ad

আড়ংয়ের বিশাল সাম্রাজ্যের নেপথ্যে কী

প্রকাশ : ১৯ আগস্ট ২০২৬, ১৯: ৫৮
আড়ংয়ের সাফল্যের নেপথ্যে কৌশলগুলো। ছবি: স্ট্রিম গ্রাফিক
আড়ংয়ের সাফল্যের নেপথ্যে কৌশলগুলো। ছবি: স্ট্রিম গ্রাফিক

দেশজুড়ে আড়ংয়ের বর্তমানে ৩৪টি আউটলেট রয়েছে। ২০২৩–২৪ সালে আড়ংয়ের মোট বিক্রির পরিমাণ ছিল প্রায় ১,৬৪১ কোটি টাকা, যা আগের বছরের ১,৫৩৫ কোটি টাকার তুলনায় প্রায় ৬ দশমিক ৯ শতাংশ বেশি। আড়ংয়ের হিসাবভুক্ত মোট সম্পদের পরিমাণও প্রায় ১,৫০০ কোটি টাকা। সারাদেশে রয়েছে ৮৩৫টির বেশি প্রোডাকশন ও সাব-সেন্টার। কর্মীসংখ্যা ৮৭ হাজারেরও বেশি।

কীভাবে একটি দেশীয় পণ্যের ব্র্যান্ড হয়ে উঠল এক বিশাল মহীরুহ? কীভাবেই বা তৈরি করল এই বিশাল সাম্রাজ্য? এর নেপথ্যে কী? চলুন জেনে নেওয়া যাক।

মানুষের হাঁটাচলা পর্যবেক্ষণ

আড়ং তাদের আউটলেটগুলোতে মানুষের হাঁটাচলার ওপর নজর রাখে। কোন সেকশনে মানুষ বেশি যাচ্ছে, কোথায় বেশি সময় থামছে, কোন শেলফের সামনে মানুষ থামছে আর কোনটিতে থামছে না, এসব তথ্যের ডেটা অ্যানালাইসিস করা হয়। এর ওপর নির্ভর করে তারা নিয়মিত আউটলেটের লেআউট পরিবর্তন করতে থাকে।

এক সপ্তাহ পর আপনি আড়ংয়ের যেকোনো আউটলেটে গেলে দেখবেন, সামান্য হলেও লেআউটে পরিবর্তন করা হয়েছে কিংবা প্রোডাক্টের প্লেসমেন্ট বদলে দেওয়া হয়েছে।

আউটলেট যখন সেলসপার্সন

আড়ং এর আউটলেটও একটা সেলসপার্সনের মতো কাজ করে। শুনতে অদ্ভুত শোনাচ্ছে না? এটা আসলে ঠিক কীভাবে কাজ করে?

ম্যানিকুইন বা ডামি, প্রোডাক্টের প্লেসমেন্ট, আলোর ব্যবহার, রঙের সমন্বয়, কোন পণ্য চোখের সমান উচ্চতায় থাকবে, কোনটি প্রবেশপথের কাছেই থাকবে, কোন র‍্যাকের পাশে কোন র‍্যাক থাকবে এসবই কাস্টমারের এটেনশনকে বদলে দেয়। একেই বলে ভিজ্যুয়াল মার্চেন্ডাইজিং।

এর মাধ্যমে ক্রেতার চোখ ও মনোযোগ নির্দিষ্ট পণ্যের দিকে টেনে নেওয়া হয়। ফলে পণ্যটির প্রতি তাঁর আগ্রহ তৈরি হওয়ার সম্ভাবনাও বাড়ে।

শেলফ খালি করার টেকনিক

ধরুন, আড়ংয়ে ঢুকেছেন একটি পাঞ্জাবি কিনতে। বাজেট ৫ হাজার টাকা। বিশ মিনিট পর কাউন্টারে গিয়ে দেখলেন, হাতে পাঞ্জাবির সঙ্গে একটি পায়জামা, একজোড়া জুতা, একটি পারফিউম কিংবা বাড়ির জন্য ছোট কোনো শোপিস। বিল হলো ৯ হাজার টাকা। মজার ব্যাপার হলো, দোকানে ঢোকার সময় এর অর্ধেক জিনিস কেনার কোনো পরিকল্পনাই আপনার ছিল না।

তাহলে বাকি জিনিসগুলো আপনার ব্যাগে ঢুকল কীভাবে?

