‘বেসামাল’ দুই নেতা নিয়ে বিপাকে জাবি ছাত্রদল

স্ট্রিম সংবাদদাতা
স্ট্রিম সংবাদদাতা
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

প্রকাশ : ১৭ আগস্ট ২০২৬, ১৫: ৪১
জাকসু ভিপি আব্দুর রশিদ জিতু ও শাখা ছাত্রদলের যুগ্ম আহ্বায়ক ফয়সাল হোসেনের কর্মকাণ্ডে বিব্রত নেতারা। স্ট্রিম গ্রাফিক

আব্দুর রশিদ জিতু ও ফয়সাল হোসেনকে নিয়ে বিপাকে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদল। কোনোভাবেই তাদের বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের লাগাম টানতে পারছে না সংগঠনটি।

এর মধ্যে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (জাকসু) ভিপি সম্প্রতি বিএনপির রাজনীতিতে যুক্ত হয়েছেন। আর ফয়সাল বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের যুগ্ম আহ্বায়কের দায়িত্ব আছেন। দলীয় শৃঙ্খলা পরিপন্থী কর্মকাণ্ডের জন্য তাঁকে শোকজ করেছে কেন্দ্রীয় ছাত্রদল।

সম্প্রতি সংগঠনের সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে এই দুই নেতার ক্যাম্পাসে শোডাউন দেওয়া নিয়ে ছাত্রদলের অভ্যন্তরে ক্ষোভ দেখা দিয়েছে। ফয়সালের বিরুদ্ধে নেতাকর্মীর সঙ্গে হাতাহাতি, আর্থিক অস্বচ্ছতা ও জাকসু নির্বাচনে ‘নিজস্ব বলয়ের’ প্রার্থী দিয়ে ভরাডুবির কারণ হওয়ার অভিযোগ রয়েছে। অন্যদিকে, ভিপি জিতুর বিরুদ্ধে নিয়মবহির্ভূতভাবে হলে অবস্থান, প্রভাব খাটিয়ে হলের নিয়ম বদল, রিকশা নিবন্ধনে চাঁদাবাজি, নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের কর্মীকে ছাড়িয়ে নেওয়া, ছাত্রনেতা ও সাংবাদিকদের সঙ্গে দুর্ব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে।

জানতে চাইলে শাখা ছাত্রদলের আহ্বায়ক জহির উদ্দীন বাবর বলেন, ‘অভিযোগ এলেই কাউকে অপরাধী বলা যায় না। দালিলিক প্রমাণ ছাড়া আমরা কাউকে দোষারোপ করতে পারি না।’

ধাক্কাধাক্কি নিয়ে ক্ষোভ

দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগে গত ৭ আগস্ট ফয়সালকে শোকজ করে কেন্দ্রীয় ছাত্রদল। এর আগের দিন ক্যাম্পাসে পানিসম্পদমন্ত্রী শহীদউদ্দীন চৌধুরী এ্যানিকে অভ্যর্থনা জানানোর সময় শাখা ছাত্রদলের সদস্যসচিব ওয়াসিম আহমেদ অনিকের সঙ্গে ধাক্কাধাক্কিতে জড়িয়ে পড়েন ফয়সাল।

ওয়াসিম আহমেদ বলেন, ‘অভ্যর্থনা জানানোর জন্য নেতাকর্মীর সারি ডেকোরাম অনুযায়ী না হওয়ায় অন্যান্য যুগ্ম আহ্বায়কের সঙ্গে ফয়সালের ধাক্কাধাক্কি হয়। একজন জ্যেষ্ঠ কর্মীর কাছ থেকে এমন আচরণ অপ্রত্যাশিত।’

এই ঘটনার রাতেই জিতু ও ফয়সাল কয়েক নেতাকর্মী নিয়ে ক্যাম্পাসে শোডাউন দেন। পরে সেলিম আল দীন মুক্তমঞ্চের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে যোগ দেন তাঁরা, যা নিয়ে সংগঠনে বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। শাখা ছাত্রদলের এক যুগ্ম আহ্বায়ক নাম প্রকাশ না করে বলেন, শোডাউনের ঘটনায় আমরা বিব্রত। নিজের স্বার্থ হাসিলের জন্যই ফয়সাল ভিপি জিতুর সঙ্গে আঁতাত করেছেন বলে মনে হচ্ছে।

