যুক্তরাষ্ট্র-ইরানের সমঝোতা চুক্তির মেয়াদ শেষ, এরপর কী

স্ট্রিম ডেস্ক
স্ট্রিম ডেস্ক

প্রকাশ : ১৭ আগস্ট ২০২৬, ১৪: ৫৩
স্ট্রিম গ্রাফিক

যুক্তরাষ্ট্র-ইরানের ইসলামাবাদ সমঝোতা স্মারকের মেয়াদ সোমবার (১৭ আগস্ট) শেষ হচ্ছে। পরস্পরের বিরুদ্ধে চুক্তি লঙ্ঘনের অভিযোগ এনে কোনো পক্ষই সমঝোতার মেয়াদ বাড়াতে সম্মত হয়নি।

গত মে মাসে পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় উচ্চপর্যায়ের বৈঠকের পর ১৭ জুন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান 'ইসলামাবাদ স্মারক' সই করেন। তিন মাসেরও বেশি সময় ধরে চলা রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের অবসান ঘটানোর লক্ষ্যেই এই চুক্তি হয়েছিল। পরমাণু কর্মসূচির মতো ইস্যুগুলোকে পরে আলোচনার জন্য রেখে চুক্তিতে অবিলম্বে এবং স্থায়ীভাবে সামরিক অভিযান বন্ধের ঘোষণা দেওয়া হয়।

স্মারকে বলা হয়েছিল, ৬০ দিনের মধ্যে ‘চূড়ান্ত চুক্তি’ স্বাক্ষরিত হবে। এই চূড়ান্ত চুক্তি জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে অনুমোদিত হবে এবং উভয় পক্ষের সম্মতিতে এর মেয়াদ বাড়ানো যাবে।

চুক্তির শর্ত অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র ৩০ দিনের মধ্যে তাদের নৌ-অবরোধ তুলে নেবে। একই সঙ্গে চূড়ান্ত চুক্তির পর ইরানের নিকটবর্তী অঞ্চল থেকে সামরিক বহর প্রত্যাহার করতে হতো। এ ছাড়া ইরানের জন্য অন্তত ৩০০ বিলিয়ন ডলারের পুনর্গঠন ও উন্নয়ন প্যাকেজের কাজ শুরু করতে হতো।

পাশাপাশি ইরানের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, তেল রপ্তানিতে ছাড় এবং অবরুদ্ধ অর্থ ব্যবহারের সুযোগ দিতে সম্মত হয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র।

অন্যদিকে ইরানকে শর্ত দেওয়া হয়েছিল, তারা হরমুজ প্রণালি থেকে মাইন অপসারণ করবে এবং ৬০ দিন কোনো প্রকার ফি ছাড়াই জাহাজ চলাচলের সুযোগ দেবে। একই সঙ্গে ইরান নিশ্চিত করবে যে তারা পরমাণু অস্ত্র তৈরি করবে না এবং ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ নিয়ে চূড়ান্ত চুক্তিতে আলোচনা করবে।

চুক্তি কেন ব্যর্থ হলো

চুক্তি সইয়ের পরপরই এর ব্যাখ্যার ভিন্নতা নিয়ে দুই দেশের মধ্যে বিরোধ দেখা দেয়। ২৭ জুনের মধ্যেই ট্রাম্প ওই অঞ্চলে ইরানের সামরিক তৎপরতাকে চুক্তির ‘বোকামিপূর্ণ লঙ্ঘন’ হিসেবে আখ্যা দেন। এর জবাবে ইরান দাবি করে যে মার্কিন হামলা স্মারকের ১ নম্বর অনুচ্ছেদের সরাসরি লঙ্ঘন। এরপর ৭ জুলাই ট্রাম্প আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করেন, চুক্তি ‘শেষ হয়ে গেছে’। এরপরই মার্কিন বাহিনী ইরানি লক্ষ্যবস্তুতে পুনরায় বোমাবর্ষণ শুরু করে, যাতে অন্তত ৫০ জন নিহত হন।

ইরানি কর্মকর্তারা জানান, যুক্তরাষ্ট্র তাদের সব প্রতিশ্রুতি লঙ্ঘন ও স্থগিত করায় তেহরানও তাদের প্রতিশ্রুতি স্থগিত করেছে। হরমুজ খোলার বিষয়টিও ভেস্তে যায় দুই পক্ষের প্রণালির ওপর কর্তৃত্ব দাবির কারণে।

