৃষ্ণবর্ণের অন্য বাঁশিতে অদ্ভুত এক মোহময়ী সুর। সেই সুর কানে যাওয়া মাত্রই কি যেন হয়ে গেল শহরের কোমলমতি শিশু-কিশোরদের! সকলে যেন জীয়নকাঠির ছোঁয়ায় হঠাৎ জেগে উঠে নাচতে নাচতে ছুটল অদ্ভুতুড়ে খ্যাপাটে বাঁশিওয়ালার পানে। পরে তার পিছু পিছু অদূরের পাহাড়ের দিকে।

অভিভাবকদের শত হাঁকডাক, নগরকর্তার চিৎকার কিছুই যে আর কানে যাচ্ছে না তাদের, গ্রীক পুরাণের সাইরেনদের মতো পাগল করা সুরে তারা হয়ে গেছে বাঁশিওয়ালার সুরের বশ। একে একে ১৩০ জন নিষ্পাপ বালক-বালিকা চলে গেল পাহাড় পেরিয়ে চোখের আড়ালে। কেবল এক পঙ্গু বালক অনেক পেছনে পরে যাওয়ায় ফিরে এল একাকি। হ্যামিলনের বুকে আবার নেমে আসা দীর্ঘশ্বাস আর বুক ফাটা আর্তনাদের চাক্ষুষ সাক্ষী সে। প্রতিশোধ নিয়েই ছাড়ল সেই পাগলাটে বাঁশিওয়ালা!

এই হলো পৃথিবীর অন্যতম জনপ্রিয় রূপকথা হ্যামিলনের বাঁশিওয়ালার সারাংশ। দেশ থেকে দেশান্তরে ছড়িয়ে পড়ার সময় এর কলেবর ব্যপক হারে বৃদ্ধি যেমন পেয়েছে, তেমনি হয়েছে নানা ঘটনার সংযোগ-বিয়োগ। কোথাও ফেলে যাওয়া পঙ্গু বালক পরিণত হয়েছে তিনটি অন্ধ, বধির ও পঙ্গু বালকে। কোথাও হারিয়ে যাওয়া শিশুর দল মাথা ঠুকে মরেছে পাহাড়ের গুহায়। কিন্তু মোদ্দা কাহিনি সব প্রায় একই রকম।

আমাদের প্রাইমারি স্কুলের বইতে ছিল এই কাহিনি। আর সেই সাথে প্রবাদপ্রতিম শিল্পী হাশেম খানের ঝকঝকে জীবন্ত অলংকরণ শিশুমনের কল্পনাকে বাড়িয়ে দিয়েছিল বহুগুণ। সেই প্রথম জার্মানি নামের দেশটার সঙ্গে পরিচয়। আর সেই সুবাদে জার্মানির প্রথম শহর হিসেবে মাথার কোষে কোষে গেঁথে যায় হ্যামিলন নামটি। গত কয়েক বছরে শিল্প-সাহিত্য-বিজ্ঞানের দেশ জার্মানিতে পা ফেলার সুযোগ হয়েছে বেশ ক’বার। নানা ঘটনায়, নানা উছিলায়, কার্ল মার্ক্সের বাড়ি থেকে আইনস্টাইনের বিশ্ববিদ্যালয়, বিটোফেনের জন্মস্থান থেকে হিটলারের বাঙ্কার, ফুটবল বিশ্বকাপের উম্মাদনা থেকে ফ্রাঙ্কফুর্টের বইমেলা, বাভারিয়ার পর্বত, ব্ল্যাকফরেস্টের বন, রাইন নদীর অববাহিকা কিছুই বাদ পড়ে না। কিন্তু ছোঁয়া ছোঁয়া করেও কোনবারই যাওয়া হয় না বাচ্চাবেলার স্বপ্নের শহর হ্যামিলনে।

