জেনজিদের জন্য

চাকরির বাজারে এগিয়ে থাকতে শিখতে পারেন যেসব স্কিল

সব দক্ষতা একসঙ্গে শেখার চেষ্টা করবেন না। এতে কোনো কিছুই ভালোভাবে শেখা হবে না। প্রথমে নিজের আগ্রহের একটি ক্ষেত্র বেছে নিন। তারপর প্রতিদিন অন্তত এক ঘণ্টা সময় দিন।

স্ট্রিম ডেস্ক
স্ট্রিম ডেস্ক

প্রকাশ : ০১ জুলাই ২০২৬, ১৬: ০৩
এআই জেনারেটেড ছবি

একসময় মনে করা হতো, ভালো চাকরি পেতে হলে ভালো ফলাফলই যথেষ্ট। কিন্তু এখন সেই ধারণা অনেকটাই বদলে গেছে। চাকরির বাজার আগের মতো নেই। শুধু বাংলাদেশেই নয়, সারা বিশ্বেই নিয়োগদাতারা এখন শুধু সিজিপিএ, সার্টিফিকেট বা বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম দেখেন না। তারা দেখতে চান, প্রার্থী বাস্তবে কী করতে পারেন, নতুন প্রযুক্তির সঙ্গে কত দ্রুত মানিয়ে নিতে পারেন এবং কাজের সমস্যার সমাধান করতে পারেন কি না।

বাংলাদেশেও এই পরিবর্তন স্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার বাড়ছে, অনলাইন ব্যবসা দ্রুত বিস্তৃত হচ্ছে, ফ্রিল্যান্সিং জনপ্রিয় হচ্ছে এবং অনেক প্রতিষ্ঠান এখন কাজ করার সুযোগও দিচ্ছে। ফলে এমন কিছু দক্ষতার চাহিদা তৈরি হয়েছে, যেগুলো কয়েক বছর আগেও এত গুরুত্বপূর্ণ ছিল না।

আপনি যদি এখন কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েন, তাহলে এটিই নতুন কিছু শেখার সবচেয়ে ভালো সময়। কারণ আজ যে দক্ষতা অর্জন করবেন, সেটিই কয়েক বছর পর আপনার প্রথম চাকরি, প্রথম ফ্রিল্যান্সিং আয় কিংবা নিজের ব্যবসার ভিত্তি হয়ে উঠতে পারে।

১. এআই ব্যবহার করার দক্ষতা

বর্তমানে প্রায় সব ধরনের প্রতিষ্ঠানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই ব্যবহার শুরু হয়েছে। লেখালেখি, গবেষণা, তথ্য বিশ্লেষণ, প্রেজেন্টেশন তৈরি, ছবি বা ডিজাইন তৈরি—অনেক কাজই এখন এআইয়ের সাহায্যে দ্রুত করা সম্ভব।

অনেকে মনে করেন, এআই মানুষের চাকরি নিয়ে নেবে। বাস্তবে বিষয়টি এত সহজ নয়। বরং যারা এআই ব্যবহার করতে জানেন না, তারাই সবচেয়ে বেশি পিছিয়ে পড়ার ঝুঁকিতে থাকবেন।

ডিগ্রি অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু এখন শুধু ডিগ্রি থাকলেই চাকরি নিশ্চিত হয় না। নিয়োগদাতারা জানতে চান, আপনি বাস্তবে কী করতে পারেন, নতুন কিছু কত দ্রুত শিখতে পারেন এবং প্রতিষ্ঠানের সমস্যার সমাধানে কতটা ভূমিকা রাখতে পারবেন।

তাই এআইকে প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, নিজের সহকারী হিসেবে ব্যবহার করতে শিখুন। কীভাবে ভালো প্রম্পট দিতে হয়, কীভাবে পাওয়া তথ্য যাচাই করতে হয় এবং কীভাবে নিজের কাজকে আরও দ্রুত ও ভালো করা যায়, এসব শেখাই হবে ভবিষ্যতের বড় দক্ষতা।

২. ইংরেজিতে যোগাযোগের দক্ষতা

বাংলাদেশে এখনও ভালো ইংরেজি জানাটা একটি বড় সুবিধা। চাকরির আবেদন করা, জীবনবৃত্তান্ত লেখা, ই-মেইল পাঠানো, বিদেশি ক্লায়েন্টের সঙ্গে কথা বলা, অনলাইন মিটিং করা কিংবা আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানে রিমোট জব, সব ক্ষেত্রেই ইংরেজির প্রয়োজন হয়।

সহজ, পরিষ্কার ও আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে নিজের কথা ইংরেজিতে বলতে এবং লিখতে পারাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিদিন একটু করে ইংরেজি পড়া, শোনা ও বলার অভ্যাস গড়ে তুললে এই দক্ষতা ধীরে ধীরে তৈরি হয়।

৩. ভিডিও সম্পাদনার দক্ষতা

এখন মানুষের সবচেয়ে বেশি সময় কাটে ভিডিও দেখে। ইউটিউব, ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, টিকটক—সব জায়গাতেই ভিডিও কনটেন্টের জনপ্রিয়তা।

