যুক্তরাষ্ট্র ইরানে হামলা চালাতে প্রস্তুত বলে মনে হচ্ছে। কয়েক সপ্তাহ ধরে ওয়াশিংটন মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক শক্তি জড়ো করছে। ২০০৩ সালে ইরাক আক্রমণের পর এই প্রথমবারের মতো অঞ্চলটিতে এত বড় আকারে মার্কিন বিমান শক্তি মোতায়েনের প্রস্তুতি দেখা যাচ্ছে।
অবশ্য এটি চাপ সৃষ্টি করার কৌশলও হতে পারে যাতে ইরান নিজেদের অনিচ্ছা স্বত্ত্বেও চুক্তিতে রাজি হয়। উপসাগরীয় আরব মিত্ররা যুক্তরাষ্ট্রকে সতর্ক করেছে—এ ধরনের হামলার অনাকাঙ্ক্ষিত পরিণতি হতে পারে।
যদি আলোচনা ভেঙে যায় এবং প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হামলার নির্দেশ দেন, তাহলে কী কী হতে পারে?
সীমিত ও নির্দিষ্ট হামলা, কম বেসামরিক হতাহত, গণতন্ত্রে রূপান্তর
মার্কিন বিমান ও নৌবাহিনী, ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ডস কর্পস (আইআরজিসি) ও তাদের অধীনস্থ আধাসামরিক বাসিজ বাহিনীর ঘাঁটি, ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ ও সংরক্ষণ কেন্দ্র এবং পারমাণবিক কর্মসূচিকে লক্ষ্য করে সীমিত ও নিখুঁত হামলা চালাতে পারে।
হামলার পর আগেই দুর্বল হয়ে পড়া সরকার পতন হতে পারে। শেষ পর্যন্ত একটি প্রকৃত গণতান্ত্রিক সরকার প্রতিষ্ঠিত হতে পারে যার মাধ্যমে ইরান আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সঙ্গে স্বাভাবিক সম্পর্কে ফিরতে পারবে।
সরকার টিকে থাকবে কিন্তু নীতিতে পরিবর্তন আনবে
এটি অনেকটা ‘ভেনেজুয়েলা মডেল’ হতে পারে। দ্রুত ও শক্তিশালী মার্কিন পদক্ষেপে যদি সরকার টিকে যায় তবে কিছু নীতিতে পরিবর্তন আসতে পারে।
ইরানের ক্ষেত্রে ইসলামি প্রজাতন্ত্র টিকে থাকতে পারে যদিও অনেক নাগরিক এতে সন্তুষ্ট হবেন না। তবে সরকারকে মধ্যপ্রাচ্যে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর প্রতি সমর্থন কমাতে, পারমাণবিক ও ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি সীমিত করতে এবং বিক্ষোভ দমনে কিছুটা শিথিলতা আনতে বাধ্য করা হতে পারে।
সরকার পতন ও সামরিক শাসন প্রতিষ্ঠা
অনেকে মনে করেন, এটি সবচেয়ে সম্ভাব্য ফল। সরকার অনেকের কাছে অজনপ্রিয় হলেও নিরাপত্তা কাঠামো শক্তিশালী এবং বর্তমান ব্যবস্থায় তাদের স্বার্থ জড়িত। আইআরজিসি ইরানের অর্থনীতির সঙ্গেও গভীরভাবে যুক্ত। বিগত বিক্ষোভগুলো সরকারকে দুর্বল করলেও বড় ধরনের ভাঙন ঘটেনি। কারণ ক্ষমতাসীনদের পক্ষ থেকে কেউ বিদ্রোহীদের সঙ্গে যোগ দেয়নি এবং সরকার ক্ষমতায় থাকতে কঠোর শক্তি প্রয়োগে প্রস্তুত।
মার্কিন হামলার পর বিশৃঙ্খলার মধ্যে আইআরজিসি-ঘনিষ্ঠ সামরিক নেতৃত্বের হাতে ক্ষমতা চলে যেতে পারে।
মার্কিন ঘাঁটিতে ইরানের পাল্টা হামলা, লক্ষ্যবস্তু ইসরায়েল
এটি খুবই সম্ভাব্য। ইরান আগেই বলেছে, যেকোনো মার্কিন হামলার জবাব তারা দেবে। খামেনি বলেছেন, হামলা হলে মার্কিন বাহিনীকে ‘কঠিন জবাব’ দেওয়া হবে।
মার্কিন নৌ ও বিমান বাহিনীর সঙ্গে ইরানের তুলনা চলে না। তবে ইরানের কাছে বিপুল ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন রয়েছে যেগুলোর বেশিরভাগ গুহা, ভূগর্ভ বা পাহাড়ি এলাকায় লুকানো।
উপসাগরের আরব উপকূলে বিশেষ করে বাহরাইন ও কাতারে মার্কিন ঘাঁটি রয়েছে। ইরান চাইলে জর্ডান বা ইসরায়েলের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোতেও হামলা চালাতে পারে, যদি তারা মনে করে ওই দেশগুলো হামলায় জড়িত।