হ্যামিলন শহরে। ছবি লেখকের সৌজন্যে
হ্যামিলন শহরে। ছবি লেখকের সৌজন্যে

একবার তাই পণ করেই গাড়ির স্টিয়ারিঙে বসেছিলাম। হ্যামিলন এবার যেতেই হবে। লোয়ার সাক্সনী রাজ্যের বড় শহর হ্যানোভারের অল্প দূরেই পাহাড় ঘেরা বিখ্যাত এই প্রতিবেশী, আমাদের যাত্রাপথ থেকে বেশ খানিকটা দূরে হলেও ঘুরপথে ঠিকই হাজির হলাম এক পাহাড়ি সন্ধ্যায়। গোধূলির মৃদু আলো যায় যায় করছে। দূর দিগন্ত পর্যন্ত দখল করে আছে সবুজে ছাওয়া পাহাড় সারি। সূর্যদেবের উপস্থিতি ম্রিয়মাণ হলেও লক্ষণীয় এমন সময়ে আমাদের প্রবেশ হ্যামিলনে।

ম্যাপ আর গাইড বই দেখে কয়েকবার ভুল রাস্তায় ঘোরার পর যখন নদীর পাশের হোটেলটিতে পৌঁছালাম, তখন অন্ধকার বেশ ভালোভাবে জেঁকে বসেছে। হোটেলের রিসেপশন ডেস্কে চোখ যেতেই আমরা তো অবাক! সেখানে এক গাদা মরা ইঁদুর ডাই করে রাখা। ইঁদুরগুলোর চামড়া ফ্যাকাসে হলুদ, দেখলেই গা গুলিয়ে ওঠে। তবে রিসেপসনিস্ট ল্যুদভিগ আমাদের আশ্বস্ত করে জানাল, এগুলো আসলে চামড়া দিয়ে তৈরি ইঁদুরের মডেল, যা পর্যটকদের কাছে বিক্রি করা হয়। বুঝলাম, এই শহরে ইঁদুর আর বাঁশিওয়ালার গল্পটাই বিশাল এক ব্যবসার পণ্য।

হবেই বা কেন? সারা বিশ্বের কোন দেশের শিশু এই গল্প শোনেনি? গ্রিম ভাইদের রূপকথা, গ্যেটে আর ব্রাইনিং-এর কবিতায় এই গল্প সারা পৃথিবী ঘুরেছে আর শিশুদের মনে জায়গা করে নিয়েছে। ব্যাগপত্র রেখে নদীর তীরে একটু হাঁটতে বেরোলাম রাতের খাবার খুঁজতে। রাস্তাঘাট তকতকে পরিষ্কার, নদীর পাড়ে একটা ইঁদুরও নজরে এল না। হ্যামিলন ভ্রমণের স্বপ্ন পূরণ হওয়ায় মনের ভেতর যেমন আনন্দ ছিল, ঠিক তেমনি অন্ধকার গলি দিয়ে হাঁটার সময় শরীরটা একটু ছমছম করছিল। বলা তো যায় না, হয়তো কোনো এক মোড়েই দেখব বিশালাকার সেই বাঁশিওয়ালা বাঁশি হাতে আমাদের অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে আছে! আর কে না জানে, সব কিংবদন্তির আড়ালেই তো খুব ছোট্ট হলেও কোনো না কোনো সত্য ঘটনা লুকিয়ে থাকে।

হ্যামিলন শহরে। ছবি লেখকের সৌজন্যে
হ্যামিলন শহরে। ছবি লেখকের সৌজন্যে

৮৫১ খ্রিষ্টাব্দে তৈরি এক ধর্মাশ্রমকে ঘিরে গড়ে ওঠা ছোট গ্রামই আস্তে আস্তে খুদে শহরের রূপ নেয় দ্বাদশ শতাব্দীতে। এখনো শহরকেন্দ্রে রেনেসাঁ আর প্রাক-রেনেসাঁ যুগের স্থাপত্যগুলো সগর্বে দাঁড়িয়ে আর সুবিশাল জার্মানির হিসেবে হ্যামিলন এখনো এক ছোট শহরের গণ্ডিতেই আছে। জনসংখ্যা মাত্র ৬০ হাজার। যদিও পর্যটকের অভাব নেই কোনো সময়েই।

খাবারের দোকানেও দেখা গেল কিংবদন্তির বাঁশিওয়ালাকে নিয়ে পুস্তিকার সমারোহ। জানা গেল গ্রীষ্মের প্রতি সপ্তাহেই সেই রূপকথার উপর ভিত্তি করে মঞ্চনাটক অনুষ্ঠিত হয় শহর কেন্দ্রে। আর বিশেষ বিশেষ দিনে মনোরঞ্জনের জন্য শহরময় হেটে বেড়ায় রহস্যময় এক আগন্তক। পরনে কখনো রঙদার ডোরাকাটা পোশাক বা পুরোনো সবুজ বস্তা ধরনের আলখাল্লা, হাতে সেই সুপরিচিত বাঁশি।

