leadT1ad

কলকাতার পথের কুকুর থেকে ‘পিস ডগ’: যুক্তরাষ্ট্রে শান্তি পদযাত্রায় আলোক

আলোক কোনো প্রশিক্ষিত পোষা কুকুর নয়। বাংলাদেশ কিংবা পশ্চিমবাংলার রাস্তায় রাস্তায় এমন চেহারার অসংখ্য কুকুরকে ঘুরতে দেখা যায়। সে জন্মেছিল কলকাতার রাস্তায়। এখন সবাই তাকে চেনে ‘দ্য পিস ডগ’ নামে। ‘শান্তি পদযাত্রা’র অংশ হিসেবে ১৯ বৌদ্ধ ভিক্ষুর সঙ্গে সে এখন হাঁটছে যুক্তরাষ্ট্রের পথে পথে।

প্রকাশ : ০৫ জানুয়ারি ২০২৬, ২০: ৪৭
যুক্তরাষ্ট্রে শান্তি পদযাত্রায় আলোক। সংগৃহীত ছবি

যুক্তরাষ্ট্রের পথে হেঁটে চলেছে কলকাতার ‘পথের কুকুর’ আলোক। এখন সবাই তাকে চেনে ‘দ্য পিস ডগ’ নামে। ‘শান্তি পদযাত্রা’র অংশ হিসেবে ১৯ বৌদ্ধ ভিক্ষুর সর্বক্ষণের সঙ্গী হয়ে সে এখন টেক্সাস থেকে ওয়াশিংটনের দিকে হাঁটছে।

এই যাত্রাপথেই আলোক হয়ে উঠেছে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। তার নিজের ইনস্টাগ্রাম আছে। ফেসবুকে লাইভ ট্র্যাকার দিয়ে যাত্রার আপডেট দেওয়া হচ্ছে। ধীরে ধীরে সে হয়ে উঠেছে এই শান্তিযাত্রার সবচেয়ে চেনা মুখ। রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে অনেকে থেমে ছবি তুলছেন, কেউ কেউ সেলফিও নিচ্ছেন। সেই সব ছবি আর ভিডিও ছড়িয়ে পড়ছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে।

আলোক যেভাবে যুক্ত হলো শান্তি পদযাত্রায়

আলোক কোনো প্রশিক্ষিত পোষা কুকুর নয়। বাংলাদেশ কিংবা পশ্চিমবাংলার রাস্তায় রাস্তায় এমন চেহারার, এমন রঙের অসংখ্য কুকুরকে ঘুরতে দেখা যায়। সে জন্মেছিল কলকাতার রাস্তায়। এই কুকুরটি ভারতীয় প্যারিয়া প্রজাতির। বয়স আনুমানিক চার বছর। আর দশটা দেশি কুকুরদের মতোই তার জীবন শুরু হয়েছিল অনিশ্চয়তায়। কোনো মালিক কিংবা নির্দিষ্ট আশ্রয় ছিল না। কখনো ফুটপাতে, কখনো গলির ধারে, কখনো কোনো দোকানের শাটারের নিচে তার রাত কাটত। খাবার জুটত কখনো মানুষের দয়া থেকে, কখনো উচ্ছিষ্ট থেকে। টিকে থাকাই ছিল প্রতিদিনের একমাত্র কাজ।

কয়েক মাস আগে কলকাতায় ১৯ জন বৌদ্ধ ভিক্ষুর একটি দল শান্তি পদযাত্রার অংশ হিসেবে এসেছিলেন। তাঁরা তখন ভারতে ১১২ দিনের এক পদযাত্রায় বেরিয়েছেন। অচেনা পোশাক বা চেহারার ১৯ জন বৌদ্ধ ভিক্ষুকে একসঙ্গে দেখে হয়ত কৌতূহলী হয়ে পড়েছিল আলোক। প্রথমে সেই কৌতূহলের বশেই তাঁদের সঙ্গে হাঁটা শুরু করে।

