এস এম মিনহাজুর রহমান

২০২৬ সালের মে মাসেই প্রায় ৮ হাজার কর্মী ছাঁটাই করেছিল মেটা। গত দুই বছরে গুগলও ছাঁটাই করেছে প্রায় ১২ হাজার কর্মী। তাহলে কী এমন বদলে গেল যে এখন মেটা, গুগল, ব্ল্যাকরকের মতো প্রতিষ্ঠানগুলোই ২৬৫ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করছে শুধু টেকনিশিয়ান আর দক্ষ শ্রমিক তৈরির জন্য?
মজার বিষয় হলো, এই সুযোগ পেতে উচ্চশিক্ষা বা আগের কাজের অভিজ্ঞতা বাধ্যতামূলক নয়। প্রশিক্ষণ হবে বিনা খরচে। থাকা-খাওয়া, যাতায়াত, বিমানভাড়া দেবে প্রতিষ্ঠানগুলো। এমনকি প্রশিক্ষণের সময় দৈনিক ভাতাও দেওয়া হবে।
এআই বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কথা শুনলেই আমাদের চোখে ভেসে ওঠে অত্যাধুনিক কম্পিউটার, গ্রাফিকস প্রসেসিং ইউনিট বা জিপিইউ, জটিল অ্যালগরিদম আর সফ্টওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারদের ছবি। কিন্তু একটি এআই মডেল যত শক্তিশালীই হোক, তাকে চালানোর ডেটা সেন্টারটি কিন্তু নিজে নিজে তৈরি হয় না।
ডেটা সেন্টার তৈরি করতে লাগে অবকাঠামো তৈরি, মাটি বা সমুদ্রের নিচে হাজার হাজার মিটার বিদ্যুৎ ও ফাইবার অপটিক্যাল ক্যাবল নেটওয়ার্ক বসানো, কুলিং পাইপ ও অগ্নিরোধক ব্যবস্থা, সার্ভার র্যাক স্থাপনসহ আরও অনেক কাজ। আর এসবের জন্য প্রয়োজন দক্ষ ইলেকট্রিশিয়ান, ওয়েল্ডার, প্লাম্বার, কাঠমিস্ত্রি, মেকানিক ও ফাইবার টেকনিশিয়ানদের।
এ কারণেই এআইয়ের এই যুগে বিশ্বের বড় প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো এখন নতুন ধরনের কর্মী খুঁজছে। তাদের সবচেয়ে বেশি দরকার এমন মানুষ, যারা হাতে-কলমে কাজ করতে পারে এবং বাস্তবে এই বিশাল অবকাঠামো গড়ে তুলতে সক্ষম।
একদিকে ২০২৬ সালের মে মাসে প্রায় ৮ হাজার কর্মী ছাঁটাই করেছে মেটা। অন্যদিকে একই প্রতিষ্ঠান দক্ষ কারিগর তৈরিতে প্রথম বছরেই বিনিয়োগ করছে ১১৫ মিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ প্রযুক্তি খাতের চাকরির বাজার দ্রুত বদলে যাচ্ছে।
মেটার এই নতুন কর্মসূচির নাম আমেরিকার’স ওয়ার্কফোর্স একাডেমি। যুক্তরাষ্ট্রের লুইজিয়ানা, ওহাইও, ইন্ডিয়ানা ও টেক্সাসে শুরু হতে যাচ্ছে প্রশিক্ষণ। পাঁচ সপ্তাহের প্রশিক্ষণে অংশ নিতে উচ্চশিক্ষা বা আগের কাজের অভিজ্ঞতা বাধ্যতামূলক নয়। প্রশিক্ষণের পুরো খরচ বহন করবে মেটা। যাতায়াত, বিমানভাড়া, থাকা-খাওয়া, এমনকি দৈনিক ভাতাও দেওয়া হবে। প্রশিক্ষণ শেষে যোগ্যদের জন্য মেটার ডেটা সেন্টারে চাকরির সুযোগও থাকবে।