ফলে ভিডিও সম্পাদনার দক্ষ মানুষের চাহিদাও দ্রুত বাড়ছে। শুরুতে সহজ সফটওয়্যার দিয়ে কাজ শেখা যায়। পরে আরও প্রো সফটওয়্যার ব্যবহার শেখা গেলে বড় প্রতিষ্ঠান বা আন্তর্জাতিক ক্লায়েন্টের সঙ্গে কাজ করার সুযোগ তৈরি হয়।

এই একটি দক্ষতা দিয়েই চাকরি করা, ফ্রিল্যান্সিং করা কিংবা নিজের ইউটিউব চ্যানেল গড়ে তোলা সম্ভব।

৪. ডিজিটাল মার্কেটিং

এখন প্রায় প্রতিটি ব্যবসাই অনলাইনে নিজেদের উপস্থিতি বাড়াতে চায়। শুধু একটি দোকান খুললেই হয় না, মানুষকে সেই দোকানের খবরও জানাতে হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারণা চালানো, অনলাইন বিজ্ঞাপন দেওয়া, ওয়েবসাইটে বেশি মানুষ নিয়ে আসা, কনটেন্ট পরিকল্পনা করা কিংবা ক্রেতাদের আচরণ বিশ্লেষণ করা, সবই ডিজিটাল মার্কেটিংয়ের অংশ।

বাংলাদেশে ছোট ব্যবসা থেকে শুরু করে বড় প্রতিষ্ঠান পর্যন্ত দক্ষ ডিজিটাল মার্কেটারের চাহিদা বাড়ছে। যারা ভবিষ্যতে নিজের ব্যবসা করতে চান, তাদের জন্যও এই দক্ষতা খুবই প্রয়োজনীয়।

৫. গ্রাফিক ডিজাইন

পোস্টার, ব্যানার, লোগো, বিজ্ঞাপন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্ট কিংবা কোনো প্রতিষ্ঠানের পরিচিতিমূলক উপকরণ, সব ক্ষেত্রেই ভালো ডিজাইনের প্রয়োজন হয়।

অনেকেই মনে করেন, গ্রাফিক ডিজাইন শেখা খুব কঠিন। আসলে শুরুটা অনেক সহজ হতে পারে। সহজ ডিজাইন টুল দিয়ে কাজ শুরু করে পরে ধীরে ধীরে আরও উন্নত সফটওয়্যার শেখা যায়। এই দক্ষতা থাকলে দেশি-বিদেশি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কাজ করার পাশাপাশি ঘরে বসেও আয় করার সুযোগ রয়েছে।

৬. কনটেন্ট রাইটিং

আপনি যদি লিখতে ভালোবাসেন, তাহলে সেটিও একটি পেশায় পরিণত হতে পারে। সংবাদমাধ্যম, ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান, বিজ্ঞাপন সংস্থা, সফটওয়্যার কোম্পানি, শিক্ষাবিষয়ক প্রতিষ্ঠান, প্রায় সব জায়গাতেই এখন ভালো লেখকের প্রয়োজন হয়।

এআই লেখার খসড়া তৈরি করতে পারে। কিন্তু মানুষের অনুভূতি বুঝে লেখা, গল্প বলা, জটিল বিষয় সহজ ভাষায় ব্যাখ্যা করা কিংবা পাঠকের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করার কাজ এখনও মানুষের হাতেই সবচেয়ে ভালো হয়। তাই ভালো লেখার দক্ষতার গুরুত্ব ভবিষ্যতেও থাকবে।

৭. সোশ্যাল মিডিয়া ম্যানেজমেন্ট

অনেকেই ভাবেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পরিচালনার কাজ মানেই শুধু পোস্ট করা। কিন্তু বাস্তবে কাজটি অনেক বড়। কখন পোস্ট দিতে হবে, কোন ধরনের ভিডিও বেশি মানুষ দেখবে, কীভাবে অনুসারীদের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করা যায়, কীভাবে গ্রাহকের প্রশ্নের উত্তর দিতে হয় এবং কীভাবে একটি ব্র্যান্ডের পরিচিতি বাড়ানো যায়, এসবই এই কাজের অংশ।

বাংলাদেশের অসংখ্য ছোট ও মাঝারি ব্যবসা এখন এই ধরনের দক্ষ মানুষ খুঁজছে।

৮. ডাটা অ্যানালাইসিস

প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ তথ্য তৈরি হচ্ছে। কিন্তু সেই তথ্য থেকে সঠিক সিদ্ধান্ত বের করে আনাটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। তথ্য বিশ্লেষণের দক্ষতা থাকলে ব্যাংক, করপোরেট প্রতিষ্ঠান, গবেষণা সংস্থা, উন্নয়ন সংস্থা এবং প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানে কাজের সুযোগ বাড়ে।