আলোক হেঁটে চলেছে শান্তি পদযাত্রায়। সংগৃহীত ছবি
আলোক হেঁটে চলেছে শান্তি পদযাত্রায়। সংগৃহীত ছবি

দিনের পর দিন ভিক্ষুরা হাঁটছেন, আর আলোক তাঁদের পাশেই আছে। তাঁরা যেখানে থামেন, সেখানেই সে গুটিসুটি মেরে শুয়ে পড়ে। ভিক্ষুরা ভোরে ঘুম থেকে উঠে হাঁটা শুরু করলে, আলোকও উঠে দাঁড়ায়। কেউ তাকে বেঁধে রাখেনি, কেউ বাধ্য করেনি। তবু সে যায়নি। ধীরে ধীরে সে আর ‘পথে পাওয়া এক কুকুর’ থাকে না। সে হয়ে ওঠে যাত্রারই অংশ।

একদিন গাড়ির ধাক্কায় সে আহত হয়। রাস্তার কুকুরদের জন্য এ ধরনের দুর্ঘটনা প্রায়ই প্রাণঘাতী হয়। ভিক্ষুরা তখন সিদ্ধান্ত নেন, এই কুকুরটিকে আর হাঁটানো ঠিক হবে না। তার কষ্ট কমাতে তাঁরা তাকে ট্রাকে তুলে নেওয়ার চেষ্টা করেন, যেন সে বিশ্রাম নিতে পারে। কিন্তু আলোক ট্রাক থেকে লাফিয়ে নেমে আবার হাঁটতে শুরু করে। সে যেন নিজেই ঠিক করে নিয়েছিল, এই পথেই তাকে থাকতে হবে। তখনই ভিক্ষুরা তার নাম রাখেন ‘আলোক’। পালি ভাষায় যার অর্থ ‘আলো’।

ওয়াক ফর পিস কী

ওয়াক ফর পিস বা শান্তি পদযাত্রা কোনো একদিনের কর্মসূচি নয়। এটি একটি দীর্ঘ আন্দোলন। ভিক্ষুদের মতে, শান্তি কোনো স্লোগান নয়, এটি একটি চর্চা। আর সেই চর্চা শুরু হয় নিজের শরীর দিয়ে, নিজের গতির মধ্য দিয়ে। তাই তাঁরা হাঁটেন খালি পায়ে। হাতে কোনো ব্যানার থাকে না, মুখে কোনো দাবি থাকে না। তাঁদের হাঁটার ভঙ্গি, ধৈর্য, নীরবতা—সব মিলিয়েই হয়ে ওঠে বার্তা। মানুষ রাস্তার ধারে থেমে দেখে, ভাবতে শুরু করে। একদল বৌদ্ধ ভিক্ষু নিয়মিত এই ধরনের পদযাত্রা করেন বিশ্বের নানা প্রান্তে।

ভারতের সেই ১১২ দিনের পদযাত্রার পর ২০২৫ সালের অক্টোবরে তাঁরা শুরু করেন আরও বড় এক যাত্রা। ১১০–১২০ দিনে যুক্তরাষ্ট্রে প্রায় ২ হাজার ৩ শ মাইল হাঁটার লক্ষ্য তাঁদের।

পিস ডগ আলোক ঘুরছে যুক্তরাষ্ট্রের পথে পথে

ভারতের ১১২ দিনের শান্তি পদযাত্রা শেষ হওয়ার পর বৌদ্ধ ভিক্ষুরা যখন ফিরে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন, তখন তাঁদের সামনে সবচেয়ে কঠিন প্রশ্নটি এসে দাঁড়ায়, আলোককে কী করা হবে? এতদিন যে কুকুরটি তাঁদের সঙ্গে একই পথে হেঁটেছে, একই জায়গায় ঘুমিয়েছে, তাকে হঠাৎ করে রাস্তায় ফেলে রেখে যাওয়া কোনোভাবেই সম্ভব ছিল না। আলোক তখন আর শুধু একটি পথকুকুর নয়, সে হয়ে উঠেছে তাঁদের যাত্রার অংশ, তাঁদের নীরব সঙ্গী।