এই ধরনের প্রশিক্ষণের প্রতি আগ্রহ কতটা, তার প্রমাণ মিলেছে মেটার আগের ‘লেভেল-আপ’ কর্মসূচিতে। মাত্র এক হাজার ফাইবার টেকনিশিয়ান প্রশিক্ষণের জন্য প্রথম সাত দিনেই আবেদন জমা পড়ে ৩৫ হাজার।
শুধু মেটাই নয়, দক্ষ কারিগর তৈরির কর্মসূচিতে ৫০ মিলিয়ন ডলার দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে গুগল। যুক্তরাষ্ট্রের ২০টির বেশি অঙ্গরাজ্যে, ১৪টি শ্রমিক ইউনিয়ন এবং চারটি ট্রেড ও কনট্রাক্টর সংগঠনের মাধ্যমে তিন লাখের বেশি কর্মীকে প্রস্তুত করার লক্ষ্য তাদের। এই কর্মসূচির আওতায় ওয়েল্ডার, প্লাম্বার, পাইপফিটার, শিট মেটাল কর্মী, কুলিং ও হিটিং (এইচভিএসি) টেকনিশিয়ানসহ বিভিন্ন কারিগরি পেশার মানুষ তৈরি করা হবে।
বিশ্বের বৃহত্তম সম্পদ ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠান ব্ল্যাকরক ফাউন্ডেশনও ঘোষণা করেছে ১০০ মিলিয়ন ডলারের কর্মসূচি। আগামী পাঁচ বছরে ৫০ হাজার মানুষকে ইলেকট্রিক্যাল, প্লাম্বিং, এইচভিএসি, আয়রন ওয়ার্কসহ বিভিন্ন কারিগরি পেশায় প্রশিক্ষণ ও লাইসেন্স পেতে সহায়তা করবে প্রতিষ্ঠানটি।
তিন প্রতিষ্ঠানের ঘোষিত বিনিয়োগ মিলিয়ে দাঁড়ায় ২৬৫ মিলিয়ন ডলার। বাংলাদেশ ব্যাংকের ২০২৬ সালের ৩০ জুলাইয়ের রেফারেন্স রেট অনুযায়ী, এর পরিমাণ প্রায় ৩ হাজার ২৮৩ কোটি টাকা।
তবে এই অর্থ সামাজিক দায়বদ্ধতা বা বেকারদের সহায়তার জন্য ব্যয় করা হচ্ছে না। এর মূল কারণ, এআইনির্ভর প্রযুক্তি অবকাঠামো গড়ে তুলতে প্রয়োজনীয় দক্ষ কারিগরের তীব্র সংকট। সেই সংকট মেটাতেই এখন নিজেরাই কর্মী তৈরি করতে নেমেছে বিশ্বের সবচেয়ে বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো।
২০২৫ সালের অক্টোবরে হোয়াইট হাউসের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি নীতি দপ্তরে পাঠানো এক চিঠিতে ওপেনএআই জানিয়েছিল, আগামী পাঁচ বছরে তাদের এআই অবকাঠামো নির্মাণে যুক্তরাষ্ট্রে কর্মরত বিশেষায়িত ইলেকট্রিশিয়ান ও মেকানিকদের প্রায় ২০ শতাংশ প্রয়োজন হবে। সহজ করে বললে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি পাঁচজন দক্ষ কারিগরের একজন শুধু ওপেনএআই-এর প্রকল্পগুলোতেই লাগতে পারে।
মেটাও জানিয়েছে, তাদের ডেটা সেন্টার নির্মাণ ও সংস্কারের কাজে ইতিমধ্যে ৩০ হাজারের বেশি দক্ষ কারিগর কাজ করছেন। এই চাহিদা এমন সময়ে বাড়ছে, যখন যুক্তরাষ্ট্রের নির্মাণশ্রমিকদের একটি বড় অংশ অবসরের কাছাকাছি চলে গেছেন। যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল সেন্টার ফর কনস্ট্রাকশন এডুকেশন অ্যান্ড রিসার্চের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০৩১ সালের মধ্যে দেশটির বর্তমান নির্মাণশ্রমিকদের প্রায় ৪১ শতাংশ অবসরে যেতে পারেন। বর্তমানে দেশটিতে প্রায় প্রতি পাঁচজন ইলেকট্রিশিয়ানের একজনের বয়স ৫৫ বছর বা তার বেশি।