সংগঠনের সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে এই দুই নেতার ক্যাম্পাসে শোডাউন দেওয়া নিয়ে ছাত্রদলের অভ্যন্তরে ক্ষোভ দেখা দিয়েছে। ফয়সালের বিরুদ্ধে নেতাকর্মীর সঙ্গে হাতাহাতি, আর্থিক অস্বচ্ছতা ও জাকসু নির্বাচনে ‘নিজস্ব বলয়ের’ প্রার্থী দিয়ে ভরাডুবির কারণ হওয়ার অভিযোগ রয়েছে। অন্যদিকে, ভিপি জিতুর বিরুদ্ধে নিয়মবহির্ভূতভাবে হলে অবস্থান, প্রভাব খাটিয়ে হলের নিয়ম বদল, রিকশা নিবন্ধনে চাঁদাবাজি, নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের কর্মীকে ছাড়িয়ে নেওয়া, ছাত্রনেতা ও সাংবাদিকদের সঙ্গে দুর্ব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে।

তবে অভিযোগ অস্বীকার করে ফয়সাল বলেন, ‘আমরা একসঙ্গে অনুষ্ঠানে গিয়েছিলাম। এটি কোনো শোডাউন ছিল না।’ একই সুরে জিতু বলেন, ‘আমি বিএনপির রাজনীতি করি। ফয়সাল ভাই ছাত্রদলের। সেদিন কোনো শোডাউন হয়নি। অনেক ছোট ভাই সেখানে ছিল।’

মুক্তমঞ্চের ওই অনুষ্ঠানে ফয়সাল ছাড়া অন্যান্য যুগ্ম আহ্বায়কের নাম ঘোষণা না করায় উত্তেজনা দেখা দেয়। ছাত্রদলের এক জ্যেষ্ঠ নেতার দাবি, জিতু ও ফয়সাল ইচ্ছাকৃতভাবে সঞ্চালকের হাতে আংশিক নামের তালিকা দিয়েছিলেন। তবে ফয়সালের দাবি, তালিকা তৈরিতে ভুল থাকায় এমনটি হয়েছে। এর সঙ্গে তাঁর কোনো সম্পৃক্ততা নেই।

‘মাই ম্যান’ নীতিতে জাকসুতে ভরাডুবি

জাকসু নির্বাচনে ছাত্রদল-সমর্থিত প্যানেলের ভরাডুবির পেছনে ফয়সালের ‘মাই ম্যান’ নীতিকে দুষছেন নেতারা। তাদের অভিযোগ, ফয়সালের অনুসারীকে মনোনয়ন দিতে গিয়ে তুলনামূলক কম পরিচিত শেখ সাদী হাসানকে সহসভাপতি (ভিপি) প্রার্থী করা হয়।

নির্বাচনে একই প্যানেলের জিএস ও এজিএস প্রার্থীরা তুলনামূলক বেশি ভোট (জিএস প্রার্থী তানজিলা হোসাইন বৈশাখী ৯৪১ ভোট) পেলেও, শেখ সাদী পান মাত্র ৬৪৮ ভোট।

ভ্যাকসিন কর্মসূচিতে নয়ছয়

গত বছরের এপ্রিলে শাখা ছাত্রদলের আয়োজনে বিনামূল্যে হেপাটাইটিস-বি ভ্যাকসিন কর্মসূচি ঘিরে ফয়সাল হোসেনের বিরুদ্ধে আর্থিক অস্বচ্ছতার অভিযোগ ওঠে। ঝিনাইদহের এক রাজনীতিকের অর্থায়নে প্রায় ৩ কোটি ২০ লাখ টাকার টিকাদান শেষে উদ্বৃত্ত ছিল ১ কোটি ৮৫ লাখ। এই টাকার ভাগ-বাটোয়ারা নিয়ে নেতাদের মধ্যে দ্বন্দ্ব দেখা দেয়। একপর্যায়ে কর্মসূচি সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়। পরে তা আবার চালু করা হয়।

জিতুর জন্য হলের নিয়ম বদল

বিশ্ববিদ্যালয়ের বিধি অনুযায়ী, ছাত্রত্ব শেষ হলে কেউ আবাসিক হলে থাকতে পারেন না। জাকসু ভিপি জিতু পরপর দুবার মাস্টার্স শেষ করতে না পারায় বর্তমানে অনিয়মিত শিক্ষার্থী। কিন্তু তাঁকে হলে রাখার সুযোগ করে দিতে গত ২৯ জুলাই বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন একটি বিজ্ঞপ্তি জারি করে।

এতে বলা হয়, জাকসু ও হল সংসদের নির্বাচিত শিক্ষার্থীরা পদের মেয়াদ শেষ না হওয়া পর্যন্ত হলে থাকতে পারবেন। জাকসুর অন্য নেতারা এর প্রতিবাদ জানালেও, জিতুর চাপেই প্রশাসন এই নিয়ম করেছে বলে অভিযোগ।

