ক্যারিয়ারের মাঝপথে দিশাহারা, সমাধান কীসে

বর্তমান সময়ের নতুন প্রজন্মের (জেন-জি) ছেলেমেয়েরা অনেক বেশি সক্রিয়। তাঁরা ইউনিভার্সিটিতে থাকতেই অনেক স্কিল শিখে ফেলে। গুগল-ইউটিউব ঘেঁটে তারা বিশ্বের সেরা শিক্ষকদের খুঁজে বের করে নেয়।

প্রকাশ : ১৩ এপ্রিল ২০২৬, ১৮: ৫৪
ক্যারিয়ারের মাঝপথে দিশাহারা, সমাধান কীসে। সংগৃহীত ছবি

ক্যারিয়ারের মাঝামাঝি সময়ে (মিড ক্যারিয়ার) এসে অনেকেই হতাশায় ভোগেন, যাকে বলা হয় ‘মধ্য ক্যারিয়ার-সংকট’। তাঁরা ভাবেন এখনো নিজের একটা বাড়ি হলো না, গাড়ি হলো না কিংবা অফিসে বড় কোনো ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে যেতে পারলাম না। এই অতৃপ্তি থেকে অনেকেই কেবল টাকার পেছনে ছুটতে থাকেন। অফিস সময়ের পর বাড়তি ব্যবসা, পরামর্শক সেবা (কনসালটেন্সি) কিংবা প্রশিক্ষণ (ট্রেনিং) নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। পরিশ্রম করা অবশ্যই প্রশংসনীয়, কিন্তু এই দৌড়ঝাঁপের ভিড়ে যা বাদ পড়ে যায়, তা হলো পড়াশোনা বা জ্ঞানার্জন। প্রায় কেউই নতুন করে শিখতে বা পড়তে চান না।

আমি অনেক ষাটোর্ধ ব্যাক্তিকে দেখে অনুপ্রাণিত হই। জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে অনেকেই এই বয়সে এসে অবদান রাখছেন। এটা কীভাবে সম্ভব? কারণ তাঁরা ৪০ থেকে ৬০ বছর বয়স পর্যন্ত সময়টাকে দারুণভাবে কাজে লাগিয়েছেন। তাঁরা পড়েছেন, লব্ধ জ্ঞান কাজে লাগিয়েছেন, সমস্যা সমাধান করেছেন, ভুল থেকে শিখেছেন এবং নিজেদের কাজে পারফেকশনিস্ট হয়ে উঠেছেন।

ক্যারিয়ারের মাঝপথে এসে অনেকেই ধরে নেন, ডিগ্রি তো শেষ, এবার শুধু কাজ আর আয়ের পালা। এই সময়ে শুধু টাকা উপার্জনের জন্য আপনার পড়াশোনা ও শেখার প্রক্রিয়া থেমে যাবে। এটা আপনাকে পরবর্তী সময়ে সংকটে ফেলতে পারে। আপনি যখন জ্যেষ্ঠ পদে যাবেন, প্রতিষ্ঠান আপনার কাছে স্ট্র্যাটেজি আশা করবে। আপনার স্ব-উদ্যোগী এবং স্ব-প্রণোদিত ভূমিকা চাইবে। আপনার চিন্তাধারা যদি এখনো কেবল নির্বাহী স্তরের কাজ সারার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে, তবে আপনি পেশাগত সংকটে পড়বেন।

ধরুন, আপনি ক্লাসে ‘কেপিআই’ (KPI) সম্পর্কে শিখলেন। এখন আপনি যদি ভাবেন, ‘আমি তো মানবসম্পদ বিভাগে কাজ করি না, আমি এটা কীভাবে কাজে লাগাব?’ তবে আপনি ভুল করছেন। প্রশ্ন হওয়া উচিত, আপনি কি আপনার নিজের বিভাগে এটি প্রয়োগ করেছেন?