আড়ংয়ের একটি আউটলেট কল্পনা করুন। পাঞ্জাবির আশপাশে পায়জামা, জুতা ও অ্যাকসেসরিজ রাখা থাকে। নারীদের পোশাকের কাছাকাছি থাকে জুয়েলারি, জুতা ও অর্নামেন্টস। হোম ডেকরের একটি পণ্যের পাশে রাখা হয় অন্য কোনো কমপ্লিমেন্টারি আইটেম। একে বলা হয় ক্রস মার্চেন্ডাইজিং বা ক্যাটাগরি অ্যাডজেসেন্সি।

আইডিয়াটা খুবই সাধারণ। আপনাকে দ্বিতীয় প্রোডাক্টটির প্রয়োজন নতুন করে তৈরি করতে হবে না। প্রথম প্রোডাক্টই দ্বিতীয় প্রোডাক্টটির কনটেক্সট তৈরি করে দেয়। আপনি পাঞ্জাবি হাতে নেওয়ার পর একটি ম্যাচিং স্যান্ডেল আর আলাদা কোনো প্রোডাক্ট থাকে না। সেটি হয়ে যায় ‘আউটফিটের একটি অসম্পূর্ণ অংশ’। এটাই বাস্কেট এক্সপ্যানশন স্ট্র্যাটেজি।

এই সাইকোলজিটাই বিখ্যাত ফার্নিচার ব্র্যান্ড ‘আইকিয়া’ ব্যবহার করছে বহু বছর ধরে। আইকিয়ার শোরুমে সারি সারি সোফা রাখা থাকে না। সোফা রাখা থাকে একটি ডামি লিভিং রুমে। সেখানে থাকে ল্যাম্প, কার্পেট, টেবিল, কুশন। এই শপিং জার্নিতে কাস্টমার রুম সেটিং থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে কেনার সিদ্ধান্ত নেন।

আপনি হয়তো সোফা দেখতে গিয়ে সাইড ল্যাম্প বা কুশনও কিনে ফেলবেন। কারণ সাইড ল্যাম্প বা কুশনকে আলাদা কোনো প্রোডাক্ট হিসেবে আপনি দেখছেন না। সোফার অংশ হিসেবেই আপনাকে সেগুলো দেখানো হয়েছে।

আড়ংয়ের বিশেষত্ব এখানেই। আড়ং তাদের শেলফগুলো এমনভাবে সাজায়, যেন একটি প্রোডাক্ট কিনলেই পরেরটি আপনার চোখের সামনে পড়ে। তাদের প্রোডাক্ট পোর্টফোলিও এত বিস্তৃত যে তারা শুধু একটি ড্রেস নয়, একটি পুরো সেটই বিক্রি করতে পারে।

ফলে, আপনি যেটা কিনতে আসেননি, সেটিও শুধুই প্রোডাক্ট প্লেসমেন্টের কারণে আপনার বাস্কেটে ঢুকে যায়।

প্রাইস অ্যাংকরিং

ধরুন, একটি সেকশনে প্রথমে আপনি ৩০ হাজার টাকার একটি শাড়ি দেখলেন। তারপর ৮ হাজার টাকার আরেকটি শাড়ি দেখলেন। ৮ হাজার টাকা তখন তুলনামূলকভাবে ‘কম’ মনে হবে। এটাই প্রাইস অ্যাংকরিংয়ের বেসিক ধারণা। মানুষ সাধারণত দামকে অ্যাবসলিউট হিসেবে বিচার করে না, তুলনা করে।

তাই দামের ক্ষেত্রে আড়ংয়ের প্রিমিয়াম রেঞ্জ শুধু ওই এক্সপেনসিভ প্রোডাক্ট বিক্রির জন্য নয়। এটি অন্য প্রোডাক্টের প্রাইস পারসেপশন বদলে দেয়। ফলে, শৌখিন বা বিলাসী মানুষ এক্সপেনসিভ প্রোডাক্ট কিনছেন। অন্যদিকে সাধারণ ক্রেতা একই জায়গায় দাঁড়িয়ে তুলনা করে কম দামের প্রোডাক্টটি বেছে নিচ্ছেন।

প্রোডাক্ট নয় বিক্রি হচ্ছে কালচার

সহজভাবে বললে, আপনার ব্র্যান্ডকে কাস্টমারের মাথার কোন জায়গায় বসাতে চান, সেটাই ব্র্যান্ড পজিশনিং। কেউ সাশ্রয়ী হতে চায়। কেউ লাক্সারি। কেউ হয়তো এমন একটা ধারণা দিতে চায় যে তার পণ্য অনেক বেশি টেকসই।

আড়ং নিজের জন্য এমন একটি জায়গা তৈরি করেছে, যা বাংলাদেশের ঐতিহ্যকে বোঝায়। এর সঙ্গে যুক্ত করেছে প্রিমিয়াম শপিং এক্সপেরিয়েন্স।

নকশিকাঁথা গ্রামের কারিগরের কাছেও পাওয়া যায়, জামদানি অন্য দোকানেও পাওয়া যায়। কিন্তু আড়ং একই ধরনের পণ্যের সঙ্গে যোগ করেছে একটি প্রিমিয়াম শপিং এক্সপেরিয়েন্স। আর কাস্টমার সেই প্রিমিয়াম এক্সপেরিয়েন্সটাও পেতে চান। এটাই আড়ংয়ের ব্র্যান্ড পজিশনিং।

কমিশন যেভাবে লাভের খাতায়

বিজনেসের ভাষায় ‘মোট’ মানে এমন একটি সুবিধা, যা কম্পিটিটর সহজে নকল করতে পারে না। বিজনেসের আইডিয়া কপি করা যায়। লোগো কপি করা যায়। একই ধরনের পোশাকও বানানো যায়। কিন্তু আড়ংয়ের কয়েক দশকে তৈরি হাজার হাজার মানুষের নেটওয়ার্ক কপি করা কঠিন।

ফলে আড়ং কোনো ডিলার পয়েন্ট, ডিস্ট্রিবিউটর বা হোলসেলারের ওপর নির্ভর না করেই এই সুবিশাল বিজনেস চেইন মেইনটেইন করতে পারছে। এতে করে ২০–৩০ শতাংশ কমিশনের পুরোটাই আড়ংয়ের লাভের খাতায় জমা হচ্ছে।

কাস্টমারকে ফিরিয়ে আনার টেকনিক

আড়ং তাদের সব গ্রাহকের তথ্য সংরক্ষণ করে। তারা জানে কোন কাস্টমার কী ধরনের প্রোডাক্ট কিনেছেন, কোন ফ্রিকোয়েন্সিতে কেনাকাটা করেন, তাঁদের বাজেট রেঞ্জ কেমন। বছরের কোন সময়ে কোন ধরনের প্রোডাক্টের চাহিদা বেশি বা কম থাকে, সেটিও এই তথ্য থেকে বোঝা যায়।

এই তথ্য ব্যবহার করেই আড়ং তার কাস্টমারদের কাছে পার্সোনালাইজড অফার পাঠায়। এভাবেই ধীরে ধীরে তারা লয়্যাল কাস্টমারের ডেটাবেজ বড় করে। লয়্যালিটি প্রোগ্রাম শুধু কাস্টমারকে ডিসকাউন্ট অফার করা নয়। এটি কাস্টমারের মধ্যে একটি কেনাকাটার অভ্যাস তৈরি করে। যেন ‘কোথা থেকে কিনব?’, এই প্রশ্ন ওঠার আগেই কাস্টমারের মাথায় অটোমেটিক্যালি ব্র্যান্ডের নাম চলে আসে।

কাপড়ের সঙ্গে বিক্রি হয় গল্পও

কাস্টমার সবসময় শুধু প্রোডাক্ট কেনেন না। তাঁরা প্রোডাক্টের পেছনের গল্পও কেনেন। কেনার পর সেই গল্প অন্যদের বলতে পছন্দ করেন।

আড়ং প্রচার করে, দেশি কারিগরের হাতে তৈরি। নারীর কর্মসংস্থান সৃষ্টি। গ্রামীণ শিল্প। দেশীয় ঐতিহ্য। ফলে আপনি যখন একটি হ্যান্ডমেড ব্যাগ বা শাড়ি কিনছেন, আপনার মনে হতে পারে, আপনি শুধু একটি প্রোডাক্ট কিনছেন না; ঐতিহ্যের একটি অংশ কিনছেন। এই ইমোশনাল স্টোরি ক্রেতার সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করে। একই ধরনের একটি ব্যাগ অন্য দোকানে কম দামে পাওয়া গেলেও কাস্টমার বলতে পছন্দ করেন, ‘এটা কিন্তু আড়ংয়ের।’

সব মিলিয়ে আড়ংয়ের বিজনেস মডেলকে বলা যায় ডেটা-বেইজড হার্ডকোর ম্যাথমেটিকস। কাস্টমার হয়তো আড়ংয়ে শপিং করতে যান দেশীয় আবেগের টানে। কিন্তু কোন প্রোডাক্ট দেখবেন, কোনটির সঙ্গে কোনটি মিলিয়ে দেখবেন, কোনটি কিনবেন এবং আবার কেন ফিরে আসবেন, এই পুরো জার্নিটাই একটি সিস্টেমেটিক, ডেটা-নির্ভর ক্যালকুলেশনের অংশ। অন্যদের থেকে এখানেই আড়ং আলাদা। তারা ঐতিহ্যকে একটি স্কেলেবল রিটেইল জায়ান্টে পরিণত করেছে।

Ad 300x250
লেটেস্ট
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত

আড়ংয়ের বিশাল সাম্রাজ্যের নেপথ্যে কী