অনন্ত রায়হান

বাংলা চলচ্চিত্রের এক সময়ের জনপ্রিয় অভিনেত্রী জয়শ্রী কবির আর নেই। গত ১২ জানুয়ারি লন্ডনের একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান। আজ তাঁর মৃত্যুর খবরটি নিশ্চিত করেছেন ভাগিনা জাভেদ মাহমুদ। দীর্ঘদিন ধরেই তিনি নানা শারীরিক জটিলতায় ভুগছিলেন।
১৯৫২ সালে কলকাতায় জন্ম জয়শ্রী কবিরের। তাঁর আসল নাম ছিল জয়শ্রী রায়। বেড়ে ওঠা ও পড়াশোনা কলকাতাতেই। সাউথ পয়েন্ট স্কুলে পড়াশোনা শেষ করার পর খুব অল্প বয়সেই তিনি সাংস্কৃতিক অঙ্গনের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়েন। ১৯৬৮ সালে ‘মিস ক্যালকাটা’ খেতাব জয়ের মাধ্যমে প্রথম আলোচনায় আসেন তিনি। পরে একাধিক সাক্ষাৎকারে জয়শ্রী নিজেই বলেছিলেন, এই প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়া ছিল পুরোপুরি কাকতালীয়। একটি পারিবারিক নৈশভোজই তাঁর জীবনের পথ ঘুরিয়ে দেয়।

‘মিস ক্যালকাটা’ হওয়ার পরই তিনি নজরে আসেন বিশ্বনন্দিত নির্মাতা সত্যজিৎ রায়ের। জয়শ্রী নিজেও স্বীকার করেছেন, তাঁর গড়ে ওঠায় সবচেয়ে বেশি প্রভাব ছিল সত্যজিৎ রায়, রবি ঘোষ ও উত্তম কুমারের। সত্যজিৎ রায়ের হাত ধরেই চলচ্চিত্রে তাঁর অভিষেক। ১৯৭০ সালে মুক্তি পাওয়া প্রতিদ্বন্দ্বী ছবিতে তিনি অভিনয় করেন সিদ্ধার্থের প্রেমিকার চরিত্রে। ছবিটি ছিল সত্যজিৎ রায়ের কলকাতা ট্রিলজির প্রথম পর্ব। বহু বছর পর, ২০২২ সালে কান চলচ্চিত্র উৎসবের ‘কান ক্ল্যাসিকস’ বিভাগে ছবিটি প্রদর্শিত হলে আন্তর্জাতিক দর্শকের কাছেও আবার আলোচনায় আসে জয়শ্রী কবিরের অভিনয়।
কলকাতার সিনেমায় সম্ভাবনাময় ভবিষ্যৎ থাকলেও তাঁর জীবনে বড় পরিবর্তন আসে, যখন সত্যজিৎ রায় তাঁকে বাংলাদেশের নির্মাতা আলমগীর কবিরের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন। ১৯৭৪ সালে ‘সূর্যকন্যা’ ছবিতে অভিনয়ের জন্য তিনি বাংলাদেশে আসেন। এই ছবির কাজ করতে গিয়েই আলমগীর কবিরের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক গড়ে ওঠে। ১৯৭৫ সালে তাঁদের বিয়ে হয়। বিয়ের পর জয়শ্রী রায় নাম বদলে হয়ে যান জয়শ্রী কবির। এই নামেই তিনি বাংলাদেশের চলচ্চিত্র ইতিহাসে পরিচিত হয়ে ওঠেন।

