এত ভয়ংকর ভিলেন, তবু কেন এত জনপ্রিয় হুমায়ূন ফরীদি

প্রকাশ : ৩০ মে ২০২৬, ১৮: ৫১
স্ট্রিম গ্রাফিক

নব্বই দশকের কথা। হুমায়ূন ফরীদি যখন সিনেমার পর্দায় আসতেন, পর্দার আবহ বদলে যেত। বাদামের ঠোঙা দর্শকের হাতেই থাকত, মুখে আর যেত না। মেরুদণ্ড বরাবর ভয়ের একটা শীতল স্রোত নামত। তবু চোখ সরানো যেত না। মনের কোণে একটা অদ্ভুত চাওয়া জন্মাত—‘এই লোকটা যদি না হারত!’

এই চাওয়াটা স্বীকার করা কঠিন। কিন্তু অস্বীকারও করা যায় না। হুমায়ূন ফরীদির জনপ্রিয়তার আসল রহস্য এখানেই। তিনি ভিলেন হয়েও দর্শকের সহানুভূতি চুরি করতেন। দর্শক টেরও পেত না কখন সেটা হয়ে গেল।

বাংলাদেশের পর্দায় ভিলেনের অভাব কখনো ছিল না। কিন্তু বেশিরভাগ ভিলেন ছিলেন ‘ফাংশনাল’। গল্পের প্রয়োজনে মন্দ, নায়কের কাছে হারার জন্য জন্মানো। দর্শক দেখামাত্র বুঝত, এই লোক শেষ দৃশ্যে মরবে। ভয় লাগত, কিন্তু কৌতূহল জন্মাত না।

ফরীদির ভিলেন চরিত্রকে এত সহজে পড়া যেত না। তার চরিত্রে মন্দটা ছিল স্তরে স্তরে। ওপরে একটা চেহারা, ভেতরে আরেকটা, তারও নিচে একটা পুরনো ক্ষত। দর্শক সেই স্তর পেরোনোর চেষ্টা করত এবং প্রতিবার আরেকটা স্তর আবিষ্কার করত। রহস্য শেষ হলে মনোযোগ শেষ হয়, কিন্তু ফরীদির রহস্য শেষ হত না।

‘বিশ্বপ্রেমিক’ সিনেমার কথাই ধরুন। চরিত্রটা সাইকোপ্যাথের—নৃশংস, ঠান্ডা, ভেতরে ভাঙা। ফরীদি সেই ভাঙনটা লুকিয়ে রাখতেন চরিত্রের দাপটের আড়ালে। দর্শক হিংস্রতা দেখত, কিন্তু মাঝে মাঝে একটা ফাটল দেখত—যেখান দিয়ে একটুখানি আলো ঢোকে। সেই ফাটলটাই ছিল সবচেয়ে বিপজ্জনক জায়গা। কারণ সেখানে ঘৃণার বদলে কৌতূহল জন্মায়।

‘ঘাতক’ সিনেমায় তিনি ভিন্নরকম সাহস দেখিয়েছিলেন। যুদ্ধাপরাধের দায়ে দণ্ডিত গোলাম আযমের আদলে তৈরি চরিত্রে অভিনয় করা মানে শুধু মন্দ লোক সাজা নয়—সেটা ছিল একটা ঐতিহাসিক দায় কাঁধে তোলা। সেই চরিত্রে তিনি কোনো নাটকীয়তা রাখেননি। ছিলেন ঠান্ডা, মসৃণ, অনুতাপহীন। যে মানুষ লক্ষ মৃত্যুর দায় বহন করেও রাতে ঘুমাতে পারে, সেই মুখটা ফরীদি দেখিয়েছিলেন বিশ্বাসযোগ্যভাবে।

‘কমান্ডার’-এ আবার অন্য এক ফরীদি। সিঁধেল চোর থেকে ক্রমে বড় অপরাধী হয়ে ওঠার যে যাত্রা—সেখানে তিনি দেখিয়েছিলেন পতনটা কীভাবে ঘটে। হঠাৎ নয়, ধীরে ধীরে। একটার পর একটা সিদ্ধান্ত, প্রতিটি সিদ্ধান্তে একটু একটু করে পিছলে যাওয়া। এই পতনের ভেতর একটা মানবিক সত্য ছিল, যে কেউ এভাবে পিছলে যেতে পারে।

আর ‘পালাবি কোথায়’-তে ছিল ডার্ক হিউমার। গার্মেন্টসের ম্যানেজার হাওলাদার—লম্পট, আত্মতুষ্ট, নিজের বিকৃতি নিয়ে সম্পূর্ণ নির্বিকার। ফরীদি সেই চরিত্রকে হাস্যকর করেননি, আবার শুধু ঘৃণ্যও রাখেননি। একটা অদ্ভুত কমিক ট্র্যাজেডি তৈরি করেছিলেন, যেখানে দর্শক হাসে, কিন্তু হাসির পরেই একটা অস্বস্তি আসে। এই অস্বস্তিটাই শিল্প।

এই গভীরতার পেছনে ছিল মঞ্চের দীর্ঘ সাধনা। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময়ই তিনি ঢাকা থিয়েটারের সদস্য হন। সেলিম আল দীনের নাটকে কাজ করতেন। থিয়েটারে দর্শক থেকে পঞ্চাশ ফুট দূরে দাঁড়িয়ে অভিনয় করতে হয়। ক্যামেরা নেই, রিটেক নেই, শুধু শরীর আর মুহূর্ত। সেই শরীরী সাধনাকে তিনি ক্যামেরার সামনে এনেছিলেন নিজের ভেতরে চালান করে দিয়ে। ফলে যা বেরোত, সেটা ছিল এক অদ্ভুত ঘনত্ব ও গভীরতাসম্পন্ন অভিনয়।

অন্য অভিনেতারা রাগ দেখাতেন চিৎকারে। ফরীদি রাগ দেখাতেন চোখের পাতা সামান্য সরু করে। গলার স্বর ঠান্ডা হয়ে আসত, ঠোঁটের কোণে একটা বাঁকা রেখা ফুটত। ঠান্ডা মাথায় যে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, সেটা সত্যিই কার্যকর হয়—দর্শক সেটা বিশ্বাস করত।

কিন্তু ভয়ের পাশাপাশি আরেকটা জিনিস ঘটত। সৈয়দ আবদুল হাদীর কণ্ঠে ‘তেল গেলে ফুরাইয়া’, ‘কে বলে আমি ভালো না’ বা ‘জাদুরে সোনারে ও খুকুমণিরে’—ফরীদির ঠোঁটে এই গানগুলো যখন আসত, হলভর্তি দর্শক হেসেও উঠত। ভিলেন নাচছে, গাইছে, দাপাচ্ছে এবং দর্শক উপভোগ করছে। এই মুহূর্তগুলোতে ভয়টা সরে গিয়ে একটা বিচিত্র আনন্দ আসত। মানুষ হাততালি দিত।

ভয় আর আনন্দ—এই দুটো একসঙ্গে দিতে পারতেন বলেই তিনি শুধু ‘ভালো ভিলেন’ ছিলেন না, হয়ে উঠেছিলেন আইকন।

আইকন হওয়ার আরেকটা কারণ আছে, যেটা কেউ সরাসরি বলে না। বাংলাদেশের সাধারণ দর্শকের বড় অংশ এমন পরিবেশে বড় হয়েছে যেখানে ক্ষমতাবান মানুষ সব সময় ছাড় পেয়ে যায়। মহল্লার মাস্তান, থানার দারোগা, ইউনিয়নের চেয়ারম্যান—এই মুখগুলো চেনা। ফরীদির ভিলেনরা এই চেনা মুখেরই পর্দার সংস্করণ। কিন্তু পর্দায় সে শুধু ভয় দেখায় না—দাপটের সঙ্গে বাঁচে, হাসে, গান গায়।

দর্শক সেই দাপটের ভেতর একটা বিকৃত আকাঙ্ক্ষা খুঁজে পেত। ঘৃণা করত, কিন্তু চোখ সরাতে পারত না। মাঝে মাঝে মনে মনে চাইত—এই লোকটা আরেকটু টিকুক। এই চাওয়াটার মধ্যেই লুকিয়ে আছে ফরীদির জনপ্রিয়তার আসল সূত্র।

‘সংশপ্তক’-এর কানকাটা রমজান সেই সূত্রের সবচেয়ে বড় প্রমাণ। চরিত্রটা কমেডির, কিন্তু পুরোপুরি হাসির না। একটু পর পর বুকে চাপ লাগে। ফরীদি সেই সীমারেখায় দাঁড়িয়ে কাজ করতেন—হাসি আর কান্নার মাঝখানে, ভালো আর মন্দের মাঝখানে। এই সীমারেখাটাই মানুষের আসল জীবন। সেখানে কেউ পুরোপুরি ভালো না, কেউ পুরোপুরি মন্দ না।

ফরীদি সেই সত্যটা অভিনয়ে ধরতেন। দর্শক সেটা চিনত, কারণ তার নিজের ভেতরেও সেই সীমারেখা আছে।

হুমায়ূন ফরীদি জন্মেছিলেন ১৯৫২ সালের ২৯ মে, পুরান ঢাকার নারিন্দায়। ২০১২ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি তিনি চলে গেলেন।

তাঁর প্রস্থানে মানুষ কাঁদছিল একজন ভিলেনের জন্য। কিন্তু আসলে কাঁদছিল এমন একজনের জন্য, যিনি দুই দশক ধরে দর্শককে সেই অনুভূতিটা দিয়েছিলেন—ভয় আর আকাঙ্ক্ষা, ঘৃণা আর ভালোবাসা, সব একসঙ্গে। যিনি প্রতিটি চরিত্রে দেখিয়ে গেছেন, মানুষ আসলে এক রঙের না।

যে শিল্পী মানুষের ভেতরের স্ববিরোধটাকে এত নিখুঁতভাবে আয়না দেখাতে পারে, তাঁকে ভুলে যাওয়া কঠিন। তাই হুমায়ূন ফরীদিকে মানুষ আজও ভুলে যায়নি।

সম্পর্কিত