leadT1ad

ভাইরাল হওয়ার বিজ্ঞান: গেরিলা মার্কেটিং কীভাবে কাজ করে

প্রকাশ : ০৭ জানুয়ারি ২০২৬, ১৪: ৪০
বাস্তব অভিজ্ঞতার মাধ্যমে মানুষের মধ্যে পণ্য সচেতনতা তৈরির এই ব্যবস্থার নাম গেরিলা মার্কেটিং। ছবি: লিংকডইন থেকে নেওয়া

২০০৯ সালে ভোডাফোন রোমানিয়া ফোন ইন্স্যুরেন্স প্রচারে এক অভিনব মার্কেটিং ক্যাম্পেইন চালায়। তারা পেশাদার পকেটমারদের দিয়ে লোকজনের পকেটে কাগজের নকল ফোন প্রবেশ করিয়ে দেয়, যাতে লেখা ছিল, ‘পকেটে প্রবেশ এত সহজ! ফোন ইন্স্যুরেন্স করুন ভোডাফোনের সঙ্গে।’ এই কৌশলটি সরাসরি ফোন চুরির ঝুঁকি মানুষের সামনে তুলে ধরেছিল। ফলে ইন্স্যুরেন্স দ্রুত বিক্রি হচ্ছিল।

প্রচার না করে, বাস্তব অভিজ্ঞতার মাধ্যমে মানুষের মধ্যে পণ্য সচেতনতা তৈরির এই ব্যবস্থার নাম গেরিলা মার্কেটিং। গেরিলা মার্কেটিং গতানুগতিক বিজ্ঞাপন কৌশলগুলোর চেয়ে ভিন্ন। সাধারণত ট্র্যাডিশনাল মিডিয়ায় যেমন খবরের কাগজ, টেলিভিশন কমার্শিয়াল কিংবা বিলবোর্ড এগুলো হচ্ছে কোনো পণ্য সম্পর্কে ভোক্তাদের জানানোর সাধারণ উপায়। কিন্তু গেরিলা মার্কেটিং হলো সর্বসাধারণকে লক্ষ্য করে এমন কোনো কাজ করা যা তাদের মনে গভীর প্রভাব ফেলে, তারা যেন এটা নিয়ে ভাবে কিংবা পরবর্তীতে আবারও এই ঘটনা তাদের মনে পড়ে। একজনের মুখ থেকে আরেকজনের কাছে তথ্য যেন ছড়িয়ে পড়ে। এই মার্কেটিং কৌশলের জন্ম হয় ১৯৮৪ সালে জে কনরাড লেভিনসন নামের এক ব্যক্তির হাত ধরে।

মজার সব গেরিলা মার্কেটিং ক্যাম্পেইন

কোকা-কোলার ‘হ্যাপিনেস মেশিন’

২০১০ সালের শুরুতে কোকা-কোলা যুক্তরাষ্ট্রের কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে একটি ব্যতিক্রমী গেরিলা মার্কেটিং ক্যাম্পেইন চালায়, যার নাম ছিল ‘হ্যাপিনেস মেশিন’। বাইরে থেকে এটি ছিল একদম সাধারণ একটি ভেন্ডিং মেশিন। কিন্তু কেউ কয়েন ঢুকিয়ে বোতাম চাপলেই চমক শুরু হতো। কোকের বোতলের পাশাপাশি মেশিন থেকে বেরিয়ে আসত ফুল, চকলেট, খেলনা, এমনকি কখনও বড় আকারের কোকের বোতল কিংবা ফ্রি খাবারের কুপন।

কোকা-কোলা ‘হ্যাপিনেস’ ক্যাম্পেইন। ছবি: সংগৃহীত
কোকা-কোলা ‘হ্যাপিনেস’ ক্যাম্পেইন। ছবি: সংগৃহীত

এই আকস্মিক ঘটনায় মানুষ অবাক হয়ে যেত, হাসত, বন্ধুদের ডাকত। কোকা-কোলা এই স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিক্রিয়াগুলো ক্যামেরায় ধারণ করে ভিডিও আকারে প্রকাশ করে। অল্প সময়েই ভিডিওগুলো ইউটিউব ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়ে যায়। কোনো সরাসরি বিজ্ঞাপন বার্তা না দিয়েও কোকা-কোলা ‘হ্যাপিনেস’কে তাদের ব্র্যান্ড পরিচয়ের মূল অংশ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়।

রাস্তায় আইকিয়া ফার্নিচারের তৈরি ঘর

বিখ্যাত ফার্নিচার ব্র্যান্ড আইকিয়া ২০০৮ থেকে ২০১১ সালের মধ্যে ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার বিভিন্ন শহরে একাধিক গেরিলা মার্কেটিং কার্যক্রম চালায়। বাসস্টপ, সাবওয়ে স্টেশন কিংবা পার্কের বেঞ্চকে সাজিয়ে ফেলা হয় একেবারে বসার ঘরের মতো। সোফা, ল্যাম্প, কার্পেট, কুশন সবকিছু এমনভাবে সাজানো হতো যেন মানুষ হঠাৎ করেই নিজের ঘরে এসে বসেছে।