কিন্তু আসলে কি প্রোথিত ছিল এই রূপকথার গভীরে? কেন হ্যামিলন ঘিরেই তৈরি হলো বিষাদময় ভয়ালচিত্র! শহরে রক্ষিত ১৩৮৪ সালের প্রাচীন নথিতেও উল্লেখ আছে—আমাদের সন্তানেরা আজ একশ বছর হলো আমাদের ছেড়ে বিদায় নিয়েছে! শতাব্দী প্রাচীন গবেষণাপত্রগুলো জোড়া লাগালে হয়তো সেই গুমোট রহস্যে খানিকটা আলোকরশ্মি ফেলা সম্ভব। আর সেখান থেকেই জানা যায় হয়তো সেই সময়ে কোনো অজানা কারণে শহরের সমস্ত শিশু মৃত্যুবরণ করেছিল, হয়তো মরণব্যধি প্লেগে অথবা অন্য কোন রোগে। কিংবা হয়তো প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে—ভূমিধ্বস বা পাথরধ্বসে।

হ্যামিলন শহরে। ছবি লেখকের সৌজন্যে
হ্যামিলন শহরে। ছবি লেখকের সৌজন্যে

অনেকেই আশঙ্কা করে থাকেন কেউ হয়তো ফুসলিয়ে কোমলতিদের নিয়ে গিয়েছিল ধর্মযুদ্ধ ক্রুসেডে অংশ নিতে। আর ডোরাকাটা পোশাকের বাঁশিওয়ালা ছিল মৃত্যুর প্রতীক, ফিরে না আসা শিশুদের বাবা-মার দুঃখ-বেদনার কল্পরূপ। মৃত্যু বা ভয়াবহ রোগকে মানুষ হিসেবে কল্পনা করার চল তো ছিল, বা আছে বিশ্বের সব জায়গাই-ই। চিন্তা করে দেখুন আমাদের অঞ্চলের শেতলা বা ওলাওঠা দেবীর কথা। আরো নিবিড় গবেষণায় প্রকাশ পায় গল্পের আদিরূপে ইঁদুরের পালের কোনো অস্তিত্বই ছিল না। কোনো উর্বর মস্তিস্ক থেকে এই ধারনা বের হয়ে গল্পে চিরতরে জায়গা করে নেয় ১৫৫৯ সালে ! এত মতের মধ্যে কোনটা যে সত্য, তা সম্ভবত চিরতরে হারিয়ে গেছে কালের অতল গর্ভে এর স্রষ্টাদের মতোই।

পরদিন ভোরেই বেরিয়ে পড়লাম হ্যামিলনের নদী ও পাহাড়ের সৌন্দর্য দেখতে। শহরের প্রতিটি মোড়ে মোড়ে ইঁদুর, বাঁশিওয়ালা কিংবা হারিয়ে যাওয়া শিশুদের কোনো না কোনো স্মারক চোখে পড়ে। অবশেষে নগরভবনের সামনে দেখা মিলল এখানকার সবচেয়ে বিখ্যাত ধাতব ভাস্কর্যের—বাঁশি বাজাচ্ছে এক দীর্ঘদেহী বাঁশিওয়ালা, আর তার পেছনে আনন্দে ছুটছে একদল কিশোর-কিশোরী। ততক্ষণে সূর্যের আলো ছড়িয়ে পড়েছে উপত্যকার বুকে, ভাস্কর্যের সামনের খোলা আঙ্গিনায় জমে উঠেছে রকমারি পণ্যের দোকানগুলো।

আমাদের গন্তব্য এখন বাভারিয়ার পাহাড়। বিদায় নেওয়ার আগে বাঁশিওয়ালার মূর্তির পানে চেয়ে কেবল অবাক বিস্ময়ে বললাম—কী অপার তোমার এই রহস্য! শিশুকাল থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত নানা কল্পনার জাল বুনেই চলেছ মনের গহনে। আমরা কি কোনোদিন জানতে পারব না তোমার সত্যিকারের পরিচয়?

Ad 300x250

সম্পর্কিত