leadT1ad

নিউইয়র্ক টাইমসের বিশ্লেষণ

ভেনেজুয়েলা নিয়ে ট্রাম্পের চ্যালেঞ্জে কেন চুপসে গেলেন পুতিন

স্ট্রিম ডেস্ক
স্ট্রিম ডেস্ক

ভেনেজুয়েলা নিয়ে ট্রাম্পের চ্যালেঞ্জে কেন চুপসে গেলেন পুতিন। স্ট্রিম গ্রাফিক

সদ্য সমাপ্ত ২০২৫ সালের মে মাসে ক্রেমলিন প্রাসাদের সবুজ ড্রয়িংরুমে সোনালি নকশা করা চেয়ারে বসেছিলেন নিকোলাস মাদুরো। ভেনেজুয়েলার এই নেতা রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের দিকে তাকিয়ে উজ্জ্বল ভবিষ্যতের কথা বলছিলেন। মাদুরো ঘোষণা করেছিলেন, মহান রাশিয়ার সঙ্গে তাঁদের সম্পর্ক দারুণভাবে বিকশিত হবে। তিনি রাশিয়াকে মানবজাতির নেতৃত্বদানকারী শক্তি বলেও প্রশংসা করেছিলেন।

আট মাস আগের সেই দৃশ্য এখন শুধুই স্মৃতি। মাদুরো এখন দেশ থেকে ৪,৭০০ মাইল দূরে। ব্রুকলিনের এক ভয়ংকর ফেডারেল বন্দিশিবিরে দিন কাটছে তাঁর। গত শনিবার কারাকাস থেকে এক ঝটিকা অভিযানে তাঁকে তুলে আনে মার্কিন বাহিনী। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের নির্দেশেই এই কাজ করা হয়েছে।

এক সপ্তাহ পেরিয়ে গেছে। প্রেসিডেন্ট পুতিন এখনো একটি কথাও বলেননি।

নীরবতার পেছনে কারণ হিসেবে অনেকে রাশিয়ায় নববর্ষের ছুটির আমেজের কথা বলছেন। তবে আসল চিত্র ভিন্ন। গত কয়েক মাস ধরেই ক্রেমলিনে এমন আচরণ দেখা যাচ্ছে। আমেরিকার যেসব কাজ আগে মস্কোকে ক্ষিপ্ত করত ও হুমকি হিসেবে চিহ্নিত করত, এখন তারা সেসব দেখেও না দেখার ভান করছে।

পুতিন এখন খুব সাবধানে পা ফেলছেন। তিনি ওয়াশিংটনকে চটাতে চান না। তাঁর চোখ এখন ইউক্রেনের দিকে। নিজের পক্ষে ফলের লক্ষ্য পূরণের জন্য প্রয়োজনে বিশ্বের অন্য প্রান্তে নিজের দাপট কমাতেও রাজি তিনি। অথচ আগে এসব ক্ষেত্রে পুতিন কঠোর অবস্থান নিতেন।

সবশেষ উদাহরণ দেখা গেল গত বুধবার। আটলান্টিক মহাসাগরে রাশিয়ার পতাকা লাগানো তেলবাহী ট্যাংকার বা জাহাজ আটক করে মার্কিন বাহিনী। মার্কিন কোস্টগার্ড ধাওয়া দিলে জাহাজটি পালানোর চেষ্টা করেছিল। এর জবাবে রাশিয়া খুবই সামান্য প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে। দেশটির পরিবহন মন্ত্রণালয় মাত্র তিন প্যারাগ্রাফের বিবৃতি দিয়েছে। যে দেশ কথায় কথায় পারমাণবিক যুদ্ধের হুমকি দেয়, তাদের এমন সংযম অবাক করার মতো!

জেমস মার্টিন সেন্টার ফর ননপ্রলিফারেশন স্টাডিজের ইউরেশিয়া কর্মসূচির পরিচালক হানা নোটের মতে, পুতিনের এখন একটাই লক্ষ্য—ইউক্রেন যুদ্ধে জেতা। বাকি সবকিছু এই লক্ষ্যের অধীন।

হানা নোটের মতে, রাশিয়া চাইলে ভেনেজুয়েলায় আমেরিকার অভিযানে ঝামেলা পাকাতে পারত। কিন্তু তাতে ট্রাম্পের সঙ্গে সম্পর্ক পুরোপুরি নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি ছিল। তিনি বলেন, রাশিয়ার বর্তমান পররাষ্ট্রনীতির সব ইঙ্গিতই ইউক্রেনকে ঘিরে। ইউক্রেন ইস্যু এখন তাদের কাছে সবকিছুর ঊর্ধ্বে। তাই ভেনেজুয়েলায় নাক গলিয়ে আমেরিকার বিরাগভাজন হওয়ার কোনো মানে হয় না।

নিকোলাস মাদুরো ও ভ্লাদিমির পুতিন। ছবি: সংগৃহীত
নিকোলাস মাদুরো ও ভ্লাদিমির পুতিন। ছবি: সংগৃহীত

মস্কোর এই চুপ থাকাটা কৌশলগত হতে পারে। তবে পুতিনের ক্ষমতাও সীমিত হয়ে আসছে। রাশিয়ার বৈশ্বিক প্রভাব এখন সুতোয় ঝুলছে। ২০২২ সালে ইউক্রেনে সর্বাত্মক আগ্রাসন শুরুর পর থেকেই মস্কোর প্রভাব কমতে থাকে। মধ্য এশিয়া, ককেশাস এবং মলদোভাসহ সাবেক সোভিয়েত দেশগুলোতে তাদের দাপট কমেছে।

২০২৪ সালের শেষের দিকে সিরিয়ায় বাশার আল আসাদ সরকারের পতনের ঘটনায় এই প্রক্রিয়া আরও ত্বরান্বিত হয়। অথচ সিরিয়ায় এই সরকারকে টিকিয়ে রাখতে পুতিন এক দশক ধরে চেষ্টা চালিয়েছেন। সেখানে বিপুল ব্যয়বহুল সামরিক হস্তক্ষেপ করা হয়েছিল। এরপর এল ভেনেজুয়েলার পালা। লাতিন আমেরিকায় রাশিয়ার অন্যতম সেরা বন্ধু মাদুরোকে অপহরণ করল আমেরিকা। ওদিকে ইরানেও সরকারবিরোধী বিশাল বিক্ষোভে ক্রেমলিনপন্থী সরকার বিপাকে আছে।

গত বছর আর্মেনিয়া ও আজারবাইজানের নেতারা হোয়াইট হাউসে গিয়ে শান্তি চুক্তি করেছেন। অথচ এই দুই সাবেক সোভিয়েত দেশ নিজেদের বিবাদ মেটাতে এতদিন মস্কোর দিকেই তাকিয়ে থাকত।

কার্নেগি রাশিয়া ইউরেশিয়া সেন্টারের পরিচালক আলেকজান্ডার গাবুয়েভের মতে, ইউক্রেন যুদ্ধ রাশিয়ার জন্য এক ব্ল্যাক হোল। এই যুদ্ধ রাশিয়ার সব সম্পদ শুষে নিচ্ছে। পশ্চিমা চাপে দেশটি ভেতরে ভেতরে শক্ত হওয়ার চেষ্টা করছে। কিন্তু বিশ্বমঞ্চে তারা দুর্বল হয়ে পড়ছে। তাদের উচ্চাকাঙ্ক্ষা পূরণের মতো সম্পদ এখন আর হাতে নেই।

গাবুয়েভ আরও বলেন, রাশিয়া চাইলেও ভেনেজুয়েলাকে বাঁচাতে পারত না। আমেরিকার মতো আরেকটি পারমাণবিক শক্তির সঙ্গে তারা ভেনেজুয়েলায় যুদ্ধে জড়াবে না। ইউক্রেনের লক্ষ্য ঝুঁকিতে ফেলে ট্রাম্পের সঙ্গে অন্য ইস্যুতে বিবাদে জড়াতে চায় না রাশিয়া।

ক্রেমলিন বছরের পর বছর ধরে বিশ্বকে কয়েকটি অঞ্চলের সমষ্টি হিসেবে দেখে। তাদের মতে, রাশিয়া ও চীন বা আমেরিকার মতো বড় শক্তিগুলোর নির্দিষ্ট কিছু এলাকায় বিশেষ স্বার্থ থাকবে। ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে রুশ কর্মকর্তারা এক অদ্ভুত প্রস্তাব দিয়েছিলেন। তারা বলেছিলেন, আমেরিকা ভেনেজুয়েলায় যা ইচ্ছা করতে পারে; বিনিময়ে ইউক্রেনে রাশিয়াকে পূর্ণ স্বাধীনতা দিতে হবে।

ট্রাম্পও ওয়াশিংটনের প্রভাব বলয় নিয়ে সচেতন। তিনি কানাডা ও গ্রিনল্যান্ডকে আমেরিকার অংশ করতে চান। সম্প্রতি তিনি ভেনেজুয়েলা ‘চালানোর’ বা পরিচালনার প্রতিশ্রুতিও দিয়েছেন।

ইউক্রেন ও ইউরোপের ফলাফলে ট্রাম্পের বড় ভূমিকা রাখার ক্ষমতা আছে। তিনি কিয়েভের সহায়তা কমিয়ে দিয়েছেন। তারপরও ইউরোপের নিরাপত্তায় আমেরিকার গুরুত্ব কমেনি। তারা এখনো ইউক্রেনকে গুরুত্বপূর্ণ গোয়েন্দা তথ্য ও অস্ত্র দিচ্ছে।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। ছবি: রয়টার্স
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। ছবি: রয়টার্স

মাদুরোকে আটকের পর ট্রাম্প প্রশাসন গ্রিনল্যান্ডকে ডেনমার্কের কাছ থেকে নেওয়ার আলোচনা নতুন করে উস্কে দিয়েছে। এতে ন্যাটোর ভবিষ্যৎ ঝুঁকির মুখে পড়েছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ১৯৪৯ সালে ইউরোপে মস্কোর প্রভাব ঠেকাতেই এই জোট গঠন করা হয়েছিল।

হানা নোটে বলেন, ট্রাম্প যদি সত্যিই গ্রিনল্যান্ড দখল করেন, তবে ন্যাটো শেষ হয়ে যাবে। এটা রাশিয়ানদের জন্য অকল্পনীয় খুশির সংবাদ হবে।

পুতিন বছরের পর বছর ধরে আমেরিকাকে তার মিত্রদের থেকে আলাদা করার চেষ্টা করছেন। এমন ফাটল ধরলে ইউরোপে রাশিয়ার ক্ষমতা বাড়বে। সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর ইউরোপের অনেক অংশে হারানো প্রভাব ফিরে পেতে চায় ক্রেমলিন।

ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধে মার্কিন নেতৃত্বে আলোচনার মধ্যেই ব্রিটেন ও ফ্রান্স নতুন সিদ্ধান্ত নিয়েছে। শান্তি চুক্তি হলে তারা ইউক্রেনে সেনা পাঠাতে রাজি হয়েছে। এর উদ্দেশ্য রাশিয়ার পুনরায় আক্রমণ ঠেকানো। মস্কো এই প্রস্তাব সাথে সাথে প্রত্যাখ্যান করেছে। এর গুরুত্ব বোঝাতে গত শুক্রবার পশ্চিম ইউক্রেনে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সীমান্তের ঠিক কাছে রাশিয়া ‘ওরেশনিক’ নামের পারমাণবিক ক্ষমতাসম্পন্ন ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে।

ইউক্রেনের সাবেক সেনাপ্রধান ও বর্তমানে ব্রিটেনে নিযুক্ত রাষ্ট্রদূত ভ্যালেরি জালুঝনি ক্ষেপণাস্ত্র হামলার বিষয়ে বলেন, রাশিয়া যুদ্ধ শেষ করার প্রস্তুতি নিচ্ছে না। তারা ইউক্রেনে দীর্ঘমেয়াদি অচলাবস্থার প্রস্তুতি নিচ্ছে।

ইউক্রেনের অনেকের কাছে মনে হয়েছে, পুতিন দেশের বাইরে নিজের দুর্বলতা ঢাকতে ঘরের কাছে শক্তি দেখাচ্ছেন।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক মাইকোলা ডেভিডুউক বলেন, পুতিন লাতিন আমেরিকায় কিছু করতে পারেননি। ট্রাম্পের বিরুদ্ধেও কিছু করার ক্ষমতা তাঁর নেই। তাই তিনি ইউক্রেনে আঘাত করেছেন। তিনি ভূ-রাজনীতিতে দুর্বল হয়ে পড়েছেন।

দ্য নিউইয়র্ক টাইমস থেকে অনুবাদ করেছেন তুফায়েল আহমদ।

Ad 300x250

সম্পর্কিত