এই ক্যাম্পেইনে কোথাও পণ্যের দাম লেখা থাকত না, কোনো সেলস ট্যাগও থাকত না। তবু মানুষ ছবি তুলত, বসে থাকত, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শেয়ার করত। আইকিয়া দেখিয়ে দেয়, তাদের পণ্য শুধু কেনার জিনিস নয়, বরং দৈনন্দিন জীবনের অংশ।

ভক্সওয়াগনের মিউজিক্যাল সিঁড়ি

২০০৯ সালে সুইডেনের স্টকহোমের একটি সাবওয়ে স্টেশনে বিখ্যাত গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ভক্সওয়াগন ‘দ্য ফান থিওরি’ নামের ক্যাম্পেইনের অংশ হিসেবে সিঁড়ির ধাপগুলোকে পিয়ানোর মতো সাজায়। প্রতিটি ধাপে পা রাখলেই পিয়ানোর সুর শোনা যেত।

মিউজিক্যাল সিঁড়ি। ছবি: সংগৃহীত
মিউজিক্যাল সিঁড়ি। ছবি: সংগৃহীত

ফলাফল ছিল চমকপ্রদ। মানুষ এসকেলেটরের বদলে সিঁড়ি ব্যবহার করতে শুরু করে। গবেষণায় দেখা যায়, আগের তুলনায় প্রায় ৬৬ শতাংশ বেশি মানুষ সিঁড়ি ব্যবহার করেছে। ভক্সওয়াগন এই ক্যাম্পেইনের মাধ্যমে দেখায়, আচরণ বদলাতে চাইলে শাস্তি নয়, আনন্দই সবচেয়ে কার্যকর কৌশল।

ইউনিসেফের ‘ডার্টি ওয়াটার ভেন্ডিং মেশিন’

২০০৯ সালে ইউনিসেফ নিউইয়র্ক শহরে একটি ব্যতিক্রমধর্মী ভেন্ডিং মেশিন স্থাপন করে। সেখানে কোনো কোমল পানীয় ছিল না। বোতলের ভেতরে ছিল ঘোলা, নোংরা পানির মতো তরল, যার লেবেলে লেখা ছিল কলেরা, টাইফয়েড, আমাশয়ের মতো রোগের নাম।

ইউনিসেফের ‘ডার্টি ওয়াটার ক্যাম্পেইন। ছবি: সংগৃহীত
ইউনিসেফের ‘ডার্টি ওয়াটার ক্যাম্পেইন। ছবি: সংগৃহীত

মেশিনের পাশে লেখা ছিল, ‘এই পানিই অনেক দেশের শিশুদের দৈনন্দিন বাস্তবতা’। চাইলে মানুষ এখানে কয়েন ফেলে দান করতে পারত। এই ক্যাম্পেইন মানুষকে অস্বস্তিতে ফেললেও বাস্তবতার মুখোমুখি এনে দাঁড় করায়। প্রচুর ফান্ড কালেকশন হয়েছিল এই ক্যাম্পেইনের মাধ্যমে। এটি প্রমাণ করে যে গেরিলা মার্কেটিং শুধু পণ্য বিক্রির জন্য নয়, সামাজিক সচেতনতা তৈরিতেও শক্তিশালী হাতিয়ার হতে পারে।

গোল্ডটোর অন্তর্বাস

আমেরিকার মোজা ও অন্তর্বাস প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান গোল্ডটোর কথাও বলা যায়। ২০১০ সালে যখন তারা অন্তর্বাসের নতুন এক সিরিজ বের করে, তখন নিউ ইয়র্ক স্টক এক্সচেঞ্জের বিখ্যাত ষাঁড়কে তাদের তৈরি করা অন্তর্বাস পরিয়ে দিয়ে ‘আউটডোর গেরিলা মার্কেটিং’ কৌশল অবলম্বন করেছিল।

গেরিলা মার্কেটিং এর আরেকটি অংশ হলো ব্র্যান্ড বনাম ব্র্যান্ড। একটি ব্র্যান্ডের জন্য গেরিলা মার্কেটিং উপযুক্ত বিজ্ঞাপন কৌশল কিনা তা নির্ভর করে অনেকগুলো বিষয়ের উপর। এমনভাবে বিজ্ঞাপনের কৌশল নিতে হয় যাতে কোনো আইনি ঝামেলা হওয়ার সম্ভাবনা থাকবে না, যাদেরকে লক্ষ্য করে এই বিজ্ঞাপন কৌশল নেওয়া হবে, তারা যেন কোনোভাবেই বিরক্তবোধ না করে। এছাড়া এই বিজ্ঞাপন কৌশলে সৃজনশীলতা খুবই দরকারি একটি দক্ষতা।