জিতু বলেন, ‘ভিপি-জিএসের ছাত্রত্ব শেষ হলে সংসদ কীভাবে চলবে, গঠনতন্ত্রে এমন কোনো নিয়ম নেই। তাই প্রশাসন নিজ উদ্যোগে এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে।’

রিকশার নিবন্ধন ঘিরে চাঁদাবাজি

বিশ্ববিদ্যালয়ে রিকশার নিবন্ধনকে কেন্দ্র করে শহীদ সালাম-বরকত হলের উচ্চমান সহকারী মনির হোসেনের বিরুদ্ধে নির্ধারিত ফির বাইরে অতিরিক্ত ১০ হাজার টাকা নেওয়ার অভিযোগ ওঠে। এ-সংক্রান্ত ফাঁস হওয়া একটি অডিও কথোপকথনে আবেদনকারীদের কাছে জাকসুর ভিপি আব্দুর রশিদ জিতু ও হল সংসদের ভিপি মারুফ হোসেনের নাম ব্যবহারের কথা শোনা যায়।

তবে এ ঘটনায় জিতু তাঁর সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ অস্বীকার করেন। তিনি বলেন, অর্থ নেওয়ার বিষয়ে তিনি কিছু জানেন না। তাঁর নাম ব্যবহার করে এসব কাজ করা হচ্ছে।

অন্যদিকে, আল-বেরুনী হল-সংলগ্ন একটি চায়ের দোকানে জিতুর নামে প্রায় ২৬ হাজার টাকা বকেয়া থাকার কথা জানা গেছে। দোকানির দাবি, কয়েকবার টাকা চাওয়ার পরও তিনি তা পাননি।

এ বিষয়ে জিতু বলেন, আমার নামে অনেকে বাকি খেয়েছে। আমি নিজে বড় কোনো ব্যবসায়ী না। তাই আমি মাঝে মাঝে বাকি নিয়েছি। ইতোমধ্যে তাঁর পাওনা শোধ করে দিয়েছি।

শিবির-ছাত্রলীগের সঙ্গে সখ্য

সন্ত্রাসবিরোধী আইনে নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের জাবি শাখার কার্যনির্বাহী সদস্য ছিলেন আব্দুর রশিদ জিতু। পরে জুলাই আন্দোলনে যুক্ত হন। অভিযোগ রয়েছে, ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে শেখ হাসিনার পতনের পরে জিতু ইসলামী ছাত্রশিবিরের পৃষ্ঠপোষকতায় গড়ে ওঠা প্ল্যাটফর্ম ‘গণঅভ্যুত্থাণ রক্ষা আন্দোলন’– এর আহ্বায়ক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। জিতুর এই প্ল্যাটফর্ম ক্যাম্পাসে শিবিরকে আত্মপ্রকাশে সহযোগিতা করে। একপর্যায়ে গত ৬ ফেব্রুয়ারি তিনি বিএনপিতে যোগ দেন।

গণঅভ্যুত্থানের পর জিতুর বিরুদ্ধে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের পৃষ্ঠপোষকতা দেওয়ার অভিযোগ ওঠে। গত ৫ আগস্ট শিক্ষার্থীরা ছাত্রলীগকর্মী মেহেদী হাসান আবীরকে ধরলে, বিএনপির প্রভাব খাটিয়ে ছাড়িয়ে নেন জিতু।

আবীর সামাজিক মাধ্যমে ছাত্র আন্দোলনবিরোধী পোস্ট সমর্থন করতেন বলে অভিযোগ শিক্ষার্থীদের। এ ব্যাপারে জিতু বলেন, ‘সবার উপস্থিতিতেই সিদ্ধান্ত হয়েছে। যেহেতু সে নিজে কোনো পোস্ট করেননি, তাই মুচলেকা দিয়ে ছাড়ার কথা বলা হয়।’

ওই রাতেই হলের এক ফিস্টে শিক্ষকদের সামনে জাকসু ও ছাত্রদলের কয়েকজন নেতাকে গালিগালাজ করেন জিতু। এ নিয়ে জাবির সাবেক সমন্বয়ক মেহেরাব সিফাতের সঙ্গে তাঁর বিতণ্ডা হয়। তবে জিতুর দাবি, আবীরকে তিনি ছাড়িয়ে এনেছেন– এমন সংবাদ প্রকাশ করা সাংবাদিকদের উদ্দেশ্যে তিনি ওই মন্তব্য করেছিলেন।

Ad 300x250
লেটেস্ট
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত

‘বেসামাল’ দুই নেতা নিয়ে বিপাকে জাবি ছাত্রদল