আমার পরিচিত এক ছোটভাই পরিবেশ বিজ্ঞানে পড়াশোনা করে এখন ব্যবস্থাপনা পর্যায়ে আছে। সে এমবিএ-ও করেছে। তাঁকে জিজ্ঞেস করলাম, এমবিএ করার সময় সোশ্যাল সাসটেইনেবিলিটিতে বা বিজনেসে তোমার অবদান কী? বলল, পড়াশুনা করেছি মাত্র। এখানেই আমাদের মূল সমস্যা। এমবিএ একটা প্রায়োগিক জ্ঞান। পড়াশোনার সময়েই সেই জ্ঞান নিজের প্রতিষ্ঠানে প্রয়োগ করার চেষ্টা করতে হয়।

ধরুন, আপনি ক্লাসে ‘কেপিআই’ (KPI) সম্পর্কে শিখলেন। এখন আপনি যদি ভাবেন, ‘আমি তো মানবসম্পদ বিভাগে কাজ করি না, আমি এটা কীভাবে কাজে লাগাব?’ তবে আপনি ভুল করছেন। প্রশ্ন হওয়া উচিত, আপনি কি আপনার নিজের বিভাগে এটি প্রয়োগ করেছেন? এই জ্ঞান যদি আপনি বাস্তবে কাজে না লাগান, তবে আপনি ক্যারিয়ারের মাঝামাঝি সময়ে এসে থমকে যেতে পারেন।

বিশ্বব্যাপী এই 'মিড ক্যারিয়ার ক্রাইসিস' দেখা যায়। সংগৃহীত ছবি
বিশ্বব্যাপী এই 'মিড ক্যারিয়ার ক্রাইসিস' দেখা যায়। সংগৃহীত ছবি

সম্প্রতি পরিবেশ বিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর করা এক ম্যানেজার ভাইকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘পরিবেশ ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি (EMS) নিয়ে আপনার পরিকল্পনা বা কৌশল কী? আপনার কোম্পানির ইএমএস ব্যবস্থাপনায় আপনি কী অবদান রাখতে চান? তিনি নিরুত্তর। এরপর জিজ্ঞেস করলাম, ‘হিগ ফ্যাসিলিটি এনভায়রনমেন্টাল মডিউল ইনডেক্স’ নিয়ে আইডিয়া আছে? একা এটি বাস্তবায়ন করতে পারবেন? তিনি না-সূচক মাথা নাড়লেন।

মনে রাখবেন, যখন ম্যানেজারিয়াল পদে থেকে এসব প্রযুক্তিগত বা কৌশলগত কাজ বাস্তবায়ন করতে পারবেন না, তখন সদ্য পাস করা একজন গ্র্যাজুয়েট আপনাকে নেতা হিসেবে মানবে না। এটাই হলো ক্যারিয়ারের মধ্যবর্তী সময়ের সংকট। বর্তমান সময়ের নতুন প্রজন্মের (জেন-জি) ছেলেমেয়েরা অনেক বেশি সক্রিয়। তাঁরা ইউনিভার্সিটিতে থাকতেই অনেক স্কিল শিখে ফেলে।

গুগল-ইউটিউব ঘেঁটে তারা বিশ্বের সেরা শিক্ষকদের খুঁজে বের করে নেয়। কর্মক্ষেত্রে এসে তারা খুব দ্রুত শিখে টিমের নেতৃত্বে পৌঁছে যায়। সেখানে আপনার ডিগ্রি, আপনার চাকরি এবং আপনার ক্যারিয়ার যদি একই সমান্তরালে না চলে, তবে পিছিয়ে পড়াই স্বাভাবিক।

তাই পড়াশোনা করুন। আরও বেশি বেশি জানুন এবং শিখুন। শুধু ভাগ্যের দোহাই দেবেন না। সৃষ্টিকর্তা তাঁর ভাগ্য পরিবর্তন করেন না, যে নিজে পরিবর্তনের চেষ্টা করে না।

সম্পর্কিত