বিয়ের পর প্রায় এক দশক তিনি ঢাকাই সিনেমায় কাজ করেন। তবে তিনি কখনোই শুধু বাণিজ্যিক নায়িকা হতে চাননি। তাঁর কাছে ছবির সংখ্যার চেয়ে কাজের মান ছিল বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তাই তাঁর অভিনীত ছবির সংখ্যা তুলনামূলক কম হলেও প্রতিটি ছবিই ছিল আলাদা গুরুত্বের। ‘সূর্যকন্যা’, ‘সীমানা পেরিয়ে’, ‘রূপালী সৈকতে’র মতো ছবিতে তাঁর অভিনয় দর্শকের মনে আলাদা করে দাগ কেটেছে।
নায়ক বুলবুল আহমেদের সঙ্গে জয়শ্রী কবিরের জুটি ঢাকাই চলচ্চিত্রে বিশেষভাবে জনপ্রিয় হয়। তবে পর্দার সাফল্যের আড়ালে ব্যক্তিগত জীবনে তিনি সুখী ছিলেন না। আলমগীর কবিরের সঙ্গে দাম্পত্য জীবনে সমস্যা দেখা দেয় এবং তিন বছরের মাথায় তাঁদের বিচ্ছেদ ঘটে। সে সময় জয়শ্রী অভিযোগ করেছিলেন, তিনি দাম্পত্য জীবনে মানসিক ও শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। এই কঠিন অভিজ্ঞতার পরই তিনি অভিনয় থেকে সরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।
বিচ্ছেদের পর প্রথমে কলকাতায়, পরে লন্ডনে চলে যান জয়শ্রী কবির। সেখানেই তিনি স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। অভিনয় ছাড়লেও সৃষ্টিশীল জগত থেকে পুরোপুরি দূরে যাননি। লন্ডনের সিটি কলেজে তিনি দীর্ঘদিন ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্য পড়িয়েছেন। পাশাপাশি যুক্ত ছিলেন চলচ্চিত্র উৎসব ও বিভিন্ন শিক্ষামূলক কাজে।

২০০৩ সালে ভারতের টেলিগ্রাফকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে জয়শ্রী বলেছিলেন, ‘একক অভিভাবক হিসেবে ছেলেকে বড় করা আর কঠিন পেশাজীবনের চাপ, দুটো একসঙ্গে সামলাতে গিয়ে আমি অভিনয় আর মিডিয়া থেকে নিজেকে সরিয়ে নিয়েছিলাম।’ তবে মন থেকে কখনোই অভিনয়কে বিদায় জানাননি। আরেক সাক্ষাৎকারে তিনি জানিয়েছিলেন, ভালো প্রস্তাব পেলে আবার বাংলাদেশে অভিনয় করতে আপত্তি নেই। ২০১৮ সালে জানা যায়, প্রায় দুই যুগের বেশি সময় ধরে অভিনয়ের বাইরে থাকলেও সুযোগ পেলে বাংলাদেশি চলচ্চিত্রের খোঁজখবর রাখে তিনি। এখনও অভিনয়ে আগ্রহী তিনি।
জয়শ্রী কবির ছিলেন এমন একজন অভিনেত্রী, যিনি জনপ্রিয়তার চেয়ে শিল্পকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন। সত্তরের দশকের বাংলা চলচ্চিত্রের যে শিল্পমনস্ক ধারা, তার অন্যতম মুখ ছিলেন তিনি। আজ তিনি আমাদের মাঝে নেই, কিন্তু তাঁর অভিনয়, তাঁর চিন্তা আর তাঁর বেছে নেওয়া পথ বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে আলাদা গুরুত্ব নিয়েই বেঁচে থাকবে।

বাংলা চলচ্চিত্রের এক সময়ের জনপ্রিয় অভিনেত্রী জয়শ্রী কবির আর নেই। গত ১২ জানুয়ারি লন্ডনের একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান। আজ তাঁর মৃত্যুর খবরটি নিশ্চিত করেছেন ভাগিনা জাভেদ মাহমুদ। দীর্ঘদিন ধরেই তিনি নানা শারীরিক জটিলতায় ভুগছিলেন।
১৯৫২ সালে কলকাতায় জন্ম জয়শ্রী কবিরের। তাঁর আসল নাম ছিল জয়শ্রী রায়। বেড়ে ওঠা ও পড়াশোনা কলকাতাতেই। সাউথ পয়েন্ট স্কুলে পড়াশোনা শেষ করার পর খুব অল্প বয়সেই তিনি সাংস্কৃতিক অঙ্গনের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়েন। ১৯৬৮ সালে ‘মিস ক্যালকাটা’ খেতাব জয়ের মাধ্যমে প্রথম আলোচনায় আসেন তিনি। পরে একাধিক সাক্ষাৎকারে জয়শ্রী নিজেই বলেছিলেন, এই প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়া ছিল পুরোপুরি কাকতালীয়। একটি পারিবারিক নৈশভোজই তাঁর জীবনের পথ ঘুরিয়ে দেয়।