ফলে এআই খাত এখন দুই ধরনের সংকটের মুখে। একদিকে বিপুল পরিমাণ বিদ্যুৎ উৎপাদন ও সরবরাহের ব্যবস্থা করতে হবে। অন্যদিকে সেই বিদ্যুৎকেন্দ্র, গ্রিড, সাবস্টেশন, ডেটা সেন্টার এবং কুলিং ব্যবস্থা তৈরি করার জন্য দরকার হাজার হাজার দক্ষ কারিগর। চিপ দিয়ে হয়তো মেশিনের গতিতে গাণিতিক হিসাব মেলানো যায় ন্যানো সেকেন্ডেরও কম সময়ে, কিন্তু একজন অভিজ্ঞ ওয়েল্ডার বা টেকনিশিয়ান রাতারাতি তৈরি করা যায় না।
২৬৫ মিলিয়ন ডলার শুনতে বিশাল অঙ্ক মনে হলেও, এআই অবকাঠামোয় প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর মোট বিনিয়োগের তুলনায় এটি খুবই ছোট। মেটা জানিয়েছে, ২০২৬ সালে তাদের মূলধনি ব্যয় হতে পারে ১৩০ থেকে ১৪৫ বিলিয়ন ডলার। গুগল একই বছরের জন্য ১৯৫ থেকে ২০৫ বিলিয়ন ডলারের মূলধনি ব্যয়ের ঘোষণা দিয়েছে। শুধু এই দুই প্রতিষ্ঠানের পূর্বাভাসের মধ্যবর্তী অঙ্ক যোগ করলেই দাঁড়ায় প্রায় ৩৩৭ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার।
সেই তুলনায় মেটা, গুগল ও ব্ল্যাকরকের কারিগরি প্রশিক্ষণে ঘোষিত ২৬৫ মিলিয়ন ডলারের বাজেট তাদের সম্মিলিত বার্ষিক মূলধনি ব্যয়ের মাত্র শূন্য দশমিক ০৮ শতাংশ। আরও মজার করে বললে, মেটা ও গুগল যদি সারা বছর সমান গতিতে অর্থ ব্যয় করে, তাহলে তাদের এক বছরের বাজেটের সমপরিমাণ অর্থের মধ্যে এই ২৬৫ মিলিয়ন ডলার খরচ হয়ে যাবে সাত ঘণ্টারও কম সময়ে।
মেটার একজন মুখপাত্র জানিয়েছেন, আবেদনকারীকে ভিসা স্পনসরশিপ ছাড়াই যুক্তরাষ্ট্রে বৈধভাবে কাজ করার যোগ্য হতে হবে। অর্থাৎ প্রতিষ্ঠানটি সরাসরি কাজের ভিসা দেবে না। শেষ পর্যন্ত নিয়োগের শর্ত ঠিক করবে সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান।
তারপরও এই পরিবর্তন বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, বিদেশে যাওয়া বাংলাদেশি কর্মীদের বড় একটি অংশ নির্মাণ, ইলেকট্রিক্যাল, ওয়েল্ডিং, প্লাম্বিং, ড্রাইভিংসহ বিভিন্ন কারিগরি পেশায় কাজ করেন। ২০২৬ সালে জাতীয় সংসদে জানানো হয়েছে, কাতার বাংলাদেশের পাঁচটি নির্দিষ্ট কারিগরি প্রশিক্ষণকেন্দ্র থেকে ইলেকট্রিশিয়ান, প্লাম্বার, এসি টেকনিশিয়ান ও ওয়েল্ডার নেওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেছে।
বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে অভিবাসী কর্মীদের জন্য আন্তর্জাতিক সনদভিত্তিক প্রশিক্ষণ বাড়ানোর কথা বলা হয়েছে। লক্ষ্য হলো বিদেশে ভালো চাকরি ও বেশি মজুরি পাওয়ার সুযোগ তৈরি করা। কিন্তু শুধু তিন বা ছয় মাসের একটি কোর্স করিয়ে সার্টিফিকেট দিয়ে দিলেই হবে না। প্রশিক্ষণকে টার্গেট দেশের লাইসেন্সিং ব্যবস্থা, নিরাপত্তার মান ও কাজের রিয়েল-টাইম চাহিদার সঙ্গে মিলিয়েও সাজাতে হবে।
বাংলাদেশ যদি আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সনদ, ভাষা শিক্ষা, বিদেশি নিয়োগদাতাদের সঙ্গে সরাসরি সংযোগ এবং দক্ষতা যাচাইয়ের পরীক্ষায় ভালো করতে পারে, তাহলে একই কর্মী ‘সাধারণ শ্রমিক’ হিসেবে নয় বরং দক্ষ টেকনিশিয়ান হিসেবেই বিদেশে যেতে পারবেন। মজুরির পার্থক্যটিও তখন উল্লেখযোগ্য হারে বাড়বে।
দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের সমাজ ব্যবস্থায় কারিগরি কাজকে পড়াশোনায় ‘ব্যর্থ মানুষের গন্তব্য’ হিসেবে দেখা হয়েছে। ২০২৬ সালে এসে বিশ্বের সবচেয়ে বড় প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো ব্যর্থ মানুষদের জন্য বিমানভাড়া দিচ্ছে, থাকার ব্যবস্থা করছে, প্রশিক্ষণের সময় ভাতা দিচ্ছে এবং দিচ্ছে চাকরির নিশ্চয়তাও।
এর মানে এই নয় যে বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রির গুরুত্ব শেষ হয়ে গেছে। কিন্তু শ্রমবাজার নতুন করে আমাদের মনে করিয়ে দিচ্ছে, কারিগরি দক্ষতার মূল্য ডিগ্রির চেয়েও বেশি হতে পারে। বিশেষ করে সেই কাজে যেখানে শারীরিক সক্ষমতা, দক্ষতা, এবং সমস্যা সমাধানের প্রয়োজন হয়।
এআই হয়তো আগামী দিনে আরও অনেক অফিসের কাজ স্বয়ংক্রিয় করে দেবে। কিন্তু যে বিদ্যুৎ দিয়ে এআই চলে, যে ডেটা সেন্টারে তার সার্ভার বসানো হয়, যে ফাইবার অপটিক কেবল দিয়ে তথ্য ছুটে যায়, সেগুলো এখনো মানুষকেই তৈরি করতে হয়। তাই এই সময়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, এআই যে নতুন পৃথিবীর সূচনা করেছে, সেই পৃথিবী তৈরির দক্ষতা আমাদের আছে তো?
তথ্যসূত্র: এফবিডটকম, গুগল ব্লগ, ব্ল্যাকরক, ওপেনএআই সিডিএন, বাংলাদেশ ব্যাংকের ওয়েবসাইট

২০২৬ সালের মে মাসেই প্রায় ৮ হাজার কর্মী ছাঁটাই করেছিল মেটা। গত দুই বছরে গুগলও ছাঁটাই করেছে প্রায় ১২ হাজার কর্মী। তাহলে কী এমন বদলে গেল যে এখন মেটা, গুগল, ব্ল্যাকরকের মতো প্রতিষ্ঠানগুলোই ২৬৫ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করছে শুধু টেকনিশিয়ান আর দক্ষ শ্রমিক তৈরির জন্য?
