leadT1ad

শত বছর আগে বৃহত্তর ফরিদপুর অঞ্চলের বন্যপ্রাণী ও মাছ

জেনে অবাক হবেন যে শত বছর আগে বৃহত্তর ফরিদপুর অঞ্চলে বন্যপ্রাণী বাস করত। কোন কোন বন্যপ্রাণী সেখানে ছিল? নদী, জলাভূমি ও পুকুরে কী কী মাছ পাওয়া যেত? ১৯২৫ সালে প্রকাশিত এল এস এস ওম্যালি-এর বেঙ্গল ডিস্ট্রিক্ট গেজেটিয়ার (ফরিদপুর) থেকে অনুবাদ করেছেন ভূ-পর্যটক তারেক অণু।

প্রকাশ : ১৮ জানুয়ারি ২০২৬, ২০: ৩৩
শত বছর আগে বৃহত্তর ফরিদপুর অঞ্চলের বন্যপ্রাণী ও মাছ। ছবি: স্ট্রিম গ্রাফিক

রেনেলের মানচিত্রে ফরিদপুর জেলার একটি বড় অংশকে দেখানো হয়েছে ‘অভেদ্য জলাভূমি’ হিসেবে। ব্রিটিশ শাসনামলের প্রথম দিকের নথিপত্র থেকেও স্পষ্ট জানা যায় যে জেলার পূর্বদিকে বিস্তীর্ণ জঙ্গল ছিল, যা ছিল বাঘ ও মহিষের আবাসস্থল। ১৭৯২ সালে মাদারীপুরে ১০টি বাঘ হত্যার জন্য পুরস্কার দেওয়া হয়েছিল। এমনকি ১৮৭৫ সালেও স্ট্যাটিস্টিক্যাল অ্যাকাউন্ট অফ বেঙ্গলে উল্লেখ করা হয় যে শীতকালে বন্য মহিষ ছিল প্রচুর।

১৯২৫ সালে এসেও এখনো ফরিদপুর জেলার উত্তর ও পশ্চিমের নানা বনে চিতাবাঘ দেখা যায়। আর কখনো কখনো সুন্দরবন থেকে পথভুলো বাঘ দক্ষিণের জলাভূমিতে এসে আশ্রয় নেয়। বন্য শূকর সংখ্যায় অনেক বেশি আছে এবং তারা ফসলের ব্যাপক ক্ষতি করে, বিশেষ করে ফরিদপুর এবং ভূষণা থানাতে (ভূষণা জনপদের কেন্দ্র বর্তমান ফরিদপুর জেলার মধুখালী উপজেলায় অবস্থিত। আর ভূষণা থানার কেন্দ্র বর্তমানে বোয়ালমারী নামে পরিচিত।)

বন্য শূকরের উপদ্রব নতুন কিছু নয়। এখন (১৯২৫ সালের কথা) থেকে ৫০ বছর আগের, অর্থাৎ ১৯৭৫ সালের রিপোর্টে জানা যায় যে তাদের ধ্বংসলীলা থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ না করলে অনেক গ্রামই জঙ্গলে পরিণত হবে। কিছু গ্রামে তাদের তাণ্ডবের কারণে প্রান্তবর্তী জমিগুলো আগেই চাষের বাইরে চলে গিয়েছিল।

জলাভূমিগুলোতে প্রচুর পরিমাণে বুনোহাঁস, রাজহাঁস, তিলি হাঁস, কাদাখোঁচা ইত্যাদির দেখা মেলে। কুমির এবং ঘড়িয়াল, উভয় প্রজাতিই সব বড় নদীতে দেখা যায়।

শত বছর আগে বৃহত্তর ফরিদপুরে কী কী মাছ পাওয়া যেত

বিস্তৃত জলাভূমি থাকায় ফরিদপুর জেলা এখন (১৯২৫ সালের কথা) মাছে ভরপুর। মাছ এখানকার মানুষের খাদ্যতালিকার একটি বড় অংশ জুড়ে আছে। বছরের একটি সময়ে যখন মাছ প্রচুর পাওয়া যায়, তখন দরিদ্র শ্রেণির মানুষ প্রায় পুরোপুরি মাছের ওপরই নির্ভর করে জীবনযাপন করে।

ফরিদপুর জেলাতে পাওয়া যায় এমন একমাত্র সামুদ্রিক মাছের নাম ভেটকি, যা কোরাল নামেও পরিচিত। ইউরোপিয়ানদের কাছে এই মাছের চাহিদা খুব বেশি। ইউরোপিয়ানদের আরো একটি প্রিয় মাছ হচ্ছে ইলিশ, যা মূলত পদ্মায় পাওয়া যায় এবং কলকাতায় রপ্তানির জন্য অন্যতম প্রধান পণ্য।

এছাড়া অন্যান্য জনপ্রিয় মাছের মধ্যে আছে রুই, কালবাউশ এবং কাতলা। প্রায় একই পরিবারের আরেকটি মাছ মৃগেল যা নদীর ও পুকুরের কাদাময় তলদেশে পাওয়া যায় এবং এই মাছে একটু অন্যধরনের গন্ধ আছে।

আঁশবিহীন মাছ বেশ ভালো পরিমাণে পাওয়া যায়। অপেক্ষাকৃত দরিদ্র শ্রেণির মানুষরা এই মাছের ওপরে অনেকটাই নির্ভর করে। এর মধ্যে একটি হলো বোয়াল। এটা খুবই রাক্ষুসে ধরনের মাছ যা অন্যান্য ছোট মাছ খেয়ে ফেলে বিধায় যে সমস্ত পুকুরে মাছের চাষ করা হয়, সেখান থেকে নিয়মিত বোয়াল সরিয়ে ফেলা হয়। বোয়াল স্বাদহীন মাছ। বরং এর চেয়ে পাবদার স্বাদ ভালো। পাতে গোটা মাছ দেওয়ার জন্য খুবই চমৎকার মাছ হিসেবে একে গণ্য করা হয়।

জলাভূমি ও পুকুরের পানিতে মাগুর নামে আরেক ধরনের মাছ পাওয়া যায়, সুস্বাদু হিসেবে যার সুনাম আছে। মাগুরের মতোই দেখতে আরো এক ধরনের মাছ পাওয়া যায় যার নাম শিঙি অর্থাৎ শিংওয়ালা মাছ। আর এই শিং যদি শরীরে লাগে তবে তা থেকে অসহ্য বেদনা হয়।

কই নামের একটি অদ্ভুত মাছ পাওয়া যায়। এর শরীরে থাকা কাঁটা থাকার ফলে কীভাবে যেন ডাঙার ওপর দিয়ে চলতে পারে। সাধারণত এটি জমে থাকা পানিতে পাওয়া যায় এবং স্বাদের জন্য অত্যন্ত সমাদৃত। অসুস্থতা থেকে সেরে ওঠা রোগীদের প্রায়ই এই মাছ খেতে দেওয়া হয়।

নদীতে প্রচুর পরিমাণে গলদা চিংড়ি মেলে এবং বৃষ্টির পরে জলমগ্ন মাঠে বিপুল পরিমাণে ধরা হয়। অন্য প্রজাতির চিংড়িও প্রচুর মেলে। জলাভূমি থেকে বিপুল পরিমাণ শামুক এবং ঝিনুক সংগ্রহ করা হয়, এগুলোর খোলস থেকে চুন তৈরি করা হয়। খোলসগুলো নদীর পাড়ে ছড়িয়ে রাখা হয় যতক্ষণ না পচন শুরু হয়; তখন খোলস সহজেই আলাদা হয়ে আসে।

Ad 300x250

সম্পর্কিত