‘মিস ক্যালকাটা’ হওয়ার পরই তিনি নজরে আসেন বিশ্বনন্দিত নির্মাতা সত্যজিৎ রায়ের। জয়শ্রী নিজেও স্বীকার করেছেন, তাঁর গড়ে ওঠায় সবচেয়ে বেশি প্রভাব ছিল সত্যজিৎ রায়, রবি ঘোষ ও উত্তম কুমারের। সত্যজিৎ রায়ের হাত ধরেই চলচ্চিত্রে তাঁর অভিষেক। ১৯৭০ সালে মুক্তি পাওয়া প্রতিদ্বন্দ্বী ছবিতে তিনি অভিনয় করেন সিদ্ধার্থের প্রেমিকার চরিত্রে। ছবিটি ছিল সত্যজিৎ রায়ের কলকাতা ট্রিলজির প্রথম পর্ব। বহু বছর পর, ২০২২ সালে কান চলচ্চিত্র উৎসবের ‘কান ক্ল্যাসিকস’ বিভাগে ছবিটি প্রদর্শিত হলে আন্তর্জাতিক দর্শকের কাছেও আবার আলোচনায় আসে জয়শ্রী কবিরের অভিনয়।
কলকাতার সিনেমায় সম্ভাবনাময় ভবিষ্যৎ থাকলেও তাঁর জীবনে বড় পরিবর্তন আসে, যখন সত্যজিৎ রায় তাঁকে বাংলাদেশের নির্মাতা আলমগীর কবিরের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন। ১৯৭৪ সালে ‘সূর্যকন্যা’ ছবিতে অভিনয়ের জন্য তিনি বাংলাদেশে আসেন। এই ছবির কাজ করতে গিয়েই আলমগীর কবিরের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক গড়ে ওঠে। ১৯৭৫ সালে তাঁদের বিয়ে হয়। বিয়ের পর জয়শ্রী রায় নাম বদলে হয়ে যান জয়শ্রী কবির। এই নামেই তিনি বাংলাদেশের চলচ্চিত্র ইতিহাসে পরিচিত হয়ে ওঠেন।

বিয়ের পর প্রায় এক দশক তিনি ঢাকাই সিনেমায় কাজ করেন। তবে তিনি কখনোই শুধু বাণিজ্যিক নায়িকা হতে চাননি। তাঁর কাছে ছবির সংখ্যার চেয়ে কাজের মান ছিল বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তাই তাঁর অভিনীত ছবির সংখ্যা তুলনামূলক কম হলেও প্রতিটি ছবিই ছিল আলাদা গুরুত্বের। ‘সূর্যকন্যা’, ‘সীমানা পেরিয়ে’, ‘রূপালী সৈকতে’র মতো ছবিতে তাঁর অভিনয় দর্শকের মনে আলাদা করে দাগ কেটেছে।
নায়ক বুলবুল আহমেদের সঙ্গে জয়শ্রী কবিরের জুটি ঢাকাই চলচ্চিত্রে বিশেষভাবে জনপ্রিয় হয়। তবে পর্দার সাফল্যের আড়ালে ব্যক্তিগত জীবনে তিনি সুখী ছিলেন না। আলমগীর কবিরের সঙ্গে দাম্পত্য জীবনে সমস্যা দেখা দেয় এবং তিন বছরের মাথায় তাঁদের বিচ্ছেদ ঘটে। সে সময় জয়শ্রী অভিযোগ করেছিলেন, তিনি দাম্পত্য জীবনে মানসিক ও শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। এই কঠিন অভিজ্ঞতার পরই তিনি অভিনয় থেকে সরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।
বিচ্ছেদের পর প্রথমে কলকাতায়, পরে লন্ডনে চলে যান জয়শ্রী কবির। সেখানেই তিনি স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। অভিনয় ছাড়লেও সৃষ্টিশীল জগত থেকে পুরোপুরি দূরে যাননি। লন্ডনের সিটি কলেজে তিনি দীর্ঘদিন ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্য পড়িয়েছেন। পাশাপাশি যুক্ত ছিলেন চলচ্চিত্র উৎসব ও বিভিন্ন শিক্ষামূলক কাজে।