মজার বিষয় হলো, এই সুযোগ পেতে উচ্চশিক্ষা বা আগের কাজের অভিজ্ঞতা বাধ্যতামূলক নয়। প্রশিক্ষণ হবে বিনা খরচে। থাকা-খাওয়া, যাতায়াত, বিমানভাড়া দেবে প্রতিষ্ঠানগুলো। এমনকি প্রশিক্ষণের সময় দৈনিক ভাতাও দেওয়া হবে।
এআই বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কথা শুনলেই আমাদের চোখে ভেসে ওঠে অত্যাধুনিক কম্পিউটার, গ্রাফিকস প্রসেসিং ইউনিট বা জিপিইউ, জটিল অ্যালগরিদম আর সফ্টওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারদের ছবি। কিন্তু একটি এআই মডেল যত শক্তিশালীই হোক, তাকে চালানোর ডেটা সেন্টারটি কিন্তু নিজে নিজে তৈরি হয় না।
ডেটা সেন্টার তৈরি করতে লাগে অবকাঠামো তৈরি, মাটি বা সমুদ্রের নিচে হাজার হাজার মিটার বিদ্যুৎ ও ফাইবার অপটিক্যাল ক্যাবল নেটওয়ার্ক বসানো, কুলিং পাইপ ও অগ্নিরোধক ব্যবস্থা, সার্ভার র্যাক স্থাপনসহ আরও অনেক কাজ। আর এসবের জন্য প্রয়োজন দক্ষ ইলেকট্রিশিয়ান, ওয়েল্ডার, প্লাম্বার, কাঠমিস্ত্রি, মেকানিক ও ফাইবার টেকনিশিয়ানদের।
এ কারণেই এআইয়ের এই যুগে বিশ্বের বড় প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো এখন নতুন ধরনের কর্মী খুঁজছে। তাদের সবচেয়ে বেশি দরকার এমন মানুষ, যারা হাতে-কলমে কাজ করতে পারে এবং বাস্তবে এই বিশাল অবকাঠামো গড়ে তুলতে সক্ষম।
একদিকে ২০২৬ সালের মে মাসে প্রায় ৮ হাজার কর্মী ছাঁটাই করেছে মেটা। অন্যদিকে একই প্রতিষ্ঠান দক্ষ কারিগর তৈরিতে প্রথম বছরেই বিনিয়োগ করছে ১১৫ মিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ প্রযুক্তি খাতের চাকরির বাজার দ্রুত বদলে যাচ্ছে।
মেটার এই নতুন কর্মসূচির নাম আমেরিকার’স ওয়ার্কফোর্স একাডেমি। যুক্তরাষ্ট্রের লুইজিয়ানা, ওহাইও, ইন্ডিয়ানা ও টেক্সাসে শুরু হতে যাচ্ছে প্রশিক্ষণ। পাঁচ সপ্তাহের প্রশিক্ষণে অংশ নিতে উচ্চশিক্ষা বা আগের কাজের অভিজ্ঞতা বাধ্যতামূলক নয়। প্রশিক্ষণের পুরো খরচ বহন করবে মেটা। যাতায়াত, বিমানভাড়া, থাকা-খাওয়া, এমনকি দৈনিক ভাতাও দেওয়া হবে। প্রশিক্ষণ শেষে যোগ্যদের জন্য মেটার ডেটা সেন্টারে চাকরির সুযোগও থাকবে।
এই ধরনের প্রশিক্ষণের প্রতি আগ্রহ কতটা, তার প্রমাণ মিলেছে মেটার আগের ‘লেভেল-আপ’ কর্মসূচিতে। মাত্র এক হাজার ফাইবার টেকনিশিয়ান প্রশিক্ষণের জন্য প্রথম সাত দিনেই আবেদন জমা পড়ে ৩৫ হাজার।
শুধু মেটাই নয়, দক্ষ কারিগর তৈরির কর্মসূচিতে ৫০ মিলিয়ন ডলার দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে গুগল। যুক্তরাষ্ট্রের ২০টির বেশি অঙ্গরাজ্যে, ১৪টি শ্রমিক ইউনিয়ন এবং চারটি ট্রেড ও কনট্রাক্টর সংগঠনের মাধ্যমে তিন লাখের বেশি কর্মীকে প্রস্তুত করার লক্ষ্য তাদের। এই কর্মসূচির আওতায় ওয়েল্ডার, প্লাম্বার, পাইপফিটার, শিট মেটাল কর্মী, কুলিং ও হিটিং (এইচভিএসি) টেকনিশিয়ানসহ বিভিন্ন কারিগরি পেশার মানুষ তৈরি করা হবে।
বিশ্বের বৃহত্তম সম্পদ ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠান ব্ল্যাকরক ফাউন্ডেশনও ঘোষণা করেছে ১০০ মিলিয়ন ডলারের কর্মসূচি। আগামী পাঁচ বছরে ৫০ হাজার মানুষকে ইলেকট্রিক্যাল, প্লাম্বিং, এইচভিএসি, আয়রন ওয়ার্কসহ বিভিন্ন কারিগরি পেশায় প্রশিক্ষণ ও লাইসেন্স পেতে সহায়তা করবে প্রতিষ্ঠানটি।
তিন প্রতিষ্ঠানের ঘোষিত বিনিয়োগ মিলিয়ে দাঁড়ায় ২৬৫ মিলিয়ন ডলার। বাংলাদেশ ব্যাংকের ২০২৬ সালের ৩০ জুলাইয়ের রেফারেন্স রেট অনুযায়ী, এর পরিমাণ প্রায় ৩ হাজার ২৮৩ কোটি টাকা।
তবে এই অর্থ সামাজিক দায়বদ্ধতা বা বেকারদের সহায়তার জন্য ব্যয় করা হচ্ছে না। এর মূল কারণ, এআইনির্ভর প্রযুক্তি অবকাঠামো গড়ে তুলতে প্রয়োজনীয় দক্ষ কারিগরের তীব্র সংকট। সেই সংকট মেটাতেই এখন নিজেরাই কর্মী তৈরি করতে নেমেছে বিশ্বের সবচেয়ে বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো।
২০২৫ সালের অক্টোবরে হোয়াইট হাউসের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি নীতি দপ্তরে পাঠানো এক চিঠিতে ওপেনএআই জানিয়েছিল, আগামী পাঁচ বছরে তাদের এআই অবকাঠামো নির্মাণে যুক্তরাষ্ট্রে কর্মরত বিশেষায়িত ইলেকট্রিশিয়ান ও মেকানিকদের প্রায় ২০ শতাংশ প্রয়োজন হবে। সহজ করে বললে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি পাঁচজন দক্ষ কারিগরের একজন শুধু ওপেনএআই-এর প্রকল্পগুলোতেই লাগতে পারে।
মেটাও জানিয়েছে, তাদের ডেটা সেন্টার নির্মাণ ও সংস্কারের কাজে ইতিমধ্যে ৩০ হাজারের বেশি দক্ষ কারিগর কাজ করছেন। এই চাহিদা এমন সময়ে বাড়ছে, যখন যুক্তরাষ্ট্রের নির্মাণশ্রমিকদের একটি বড় অংশ অবসরের কাছাকাছি চলে গেছেন। যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল সেন্টার ফর কনস্ট্রাকশন এডুকেশন অ্যান্ড রিসার্চের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০৩১ সালের মধ্যে দেশটির বর্তমান নির্মাণশ্রমিকদের প্রায় ৪১ শতাংশ অবসরে যেতে পারেন। বর্তমানে দেশটিতে প্রায় প্রতি পাঁচজন ইলেকট্রিশিয়ানের একজনের বয়স ৫৫ বছর বা তার বেশি।
ফলে এআই খাত এখন দুই ধরনের সংকটের মুখে। একদিকে বিপুল পরিমাণ বিদ্যুৎ উৎপাদন ও সরবরাহের ব্যবস্থা করতে হবে। অন্যদিকে সেই বিদ্যুৎকেন্দ্র, গ্রিড, সাবস্টেশন, ডেটা সেন্টার এবং কুলিং ব্যবস্থা তৈরি করার জন্য দরকার হাজার হাজার দক্ষ কারিগর। চিপ দিয়ে হয়তো মেশিনের গতিতে গাণিতিক হিসাব মেলানো যায় ন্যানো সেকেন্ডেরও কম সময়ে, কিন্তু একজন অভিজ্ঞ ওয়েল্ডার বা টেকনিশিয়ান রাতারাতি তৈরি করা যায় না।