সব দক্ষতা একসঙ্গে শেখার চেষ্টা করবেন না। এতে কোনো কিছুই ভালোভাবে শেখা হবে না। প্রথমে নিজের আগ্রহের একটি ক্ষেত্র বেছে নিন। তারপর প্রতিদিন অন্তত এক ঘণ্টা সময় দিন।

অনেকেই মনে করেন, এটি শেখার জন্য গণিতে খুব ভালো হতে হবে। বাস্তবে তা নয়। নিয়মিত অনুশীলন করলে এবং প্রয়োজনীয় সফটওয়্যার ব্যবহার শিখলে ধীরে ধীরে এই দক্ষতা অর্জন করা সম্ভব।

৯. ওয়েব ডেভেলপমেন্ট

এখন প্রায় প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের একটি ওয়েবসাইট প্রয়োজন। ছোট ব্যবসা, স্কুল, হাসপাতাল, রেস্তোরাঁ, সংবাদমাধ্যম কিংবা ব্যক্তিগত ব্র্যান্ড, সবাই এখন অনলাইনে নিজেদের পরিচয় গড়ে তুলতে চায়।

ওয়েবসাইট তৈরি ও পরিচালনার দক্ষতা থাকলে চাকরির পাশাপাশি ফ্রিল্যান্সিংয়ের সুযোগও পাওয়া যায়। বাংলাদেশে এখনও এই দক্ষতার মানুষের চাহিদা অনেক বেশি।

১০. সফট স্কিল

সবচেয়ে বেশি অবহেলিত, কিন্তু সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দক্ষতাগুলোর একটি হলো সফট স্কিল। সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করা, দায়িত্ব নেওয়া, নতুন কিছু শেখার আগ্রহ, দলগতভাবে কাজ করা, সমস্যার সমাধান করা, নেতৃত্ব দেওয়া এবং মানুষের সঙ্গে সুন্দরভাবে যোগাযোগ করতে পারা—এসবই সফট স্কিলের অংশ।

অনেক নিয়োগদাতার মতে, প্রযুক্তিগত দক্ষতা পরে শেখানো সম্ভব। কিন্তু দায়িত্বশীলতা, সততা, সময়ানুবর্তিতা বা দলগতভাবে কাজ করার মানসিকতা গড়ে তোলা অনেক কঠিন। তাই এই দক্ষতাগুলোর গুরুত্ব কখনোই কম নয়।

এখন থেকেই কী করবেন?

সব দক্ষতা একসঙ্গে শেখার চেষ্টা করবেন না। এতে কোনো কিছুই ভালোভাবে শেখা হবে না। প্রথমে নিজের আগ্রহের একটি ক্ষেত্র বেছে নিন। তারপর প্রতিদিন অন্তত এক ঘণ্টা সময় দিন। ইউটিউব, অনলাইন কোর্স, উন্মুক্ত শিক্ষার ওয়েবসাইট কিংবা বিভিন্ন বিনা মূল্যের রিসোর্স ব্যবহার করে শেখা শুরু করুন।

তবে শুধু ভিডিও দেখে বা বই পড়ে থেমে থাকবেন না। নিজের হাতে কাজ করুন। পোস্টার ডিজাইন করুন, ভিডিও সম্পাদনা করুন, ওয়েবসাইট তৈরি করুন, কয়েকটি লেখা প্রকাশ করুন কিংবা ছোট একটি প্রকল্প শেষ করুন। এই কাজগুলোই পরে আপনার পোর্টফোলিও হবে, যা চাকরির সাক্ষাৎকারে বা ক্লায়েন্টের সামনে আপনার দক্ষতার প্রমাণ হিসেবে কাজ করবে।

এ ছাড়া নিজের কাজ নিয়মিত অনলাইনে প্রকাশ করার অভ্যাস গড়ে তুলুন। ব্যক্তিগত ওয়েবসাইট, পেশাগত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রোফাইল কিংবা অনলাইন পোর্টফোলিও ভবিষ্যতে আপনাকে অন্যদের থেকে আলাদা পরিচিতি দিতে পারে।

আর একটি বিষয় সব সময় মনে রাখবেন। এআই ব্যবহার করতে শিখুন, ইংরেজিতে যোগাযোগের দক্ষতা বাড়ান এবং এর সঙ্গে অন্তত একটি ডিজিটাল দক্ষতায় পারদর্শী হওয়ার চেষ্টা করুন। বর্তমানে বাংলাদেশের চাকরির বাজারে এই তিনটির সমন্বয় একজন চাকরিপ্রার্থীকে অনেক এগিয়ে রাখতে পারে।

ডিগ্রি অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু এখন শুধু ডিগ্রি থাকলেই চাকরি নিশ্চিত হয় না। নিয়োগদাতারা জানতে চান, আপনি বাস্তবে কী করতে পারেন, নতুন কিছু কত দ্রুত শিখতে পারেন এবং প্রতিষ্ঠানের সমস্যার সমাধানে কতটা ভূমিকা রাখতে পারবেন। আপনি যদি এখন কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েন, তাহলে অপেক্ষা করার সময় নয়। এই সময়টাকেই কাজে লাগান।

Ad 300x250

সম্পর্কিত