leadT1ad

গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী দেশে লক্ষ্য যখন গণতন্ত্রে উত্তরণ

স্ট্রিম গ্রাফিক

গণঅভ্যুত্থানের পর মাঠে থাকা সব রাজনৈতিক দলের সমর্থনে যে অন্তর্বর্তী সরকার এসেছিল, তার সাফল্য-ব্যর্থতা নিয়ে এখন আলোচনা হচ্ছে কমই। কেননা নির্বাচন এসে গেছে। জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সঙ্গে এবার গণভোটও হবে। সত্যি বলতে, সুষ্ঠুভাবে জাতীয় নির্বাচন সম্পন্ন করাই ছিল সরকারটির প্রধান করণীয়। এ ধরনের একটি নির্বাচন ছাড়া তো গণতন্ত্রে উত্তরণের কোনো সুযোগ নেই। ‘রাষ্ট্র সংস্কারে’ হাত না দিলেও হতো; সেই পথে পরে অগ্রসর হওয়াটাও অসম্ভব ছিল না। কিন্তু নির্বাচন সুসম্পন্ন করার কোনো বিকল্প নেই। তবে সরকার স্থির করেছিল, সংস্কারে সুস্পষ্ট অগ্রগতি এনে তবেই নির্বাচন। রাজনৈতিক অঙ্গন থেকে এর বিরোধিতাও প্রবলভাবে আসেনি। এ অবস্থায় দেশে কী কী ঘটেছে, তা সবারই জানা।

একটা সময় পর্যন্ত নির্বাচন কম গুরুত্ব পেয়েছে– সংস্কারের তুলনায়। এ অবস্থায় সরকার যে সুষ্ঠুভাবে দেশ পরিচালনা করতে পেরেছে, তা বলা যাবে না। একটা রক্তক্ষয়ী গণঅভ্যুত্থানের পর সেটা সহজও নয়। তা সত্ত্বেও সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা ছিল, আগেকার তত্ত্বাবধায়ক সরকারগুলোর মতো অন্তর্বর্তী সরকারও সুষ্ঠুভাবে দেশ চালাবে। তাদের সবাই এটা বিচার করে দেখার কথা নয় যে, চব্বিশের আগস্টে সূচিত পরিবর্তনের সঙ্গে নব্বইয়ের পট-পরিবর্তনকেও মেলানো যায় না। এমনকি পঁচাত্তরের ১৫ আগস্টে সূচিত পরিবর্তনের চেয়েও এটা ছিল ভিন্ন চরিত্রের। এ অবস্থায় এমনটিও অনেকে বলছেন, গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী অভিজ্ঞতা আরও হতাশাজনক হতে পারতো। সমসাময়িক দুনিয়ার অন্যান্য গণঅভ্যুত্থানের অভিজ্ঞতার সঙ্গে এটাকে তুলনা করে দেখার ওপরও তারা জোর দিচ্ছেন।

রাজনৈতিক দলগুলোর ভূমিকা ও সমঝোতার নির্বাচন

এটাও প্রশ্ন, গণঅভ্যুত্থানের পর এতে অংশগ্রহণকারী রাজনৈতিক দলগুলোর ভূমিকা কী? তারা তো এখনও যে যার মতো ভূমিকা রেখে যাচ্ছে। মাঝে দীর্ঘ সংস্কার আলোচনায় তাদের ভূমিকা আমরা দেখেছি। এখন নির্বাচন সামনে রেখেও তাদের ভূমিকা দেখছি। গণভোটে কোন পক্ষ কী ভূমিকা রাখছে, সেটা অবশ্য স্পষ্ট নয়। তবে সরকারের ভূমিকা স্পষ্ট; তারা ‘হ্যাঁ’ ভোট চাইছেন। এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। প্রধান উপদেষ্টা শুরু থেকে বলছেন, রাষ্ট্র সংস্কারে অগ্রগতি না হলে দেশ পুরনো রাজনৈতিক ব্যবস্থায় ফিরে যাবে। গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে কিনা, তেমন নির্বাচন না হলে জাতি কোন সংকটে নিপতিত হবে; তা নিয়েও আলোচনা কম হচ্ছে না। নির্বাচন সামনে রেখে সরকার ও নির্বাচন কমিশনের (ইসি) যেটুকু প্রস্তুতি পরিলক্ষিত, তাতে অনেকেই ধারণা করছেন– রাজনৈতিক দলগুলো ‘দায়িত্বশীল ভূমিকা’ না রাখলে গ্রহণযোগ্য নির্বাচন হবে না। এ অবস্থায় শেষে একটা ‘সমঝোতার নির্বাচন’ হয় কিনা, এমন প্রশ্নও তুলছেন কেউ কেউ।

রাজনৈতিকভাবে একই দিকে অবস্থান নেওয়া দলগুলো মিলেমিশে নির্বাচনকে তামাশায় পরিণত করা তো কোনো কাজের কথা নয়। শেখ হাসিনা নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ শাসনামলে সে অভিজ্ঞতা যথেষ্টই হয়েছে। এর পুনরাবৃত্তি কাম্য নয়। এর ভেতর দিয়ে আর যা-ই হোক, গণতন্ত্র চর্চা হবে না। নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা অবশ্যই বজায় রাখতে হবে। ভোটারদের নানামুখি পছন্দ প্রকাশের সুযোগ থাকতে হবে। তাহলেই একটি জনপ্রতিনিধিত্বশীল সংসদ আমরা পাব। আসলে ‘সমঝোতা’ হতে হবে গ্রহণযোগ্য নির্বাচন হতে দেওয়ার বিষয়ে। এ ক্ষেত্রে মাঠে থাকা প্রধান দলগুলো সরকার ও ইসিকে সহায়তা জোগালেই চলবে। নির্বাচনে জনগণের ইচ্ছার প্রতিফলন ঘটতে দিতে হবে এবং রাখতে হবে পরাজয় মেনে নেওয়ার মানসিক প্রস্তুতি।

আগামী নির্বাচনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে আওয়ামী লীগ সমর্থকদের ভোট। আদর্শ বিচার না করে কিছু এলাকায় ‘নিরাপত্তার নিশ্চয়তা’ প্রদানকারীদের ভোটদানের ঘটনাও নিশ্চয় দেখতে হবে। এটা কম দেখা যেত– সরকার আইনের শাসন জোরদারে সচেষ্ট হলে। তারা চাঁদাবাজ দমনে উদ্যোগী হননি। জুলাইয়ের চেতনা রক্ষার নামে মবকারীদের দমনেও নিষ্ক্রিয় থেকেছেন।

কথাগুলো ‘বুকিশ’ শোনাতে পারে; তবে এটাই বাস্তবতা। গ্রহণযোগ্য নির্বাচন আয়োজনে সরকারের প্রস্তুতিতে যে ঘাটতি রয়েছে, সেটা বোঝার জন্য বিদ্যমান আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিই যথেষ্ট। তফসিল ঘোষণার পরও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে জনমনে স্বস্তি নেই। শান্তিপ্রিয় মানুষের ধারণা, মোক্ষম যে কোনো ইস্যুতে পরিস্থিতি ঘোলাটে করে তোলার মতো অপশক্তি মাঠে তৎপর রয়েছে। ক্ষমতাচ্যুত রাজনৈতিক দলও প্রত্যাঘাত হেনে নির্বাচনের পরিবেশ আরও নেতিবাচক করে তুলতে পারে। তাদের সমর্থক আঞ্চলিক শক্তির ভূমিকা এ ক্ষেত্রে কেমন থাকবে, সেটাও স্পষ্ট নয়। ঘোষিত অবস্থান ও বাস্তবের ভূমিকা এক নাও হতে পারে। এ শংকা পাশে সরিয়ে রাখলেও মাঠে থাকা সব পক্ষ যে গ্রহণযোগ্য নির্বাচন হতে দিতে প্রস্তুত, সে বিষয়েও সংশয় রয়েছে। নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বী কোনো পক্ষ হারতে প্রস্তুত নয় বলেই মনে হচ্ছে। এ অবস্থায় উভয় পক্ষই পরস্পরের বিরুদ্ধে তুলে রাখছে নির্বাচনকে প্রভাবিত করার চেষ্টার অভিযোগ। কোনো পক্ষই সরকার, প্রশাসন ও ইসির ভূমিকায় ‘সন্দেহমুক্ত’ হতে পারছে না।

তারেক রহমানের প্রত্যাবর্তন ও বিএনপির চ্যালেঞ্জ

নির্বাচনের অনেক আগে থেকেই অবশ্য সরকারের ‘রাজনৈতিক নিরপেক্ষতা’ হারানোর অভিযোগ করছিল প্রতিদ্বন্দ্বী দলগুলো। একেক সময় একেক পক্ষকে এমন অভিযোগ তুলতে দেখা গেছে। অতীতে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলেও এ ধরনের অভিযোগ উঠতে দেখা যেত। তারপরও কোনো তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনেই নির্বাচন সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য হতে দেখা যায়নি। মনোনয়নপত্র চূড়ান্ত হওয়ার প্রক্রিয়ায় আপিল নিষ্পত্তি হচ্ছে। প্রতীক বরাদ্দ শেষে শুরু হবে প্রচারণা। বিএনপির শীর্ষ নেতা তারেক রহমান ইসির অনুরোধে উত্তরবঙ্গে তার ব্যক্তিগত সফর বাতিল করেছেন। তিনি বিতর্ক এড়াতে চেয়েছেন আসলে। মাঠে প্রতিপক্ষ উপস্থিত; সরকার আর প্রশাসনেও তাদের প্রভাব যথেষ্ট বলে মনে করা হচ্ছে। তারেক রহমানের দেশে ফেরাটাও অনেকদিন ধরে ছিল অনিশ্চিত। দলে ছিল এক ধরনের হতাশা। গণঅভ্যুত্থানের মাস ছয়েকের মধ্যে নির্বাচন হয়ে গেলে বিএনপির জন্য পরিস্থিতি মোকাবিলা কিন্তু সহজ হতো। সে ক্ষেত্রে তারেক রহমান ফিরতেও পারতেন দ্রুত।

নির্বাচন হতে যাচ্ছে দেরিতে; তাকে ফিরতেও হলো দেরি করে। এর মধ্যে বিএনপি বিতর্কিত হয়েছে দলের একাংশের ক্ষমতা অপব্যবহারের কারণে। ক্ষমতায় আসার আগেই এর অপব্যবহার মানুষ স্বভাবতই ভালোভাবে নেয়নি। গণঅভ্যুত্থানের সাধারণ প্রত্যাশাও এতে মার খেয়েছে। জুলাইয়ের ঘটনা তো নিছক ‘রেজিম চেইঞ্জ’ ছিল না যে, কিছু লোক গতানুগতিক আচরণ করবে ক্ষমতাহীন মানুষের সঙ্গে। ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের ওপর প্রতিশোধ গ্রহণের পাশাপাশি ‘মামলা বাণিজ্যে’ও জড়িয়েছে দলের একাংশ। নেমেছে দখলে। তারেক রহমান দেশে ফেরার পর এসব অভিযোগ কমলেও যা বদনাম হওয়ার– হয়ে গেছে। এর সাক্ষাৎ ফলও কি পাওয়া গেল পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর নির্বাচনে? সর্বশেষ জরিপেও কি সেটা প্রতিফলিত, যেখানে জামায়াতের সঙ্গে তার ভোটের ব্যবধান সামান্য?

