জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০২৬

ও গণভোট

ক্লিক করুন

একাত্তরে হাসপাতালেও থাবা বসিয়েছিল পাকিস্তানি জল্লাদরা

প্রকাশ : ০১ মার্চ ২০২৬, ১৫: ৩৬
১৯৭১ সালের একটি ফিল্ড হাসপাতাল। ছবিটি স্বাধীনতা যুদ্ধ আর্মি মেডিকেল কোর গ্রন্থ থেকে নেওয়া।

অগ্নিঝরা মার্চ চলছে। এই মাস যেমন বাঙালির শ্রেষ্ঠ অর্জনের স্মারক, তেমনি তা পাকিস্তানি হানাদারদের চরম পৈশাচিকতারও সাক্ষী। ১৯৭১ সালের মার্চে পাকিস্তানি বাহিনী মেতে উঠেছিল এক সুপরিকল্পিত নিধনযজ্ঞে। তাদের সেই বর্বরোচিত আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু কেবল সম্মুখ সমরের যোদ্ধা বা রাজনৈতিক কর্মীরাই ছিল এমন নয়। বহু মানুষকে নির্বিচারে তারা হত্যা তো করেছেই, হাসপাতালের শয্যায় শায়িত মুমূর্ষু রোগী আর সেবাপরায়ণ চিকিৎসকেরাও রক্ষা পাননি তাদের বুলেট থেকে।

আন্তর্জাতিক যুদ্ধ আইনে হাসপাতাল বা চিকিৎসাকেন্দ্র আক্রান্ত হওয়া সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ হলেও পাকিস্তানি সেনারা সেই আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে রক্তের হোলি খেলায় মেতেছিল।

গবেষক ড. আহম্মেদ শরীফ তাঁর মুক্তিযুদ্ধে গণহত্যার প্রকৃতি ও স্বরূপ: ১৯৭১ গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন যে, একাত্তরে পাকিস্তানি বাহিনী যে ঘৃণ্য অপরাধগুলো করেছিল, তার অন্যতম হলো হাসপাতালে হামলা। সাধারণত যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে হাসপাতালগুলোকে নিরাপদ অঞ্চল হিসেবে গণ্য করা হয়। কিন্তু বাংলাদেশে পাকিস্তানি সৈন্যরা সুপরিকল্পিতভাবে লালমনিরহাট রেলওয়ে হাসপাতাল, নাটোর সদর হাসপাতাল ও কুমিল্লা পুলিশ লাইন হাসপাতালে গণহত্যা সংঘটিত করে।

নাটোর সদর হাসপাতালের নির্মমতার এক করুণ চিত্র পাওয়া যায় সুমা কর্মকারের গণহত্যা-বধ্যভূমি ও গণকবর জরিপ: নাটোর জেলা গ্রন্থে। ১৯৭১ সালের ১৬ এপ্রিল সেখানে শহীদ হন হাসপাতালের কর্মচারী জীবনকৃষ্ণ মানি। যুদ্ধের ডামাডোলে নিরাপত্তার অভাবে জীবনকৃষ্ণ যখন শহর ছাড়তে চেয়েছিলেন, তখন স্থানীয় আঁকি চৌধুরী, মধু মিয়া ও দুদু মিয়ারা তাঁকে আশ্বস্ত করেছিলেন। বলেছিলেন চিকিৎসাসেবার সঙ্গে জড়িতদের কোনো ক্ষতি হবে না। কিন্তু সেই আশ্বাস ছিল স্রেফ এক মরণফাঁদ। হানাদাররা তাঁর বাড়িতে হামলা চালিয়ে অমানুষিক নির্যাতন করে। তিনি মারাত্মক আহত অবস্থায় সদর হাসপাতালে ভর্তি হন।

তাঁকে বাঁচাতে সহকর্মীরা পুরুষ ওয়ার্ডের পেছনে লুকিয়ে চিকিৎসার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু স্থানীয় দালালরা তাঁর অবস্থান হানাদারদের জানিয়ে দেয়। পাকিস্তানি সেনারা হাসপাতালে ঢুকে জীবনকৃষ্ণকে খুঁজে বের করে। পরপর তিন রাউন্ড গুলি চালিয়ে তাঁর প্রাণ কেড়ে নেয়। হাসপাতালের আঙিনা তাঁর রক্তে রঞ্জিত হয়।

একইভাবে লালমনিরহাট রেলওয়ে হাসপাতালের বীভৎস বর্ণনা উঠে এসেছে আজহারুল আজাদ জুয়েলের গণহত্যা-বধ্যভূমি ও গণকবর জরিপ: লালমনিরহাট জেলা গ্রন্থে। ১৯৭১ সালের ৪ এপ্রিল পাকিস্তানি সেনারা শহরে প্রবেশের প্রথম দিকেই এই হাসপাতালে হামলা চালায়। সেখানে চিকিৎসাধীন প্রায় ৩০ জন রোগীকে বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে ও গুলি করে হত্যা করা হয়। নিহতদের মধ্যে ছিলেন লালমনিরহাট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মীর মোশাররফ হোসেন ও খোচাবাড়ি মডেল হাই স্কুলের ছাত্র সোলেমান আলী কান্দু।

হাসপাতালের ভেতর এই নারকীয় হত্যাকাণ্ডের সমান্তরালে চলেছে বাইরের বিভীষিকা। হাসপাতালের নার্স লতিফা বেগমের দুই কিশোর ছেলে লতিফুল ইসলাম ও রিয়াজুল ইসলামকে ধরে নিয়ে গিয়ে ট্রলিল্যান্ডে ধারালো অস্ত্র দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে হত্যা করা হয়। একজন সেবিকার সামনেই তাঁর সন্তানদের এই পৈশাচিক মৃত্যু একাত্তরের নির্মমতার এক চরম দলিল।

একাত্তরের এই হাসপাতাল গণহত্যাগুলো ছিল চরম মানবতাবিরোধী অপরাধ। যারা অসুস্থ মানুষের সেবা করতেন এবং যারা জীবন বাঁচাতে হাসপাতালের শরণাপন্ন হতেন, তাঁদের ওপরেই চলত দখলদারদের মরণকামড়। আজ স্বাধীনতার পাঁচ দশকেরও বেশি সময় পর দাঁড়িয়ে এই ইতিহাসগুলো বর্তমান প্রজন্মের কাছে তুলে ধরা অপরিহার্য। হাসপাতালের শ্বেতবস্ত্র যখন দেশপ্রেমিকদের রক্তে লাল হচ্ছিল, সেই স্মৃতি আমাদের মনে করিয়ে দেয় এই স্বাধীনতার মূল্য কতখানি।

তথ্যসূত্র:

১. গণহত্যা-বধ্যভূমি ও গণকবর জরিপ: লালমনিরহাট জেলা —আজহারুল আজাদ জুয়েল।

২. গণহত্যা-বধ্যভূমি ও গণকবর জরিপ: নাটোর জেলা —সুমা কর্মকার।

৩. মুক্তিযুদ্ধে গণহত্যার প্রকৃতি ও স্বরূপ: ১৯৭১ — ড. আহম্মেদ শরীফ।

সম্পর্কিত