জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০২৬

ও গণভোট

ক্লিক করুন

ইসি থেকে সুপ্রিম কোর্ট: প্রার্থিতা ফিরে পাওয়ার আইনি লড়াই

স্ট্রিম ডেস্ক
স্ট্রিম ডেস্ক

প্রকাশ : ১৫ জানুয়ারি ২০২৬, ২১: ২৫
প্রার্থিতা ফিরে পাওয়ার আইনি লড়াই। এআই দিয়ে নির্মিত ছবি

আগামী ফেব্রুয়ারি মাসে দেশে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। জুলাই গণঅভ্যুত্থানে পরিবর্তিত রাজনৈতিক দৃশ্যপটে এবারের ভোটের হিসাবনিকাশ আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে আলাদা। নির্বাচন কমিশন (ইসি) এবার নজিরবিহীন কঠোর অবস্থানে রয়েছে। তারা কোনোভাবেই ঋণখেলাপি বা দুর্নীতি মামলার আসামিদের ছাড় দিতে রাজি নয়। এই কড়াকড়ির ফলে মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাইয়ের টেবিলে বড় ধরনের ঝড়ের আভাস পাওয়া যাচ্ছে। সামান্য ত্রুটি পেলেই বাতিল হচ্ছে প্রার্থীদের মনোনয়ন। তবে মনোনয়নপত্র বাতিল মানেই সব শেষ নয়। একজন প্রার্থী তাঁর প্রার্থিতা ফিরে পেতে ধাপে ধাপে আইনি লড়াই চালাতে পারেন। জেলা প্রশাসকের কার্যালয় থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ আদালত পর্যন্ত যাওয়ার সুযোগ রয়েছে।

নির্বাচনের প্রাথমিক যুদ্ধ

গত ২৯ ডিসেম্বর ছিল মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার শেষ তারিখ। ৪ জানুয়ারি যাচাই-বাছাই শেষে বৈধ প্রার্থীদের তালিকা প্রকাশ করে নির্বাচন কমিশন। প্রার্থিতা বাতিল হয়েছে এমন প্রার্থীদের ৫ থেকে ৯ জানুয়ারির মধ্যে নির্বাচন কমিশন বরাবর আপিল করতে বলা হয়। মোট ৬৪৫ জন প্রার্থী তাঁদের মনোনয়ন ফিরে পাওয়ার জন্য ইসিতে আপিল করেন। এবার আপিলের সংখ্যা বিগত দুই নির্বাচনের তুলনায় অনেক বেশি। দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আপিল আবেদন করেছিলেন ৫৬২ জন।

১০ জানুয়ারি থেকে নির্বাচন কমিশনে শুরু হয়েছে আপিল শুনানি। প্রতিদিন প্রায় ৭০টি করে আপিলের ভাগ্য নির্ধারিত হচ্ছে। ইসির অডিটোরিয়ামে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের নেতৃত্বে বিশেষ এজলাসে বসে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে। প্রার্থীর আইনজীবী তাঁর মক্কেলের হয়ে যুক্তি তুলে ধরছেন। কোথাও ছোটখাটো ভুলের জন্য ছাড় দেওয়া হচ্ছে, আবার কোথাও আইনের প্রশ্নে কঠোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে।

যেমন, স্বতন্ত্র প্রার্থীদের ১ শতাংশ সমর্থক স্বাক্ষর যাচাইয়ের ক্ষেত্রে দুই-একজন সমর্থককে না পাওয়া গেলেও মানবিক বা বাস্তবসম্মত কারণে তা মেনে নেওয়া হয়েছে। অনেক প্রার্থীর ফরমে দাপ্তরিক ত্রুটি ছিল—সিল নেই, বা ঠিকমতো সই করা হয়নি। সেসব ক্ষেত্রে কমিশন ‘সুবিধা’ দেওয়ার মনোভাব দেখিয়েছে। এই প্রক্রিয়ায় জাতীয় পার্টির অধিকাংশ প্রার্থী ও বিভিন্ন ছোট দলের প্রার্থীরা তাদের প্রার্থিতা ফেরত পেয়েছেন।