ব্র্যান্ড বনাম ব্র্যান্ড: মার্কেটিং যুদ্ধ

বার্গার কিং বনাম ম্যাকডোনাল্ডস

২০২০ সালের সেপ্টেম্বর মাসে করোনা মহামারির সময় বার্গার কিং এক অভিনব গেরিলা মার্কেটিং ক্যাম্পেইন চালায়। ইউরোপের একাধিক দেশে তারা পোস্টার ও ডিজিটাল বিজ্ঞাপনে লিখেছিল, ‘ম্যাকডোনাল্ড, কেএফসি কিংবা আপনার লোকাল রেস্টুরেন্ট থেকে অর্ডার করুন’। প্রথম দেখায় মনে হবে এটি যেন নিজের প্রতিদ্বন্দ্বীদের পক্ষে প্রচারণা। কিন্তু মূল লেখার নিচে ছোট করে লেখা ছিল ‘শুধু আমাদের কাছ থেকেই নয়’। এই কৌশলের মাধ্যমে বার্গার কিং বোঝাতে চেয়েছিল নামি ফুড ব্র্যান্ডগুলোর থেকেও তাদের চাহিদা কাস্টমারদের কাছে অনেক বেশি।

পেপসি বনাম কোকা-কোলা

পেপসি ও কোকা-কোলার দ্বন্দ্ব মার্কেটিং ইতিহাসের সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী প্রতিযোগিতাগুলোর একটি। ১৯৭৫ সালে পেপসি চালু করে ঐতিহাসিক ‘পেপসি চ্যালেঞ্জ’। শপিং মল ও জনসমাগমপূর্ণ স্থানে চোখ বেঁধে মানুষকে দুই পানীয় চেখে দেখানো হতো। ফলাফলে দেখা যায়, অনেকেই কোকা-কোলার চেয়ে পেপসি বেশি পছন্দ করছেন।

এই ক্যাম্পেইন কোকা-কোলার বাজার দখলে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেয় এবং বিশ্বব্যাপী তুমুল আলোচনার জন্ম দেয়।

অডি, বিএমডব্লিউ ও মার্সিডিজ বেঞ্জ

২০০৯ সালে জার্মান বিলাসবহুল গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে শুরু হয় এক ব্যতিক্রমী বিলবোর্ড যুদ্ধ। অডি একটি বিলবোর্ডে লেখে, ‘Your move, BMW’। এর জবাবে বিএমডব্লিউ পাশের বিলবোর্ডে লিখে দেয়, ‘Checkmate’। কিছুদিন পর মার্সিডিজ বেঞ্জও তার পাশে একটি বিলবোর্ডে লিখে দেয় ‘Final move’।

এই বিলবোর্ডগুলো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে মানুষ এগুলোকে বিজ্ঞাপন নয়, বরং একটি মজার গল্প হিসেবে দেখতে শুরু করে।

এই প্রচারণা দেখিয়ে দেয়, একই ইন্ডাস্ট্রির প্রতিদ্বন্দ্বীরা চাইলে শত্রুতা নয়, বুদ্ধিদীপ্ত রসবোধ দিয়েও ব্র্যান্ড পজিশনিং শক্ত করতে পারে।

স্যামসাং বনাম অ্যাপল

২০১৬ সালে অ্যাপল যখন তাদের ফোনে হেডফোন জ্যাক বাদ দেয়, স্যামসাং তখন একটি ব্যঙ্গাত্মক বিজ্ঞাপন প্রকাশ করে। সেখানে দেখানো হয়, অ্যাপল ব্যবহারকারীরা বিভিন্ন অ্যাডাপ্টার নিয়ে ভোগান্তিতে পড়ছেন, আর স্যামসাং ব্যবহারকারীরা নির্বিঘ্নে গান শুনছেন।

এই বিজ্ঞাপন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে এবং স্যামসাংয়ের ‘ফিচার-শেমিং’ কৌশল প্রশংসা পায়। তবে ২০১৯ সালে স্যামসাং তাদের নিজেদের কিছু ফোনের মডেলে হেডফোন জ্যাক বাদ দিলে, সেই পুরনো বিজ্ঞাপন আবার নতুন করে ভাইরাল হয়। তবে সেটি স্যামসাংয়ের বিরুদ্ধে ব্যঙ্গ হিসেবে।

তবে গেরিলা মার্কেটিং প্রমাণ করে, শুধু বড় বাজেট নয়, সঠিক সময়, সৃজনশীল ভাবনা আর মানুষের মনস্তত্ত্ব বোঝাই একটি ব্র্যান্ডকে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে আসতে পারে। বাস্তব অভিজ্ঞতা ও চমকের মাধ্যমে ভোক্তার সঙ্গে সরাসরি সংযোগ তৈরি করা যায়। সঠিকভাবে প্রয়োগ করা গেলে, এই কৌশল অল্প খরচে বড় প্রভাব ফেলতে সক্ষম। তবে এই পথে সফল হতে হলে আইনি সীমা, সামাজিক সংবেদনশীলতা ও নৈতিকতার বিষয়গুলো মাথায় রাখা জরুরি। একবার ভুল হলে গেরিলা মার্কেটিং আশীর্বাদ নয়, বরং ব্র্যান্ডের জন্য ঝুঁকিতে পরিণত হতে পারে।

Ad 300x250
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত