সিনেমা রিভিউ

বনলতা সেন: সিনেমায় কবিতার ছবি

প্রকাশ : ৩১ মে ২০২৬, ১৪: ৫৫
স্ট্রিম গ্রাফিক

বনলতা সেন। কবিতা আর সিনেমা মিলেমিশে একাকার। এ যেন কবিতার মতো এক সিনেমা। কবিতা থেকে সিনেমা নির্মাণ— ব্যাপারটিকে খুব স্বাভাবিক মনে হলেও সেটাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল এই সিনেমার। নির্মাতা মাসুদ হাসান উজ্জ্বল সেই পরীক্ষায় দারুণভাবে সফল হয়েছেন।

জীবনানন্দের বনলতা সেন ১৮ লাইনের কবিতা। পড়তে দেড়-দুই মিনিটের বেশি লাগে না। অথচ সেই কবিতাকে ঘিরে নির্মিত সিনেমার দৈর্ঘ্য ২ ঘণ্টা ২৭ মিনিট। প্রশ্ন উঠতেই পারে, যে কবিতা এত অল্প সময়ে পড়ে ফেলা যায়, তার ভেতর-বাইরের ছবি আঁকতে এত সময় লেগে গেল? তাও কি যথেষ্ট সময় পেল? না। সেটা হয় না বলেই কবিতার এত শক্তি আর সে কারণেই কবিতার মতো সিনেমা বানানো এত শক্ত।

জীবনানন্দ দাশ বাঙালির প্রিয় কবি৷ তাঁর অনেক কবিতা বাঙালি পাঠকের মনে আর মুখে৷ তবে বনলতা সেন কবির ‘সিগনেচার’, সেটাও সত্যি। উজ্জ্বল ভাই জীবনানন্দ অন্ত:প্রাণ। তিনি কবিকে ধারণ করেন বলেই এমন সিনেমা বানাতে পেরেছেন।

জীবনানন্দ এবং তাঁর কবিতাকে নিজেদের মতো করে ধারণ করেন এমন মানুষের সংখ্যাও কম নয়। প্রত্যেকের মনে ‘বনলতা সেন’-এর একটি আলাদা ছবি আছে, আলাদা ব্যাখ্যা আছে। এই সিনেমায় এটিই চ্যালেঞ্জ ছিল নির্মাতার জন্য। কারণ, এক বিষয়ে একেকজনের ইন্টারপ্রিটেশান একেকরকম।

আমার ব্যক্তিগতভাবে মনে হয়েছে, সংগীত পরিচালনার দায়িত্ব বাপ্পা মজুমদারের হাতে তুলে দেওয়ার সিদ্ধান্তটি এই সিনেমার ওপর বড় প্রভাব ফেলেছে।

সেক্ষেত্রে যতই জীবনানন্দ প্রেমিক হোন না কেন, এই বিষয়ে স্বেচ্ছাচারিতায় জায়গা খুব কম। আবার সবার ভাবনা মিলে যাবার সম্ভাবনাও নেই। তাই চেষ্টাটা সৎ ও প্রয়োগটা সুন্দর হবার পরীক্ষায় পাশ করাটা কঠিন হলেও সফল হয়েছেন মাসুদ হাসান উজ্জ্বল।

এই সিনেমা মূলত বনলতা সেনকে খুঁজে ফেরার গল্প। জীবনানন্দ দাশের জীবনের নানা অনুষঙ্গ সিনেমায় এসেছে, কিন্তু এটি কোনোভাবেই কবির জীবনীভিত্তিক চলচ্চিত্র নয়। এমনকি জীবনানন্দের জীবনও এই সিনেমার প্রধান বিষয় নয়। বরং বনলতা সেন কবিতাটিই এই চলচ্চিত্রের মূল কেন্দ্র, যার চারপাশে আবর্তিত হয়েছে পুরো নির্মাণ।

বাংলাদেশে নাটক-সিনেমায় সুররিয়ালিজম বা পরাবাস্তববাদ নিয়ে কাজ করা নির্মাতাদের মধ্যে মাসুদ হাসান উজ্জ্বল অগ্রগণ্য। তাঁর নানা নির্মাণে সেই প্রভাব প্রকট। এই সিনেমাতেও পরাবাস্তবতার ছবি দারুণভাবে এঁকেছেন নির্মাতা। ‘আঁকা’ শব্দটা শুধু উপমা নয়, এই নির্মাতার ক্ষেত্রে বিষয়টি খুব ঠিকঠাক বিশেষণ। উজ্জ্বল ভাই একজন পেইন্টার, তাঁর পড়াশোনাও চিত্রকলায়। সেট, কালার গ্রেডিং, কস্টিউম আর চিত্রায়ন—সবখানে কবিতার ছবি এঁকেছেন মাসুদ হাসান উজ্জ্বল। হৃদয় সরকার খুব ভালো কাজ করেছেন সিনেমাটোগ্রাফার হিসেবে।