আলোক এখন বৌদ্ধ ভিক্ষুদের সঙ্গী। সংগৃহীত ছবি
আলোক এখন বৌদ্ধ ভিক্ষুদের সঙ্গী। সংগৃহীত ছবি

কিন্তু আবেগ থাকলেই তো সব সহজ হয় না। একটি পথকুকুরকে এক দেশ থেকে আরেক দেশে নিয়ে যাওয়া মানে অনেক জটিল নিয়মের ভেতর দিয়ে যাওয়া। স্বাস্থ্য পরীক্ষা, টিকা, প্রয়োজনীয় নথিপত্র, সরকারি অনুমোদন—সবই বাধ্যতামূলক। বিশেষ করে এমন একটি কুকুরের ক্ষেত্রে, যার কোনো আগের কাগজপত্রই ছিল না, পুরো প্রক্রিয়াটি আরও সময়সাপেক্ষ হয়ে ওঠে।

ভিক্ষুরা এই প্রক্রিয়া শুরু করেন ধৈর্য নিয়ে। আলোককে নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষার মধ্যে রাখা হয়। প্রয়োজনীয় টিকা দেওয়া হয়। প্রতিটি কাগজ ঠিকঠাক করতে তাঁদের লেগে যায় আরও এক মাসের বেশি সময়। সব নিয়মকানুন শেষ হওয়ার পর অবশেষে আলোক পাড়ি জমায় যুক্তরাষ্ট্রে।

আলোক যেভাবে আলোচনায়

যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি দিলে আলোকর পরিচয়ও বদলে যায়। সে আর শুধু ‘ভারতের এক পথের কুকুর’ নয়। সে হয়ে ওঠে ‘আলোক দ্য পিস ডগ’। শান্তির যাত্রার এক নীরব মুখ। তার গল্প ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়তে থাকে মানুষের মধ্যে। ভিক্ষুদের একজন পরে বলেন, ‘ও এখন আমাদের পরিবারের সদস্য। সারা জীবন আমাদের সঙ্গেই থাকবে।’

এখন আলোক যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে শান্তি পদযাত্রায় অংশ নিচ্ছে। প্রতিদিন সে ভিক্ষুদের সঙ্গে হাঁটে, ক্লান্ত হলে বিশ্রাম নেয়। খুব প্রয়োজন হলে গাড়িতে ওঠে, কিন্তু বেশিরভাগ সময় সে রাস্তাতেই থাকতে চায়।

জর্জিয়া অঙ্গরাজ্যে হাঁটার সময় এক রাতে প্রচণ্ড ঠান্ডা ও ভিড়ের কারণে নিরাপত্তার স্বার্থে তাকে গাড়িতে তোলা হয়। কিন্তু গাড়িতে বসে সে অস্থির হয়ে ওঠে। শব্দ করতে থাকে। ভিক্ষুরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লেখেন, আলোক রাস্তায় হাঁটতেই স্বস্তি পায়।

আলোকার গল্প ভাইরাল হওয়ার পর তার ভক্তসংখ্যাও বেড়েছে। পথে পথে মানুষ তাকে চিনে ফেলছে। গাড়ি থামিয়ে তাকে ট্রিটস দেওয়ার ভিডিও এখন সাধারণ দৃশ্য। তার নিজের নাম লেখা একটি বোনা সোয়েটারও আছে। শুধু তাই নয়, তার দৈনন্দিন যাত্রা তুলে ধরতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও তার উপস্থিতি রয়েছে। আর যাঁরা পথে তার সঙ্গে দেখা করেন, তাঁদের কাছ থেকে সে পাচ্ছে অফুরন্ত আদর আর ভালোবাসা।

Ad 300x250

সম্পর্কিত