উপসাগরে মাইন পেতে ইরানের প্রতিশোধ
১৯৮০-৮৮ সালের ইরান-ইরাক যুদ্ধের সময় ইরান সমুদ্রপথে মাইন পেতেছিল। এরপর থেকেই এটি বৈশ্বিক বাণিজ্য ও তেল সরবরাহের জন্য সম্ভাব্য হুমকি হিসেবে দেখা হয়।
ইরান ও ওমানের মধ্যের সরু হরমুজ প্রণালি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ। বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) এবং ২০-২৫ শতাংশ তেল ও তেলজাত পণ্য এই পথ দিয়ে যায়।
এই সপ্তাহে জেনেভায় যুক্তরাষ্ট্র-ইরান আলোচনা চলাকালে ইরান কয়েক ঘণ্টার জন্য প্রণালি বন্ধ রেখে সরাসরি গোলাবর্ষণের মহড়া চালায়। ১৯৮০-র দশকের পর এটিই প্রথম।
সম্প্রতি ওমান উপসাগর ও ভারত মহাসাগরে রুশ নৌবাহিনীর সঙ্গে যৌথ মহড়ার খবরও পাওয়া গেছে। ইরান দ্রুত সমুদ্র মাইন মোতায়েনের মহড়াও করেছে। আবার যদি তা করে, তাহলে বিশ্ব বাণিজ্য ও তেলের দামে বড় প্রভাব পড়বে। তবে এতে ইরান নিজেও ক্ষতিগ্রস্ত হবে। কারণ তাদের অর্থনীতি তেল রপ্তানির ওপর নির্ভরশীল। পাশাপাশি এশিয়ায় তাদের প্রধান ক্রেতা বিশেষ করে চীনও ক্ষতির মুখে পড়বে।
ইরানের পাল্টা হামলায় মার্কিন যুদ্ধজাহাজ ডুবে যাওয়া
উপসাগরে অবস্থানরত একটি মার্কিন যুদ্ধজাহাজের এক নৌ-ক্যাপ্টেন জানান, ইরানের আকস্মিক ড্রোন আক্রমণ নিয়েই তাদের যত চিন্তা।
এর অর্থ হচ্ছে, ইরান একসঙ্গে বিপুলসংখ্যক বিস্ফোরকবাহী ড্রোন ও দ্রুতগতির টর্পেডো নৌকা একটি বা একাধিক লক্ষ্যবস্তুতে ছুড়ে দেয়। এতে মার্কিন নৌবাহিনীর শক্তিশালী প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাও সময়মতো সবগুলো ঠেকাতে ব্যর্থ হতে পারে।
উপসাগর অঞ্চলে দীর্ঘদিন ধরেই ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ডস কর্পস (আইআরজিসি) নৌবাহিনী প্রচলিত ইরানি নৌবাহিনীর জায়গা নিয়েছে। শাহ আমলে ইরানের কিছু নৌ-কমান্ডার যুক্তরাজ্যের ডার্টমাউথে প্রশিক্ষণ পেয়েছিলেন।
ইরানের নৌবাহিনীর সদস্যরা মূলত অপ্রচলিত বা ‘অসম যুদ্ধ’ কৌশলে প্রশিক্ষণ নিয়েছে। যাতে তাঁরা প্রধান প্রতিপক্ষ মার্কিন নৌবাহিনীর পঞ্চম নৌবহরের প্রযুক্তিগত সুবিধা পাস কাটাতে পারে।
একটি মার্কিন যুদ্ধজাহাজ ডুবে গেলে এবং তার নাবিকদের কেউ বন্দি হলে তা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বড় ধরনের অপমান হবে।
সরকার পতন, চারদিকে বিশৃঙ্খলা
এটিও একটি বাস্তব ঝুঁকি। কাতার ও সৌদি আরবের মতো প্রতিবেশী দেশগুলোর জন্য বড় উদ্বেগের কারণ হতে পারে।
সিরিয়া, ইয়েমেন ও লিবিয়ার মতো গৃহযুদ্ধের সম্ভাবনা রয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের অনেক দেশই ইসলামি প্রজাতন্ত্রের অবসান দেখতে চাইবে—বিশেষ করে ইসরায়েল।
তবে প্রায় ৯ কোটি ৩০ লাখ জনসংখ্যার মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে বড় দেশটি বিশৃঙ্খলার মধ্যে ডুবে যাক—এমনটা কেউই চায় না। এতে মানবিক বিপর্যয় ও শরণার্থী সংকট তৈরি হতে পারে।
সবচেয়ে বড় আশঙ্কা এখন হলো প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ইরানের সীমান্তের কাছে এত শক্তিশালী বাহিনী জড়ো করার পর যদি মনে করেন যে তাঁকে পদক্ষেপ নিতেই হবে। তাহলে এমন একটি যুদ্ধ শুরু হতে পারে যার স্পষ্ট সমাপ্তি নেই। যার পরিণতি অনিশ্চিত ও ক্ষতিকর হতে পারে।