কঠোর আইন ও বাধাপ্রাপ্ত প্রার্থীরা

তবে সবার ভাগ্য সমান হয়নি। নির্বাচন কমিশন কিছু বিষয়ে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করেছে। বিশেষ করে ঋণখেলাপি এবং দ্বৈত নাগরিকত্ব ইস্যুতে ইসি অনড়। শামসুল ইসলামের মতো অনেক প্রার্থী তাঁদের অজান্তেই ঋণখেলাপি ছিলেন বলে দাবি করেছেন, কিন্তু কমিশন তাঁদের যুক্তি গ্রহণ করেনি। দ্বৈত নাগরিকত্বের প্রমাণ সঠিকভাবে দাখিল করতে না পারায় অনেকেই প্রার্থিতা ফিরে পাননি। জামায়াতের প্রার্থী ডা. মোসলেহউদ্দিন ফরিদের মতো হেভিওয়েট প্রার্থীদের ক্ষেত্রেও আইনি জটিলতা তৈরি হয়েছে, যার চূড়ান্ত ফয়সালা এখনও ঝুলে আছে।

হাইকোর্টে রিট পিটিশন দায়ের

ইসিতেও যাদের মনোনয়ন বাতিল বহাল থাকল তাদের সামনে খোলা আছে হাইকোর্ট ও সুপ্রিম কোর্টের দরজা। ব্যারিস্টার শামীম হায়দার পাটোয়ারীর মতো অনেকেই ঘোষণা দিয়েছেন তারা আইনি লড়াই চালিয়ে যাবেন। অর্থাৎ ইসির সিদ্ধান্তই শেষ কথা নয়। আদালত প্রাঙ্গণেও চলবে নির্বাচনী যুদ্ধের এই আইনি অধ্যায়

হাইকোর্টের নির্দিষ্ট বেঞ্চে এসব রিটের শুনানি অনুষ্ঠিত হয়। এখানে প্রার্থীর আইনজীবীরা প্রমাণ করার চেষ্টা করেন যে, রিটার্নিং অফিসার বা ইসির সিদ্ধান্ত আইনানুগ বা তথ্যভিত্তিক ছিল না। ঋণখেলাপি ইস্যুতে ব্যাংক কর্তৃক ভুল তথ্য প্রদান কিংবা নাগরিকত্ব ত্যাগের প্রমাণপত্রের মতো জটিল আইনি বিষয়গুলোর সুরাহা মূলত এখানেই হয়। হাইকোর্ট যদি মনে করে প্রার্থিতা বাতিলের সিদ্ধান্তটি সঠিক ছিল না, তবে আদালত ইসির রায় স্থগিত করে প্রার্থীকে প্রতীক বরাদ্দের নির্দেশ দিতে পারে।

চেম্বার আদালত ও আপিল বিভাগের চূড়ান্ত রায়

হাইকোর্ট বিভাগের রায়েও যদি প্রার্থী কিংবা নির্বাচন কমিশন সন্তুষ্ট না হয়, তবে আইনি যুদ্ধের ক্ষেত্র সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে স্থানান্তরিত হয়। প্রথমে আবেদন শুনানির জন্য চেম্বার বিচারপতির আদালতে যায়। ভোটের আগে সময় অত্যন্ত কম থাকে বলে চেম্বার জাজ অনেক সময় তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত দেন অথবা হাইকোর্টের আদেশের ওপর স্থগিতাদেশ বা ‘স্টে অর্ডার’ জারি করেন। অধিকতর ব্যাখ্যার প্রয়োজন হলে মামলা আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চে পাঠানো হয়।

নির্বাচন কমিশনের তফসিল অনুযায়ী ১৮ জানুয়ারির মধ্যে ইসির অভ্যন্তরীণ সব আপিল নিষ্পত্তি হবে। এরপর ২০ জানুয়ারি প্রার্থিতা প্রত্যাহারের শেষ সময় ও ২১ জানুয়ারি প্রতীক বরাদ্দ করা হবে। উচ্চ আদালতের আইনি প্রক্রিয়া এই সময়সীমার সমান্তরালেই চলতে থাকবে। প্রতীক বরাদ্দের পরও আদালতের নির্দেশে প্রার্থিতা ফিরে পাওয়ার বা বাতিল হওয়ার সুযোগ থাকে। অতীতে দেখা গেছে ভোটের কয়েকদিন আগেও আপিল বিভাগের রায়ে প্রার্থিতা ফিরে পেয়ে অনেকে নির্বাচনে অংশ নিয়েছেন।

তথ্যসূত্র: নির্বাচন কমিশন, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধান এবং বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম

সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত