আরিফ রহমান

অগ্নিঝরা মার্চের শুরু। এই মাস আমাদের জাতীয় জীবনের শ্রেষ্ঠ অর্জনের সূচনালগ্ন। আবার সেই সাথে শোক ও দহনের স্মৃতিবাহক। ১৯৭১ সালের মার্চে বাংলার মানুষ যখন স্বাধীনতার স্বপ্নে বিভোর, ঠিক তখন পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ঝাঁপিয়ে পড়েছিল এক পরিকল্পিত নিধনযজ্ঞে। তাদের এই পাশবিকতার সবচেয়ে করুণ আখ্যানটি সম্ভবত হলো ধর্মের দোহাই দিয়ে ধর্মপ্রাণ মানুষের ওপর আক্রমণ। যে পাকিস্তানি শাসকেরা ‘ইসলাম রক্ষা’র বুলি আওড়ে এদেশের মানুষের ওপর চড়াও হয়েছিল, তাদের হাতেই সবচেয়ে বেশি লাঞ্ছিত ও অবমানিত হয়েছে ইসলাম ধর্ম এবং ধর্মীয় পবিত্র স্থাপনাগুলো। একাত্তরের সেই বিভীষিকাময় দিনগুলোতে মসজিদ, মাদ্রাসা ও পবিত্র ধর্মগ্রন্থ কুরআন শরিফও তাদের পৈশাচিকতা থেকে রেহাই পায়নি।
পাকিস্তানি বাহিনী দেশব্যাপী গণহত্যার যে নীল নকশা বাস্তবায়ন করেছিল, তাতে বাংলার বহু মসজিদ-মাদ্রাসার মতো পবিত্র স্থানগুলো হয়ে উঠেছিল বধ্যভূমি। গবেষক ড. আহম্মেদ শরীফের লেখা মুক্তিযুদ্ধে গণহত্যার প্রকৃতি ও স্বরূপ: ১৯৭১ গ্রন্থে উঠে এসেছে তেমন কিছু ঘটনার বিবরণ। নাটোর সদর উপজেলার বনবেলঘরিয়ার মসজিদে ১০৫ বছরের বৃদ্ধ সৈয়দ আলী মুন্সিকে ইবাদত রত অবস্থায় টেনে বের করে হত্যা করে হানাদার বাহিনী। চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ উপজেলার সালামপুর মসজিদে নামাজরত অবস্থায় গুলি করে হত্যা করা হয় দুজনকে।
লালমনিরহাটের ভেলাবাড়ি ইউনিয়নে সাকোয়া জামে মসজিদে ৬৪ জনকে আটকে রেখে আগুন ধরিয়ে দেয় পাকিস্তানি সৈন্যরা। আগুনের লেলিহান শিখায় ভস্মীভূত হয় ৬৪টি প্রাণ। একইভাবে পঞ্চগড়ের দুইপাড়া মাদ্রাসায় আশ্রয় নেওয়া মানুষদের টেনে হিঁচড়ে বের করে হত্যা করা হয়। কুরআনের হাফেজ আসিকুল্লাহকেও তারা গুলি করে হত্যা করতে দ্বিধা করেনি।
ফতেঙ্গাপাড়া গণহত্যায় শহীদ আব্দুস সালাম সরকারের বুকের ওপর পাওয়া গিয়েছিল রক্তভেজা কুরআন শরিফ। ঠাকুরগাঁওয়ে পুলিশ লাইন সংলগ্ন মাদ্রাসায় পবিত্র কুরআন শরিফ পুড়িয়ে দেওয়ার ঘটনা প্রমাণ করে, তাদের কাছে ধর্মের কোনো প্রকৃত মর্যাদা ছিল না। ধর্ম ছিল তাদের কাছে কেবল একটি রাজনৈতিক অস্ত্র।
তপন কুমার দে তার বাংলাদেশে পাকিস্তানিদের গণহত্যা ও নারী ধর্ষণ গ্রন্থে একাত্তরে নারী নির্যাতনের প্রামাণ্য সব তথ্য তুলে এনেছেন। তাঁর বইতেই মসজিদ থেকে ১১ তরুণীকে উদ্ধার করার ঘটনার বিবরণ খুঁজে পাওয়া যায়
১৯৭১ সালের ১০ ডিসেম্বর। দেশ স্বাধীন হওয়ার মাত্র কয়েকদিন বাকি। ভারতীয় সেনাবাহিনীর ক্যাপ্টেন বিক্রম সিং তখন সাতক্ষীরার দিকে অগ্রসর হচ্ছেন। সাথে আছেন স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের মুসা সাদিকসহ একদল মুক্তিযোদ্ধা। মাহমুদপুর ঘোনার কাছে তিন কৃষক ও দুজন বালক তাদের গাড়ি থামান। গাড়ি থামানো হল। সেই পাঁচজন তখন কান্নায় ভেঙে পড়ে । তাদের কাছ থেকে যা জানা গেল তা শুনে স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিলেন তারা। নিকটস্থ একটি মসজিদে পাকিস্তানি হানাদাররা গত কয়েক মাস ধরে এলাকার ১১ জন তরুণীকে আটকে রেখেছিল।
মসজিদটি দখলমুক্ত করে দেখা যায় এক অবর্ণনীয় দৃশ্য। মসজিদের ভেতরে একে অপরকে জড়িয়ে ধরে কাঁদছেন ১১ জন নারী। তাদের প্রত্যেকের শরীর ছিল সম্পূর্ণ বিবস্ত্র। নয় মাস ধরে এই পবিত্র ইবাদতের স্থানটিকে পাকিস্তানি সেনারা তাদের লালসা মেটানোর স্থান হিসেবে ব্যবহার করেছে। যে সেনারা নিজেদের ইসলামের সৈনিক দাবি করত, তারা মসজিদের পবিত্রতা নষ্ট করে সেখানে নির্যাতনের আস্তানা গেড়েছিল।
একাত্তরের গণহত্যা কেবল ভূখণ্ড দখলের লড়াই ছিল না। এটি ছিল একটি জাতির সংস্কৃতি, বিশ্বাস এবং মানবিকতার ওপর চরম আঘাত। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও তাদের দোসররা ধর্মের দোহাই দিয়ে যে পৈশাচিকতা চালিয়েছে, তা মানব সভ্যতার ইতিহাসে এক কলঙ্কজনক অধ্যায়। আজ ৫৫ বছর পর দাঁড়িয়ে যখন আমরা অগ্নিঝরা মার্চকে স্মরণ করি, তখন এই সত্যটি বারবার আমাদের সামনে আসে যে—ধর্মের প্রকৃত শিক্ষা কোনোদিন হত্যা বা নির্যাতনকে প্রশ্রয় দেয়া নয়।
মসজিদের পবিত্র আঙিনায় যারা রক্ত ঝরিয়েছে, যারা মা-বোনদের ওপর পাশবিক নির্যাতন চালিয়েছে, তারা ইসলামের রক্ষক নয় মোটেও। বর্তমান প্রজন্মে কাছে এই সত্যগুলো তুলে ধরা জরুরি, যাতে ধর্মের অপব্যবহার করে আর কেউ কোনোদিন এমন মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটিত করতে না পারে।
তথ্যসূত্র:
১. মুক্তিযুদ্ধে গণহত্যার প্রকৃতি ও স্বরূপ: ১৯৭১ — ড. আহম্মেদ শরীফ।
২. বাংলাদেশে পাকিস্তানিদের গণহত্যা ও নারী ধর্ষণ — তপন কুমার দে।

অগ্নিঝরা মার্চের শুরু। এই মাস আমাদের জাতীয় জীবনের শ্রেষ্ঠ অর্জনের সূচনালগ্ন। আবার সেই সাথে শোক ও দহনের স্মৃতিবাহক। ১৯৭১ সালের মার্চে বাংলার মানুষ যখন স্বাধীনতার স্বপ্নে বিভোর, ঠিক তখন পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ঝাঁপিয়ে পড়েছিল এক পরিকল্পিত নিধনযজ্ঞে। তাদের এই পাশবিকতার সবচেয়ে করুণ আখ্যানটি সম্ভবত হলো ধর্মের দোহাই দিয়ে ধর্মপ্রাণ মানুষের ওপর আক্রমণ। যে পাকিস্তানি শাসকেরা ‘ইসলাম রক্ষা’র বুলি আওড়ে এদেশের মানুষের ওপর চড়াও হয়েছিল, তাদের হাতেই সবচেয়ে বেশি লাঞ্ছিত ও অবমানিত হয়েছে ইসলাম ধর্ম এবং ধর্মীয় পবিত্র স্থাপনাগুলো। একাত্তরের সেই বিভীষিকাময় দিনগুলোতে মসজিদ, মাদ্রাসা ও পবিত্র ধর্মগ্রন্থ কুরআন শরিফও তাদের পৈশাচিকতা থেকে রেহাই পায়নি।
পাকিস্তানি বাহিনী দেশব্যাপী গণহত্যার যে নীল নকশা বাস্তবায়ন করেছিল, তাতে বাংলার বহু মসজিদ-মাদ্রাসার মতো পবিত্র স্থানগুলো হয়ে উঠেছিল বধ্যভূমি। গবেষক ড. আহম্মেদ শরীফের লেখা মুক্তিযুদ্ধে গণহত্যার প্রকৃতি ও স্বরূপ: ১৯৭১ গ্রন্থে উঠে এসেছে তেমন কিছু ঘটনার বিবরণ। নাটোর সদর উপজেলার বনবেলঘরিয়ার মসজিদে ১০৫ বছরের বৃদ্ধ সৈয়দ আলী মুন্সিকে ইবাদত রত অবস্থায় টেনে বের করে হত্যা করে হানাদার বাহিনী। চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ উপজেলার সালামপুর মসজিদে নামাজরত অবস্থায় গুলি করে হত্যা করা হয় দুজনকে।
লালমনিরহাটের ভেলাবাড়ি ইউনিয়নে সাকোয়া জামে মসজিদে ৬৪ জনকে আটকে রেখে আগুন ধরিয়ে দেয় পাকিস্তানি সৈন্যরা। আগুনের লেলিহান শিখায় ভস্মীভূত হয় ৬৪টি প্রাণ। একইভাবে পঞ্চগড়ের দুইপাড়া মাদ্রাসায় আশ্রয় নেওয়া মানুষদের টেনে হিঁচড়ে বের করে হত্যা করা হয়। কুরআনের হাফেজ আসিকুল্লাহকেও তারা গুলি করে হত্যা করতে দ্বিধা করেনি।
ফতেঙ্গাপাড়া গণহত্যায় শহীদ আব্দুস সালাম সরকারের বুকের ওপর পাওয়া গিয়েছিল রক্তভেজা কুরআন শরিফ। ঠাকুরগাঁওয়ে পুলিশ লাইন সংলগ্ন মাদ্রাসায় পবিত্র কুরআন শরিফ পুড়িয়ে দেওয়ার ঘটনা প্রমাণ করে, তাদের কাছে ধর্মের কোনো প্রকৃত মর্যাদা ছিল না। ধর্ম ছিল তাদের কাছে কেবল একটি রাজনৈতিক অস্ত্র।
তপন কুমার দে তার বাংলাদেশে পাকিস্তানিদের গণহত্যা ও নারী ধর্ষণ গ্রন্থে একাত্তরে নারী নির্যাতনের প্রামাণ্য সব তথ্য তুলে এনেছেন। তাঁর বইতেই মসজিদ থেকে ১১ তরুণীকে উদ্ধার করার ঘটনার বিবরণ খুঁজে পাওয়া যায়
১৯৭১ সালের ১০ ডিসেম্বর। দেশ স্বাধীন হওয়ার মাত্র কয়েকদিন বাকি। ভারতীয় সেনাবাহিনীর ক্যাপ্টেন বিক্রম সিং তখন সাতক্ষীরার দিকে অগ্রসর হচ্ছেন। সাথে আছেন স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের মুসা সাদিকসহ একদল মুক্তিযোদ্ধা। মাহমুদপুর ঘোনার কাছে তিন কৃষক ও দুজন বালক তাদের গাড়ি থামান। গাড়ি থামানো হল। সেই পাঁচজন তখন কান্নায় ভেঙে পড়ে । তাদের কাছ থেকে যা জানা গেল তা শুনে স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিলেন তারা। নিকটস্থ একটি মসজিদে পাকিস্তানি হানাদাররা গত কয়েক মাস ধরে এলাকার ১১ জন তরুণীকে আটকে রেখেছিল।
মসজিদটি দখলমুক্ত করে দেখা যায় এক অবর্ণনীয় দৃশ্য। মসজিদের ভেতরে একে অপরকে জড়িয়ে ধরে কাঁদছেন ১১ জন নারী। তাদের প্রত্যেকের শরীর ছিল সম্পূর্ণ বিবস্ত্র। নয় মাস ধরে এই পবিত্র ইবাদতের স্থানটিকে পাকিস্তানি সেনারা তাদের লালসা মেটানোর স্থান হিসেবে ব্যবহার করেছে। যে সেনারা নিজেদের ইসলামের সৈনিক দাবি করত, তারা মসজিদের পবিত্রতা নষ্ট করে সেখানে নির্যাতনের আস্তানা গেড়েছিল।
একাত্তরের গণহত্যা কেবল ভূখণ্ড দখলের লড়াই ছিল না। এটি ছিল একটি জাতির সংস্কৃতি, বিশ্বাস এবং মানবিকতার ওপর চরম আঘাত। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও তাদের দোসররা ধর্মের দোহাই দিয়ে যে পৈশাচিকতা চালিয়েছে, তা মানব সভ্যতার ইতিহাসে এক কলঙ্কজনক অধ্যায়। আজ ৫৫ বছর পর দাঁড়িয়ে যখন আমরা অগ্নিঝরা মার্চকে স্মরণ করি, তখন এই সত্যটি বারবার আমাদের সামনে আসে যে—ধর্মের প্রকৃত শিক্ষা কোনোদিন হত্যা বা নির্যাতনকে প্রশ্রয় দেয়া নয়।
মসজিদের পবিত্র আঙিনায় যারা রক্ত ঝরিয়েছে, যারা মা-বোনদের ওপর পাশবিক নির্যাতন চালিয়েছে, তারা ইসলামের রক্ষক নয় মোটেও। বর্তমান প্রজন্মে কাছে এই সত্যগুলো তুলে ধরা জরুরি, যাতে ধর্মের অপব্যবহার করে আর কেউ কোনোদিন এমন মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটিত করতে না পারে।
তথ্যসূত্র:
১. মুক্তিযুদ্ধে গণহত্যার প্রকৃতি ও স্বরূপ: ১৯৭১ — ড. আহম্মেদ শরীফ।
২. বাংলাদেশে পাকিস্তানিদের গণহত্যা ও নারী ধর্ষণ — তপন কুমার দে।

অগ্নিঝরা মার্চ চলছে। এই মাস যেমন বাঙালির শ্রেষ্ঠ অর্জনের স্মারক, তেমনি তা পাকিস্তানি হানাদারদের চরম পৈশাচিকতারও সাক্ষী। ১৯৭১ সালের মার্চে পাকিস্তানি বাহিনী মেতে উঠেছিল এক সুপরিকল্পিত নিধনযজ্ঞে। তাদের সেই বর্বরোচিত আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু কেবল সম্মুখ সমরের যোদ্ধা বা রাজনৈতিক কর্মীরাই ছিল এমন নয়। বহু মান
২ ঘণ্টা আগে
শীতের রুক্ষ দিনগুলো শেষ। প্রকৃতি এখন নতুন প্রাণের স্পন্দনে জেগে উঠছে। আর এই ঋতুরাজ বসন্তের আগমনী বার্তা নিয়ে মৌলভীবাজারের পথে-প্রান্তরে ফুটেছে চিরচেনা ‘ভাঁটফুল’। গ্রামীণ মেঠোপথ, সড়কের ধার কিংবা নদী-খালের পাড়—যেদিকেই তাকানো যায়, সাদা আর হালকা বেগুনি রঙের থোকা থোকা ভাঁটফুলে যেন প্রকৃতি সেজেছে।
২ ঘণ্টা আগে
আজ মার্চের প্রথম দিন। বসন্তের দখিনা হাওয়ার সঙ্গে আজ মিশে আছে এক বিশেষ গর্ব আর বিষাদমাখা ইতিহাস। আজ থেকে ৫৫ বছর আগে এই মার্চ মাসেই বাঙালির হাজার বছরের পরাধীনতার শিকল ভাঙার চূড়ান্ত সংগ্রাম শুরু হয়েছিল। আজ সেই ‘অগ্নিঝরা মার্চের’ প্রথম দিন।
৩ ঘণ্টা আগে
১৯৫২ এর ফেব্রুয়ারির ভাষা আন্দোলনে শুরু হওয়া, চব্বিশের বর্ষা বিপ্লবের হাত ধরে সফলভাবে এগিয়ে গিয়ে ২০২৬ এর ফেব্রুয়ারিতে পৌঁছে যাওয়া, চুয়াত্তর বছরের বাংলা ভাষার এই অভিযাত্রা এবং প্রেক্ষাপট অনেকটাই ভিন্ন।
১৯ ঘণ্টা আগে