বিশ্ববিদ্যালয় অব অ্যাপ্লাইড সায়েন্সেসের অধ্যাপক মোস্তফা খশচেশম আল জাজিরাকে বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র চুক্তির শর্ত না মানায় যুদ্ধবিরতি স্তব্ধ ও অকার্যকর হয়ে পড়েছে।’ তিনি জানান, ইরানি সম্পদ অবমুক্ত করা, নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, নৌ-অবরোধ তোলা এবং দক্ষিণ লেবানন থেকে ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহারের প্রতিশ্রুতি পূরণে যুক্তরাষ্ট্র ব্যর্থ হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, কাগজপত্রে স্মারকের মেয়াদ সোমবার শেষ হলেও এই সমঝোতা ভেস্তে গেছে অনেক আগেই।

এরপর কী

ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি বার্তা সংস্থা আইএসএনএ-কে বলেন, ‘ইসলামাবাদ স্মারকে ৬০ দিনের যুদ্ধবিরতি নয়, বরং যুদ্ধ অবসানের কথা বলা হয়েছিল। যুক্তরাষ্ট্র নিজেই সেই স্মারক লঙ্ঘন করায় পুনরায় লড়াই শুরু হয়েছে। তাই নতুন করে সময়সীমা বাড়ানোর কোনো প্রশ্নই ওঠে না।’

তিনি আরও জানান, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা পুনরায় শুরু করা হবে কি না সে বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি।

এদিকে, ইরানের নীতিনির্ধারণী মহলে রদবদল ঘটিয়ে ইরানের রিভোল্যুশনারি গার্ডের সাবেক প্রধান মহসেন রেজাইকে সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের প্রধান করা হয়েছে।

অধ্যাপক খশচেশম মনে করেন, এই নেতৃত্বের পরিবর্তন প্রমাণ করে ‘ইরান বিশ্বাস করে যে তারা সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে।’ নতুন করে কোনো আলোচনা শুরু হলে ইরান আরও বেশি দাবি তুলবে বলে ধারণা তাঁর। এর মধ্যে গাজায় যুদ্ধ বন্ধ, ইয়েমেনের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা ও অবরোধ তোলা এবং ইসরায়েলের পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণের দাবিও অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারে।

অন্যদিকে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ও তাঁর প্রশাসন অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা ও হরমুজ নিয়ে উসকানিমূলক বক্তব্য বাড়িয়েছেন। ট্রাম্প ঘোষণা দিয়েছেন, ইরানকে পরাজিত করার পর হরমুজ নিজেদের ‘ভূখণ্ড’ হিসেবে ঘোষণা করবে যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন ট্রেজারি সচিব স্কট বেসেন্টও ইরানের ওপর নজিরবিহীন অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টির হুমকি দিয়েছেন।

ওয়াশিংটনভিত্তিক স্টিমসন সেন্টারের ডিস্টিংগুইশড ফেলো বার্বারা স্লাভিন আল জাজিরাকে জানান, ট্রাম্পের হাতে নতুন করে চাপ দেওয়ার মতো কার্ড খুব বেশি নেই।

স্লাভিন জানান, যুক্তরাষ্ট্রের ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত ফুরিয়ে আসছে, কৌশলগত তেলের মজুত কমছে এবং বিমানবাহী রণতরীগুলোকে নির্ধারিত সময়ের চেয়ে বেশি সময় সাগরে রাখতে হচ্ছে। ফলে নতুন সামরিক অভিযানের সুযোগ সীমিত।

তিনি বলেন, ‘ইরান মনে করে, ইসলামাবাদ সমঝোতার শর্ত পূরণ না করে যুক্তরাষ্ট্র চরম অবিচার করেছে। এর জবাবে ইরানের নেওয়া কঠোর অবস্থান বৈশ্বিক অর্থনীতি এবং ডোনাল্ড ট্রাম্পকে বেশ চাপে ফেলেছে।’

বার্বারা স্লাভিন মনে করেন, শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের পরেই নতুন চুক্তিতে এই সংঘাতের অবসান হতে পারে।

তথ্যসূত্র: আল-জাজিরা

Ad 300x250
লেটেস্ট
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত

যুক্তরাষ্ট্র-ইরানের সমঝোতা চুক্তির মেয়াদ শেষ, এরপর কী