২৬৫ মিলিয়ন ডলার শুনতে বিশাল অঙ্ক মনে হলেও, এআই অবকাঠামোয় প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর মোট বিনিয়োগের তুলনায় এটি খুবই ছোট। মেটা জানিয়েছে, ২০২৬ সালে তাদের মূলধনি ব্যয় হতে পারে ১৩০ থেকে ১৪৫ বিলিয়ন ডলার। গুগল একই বছরের জন্য ১৯৫ থেকে ২০৫ বিলিয়ন ডলারের মূলধনি ব্যয়ের ঘোষণা দিয়েছে। শুধু এই দুই প্রতিষ্ঠানের পূর্বাভাসের মধ্যবর্তী অঙ্ক যোগ করলেই দাঁড়ায় প্রায় ৩৩৭ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার।
সেই তুলনায় মেটা, গুগল ও ব্ল্যাকরকের কারিগরি প্রশিক্ষণে ঘোষিত ২৬৫ মিলিয়ন ডলারের বাজেট তাদের সম্মিলিত বার্ষিক মূলধনি ব্যয়ের মাত্র শূন্য দশমিক ০৮ শতাংশ। আরও মজার করে বললে, মেটা ও গুগল যদি সারা বছর সমান গতিতে অর্থ ব্যয় করে, তাহলে তাদের এক বছরের বাজেটের সমপরিমাণ অর্থের মধ্যে এই ২৬৫ মিলিয়ন ডলার খরচ হয়ে যাবে সাত ঘণ্টারও কম সময়ে।
মেটার একজন মুখপাত্র জানিয়েছেন, আবেদনকারীকে ভিসা স্পনসরশিপ ছাড়াই যুক্তরাষ্ট্রে বৈধভাবে কাজ করার যোগ্য হতে হবে। অর্থাৎ প্রতিষ্ঠানটি সরাসরি কাজের ভিসা দেবে না। শেষ পর্যন্ত নিয়োগের শর্ত ঠিক করবে সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান।
তারপরও এই পরিবর্তন বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, বিদেশে যাওয়া বাংলাদেশি কর্মীদের বড় একটি অংশ নির্মাণ, ইলেকট্রিক্যাল, ওয়েল্ডিং, প্লাম্বিং, ড্রাইভিংসহ বিভিন্ন কারিগরি পেশায় কাজ করেন। ২০২৬ সালে জাতীয় সংসদে জানানো হয়েছে, কাতার বাংলাদেশের পাঁচটি নির্দিষ্ট কারিগরি প্রশিক্ষণকেন্দ্র থেকে ইলেকট্রিশিয়ান, প্লাম্বার, এসি টেকনিশিয়ান ও ওয়েল্ডার নেওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেছে।
বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে অভিবাসী কর্মীদের জন্য আন্তর্জাতিক সনদভিত্তিক প্রশিক্ষণ বাড়ানোর কথা বলা হয়েছে। লক্ষ্য হলো বিদেশে ভালো চাকরি ও বেশি মজুরি পাওয়ার সুযোগ তৈরি করা। কিন্তু শুধু তিন বা ছয় মাসের একটি কোর্স করিয়ে সার্টিফিকেট দিয়ে দিলেই হবে না। প্রশিক্ষণকে টার্গেট দেশের লাইসেন্সিং ব্যবস্থা, নিরাপত্তার মান ও কাজের রিয়েল-টাইম চাহিদার সঙ্গে মিলিয়েও সাজাতে হবে।
বাংলাদেশ যদি আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সনদ, ভাষা শিক্ষা, বিদেশি নিয়োগদাতাদের সঙ্গে সরাসরি সংযোগ এবং দক্ষতা যাচাইয়ের পরীক্ষায় ভালো করতে পারে, তাহলে একই কর্মী ‘সাধারণ শ্রমিক’ হিসেবে নয় বরং দক্ষ টেকনিশিয়ান হিসেবেই বিদেশে যেতে পারবেন। মজুরির পার্থক্যটিও তখন উল্লেখযোগ্য হারে বাড়বে।
দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের সমাজ ব্যবস্থায় কারিগরি কাজকে পড়াশোনায় ‘ব্যর্থ মানুষের গন্তব্য’ হিসেবে দেখা হয়েছে। ২০২৬ সালে এসে বিশ্বের সবচেয়ে বড় প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো ব্যর্থ মানুষদের জন্য বিমানভাড়া দিচ্ছে, থাকার ব্যবস্থা করছে, প্রশিক্ষণের সময় ভাতা দিচ্ছে এবং দিচ্ছে চাকরির নিশ্চয়তাও।
এর মানে এই নয় যে বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রির গুরুত্ব শেষ হয়ে গেছে। কিন্তু শ্রমবাজার নতুন করে আমাদের মনে করিয়ে দিচ্ছে, কারিগরি দক্ষতার মূল্য ডিগ্রির চেয়েও বেশি হতে পারে। বিশেষ করে সেই কাজে যেখানে শারীরিক সক্ষমতা, দক্ষতা, এবং সমস্যা সমাধানের প্রয়োজন হয়।
এআই হয়তো আগামী দিনে আরও অনেক অফিসের কাজ স্বয়ংক্রিয় করে দেবে। কিন্তু যে বিদ্যুৎ দিয়ে এআই চলে, যে ডেটা সেন্টারে তার সার্ভার বসানো হয়, যে ফাইবার অপটিক কেবল দিয়ে তথ্য ছুটে যায়, সেগুলো এখনো মানুষকেই তৈরি করতে হয়। তাই এই সময়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, এআই যে নতুন পৃথিবীর সূচনা করেছে, সেই পৃথিবী তৈরির দক্ষতা আমাদের আছে তো?
তথ্যসূত্র: এফবিডটকম, গুগল ব্লগ, ব্ল্যাকরক, ওপেনএআই সিডিএন, বাংলাদেশ ব্যাংকের ওয়েবসাইট
.png)

১৯৯৫ সালে অ্যামাজন প্রথম যে পণ্যটি বিক্রি করেছিল, সেটি ছিল ডগলাস হফস্ট্যাডারের লেখা বই ‘ফ্লুইড কনসেপ্টস অ্যান্ড ক্রিয়েটিভ’। তিন দশক পর সেই অনলাইন বইয়ের দোকানটির বাজারমূল্য ৩ ট্রিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে। ২০২৬ সালের দ্বিতীয় প্রান্তিকে মাত্র তিন মাসেই প্রতিষ্ঠানটি বিক্রি করেছে ২০০ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলারের পণ্য
১ ঘণ্টা আগে
হুমায়ুন আজাদের বহুল আলোচিত এই উক্তিগুলো পাওয়া যায় ‘হুমায়ুন আজাদের প্রবচনগুচ্ছ’ বইয়ে। কিন্তু বইটি কেবল এমন কিছু আপাত-নিরীহ অথচ গভীর সত্য উচ্চারণে ভরা—এমনটা ভাবলে ভুল হবে। বইয়ের পাঁচ নম্বর প্রবচনেই পাঠক থমকে যেতে পারেন। সেখানে লেখা, ‘শামসুর রাহমানকে একটি অভিনেত্রীর সাথে টিভিতে দেখা গেছে।
৫ ঘণ্টা আগে
হোমারের লেখা মহাকাব্য ‘ওডিসি’র প্রধান চরিত্র ওডিসিউস বাড়ি ফেরার পর তার বিশ্বস্ত কুকুর আর্গোস তাকে চিনতে পারে। তাদের পুনর্মিলনের এই আবেগঘন দৃশ্যটি বর্ণনা করতে হোমার ব্যবহার করেছেন মাত্র প্রায় ৪০টি লাইন। অথচ এটি পুরো মহাকাব্যের অন্যতম আবেগঘন ঘটনা। মহাকাব্যের এই দৃশ্যটি পর্দায় নতুন করে তুলে ধরেছেন
১১ আগস্ট ২০২৬
পৃথিবীর সবচেয়ে পরিচিত বন্য প্রাণীগুলোর একটি সিংহ। ছোটবেলা থেকেই গল্প, সিনেমা আর ছবিতে আমরা তাকে দেখে এসেছি বনের রাজা হিসেবে। তার গর্জন, কেশর আর রাজকীয় উপস্থিতি যেন আলাদা পরিচয় তৈরি করেছে। ‘বনের রাজা’কে বিশ্ব সিংহ দিবসের পরের দিন একটু অন্যভাবে চেনা যাক।
১১ আগস্ট ২০২৬