কোনো সিনেমা কখন মনে দাগ কেটে যায়? দেখা যায়, বছর পেরিয়ে আর মনে থাকে না কারও। যখন কিছু দৃশ্য মনে গেঁথে থাকে তখন সেই সিনেমাও টিকে থাকে দর্শকের মনে। ভেবে দেখুন নিজের প্রিয় সিনেমার কথা। একটা-দুটো-চারটা দৃশ্য আপনার মনে আছে। সেটা ১০-২০-৩০ বছর আগে দেখা হলেও। দৃশ্যগুলোর মধ্য দিয়েই সিনেমাটাও বেঁচে থাকে। এমন বেশ কিছু দৃশ্য এই সিনেমায় তৈরি করতে পেরেছেন নির্মাতা।

বনলতা-জীবনানন্দ-মহীনের সাগর পাড়ের সেই মেটাফোরিক দৃশ্য কিংবা মহীনের ঘোড়াগুলো নিয়ে হেঁটে যাবার সেই দৃশ্য যারা সিনেমাটি দেখেছেন, তাঁদের মনে থাকবেই। ক’বছর আগেও এমন কোনো দৃশ্য বাংলাদেশের সিনেমায় দেখতে পারার আশা করেছেন, এমন ব্যক্তি দেশে খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। এসব দৃশ্যায়নের এই সিনেমার অন্যতম শক্তি। সিনেমার শেষদিকে রুপক হিসেবে লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চির ‘দ্য লাস্ট সাপার’ আর পিকাসোর ‘গিয়্যের্নিকা’ পেইন্টিং দুটির প্রতীকী ব্যবহারে উজ্জ্বল ভাই যে মুনশিয়ানা দেখিয়েছেন, তার কথাও বলতে হবে আলাদা করে।

বনলতা সেন সিনেমায় একটি দৃশ্য
বনলতা সেন সিনেমায় একটি দৃশ্য

সিনেমার কাহিনি নিয়ে বলতে গেলে আগের কথাই আবার বলতে হয়। এই সিনেমা আসলে কবিতাই। বনলতা সেনকে খুঁজতে গিয়ে এখানে বাস্তব তথ্যের সঙ্গে মিশেছে নানা ব্যাখ্যা, ধারণা ও কল্পনা। তাই সরল, ধারাবাহিক গল্পের কাঠামো না থাকাটাই স্বাভাবিক। বরং ছড়ানো গল্পের সম্মিলনের কাহিনি, যা হয়তো এক সুতোয় গাঁথা না। তবে যেহেতু একই চরিত্রকে ঘিরে একাধিক ভাবনার বিচরণ ঘটেছে, তাই ব্যাপারটিকে স্বাভাবিক মনে হয়েছে আমার কাছে। অবশ্য অন্য কারও কাছে এটিই সিনেমার দুর্বলতা বলে মনে হতে পারে।

অভিনয়ের ক্ষেত্রে পুরো দলই প্রশংসার দাবিদার। খায়রুল বাসার অসাধারণ অভিনয় করেছেন। দেখতে যতটা সহজ মনে হয়েছে, কাজটি ততটাই কঠিন ছিল। বাসারের কণ্ঠস্বর চরিত্রায়নকে আরও ঋদ্ধ করেছে। সোহেল মণ্ডল জাত অভিনেতা। এমন চরিত্র পেলে যে তিনি প্রমাণের সুযোগ পান, তার সঠিক ব্যবহার করেছেন। মাসুমা রহমান নাবিলাও খুব ভালো করেছেন। কাজ বেছে নেওয়ার ক্ষেত্রে তিনি বরাবরই সচেতন। আয়নাবাজি, তুফানের পর বনলতা সেন তাঁর ক্যারিয়ারের আরেকটি পালক হয়ে থাকবে। সিনেমায় মায়মুনা মমো, রূপন্তি আকিদ, নাজিবা বাশার, প্রিয়ন্তি উর্বীদের চরিত্রের ব্যাপ্তি ছোট হলেও, গুরুত্বে মোটেও কম নয়। প্রত্যেকেই নিজেদের ভূমিকা সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। সব মিলিয়ে অভিনয়ের জায়গায় সিনেমাটি বেশ শক্ত অবস্থান তৈরি করেছে।

বনলতা সেন সিনেমার অন্যতম প্রধান ও গুরুত্বপূর্ণ দিক এই সিনেমার সংগীত। সিনেমায় গান মাত্র একটি। সেটি দুর্দান্ত। ‘এখানে কেউ নেই’ শিরোনামের গানটির কথা লিখেছেন বাপ্পা মজুমদার ও শাহান কবন্ধ। কণ্ঠ দেবার পাশাপাশি সুর ও সংগীতায়োজন করেছেন বাপ্পা মজুমদার। পুরো চলচ্চিত্রের আবহসংগীতও তাঁরই করা। অসাধারণ কাজ করছেন। তিনি বাংলাদেশের সংগীত জগতের সম্পদ। তাঁর যোগ্যতা নিয়ে কারও কোনো প্রশ্ন নেই। কিন্তু আমাদের দেশে যেটা হয়, এমন দারুণ প্রতিভাধর মানুষেরা নিজের জাদু দেখানোরই সুযোগ পান না।

বনলতা সেন সিনেমার গল্প আর নির্মাণ এমন ধরনের যে, সিনেমার প্রাণ এর আবহ সংগীত। যে পরাবাস্তবতা ক্যামেরার ফ্রেমে পরিচালক ধরেছেন, তার ঠিকঠাক প্রকাশের জন্য সংগীতের সঠিক ব্যবহার অপরিহার্য। বাপ্পা ভাইয়ের অগুনতি সুন্দর গান আছে, ভবিষ্যতেও আরো হবে। কিন্তু এমন দারুণ আবহ সংগীত করার সুযোগ আমার ধারণা তিনি প্রথম পেলেন! এর প্রয়োগেও বাপ্পা ভাই ১০০-তে ১০০ পাবেন। আর এখানে আলাদা করে ধন্যবাদ পাবেন পরিচালক। কারণ তিনি নিজেই একজন স্বয়ংসম্পূর্ণ সংগীত পরিচালক হয়েও বাপ্পা ভাইয়ের ওপর দায়িত্বটা ন্যস্ত করেছেন।

সিনেমা ‘বনলতা সেন’ কি সবার জন্য? সবাই বুঝবে? এমন প্রশ্ন সোশ্যাল মিডিয়ায় দেখতে পাচ্ছি। প্রথম প্রশ্নের উত্তর ‘হ্যা’। দ্বিতীয় প্রশ্নের উত্তর ‘না’। তাহলে প্রশ্ন উঠতে পারে, যারা বুঝবে না তাঁরা দেখবে কেন?

আমার ব্যক্তিগতভাবে মনে হয়েছে, সংগীত পরিচালনার দায়িত্ব বাপ্পা মজুমদারের হাতে তুলে দেওয়ার সিদ্ধান্তটি এই সিনেমার ওপর বড় প্রভাব ফেলেছে। বাপ্পা মজুমদার তাঁর কাজটি অসাধারণভাবে করবেন—এমন প্রত্যাশা তো থাকেই। ফলে সংগীতের মতো গুরুত্বপূর্ণ একটি বিভাগ নিয়ে নির্ভার থাকতে পেরে মাসুদ হাসান উজ্জ্বল নিশ্চয়ই তাঁর মনোযোগ আরও বেশি দিতে পেরেছেন নির্মাণের অন্যান্য দিকে। কারণ এই সিনেমার কাহিনি, সংলাপ এবং সম্পাদনার কাজও তিনি নিজেই করেছেন। এতগুলো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব একসঙ্গে সামলানো সহজ নয়। তবে উজ্জ্বল ভাইকে যতটুকু চিনি, তাতে মনে হয় তিনি এই বহুমাত্রিক কাজের ধরনেই স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন।

সিনেমা ‘বনলতা সেন’ কি সবার জন্য? সবাই বুঝবে? এমন প্রশ্ন সোশ্যাল মিডিয়ায় দেখতে পাচ্ছি। প্রথম প্রশ্নের উত্তর ‘হ্যা’। দ্বিতীয় প্রশ্নের উত্তর ‘না’। তাহলে প্রশ্ন উঠতে পারে, যারা বুঝবে না তাঁরা দেখবে কেন? কারণ, এমন চলচ্চিত্র দেখতে দেখতেই দর্শকের দেখার অভ্যাস তৈরি হয়, চলচ্চিত্র ভাষা সম্পর্কে নতুন বোধ তৈরি হয়। তাই সিনেমা সবার জন্যই। শুধুমাত্র শ্রোতা-দর্শকদের চাহিদামাফিক কাজ করাই শিল্পীর কাজ না। বরং দায়িত্বশীল শিল্পীর কাজ শ্রোতা, দর্শক তৈরি করা। সেক্ষেত্রে এই সিনেমা একটি উদাহরণ।

এতক্ষণ এত প্রশংসার কথা বললাম। তাই বলে কি সিনেমাটির কোনো সীমাবদ্ধতা নেই? অবশ্যই আছে। স্পেশাল ইফেক্ট ও এআই-নির্ভর কাজগুলো আরও ভালো হবার সুযোগ ছিল। সিনেমার দ্বিতীয়ভাগে আরেকটু গতি থাকলে হয়তো ভালো হতো। এমন কিছু বিষয় তো থেকেই যায়।

তবে সব মিলিয়ে ‘বনলতা সেন’ মাসুদ হাসান উজ্জ্বলের দারুণ এক নির্মাণ। মর্ত্যলোক থেকে কবি জীবনানন্দ দাশ নিশ্চয়ই খুশি হয়েছেন, তাঁর সৃষ্টি নিয়ে এই সৃষ্টিশীল কাঁটাছেড়ায়।

লেখক: সংগীতশিল্পী; প্রকাশক

সম্পর্কিত