২০০৩ সালে ভারতের টেলিগ্রাফকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে জয়শ্রী বলেছিলেন, ‘একক অভিভাবক হিসেবে ছেলেকে বড় করা আর কঠিন পেশাজীবনের চাপ, দুটো একসঙ্গে সামলাতে গিয়ে আমি অভিনয় আর মিডিয়া থেকে নিজেকে সরিয়ে নিয়েছিলাম।’ তবে মন থেকে কখনোই অভিনয়কে বিদায় জানাননি। আরেক সাক্ষাৎকারে তিনি জানিয়েছিলেন, ভালো প্রস্তাব পেলে আবার বাংলাদেশে অভিনয় করতে আপত্তি নেই। ২০১৮ সালে জানা যায়, প্রায় দুই যুগের বেশি সময় ধরে অভিনয়ের বাইরে থাকলেও সুযোগ পেলে বাংলাদেশি চলচ্চিত্রের খোঁজখবর রাখে তিনি। এখনও অভিনয়ে আগ্রহী তিনি।
জয়শ্রী কবির ছিলেন এমন একজন অভিনেত্রী, যিনি জনপ্রিয়তার চেয়ে শিল্পকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন। সত্তরের দশকের বাংলা চলচ্চিত্রের যে শিল্পমনস্ক ধারা, তার অন্যতম মুখ ছিলেন তিনি। আজ তিনি আমাদের মাঝে নেই, কিন্তু তাঁর অভিনয়, তাঁর চিন্তা আর তাঁর বেছে নেওয়া পথ বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে আলাদা গুরুত্ব নিয়েই বেঁচে থাকবে।
.png)

‘আশা ছিল ভালোবাসা ছিল’, ‘সেই রাতে রাত ছিল পূর্ণিমা’, ‘মেরে সপ্নো কি রানি’, ‘রূপ তেরা মস্তানা’ কিংবা ‘জিন্দেগি এক সফর হ্যায় সুহানা’—এমন অসংখ্য জনপ্রিয় গানের কণ্ঠশিল্পী বলিউডের কিংবদন্তি কিশোর কুমার। সময় বদলেছে, প্রজন্ম বদলেছে, কিন্তু তাঁর গান আজও মানুষের মনে একই রকম জনপ্রিয়। রোমান্টিক গানে যেমন শ্রোত
০৪ আগস্ট ২০২৬
বাংলাদেশের সিনেমার ইতিহাসে মাইলফলক হয়ে আছে ‘মুখ ও মুখোশ’। এই সিনেমার হাত ধরেই এ দেশে নিজেদের সিনেমা তৈরির স্বপ্ন সত্যি হয়। ১৯৫৬ সালের ৩ আগস্ট মুক্তি পাওয়া ছবিটি ছিল তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের (বর্তমান বাংলাদেশ) প্রথম সবাক পূর্ণাঙ্গ বাংলা সিনেমা। এই ছবির পেছনের কারিগর ছিলেন আবদুল জব্বার খান। তিনি অনেক
০৩ আগস্ট ২০২৬
সম্প্রতি নেটফ্লিক্সে মুক্তি পাওয়া ‘মুসাফির ক্যাফে’ এখন সোশ্যাল মিডিয়ার আলোচিত ওয়েব সিরিজ। কেউ স্ক্রিনের সামনে জুতা তুলে ধরছেন, কেউ বলছেন অসমাপ্ত ভালোবাসার নির্মল উপাখ্যান। চলুন জেনে নেওয়া যাক, মুসাফির ক্যাফেতে আসলে কী আছে? আর যদি স্পয়লার এড়িয়ে চলতে চান, তাহলে এখানেই থেমে যাওয়া ভালো।
০১ আগস্ট ২০২৬
ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বয়ান অনেক সময়ই ক্ষমতার কেন্দ্র থেকে আসে না; আসে সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ, আত্মত্যাগ ও অভিজ্ঞতার গল্প থেকে। চব্বিশের জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের সেই জনতার গল্প নিয়ে নির্মিত হয়েছে পূর্ণদৈর্ঘ্য প্রামাণ্যচিত্র ‘জুলাই ডায়েরিজ’।