জামায়াত-এনসিপি জোট ও ডানপন্থার উত্থান

জামায়াতের ভোট বেড়েছে, সন্দেহ নেই। বাকি ‘ইসলামপন্থী’ দলগুলো তো বটেই, এমনকি এনসিপিকে জোটে নিয়েও ‘জুলাইয়ের চেতনা’ সমুন্নত রাখার এক ধরনের আওয়াজ তুলতে পারছে দলটি। এসব দল জুলাই গণঅভ্যুত্থানকে তাদের নেতৃত্বে সংঘটিত পরিবর্তন বলে প্রচার চালিয়ে আসছে অনেকদিন ধরে। ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের প্রচারিত বয়ানের কারণেও গণঅভ্যুত্থানে জামায়াতসহ ডানপন্থীদের ভূমিকার বিষয়টি সামনে এসেছে। সরকারের একাংশও তাদের সপক্ষে ভূমিকা রেখেছে বলে ধারণা সুপ্রতিষ্ঠিত। এনসিপির সঙ্গে ঘনিষ্ঠরা সরকার থেকে বিদায় নিয়েছেন একেবারে তফসিল ঘোষণার সময়ে এসে। এর আগ পর্যন্ত মব ভায়োলেন্সকেও ‘জেনুইন ক্ষোভের প্রকাশ’ বলে বর্ণনা করা হয়েছে। শুধু ক্ষমতাচ্যুত দল নয়; দুর্বল জনগোষ্ঠীর ওপরও মব চলেছে প্রতিকারহীনভাবে। এসব হতে হতে শেষে দুটি মিডিয়া প্রতিষ্ঠানও অবিশ্বাস্যভাবে আক্রান্ত হয় রাজধানীর কেন্দ্রস্থলে; প্রকাশ্যে। যারা এটি করেছে, তারা আর যা-ই হোক– বিএনপির কেউ নয়।

অনেকে বলছেন, আগামী নির্বাচনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে আওয়ামী লীগ সমর্থকদের ভোট। আদর্শ বিচার না করে কিছু এলাকায় ‘নিরাপত্তার নিশ্চয়তা’ প্রদানকারীদের ভোটদানের ঘটনাও নিশ্চয় দেখতে হবে। এটা কম দেখা যেত– সরকার আইনের শাসন জোরদারে সচেষ্ট হলে। তারা চাঁদাবাজ দমনে উদ্যোগী হননি। জুলাইয়ের চেতনা রক্ষার নামে মবকারীদের দমনেও নিষ্ক্রিয় থেকেছেন। নির্বাচন যতটা সম্ভব পিছিয়ে দিতে এদের নানাবিধ ইস্যুভিত্তিক আন্দোলনের সময়ও সরকার দ্রুত যৌক্তিক অবস্থান নেয়নি। রাষ্ট্র সংস্কার প্রশ্নেও হেলে ছিল জামায়াত ও এনসিপির দিকে। সরকারের তো কোনো দিকে হেলে পড়ার কথা নয়। বরং হওয়ার কথা ছিল গণঅভ্যুত্থানে অংশগ্রহণকারী সব পক্ষের আস্থাভাজন। এখন কথা হলো, সরকারের এ ভূমিকার কারণেও কি জামায়াত জোটের ভোট বাড়বে? নাকি এর প্রতিক্রিয়ায় তাদের ভোট কমার কথা?

ভোট বাড়লেই আসন সে অনুপাতে বাড়বে, তা নয়। আর গণভোটে ‘না’ জয়যুক্ত হলেও ক্ষতি নেই। রাষ্ট্র সংস্কার না হলেও গণতন্ত্রে উত্তরণ সম্ভব হবে জাতীয় নির্বাচন ঠিকমতো হলে। তবে গণতন্ত্রকে টেকসই করতে সংস্কার লাগবে। সংস্কারে বিএনপির নিজের প্রতিশ্রুতি রয়েছে। জামায়াত-এনসিপি তো দেখা গেল আরও বেশি ‘সংস্কারবাদী’। বিরোধী দলে গিয়ে বসলেও তারা সংস্কারের দাবি নতুনভাবে জোরদার করতে পারবে। দেশ পরিচালনায় বিরোধী দলের অংশগ্রহণ বাড়ানোর বিষয়ে তো কিছু ঐকমত্যও হয়ে আছে। তবে এক বা একাধিক কারণে নির্বাচনটাই ভণ্ডুল কিংবা প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়লে দেশ নিমজ্জিত হবে আরও বেশি অরাজকতায়। গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী বাংলাদেশ কি সেটা ‘অ্যাফোর্ড’ করতে পারবে? অর্থনীতি পুনরুদ্ধার না করেই বা আর কতদিন আমরা জাতীয় জীবনের অর্জিত মান ধরে রাখতে পারব?

হাসান মামুন: সাংবাদিক, কলাম লেখক

Ad 300x250

সম্পর্কিত